প্রযুক্তি এবং প্যারেন্টিং

করেছে Sabiha Zaman

মাহফুজ রহমান: দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির গুরুত্ব সীমাহীন। বলা যেতে পারে আমরা প্রযুক্তি দ্বারা সর্বদাই পরিবেষ্টিত। কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার, প্রযুক্তি পাগলা ঘোড়ার মতো। পাগলা ঘোড়াকে বশীভূত করতে পারলে প্রয়োজনীয় গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে, আবার ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে যেকোনো মুহূর্তে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে।

মনে রাখা দরকার

প্রযুক্তি জগতের গুরু তারা সাধারণত তাদের সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক সতর্ক থাকেন। যেমন স্টিভ জবস তার সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহার একটা সীমানার মধ্যে রাখতেন, এমনকি তাদের আইপ্যাড ব্যবহার করার অনুমতি দিতেন না। যেহেতু আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার বলতে মূলত ফেসবুক, ইউটিউব, মেসেঞ্জার, মোবাইল গেমস, কলিং এন্ড চ্যাটিং, মেসেজিং এগুলোকে বেশি বুঝে থাকি, তাই আমাদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার।

সমস্যা

১. সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাপারে সাবধান

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে একটি প্রতারণা কৌশল, যার মাধ্যমে যে কোনো অসৎ লোক ব্যক্তিগত তথ্যাদি চুরি করে অন্য ব্যক্তির নামে নানা ধরনের অপরাধ করে বসতে পারে। তাই ইন্টারনেটে থাকা অবস্থায় যেকোনো জায়গায় ক্লিক করার আগে সতর্ক থাকুন। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ পারসেন্ট ছেলেমেয়ে তাদের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই তাদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রতারক চক্রের কাছে সমর্পণ করছে এবং পরে অপরাধ না করেও ফাঁদে পড়ছে।

২. অতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ

মনোবিজ্ঞানী ল্যারি রোজেন ও তার টিমের গবেষণায় উঠে এসেছে, স্ক্রিনের সামনে আমাদের কাটানো সময়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের।

সাবির

৩. নিয়ন্ত্রণহীনতা

আমাদের জীবন আর এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আমরা এখন এটা কম ভাবি যে কিসে আমাদের ভালো লাগবে বা কোন বিষয়টা আমরা উপভোগ করব। বরং আমরা এটা এখন বেশি ভাবছি যে কিসে আমাদের সুন্দর দেখাবে। কোন ছবিটা দিলে আমরা বেশি লাইক পাব। ক্ষণিকের জন্য কিছু নিয়ে আমরা খুশি হলেও, সব সময় অস্থির থাকি।

৪. বাস্তব জগৎ থেকে সরে যাওয়া

শিশুদের মানসিক বিকাশ খুবই দরকার। শিশুদের জন্মের পর বেশ কয়েক বছর তাদের মস্তিষ্কের উন্নয়ন মূলত বাস্তব-জগতের মানুষ ও বিভিন্ন বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আমরা মা-বাবা প্রযুক্তিতে ডুবে থাকছি এবং তাদের সময় দেওয়ার বিড়ম্বনা থেকে নিজেদের বাঁচাতে তাদের হাতেও ধরিয়ে দিচ্ছি মোবাইল ফোন বা ভিডিও গেমস। আমাদের ধ্বংসযাত্রায় আমরা আমাদের সন্তানদেরও শামিল করছি।

৫. সহমর্মিতা ও সহানুভূতির ব্যাপক অবনতি

আরেকটি ভয়ংকর যে ঘটনা ঘটে থাকে, সেটি হলো সহমর্মিতা ও সহানুভূতির ব্যাপক অবনতি। মানুষগুলো আসল হলেও, চারদিকে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ ও অগভীর সম্পর্কের কারণে কেউ কারও অনুভূতি নিয়ে এখন আর মাথা ঘামায় না। মানুষকে অনলাইনে আঘাত করা সহজ।

৬. পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা

পর্নোগ্রাফির জন্য এখন আর পর্নো সাইটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে গেছে পর্নোগ্রাফিতে। পর্নোগ্রাফি ব্যাপারটি বেশ পুরোনো হলেও আগে এগুলো এত সহজলভ্য কখনোই ছিল না। সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি, সুখের উন্মাদনা, অজস্র কৃত্রিমতা, বাস্তব জীবনে অস্বাভাবিক মানসিক চাপ এগুলোর পাশাপাশি পর্নোগ্রাফির ব্যাপক ছড়াছড়ি সামগ্রিকভাবে আমাদের একটি সহিংস ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, এতে সন্দেহ নেই।

এ অবস্থায় আমরা কী করতে পারি?

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (এএপি) শিশুদের এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। প্রযুক্তির প্রভাব পৃথিবীতেই সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, আশা করছি এই নির্দেশনাগুলো আমাদের দেশের মানুষের ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক হবে।

নিজে প্রযুক্তি ব্যবহারের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে ওঠো

সন্তানেরা অন্তত একটা বয়স পর্যন্ত তাদের মা-বাবাকে অনুসরণ করে। তাই তাদের কোনো কাজ করাতে চাইলে আগে নিদর্শন দেখাতে হয়। মা-বাবা হিসেবে উদাহরণ সৃষ্টি করতে না পারলে শিশুদের কাছে আদেশগুলোকে তথাকথিত লেকচার ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় না। তাই মা-বাবাকে প্রযুক্তি ব্যবহারের আদর্শ দৃষ্টান্ত হতে হবে সন্তানের কাছে।

মুখোমুখি যোগাযোগে উৎসাহ দাও

ছোট শিশুদের (দুই বছর বা তার কম) ক্ষেত্রে মুখোমুখি বসে কথা বলা, বিভিন্ন জিনিস নিয়ে গল্প করা, খেলার ছলে বিভিন্ন ধরনের কাজ করা খুবই উপকারী হতে পারে। এ সময় প্রযুক্তি ব্যবহারে তাদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। সুতরাং ছোট শিশুদের সঙ্গে কথা বলো, শারীরিক চর্চা হয় এমন কিছু করো।

সন্তানের সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করো

সন্তানকে ডিভাইস দিয়ে বসিয়ে না দিয়ে ভালো কন্টেন্ট একসঙ্গে দেখো, নিজে শেখো, তাকে ব্যাখ্যা করে শোনাও, তার মতামত জানতে চাও। সন্তান প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে থাকলে তার কাছ থেকে শিখতে পারো।

যেকোনো অ্যাপস ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগে নিজে গবেষণা করো

অ্যাপস বা টিভি চ্যানেল শিশুকে ব্যবহারের জন্য দেওয়ার আগে, সেটা শিক্ষণীয় কি না বা কতটা শিক্ষণীয়, সেটি বোঝার চেষ্টা করো। অ্যাপস বা টিভি চ্যানেলটি বিনোদনধর্মী হলে সেটি শিশুদের বিনোদন হিসেবে যথোপযুক্ত কি না, সে ব্যাপারে মা-বাবা হিসেবে আগে ভালো করে জানার চেষ্টা করতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত রাখো এবং ‘যেমন খুশি তেমন’ খেলাধুলায় উৎসাহিত করো

আধুনিক নিউরোসায়েন্স গবেষণায় দেখা গেছে যে মোবাইলে বা কম্পিউটারে একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলায় খেলাধুলা করার চেয়ে ফ্রি বা ‘যেমন খুশি তেমন’ খেলাধুলায় আমাদের সন্তানদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।

অনলাইন এবং অফলাইন জীবনের ভারসাম্য সৃষ্টি

আমরা এখন প্রযুক্তি নিয়ে অনেক ব্যস্ত, তাই বাস্তব জীবনের দিকে অনেকেই উদাসীন। সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা যাতে অনলাইন আর অফলাইন জগৎ দুই সামাল দিয়ে চলে তাই খেয়াল রাখো,
শিশুর প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন?
কত ঘণ্টা পেশাগত কাজে সময় দেওয়া প্রয়োজন?
পরিবারের সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, গল্পগুজব, ভাববিনিময়ের জন্য কতটুকু সময় রাখবে?
কতটুকু সময় দেবে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার জন্য?
কতটুকু সময় রাখবে বাস্তব দুনিয়ায় তোমার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য?
এই বাস্তব, অতি প্রয়োজনীয় কাজগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করার পর নিজেই বুঝতে পারবে কতটা সময় সোশ্যাল মিডিয়া বা মোবাইল ফোনের জন্য দিতে হবে।

বাসায় প্রযুক্তিমুক্ত এলাকা তৈরি

বাসায় বা বাড়ির নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। যেমন শোবার ঘরে ঘুমানোর সময়, যখন পরিবারের সবাই এক জায়গায় বসে গল্প করে তখন, বা সবাই যখন একসঙ্গে খেতে বসে বা একসঙ্গে কোনো বিনোদনধর্মী প্রোগ্রাম দেখার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।

পারিবারিকভাবে ‘নো স্ক্রিন’ সময় নির্ধারণ করো

রাস্তায় হাঁটার সময়, গাড়িতে করে কোথাও ভ্রমণ করার সময়, স্কুলে যাওয়ার সময়, ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে, খাবার সময় ও পারিবারিক আড্ডায়, শোবার ঘরে ঘুমাতে যাওয়ার সময় মোবাইল বা যেকোনো স্ক্রিনে চোখ রাখা থেকে বিরত থাকো।

সন্তানের সময় ও পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করো

যুগের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন সময় টিনএজ সন্তানের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। স্কুল থেকে দেওয়া হোমওয়ার্ক সমাধানের জন্য তাকে প্রযুক্তির সহায়তা নিতে হবে। তাকে নির্দিষ্ট সীমায় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দিতে হবে। শুধু খেয়াল রাখতে হবে অনলাইনে তারা কী কন্টেন্ট ব্যবহার করছে, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোন ধরনের তথ্য শেয়ার করছে। এটা ঠিক গোয়েন্দাগিরি নয়, এটা আগেভাগেই তাকে জানিয়ে দাও যে সে যথেষ্ট বড় না হওয়া পর্যন্ত তুমি তার অনলাইন কার্যক্রম পুরোটাই জানার অধিকার রাখবে।


মাহফুজ রহমান
পিএইচডি গবেষক (কম্পিউটার সায়েন্স, নিউরোসায়েন্স)
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি
আটলান্টা, জর্জিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।
এবং অ্যাডমিন-প্যারেন্টিংয়ের পাঠশালা।

ছবি: রোদসী ও ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

10 − three =