প্রজাপতির দুটো ডানার দুটো ভিন্ন রং! 

করেছে Rodoshee

লেখাঃ তাহমিনা জ্যোতি 

ছবিঃ সংগৃহীত

তারেক এবং মিলির বিয়ের তিন মাস হলো। বিয়ের আগে ছয় বছরের প্রেমের সম্পর্ক। বন্ধুমহলের কাছে শ্রেষ্ঠ জুটি হিসেবে পরিচিত। নিজেদের কাছেও মনে হয়েছে তারা একজন অন্যজনকে খুব ভালো বুঝতে পারে। তাই দুই পরিবারের মতেই বিয়েটা হয়। কিন্তু বিয়ের পরই শুরু মতের অমিল। মিলির একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস। অন্যদিকে তারেকের সকাল শুরু হয় মর্নিং ওয়াক দিয়ে। রাতে মিলির কোনো উপন্যাসের পাতায় চোখ না বোলালে ঘুম আসে না। আর তারেকের সকালে অফিস, তাই তাকে আগে আগে শুয়ে পড়তে হয়। ল্যাম্পের আলোতে যখন মিলি উপন্যাস পড়ে, তখন সেই আলোকেই তারেকের কাছে ঘুমের শত্রু বলে মনে হয়। এমনি করে দুপুরে কী রান্না হবে তা থেকে শুরু করে তারেক অফিসে কী পরে যাবে, মিলির বোনের বিয়েতে কী গিফট দেওয়া হবে এসব ছোট ছোট বিষয়ে দেখা দেয় মতের অমিল। একটা সময় সেটা এতটাই প্রকট আকার ধারণ করে যে দুজনে আলাদা থাকার সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এক সময়ের পারফেক্ট জুটি এখন সম্পর্ক ভাঙনের উদাহরণে পরিণত হয়।
এই ঘটনাটি কাল্পনিক হলেও হরহামেশাই আমাদের সমাজের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। একটা সম্পর্কের শুরু যে রকমভাবে হয়, মাঝপথে গিয়ে সেটা আর একরকম থাকে না। দুটি মানুষ যখন একসঙ্গে এক ছাদের নিচে বসবাস শুরু করে, তখন একে অপরকে ভালোভাবে জানার, ভালোভাবে দেখার সুযোগ মেলে। একজন আরেকজনের পছন্দ-অপছন্দগুলোর সঙ্গে খুব কাছ থেকে পরিচিত হয়। তখনই বের হয়ে আসে তাদের মতের অমিলগুলো। আর যখন সঙ্গীর এখনের এই অমিলের সঙ্গে পূর্বের আচার-আচরণের মিল খুঁজতে যাওয়া হয়, তখনই পার্থক্যগুলো ধরা পড়ে। এতে দেখা যায় দুজনই সম্পর্কের প্রতি হতাশ হয়ে পড়ে। তাই দুজনই সম্পর্কের এই জটিল সমীকরণ থেকে মুক্তি খুঁজে বেড়ায়।

কেন এই মতের অমিল
আমাদের প্রতেকের পারিবারিক বন্ধন আলাদা। প্রতিটি পরিবারেই কিছু নিজস্ব সত্তা রয়েছে। পরিবারেই মানুষগুলো সেই সত্তার বাহক। দুটি ভিন্ন পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা মানুষ যখন একসঙ্গে এক ছাদের নিচে বসবাস শুরু করে তখন তাদের নিজস্ব সত্তাগুলো বের হয়ে আসে। প্রত্যেকেই চায় তার নিজস্ব সত্তাকে টিকে রাখতে। তাই একজন আরেকজনের উপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া শুরু করে। যার উপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় তার কাছে মনে হয় সঙ্গী তাকে ডমিনেট করছে। এই নিয়ে শুরু হয়ে যায় একে অপরকে দোষারোপ করা। আবার একটা নতুন সম্পর্ক যখন শুরু হয়, তখন একজনের উপর আরেক জনের আশা অনেক বেশি থাকে। সেই আশা যখন সঠিকভাবে পূরণ হয় না, তখনই দুজনের দুজনের প্রতি হতাশ হয়ে পড়ে। মতের অমিলগুলোই সম্পর্ক ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
করণীয় কী?

সংসার একটি দুই চাকার যানের মতো। এটিকে চালিয়ে নিয়ে যেতে হলে দুটি চাকাকেই একসঙ্গে চলতে হবে। স্বামী এবং স্ত্রী হলো সংসারের দুটি চাকা। সংসারকে সুন্দর করে রাখতে হলে দুজকেই সমানভাবে অংশগ্রহণ করে যেতে হবে। একজন আর একজনের মতের গুরুত্ব দেওয়া শিখতে হবে। ঠিক তেমনিভাবে একজন আরেক জনের ভুলগুলো শুধরে দেওয়াও শিখতে হবে। স্বামী- স্ত্রী একজন আরেক জনের কাজের মূল্যায়ন করা, প্রশংসা করা, উৎসাহ দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি সুন্দর সম্পর্কের সূচনা হতে পারে। একসঙ্গে থাকতে গেলে মতের অমিল থাকবেই। সেই অমিলগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাই হলো বিচক্ষণতার পরিচয়। খেয়াল রাখবে যেন সম্পর্কটা দুজনের কাছে বোঝা মনে না হয়। তোমার কাছে সঙ্গীর যেই জিনিসটা ভালো লাগবে না, সেটা তাকে বুঝিয়ে বলো। তেমনিভাবে সঙ্গীর অপছন্দের জিনিসের চেয়ে নিজেকে বের করে আনার চেষ্টা করো। সঙ্গীর কাজের উৎসাহ দাও। সঙ্গী তোমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তাকে সেটা বুঝতে দাও। একজন আরেকজনের গুরুত্বটা ঠিকমতো বুঝতে পারলেই তারা একে অপরকে সম্মান করা শিখবে। মতের অমিলগুলোকে দূরে ঠেলে মত গ্রহণের মানসিকতাই সম্পর্ক সুন্দর রাখতে সহায়তা করে।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

nineteen + 11 =