প্রেমের বিয়ে ভালোবাসা কি হারিয়ে যায়?

করেছে Wazedur Rahman

প্রেম- খুব ছোট্ট একটি শব্দ। একটি দ্বৈত সম্পর্ক। দুজন মানুষের পূর্ণ অংশগ্রহণের সম্পর্ক। প্রেম সুন্দর, প্রেম পবিত্র। কিন্তু প্রেমের সম্পূর্ণটাই আনন্দদায়ক নয়। প্রেমে ব্যর্থতার গল্প হয়তো সাফল্যের গল্পের চেয়ে অনেক বেশি শোনা যায়। আবার বিয়ের পরে প্রেম হারিয়ে যায়, এমনটাও খুব সাধারণ।

জীবনের বিভিন্ন ব্যস্ততার ভিড়ে প্রেম হারিয়ে গেলেও আমাদের মধ্যে অনেকেই সেটাকে স্বাভাবিক মনে করে নিয়ে চলতে থাকি। কিন্তু আমরা এটা চিন্তা করি না যে বিয়ের পরেও প্রেম সম্ভব। শুধু তা-ই নয়, বিয়ের পরে প্রেম বেড়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। শুধু একটু চেষ্টার প্রয়োজন।

বিয়ে মানে নতুন করে শুরু করা

কৈশোরে যখন প্রেমের প্রথম ছোঁয়া লাগে মনে, তখন সবকিছুই সুন্দর মনে হয়। এমনকি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনেকেই ভুল-ঠিক এর বিচার-বিবেচনাও করতে পারে না। পরিবার থেকে বাধা এলেও মনে হয় মনের মানুষটা সঙ্গে থাকলে সব বাধাই পেরোনো সম্ভব। তারুণ্যে পা দিয়ে প্রেম, গল্পের বই ও সিনেমা থেকে বেরিয়ে এসে একটু একটু করে বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে থাকে। কিন্তু সেই সঙ্গে বিয়ে নিয়েও চলতে থাকে নানা ধরনের পরিকল্পনা ও স্বপ্নের জাল বোনা।

সেই সময় মনে হয় যেন কোনোভাবেই এই প্রেম হারাতে পারে না। বরং বিয়ে করতে পারা মানেই প্রেমের সফলতা। কিন্তু সবাইকে বরাবরই ভুল প্রমাণ করে দিয়ে বিয়েই প্রেমের সঠিক রূপটি চিনতে মানুষকে সাহায্য করে। না, সেটা সব সময়ই নেতিবাচক হয় না। বরং, এমন অনেক স্বামী-স্ত্রী রয়েছে যারা প্রেম করে বিয়ে করলেও বিয়ের পরই সঙ্গীকে পুরোপুরিভাবে বুঝতে পারে, যেটা সম্পর্কটাকে আরও মজবুত করে তোলে।

যা করতে হবে

সাইকোলজি টুডে ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে যে, বিশেষজ্ঞদের মতে শরীরের বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের কারণেই দুজন নারী-পুরুষ একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আফসোস এই যে এই আকর্ষণ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফুরিয়েও যায়। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ স্বামী-স্ত্রী ‘এটাই স্বাভাবিক’-  এ রকম মনে করে চলতে থাকে।

আর সাধারণ মতামত দাঁড়ায়, বিয়ে মানেই ঝামেলা, বিয়ে মানেই অসুখী জীবনের শুরু। কিন্তু তা-ও বিয়ে করা বন্ধ হচ্ছে না। একই সঙ্গে ডিভোর্সও বন্ধ হচ্ছে না। অর্থাৎ যারা বিয়ের পরে প্রেমের হারিয়ে যাওয়াকে স্বাভাবিক মেনে নিয়ে আপস করে চলতে পারে না, তারা এই বিচ্ছেদের রাস্তাটি বেছে নেয়। অথচ এতটা নেতিবাচক না হয়ে, ভিন্ন কিছু চেষ্টা করাই যায়। সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ দিতে হয়।

ইমোশনাল ফিটনেস এক্সপার্ট ড. বার্টন গোল্ডস্মিথ বলেন, ভালোবাসা হারিয়ে যায় না, শুধু প্রাথমিক আকর্ষণটা মিইয়ে যায়। আর এই মিইয়ে যাওয়া আকর্ষণকে ফিরিয়ে আনার জন্য বেশির ভাগ স্বামী-স্ত্রী শারীরিক সম্পর্কের আশ্রয় নিয়ে থাকেন।

কিন্তু সেটিও সঠিক সমাধানের পথ নয়। এটা ঠিক যে একটা সম্পর্কে শরীর ও মন দুই-ই একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। একটিকে বাদ দিলে অন্যটি অর্থহীন। তাই দুটিকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু হারিয়ে বা মিইয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে ফিরিয়ে আনার জন্য শারীরিক সম্পর্ক কোনো সমাধান নয়। বরং নিত্যনতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই জীবনে বৈচিত্র্য আনা উচিত।

সঙ্গীকে সঠিকভাবে জানতে পারা এবং বুঝতে পারা খুবই জরুরি। আর অবশ্যই উভয়ের মতামত ও রুচিকে একই রকমভাবে প্রাধান্য দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা মানেই নতুন নতুন রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া বা শপিং করা নয়। বরং এমন কিছু করা যাতে দুজনেই একান্তভাবে একজন আরেকজনকে সময় দিতে পারে। হতে পারে সপ্তাহের কোনো একদিন দুজনে মিলে একসঙ্গে রান্না করা কিংবা নতুন কোথাও বেড়াতে যাওয়া।

মনে রাখবে, দুজনে মিলে একসঙ্গে নতুন কোনো অভিজ্ঞতা অর্জন নিজেদের মধ্যে সম্পর্ককে আরও মজবুত করে তোলার সবচেয়ে উপযোগী উপায়। কিন্তু এই ধরনের যে কোনো কাজের ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় দুজনের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। একজনের ভালো লাগে বলেই সেটা আরেকজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আবার অন্যের কোনো রকম অসুবিধা হয়, এমন কিছুও করা যাবে না।

আমরা বিয়েকে দোষ না দিয়ে বা ‘সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়’- এ রকম কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে যদি নিজেদের মধ্যকার ভুল-বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা করি, তাহলেই বেশির ভাগ সমস্যা শেষ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন যে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মতামত বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালো লাগা খারাপ লাগা এই অনুভূতিগুলো সরাসরি প্রকাশ করলে সমস্যা হওয়ার আগেই সেটাকে এড়ানো যায়।

যা করা যাবে না

আজকের যুগে প্রায় সব পরিবারেই স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরি করে। সে ক্ষেত্রে ব্যস্ততা ও স্ট্রেস দুজনেরই সমান। সুতরাং কখনোই সঙ্গীর কাজকে ছোট করে দেখা যাবে না, বা সঙ্গীর ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করা যাবে না। ব্যস্ততায় সকালের নাশতা প্রায়ই হয় না। তাই দিন শেষে চেষ্টা করো যেন একসঙ্গে রাতের খাবারটা খাওয়া যায়। আর অবশ্যই এ সময় মুঠোফোনটি বন্ধ রাখো।

সন্তানের দায়িত্বটিও ভাগাভাগি করে নিতে হবে যেন সে উপেক্ষিত বোধ না করে, আবার স্বামী বা স্ত্রী কোনো একজনের ওপর চাপ না পড়ে। সন্তান দুজনেরই আর তাকে সময়ও তাই দুজনেরই দিতে হবে। বাবা-মা উভয়েরই প্রয়োজন একটি সন্তানের সুষ্ঠুভাবে বড় হয়ে ওঠার জন্য।

স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভুল-বোঝাবুঝির শুরুটা প্রায়ই তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কারণে ঘটে থাকে। সেটা হতে পারে প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী বা আত্মীয়-পরিজন। একটা কথা মনে রাখবে, দিন শেষে তোমরা দুজনই নিজেদের সবচেয়ে কাছের মানুষ। বিশ্বাস যে কোনো সম্পর্কে যেমন সবচেয়ে জরুরি, তেমনি সবচেয়ে সংবেদনশীলও। সেই সঙ্গে অযথা অন্য কারও সঙ্গে নিজের সঙ্গীর তুলনা করে তাকে খাটো করে দেখানো যাবে না। যে কোনো সমস্যাতেই চেষ্টা করো বাড়িতে নিজেদের মধ্যে সমাধান করতে।

বাইরের মানুষের সামনে কখনই সঙ্গীকে ছোট করা যাবে না। তর্ক-বিতর্ক খুব স্বাভাবিক, কিন্তু চেঁচামেচি করে অযথা নিজেকে ছোট করার কোনো মানে হয় না। বরং ধীরস্থিরভাবে যুক্তির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। আমরা অনেক সময়ই সেই বন্ধুটির সাহায্য চাই যে আমাদের বিয়ের আগের প্রেমের সময়টাতে আমাদের খুব কাছে ছিল। এটাও সব সময় ঠিক নয়। মনে রেখো, সেই বন্ধুটি কিন্তু বিয়ের পরে তোমাদের মাঝে গড়ে ওঠা নতুন সম্পর্কটাকে বুঝবে না।

সম্পর্ক যেমন দুজন মানুষ একসঙ্গে শুরু করে, ঠিক তেমনিভাবেই একসঙ্গে থেকেই পুরোনো প্রেমকে বছরের পর বছর নতুন রূপে জিইয়ে রাখতে পারে। সঙ্গীর প্রতি যত্নবান হওয়াটাই এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে জরুরি। তবে কোনোভাবেই ‘মানিয়ে নেওয়া’টা যেন একজনের দায়িত্ব না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। মানসিকভাবে একজনের পরাধীন বোধ করতে শুরু করার মাধ্যমেই সম্পর্কের অবনতির শুরু হয়। ভালোবাসা হারিয়ে যায় না, মানুষ নিজের ভুলের কারণেই তা হারিয়ে ফেলে।

লেখা : সোহেলী তাহমিনা 
ছবি: সংগ্রহীত 

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

three × 3 =