প্রতিটি দিন বাংলার, বাঙালিয়ানার

করেছে Rodoshee

লেখা : শারমিন শামস্

বৈশাখ কি রঙের নাম? বৈশাখ কি গন্ধ? বৈশাখ কি শুরু? কিসের শুরু? জীবনের? নতুন বছর মানে তো শুরুই। কেমন করে শুরু? আনন্দে? সবার বছর সুখে শুরু হয়? তাই কি হয়! কেউ কেউ তো আছেই, অশ্রুর ধারাপাতে যার পহেলা বৈশাখ কাটে। আপনজন চলে যায়, নতুন-পুরোনোর হিসাবের বাইরে। সংসারের দৈনন্দিনের হালখাতায় তার আর কিছু যায় আসে না। কত সংসার ভেঙে যায় বৈশাখেই। বৈশাখের ভেতরে তখন শুধু খররোদ, রং নেই কোনো, গন্ধহীন। এমন বৈশাখও তো আসে জীবনে, কোনো কোনো জীবনে। কত বৈশাখ অভাব-অনটনের, বেকারত্বের, দুশ্চিন্তার। কত বৈশাখ বিরহের। পাহাড়ের উপরে ছাইরঙা মেঘ উড়ে যায় মেঘদূত। সেসব বৈশাখের মেঘ। তবু বিরহ যার, সে শুধু মেঘটাকেই দেখে। বৈশাখকে ভুলে যায়। হায়! তুমি আমার জীবনে না এলে আমি এই মেঘ চিনতুম না গো!

বৈশাখ তো খরতার রূপও, শুধু নতুনের নয়। রুদ্র রুক্ষ খরতপ্ত। বৈশাখী বিকেলের মতো ঝা ঝা আমাদের নতুনের স্বপ্ন। উত্তাল, লড়াই লড়াই ঘ্রাণ, লড়াই করে সব জিতে ছিনিয়ে আনার বাসনা। তারুণ্য-বৈশাখ তো তরুণই, তরুণীই। বৈশাখ আগুনের হলকা।

আমি বৈশাখকে কবে চিনলাম। শৈশবে? যখন হুটহাট ঝড় হতো বিকেলের বারান্দায়। পদ্মাপারের ফ্ল্যাটবাড়ি ঢেকে যেত বালির সমুদ্রে। শো শো আওয়াজে বুঝতাম, উনি আসছেন। ডাকি আর নাই ডাকি, রুদ্রমূর্তি অতিথিনারায়ণ এসে পদধূলি দিলেন। এমনই সেই ধূলি, বাড়িসুদ্ধ লোকে মিলে ঝেঁটিয়েও বিদায় হয় না। কালবৈশাখী। হাহাকার অন্ধকার হয়ে বাতাসের ডুবসাঁতারের সঙ্গে যুগলসন্ধি করে। বেশ একখানা ব্যাপার বটে। তারপর প্রতিবেশীর বাড়ির কাঁচা আম কাসুন্দি আর লবণে মরিচে মেখে..উফ্ জিভ জ্বলে গেল, জলেও ভরে গেল। অমৃত! দুই ঘণ্টার তা-বের পর অতিথির দান অমৃত পেয়ে আমাদের মনখুশ। আহা কাঁচামিঠে আম। আহা ঝরাপাতা আমি তোমারই দলে!
তো সেই আম চাখতে চাখতে, ঝড়পরবর্তী লোডশেডিংয়েই তাহার সঙ্গে দেখা। সদ্য কৈশোর প্রেমে পাখা মেলে। এর নাম বৈশাখী ভালোবাসা। ঝড়ের পরে। কিন্তু বৈশাখ তো প্রেমের ঋতু নয়। প্রেম তো এসে চলে গেছে নীরবে, গত ফাল্গুনে। চৈত্রে তাহাকে মনে পড়ে পড়ে আমার গা ঝাড়া দিয়ে উঠবার কথা বৈশাখের দিনে- নতুন বছরে। প্রেম-অপ্রেম ব্যর্থতা পরাজয় সব ভুলে যাবার জন্যই না নতুন বছর আসে প্রতিবার। তাও কেন বৈশাখে আবারও সবকিছু ঘুরেফিরে আসে? জীবনের চক্রটা বৈশাখে এসে নতুন করে দম নেয় জোরে, তারপর ফের ছুটতে থাকে ছুটতে থাকে। এর নাম জীবন, চক্রে চক্রে বাধা। পুরোনোকেই নতুন করে ঘুরিয়ে-টুরিয়ে বেঁচে থাকার যন্ত্রণাকে গর্তে ফেলে জীবনটাকে আবার শাণিয়ে নিতে হয়। না হলে আর কিসের মনুষ্যজীবন। তাই বৈশাখ আসে, ঝড়ের মতো, প্রেমের মতো, তোমার মতো। তুমি কি বৈশাখ?

রমনার বটমূলে, ছায়ানটের আয়োজনে, রবিঠাকুরের সুরে ঝংকারে আমরা বৈশাখকে আদরে সাজাই। তার খোঁপায় বাঁধি ফুল। পরনে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। আমার বাড়ি এসো বৈশাখ, বসতে দেব পিঁড়ে। পান্তা ইলিশের হুজুগে বাঙালিত্বও করব আমি। করলামই নাহয়। নাহয় কিনলুম একখানা বড়সড় ইলিশ। না হয় খেলুম পান্তায় মেখে। এই বাংলার লাখ লাখ মানুষ যা পালন করছে সাগ্রহে, একটি বাংলা বছরকে স্বাগত জানাতে, সে পালনে আমার ক্ষতি নেই কোনো। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত জীবনে ক্ষণিক এই ইলিশ উৎসব আনন্দ দেয় যদি, হোক তবে আনন্দই হোক।
ভোর ভোর ঘুমভাঙা চোখে সেজেগুজে উৎসবের কাফেলা চলেছে চারুকলার দিকে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় আমাদের তরুণ শিল্পীরা কি রেখেছে এবার আমাদের অবাক করে দিতে, দেখা চাই। ওরা তো ঘুমায়নি কয়েক রাত। হাসিমুখে রাতজাগা চোখে এঁকেছে আমাদের জীবন, সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য আর বাঙালিত্বকে। আমাদের সত্তাকে। এই বিস্তৃত শোভাযাত্রা আমাদের নিয়ে যাবে আমাদের আত্মোপলব্ধির দিকে, আমাদের ঐক্যের দিকে, আমাদের সম্মিলিত শক্তির দিকে। এই বোধ যদি জেগে ওঠে ভোরের শোভাযাত্রায়, ছায়ানটের গানে, তরুণীর খোঁপায়, তরুণের পাঞ্জাবিতে, শিশুর ইলিশ ভাতের প্লেটে, যদি আমাদের প্রাণের গভীরে সারা দিনমান বাজে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’; যদি আমরা ফের যাত্রা করি শুরু- আমাদের আত্মার দিকে, আমাদের শিকড়ে- তবে জানব ভয় নেই। একদম ভয় নেই কোনো। বৈশাখ তুমি প্রেম দিও, দ্রোহ দিও, রুদ্রতপ্ত বিপ্লব দিও, ভালোবাসা আর অনুভব দিও। বৈশাখ তুমি সাহস, শক্তি আর আত্মবিশ্বাস দিও। যেন আমরা হালখাতাজুড়ে লিখে রাখি প্রতিবার, আমার প্রতিটি দিন বাংলার, বাঙালিয়ানার এবং আমার সবটুকু বাংলাদেশের। আর বাকি যা কিছু, বেদনা, বিমর্ষতা, পরাজয়ের স্মৃতি, যা কিছু অশ্রুবাষ্প আমার- সব সুদূরে মিলাক।

বৈশাখ, ঘরে এসো, তোমাকে আদরে আদরে বরণ করি। তুমি নতুনের দূত, তুমি পুরাতনের সান্তনা, তুমি উৎসব- তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা!

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

one × three =