বঙ্গবন্ধু হত্যা: প্রতিবাদকারী হালিম দাদ খান

করেছে Sabiha Zaman

হালিম দাদ খান। জন্ম ১৯৫৫ সালের ৭ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলের ইটনা উপজেলার শিমুলবাঁক গ্রামে। হাওরের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা হালিম দাদ খান এ এলাকায় তৃতীয় গ্র্যাজুয়েট ও প্রথম স্নাতক এবং অদ্যাবধি তিনিই একমাত্র পিএইচডি ডিগ্রিধারী। ১৯৭৫-এ মুজিব হত্যার একজন প্রতিবাদী বীর, অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা, বলিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কৈশোরেই ছিলেন নিজ জেলায় ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

 

যার কিশোর বয়েসেই ঘটে রাজনীতির হাতেখড়ি। অংশ নেন ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে। এখান থেকেই শুরু হয় রাজনৈতিক পথচলা। তারপর আসে ৭০-এর নির্বাচন এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছেন। বয়স সবে ১৬ বা ১৭। মো. রওশন আলী রুশো তার মুক্তিযুদ্ধের রোজনামচা’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, অষ্টগ্রামের দুদিনব্যাপী এক যুদ্ধে সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন শিমুলবাঁক গ্রামের স্কুল-কলেজের বন্ধু হালিম দাদ খানকে। তিনি এতটাই ক্ষীণকায় ছিলেন যে তার হাতের রাইফেলটা বেশ বেমানান দেখা”ছিল।

১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন, ১৯৭২-এ সংবিধান রচনা। ১৯৭৩-এ সাধারণ নির্বাচন। ১৯৭৪-এ বন্যা-দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫-এ সামরিক অভ্যুত্থান, জেলহত্যা, সিপাহি অভ্যুত্থান। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার জন্য ১৯৭২-এ যে যাত্রাপথ শুরু হয়, ১৯৭৫-এর আগস্ট-অভ্যুত্থানের ফলে তার গতিপথ পরিবর্তিত হয়।

১৯৭২-১৯৭৫এ কালপর্বেই স্বাধীন বাংলাদেশের নবযাত্রার ভিত্তি স্থাপিত হয়। কালপর্বে গৃহীত ব্যবস্থাবলি ও সংঘটিত প্রধান প্রধান ঘটনার যথা পুনর্বাসন-পুনর্গঠন, দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সন্ত্রাস, দুর্যোগ-দুর্ঘটনা-অন্তর্ঘাত, আইনশৃঙ্খলা, সামরিক অভ্যুত্থান, মুজিব হত্যাসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি-প্রকৃতি প্রভৃতির বিবরণ, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিস্মৃতিপ্রবণ জাতির সমক্ষে উপস্থাপনের প্রয়াস থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫’ শিরোনামের বই লিখেছেন হালিম দাদ খান।

বইটির প্রথম প্রকাশ হয় ফাল্গুন ১৪১০, ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালে।

সঠিক পথে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার গতিকে দ্রুততর করার জন্য অতীতের বস্তনিষ্ঠ পর্যালোচনা অপরিহার্য। আলোচ্য কালপর্বটি নিয়ে যে পরিমাণ সমালোচনা হয়েছে, যথাযথ আলোচনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সে পরিমাণে হয়নি। সেদিক লক্ষ্য রেখেই এ গ্রন্থটি রচিত হয়েছে। আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইয়ের ফ্ল্যাপে এমনটাই লিখেছেন এই লেখক। বইটির প্রথম প্রকাশ হয় ফাল্গুন ১৪১০, ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালে।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এক ঘোর অন্ধকারের সময়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। দেশজুড়ে যখন স্তব্ধতা, ভয়-আতঙ্ক ঘিরে ধরেছে, তখন কিশোরগঞ্জের কিছু তরুণ সমস্ত ভয়ভীতি উপেক্ষা করে পথে নেমেছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে। সেই মিছিলেরই এক তরুণ-যুবা আজকের হালিম দাদ খান। প্রত্যন্ত এলাকার এক তেজি তরুণ, যার পদভারে সূচিত হলো একটি অবিস্মরণীয় ইতিহাস।

খোদ বাংলাদেশের সব মানুষ যখন নিজ কানে শুনল তাদের জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, থমকে গেছে পিতার হৃৎস্পন্দন, তখন খোদ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচরেরা নিশ্চুপ ছিলেন। নিশ্চুপ ছিল কোটি বাঙালির গোটা বাংলাদেশটাই। তখন হালিম দাদ খান পথে নেমেছিলেন পিতার খুনিদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে। প্রকৃত অর্থেই বিশ্বাস করেছিলেন পিতার হত্যার মধ্য দিয়ে লাখো জীবনের বিনিময়ে কেনা স্বাধীনতা খর্ব হবে।

 

প্রতিবাদ মিছিলেরই এক তরুণ-যুবা আজকের হালিম দাদ খান

১৫ আগস্ট সকালবেলা রেডিওতে বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘোষণা শুনে মনে দারুণ অবিশ্বাস জন্মেছিল তার। নাহ্।, এ হতেই পারে না। আসলেই এমন হয়েছে! বারবারই রেডিওতে একই ঘোষণা আসছে। তবে কি সত্যিই…বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে? সত্যিটা আসলে কী? মন প্রবল আক্রোশে ফেটে পড়তে চায়। অবিশ্বাস নিয়েই ঘরের বাইরে পা রাখেন। ছুটে যান রাজনৈতিক বন্ধুদের মিলনস্থল কিশোরগঞ্জ শহরের রংমহল সিনেমা হলের পাশে ছাত্র ইউনিয়নের অফিসের সামনে জাহিদের চায়ের দোকানে।

একজন-দুজন করে অবিশ্বাসী মন নিয়ে অনেকেই হাজির হয়েছিলেন সেদিন সেখানে। ঘর ছেড়ে বেরোনোর আগে সবারই মনে হয়েছিল জাহিদের চায়ের দোকানে গেলেই সবার সঙ্গে দেখা হবে এবং হয়েছিলও তাই। সেখানে এসেই দেখা হয়ে যায় প্রায়  ২০ জন সমমনা বন্ধুর। সেখানেই ঠিক হয় তাদের করণীয় সম্পর্কে। তাদের প্রত্যেকের মধ্যে স্ফুলিঙ্গ। চোখের তারায় ভাসছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানিরা এ দেশে অতর্কিতে আক্রমণ চালায়, তখন খুব সাহসে দু-একজন নেমে পড়েছিল মিছিলে। সেই মিছিলে একজন-দুজন করে যোগ হতে হতে তা পরিণত হয় উত্তাল জনমিছিলে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার দিনটিও তেমনি উত্তাল জনমিছিলে পরিণত হবে ভাবনায় একত্রিত হওয়া সেই ১৯-২০ জন তরুণ নেমে পড়েন প্রতিবাদ মিছিলে। দিতে থাকেন মুহুর্মুহু স্লোগান। কেউ একজন আওয়াজ তোলেন মেজর ডালিমের ঘোষণা মানি না মানি না।’মুজিব হত্যার পরিণাম, বাংলা হবে ভিয়েতনাম’ তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলান অন্য তরুণেরা। তাদের প্রতিবাদধ্বনি তরঙ্গায়িত হয়ে ভেসে যায় কিশোরগঞ্জ শহরের বাঁকে বাঁকে।

 

কিন্তু‘ তরুণদের প্রত্যাশা অনুযায়ী অন্য আর কারও অংশগ্রহণ বাড়ে না সেদিনের মিছিলে। সবাই উঁকিঝুঁকি দেয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে, রেডিও শোনে, কিন্তু‘ মিছিলে এসে দুকদম হাঁটে না, আওয়াজ তোলে না তাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার প্রতিবাদে। সেদিন এই  তরুণদের মিছিলে একজনও নেতৃস্থানীয় কেউ ছিলেন না। তারা যেমন ভেবেছিলেন অনেক বড়  মিছিল হবে, দীর্ঘ পথপরিক্রমা হবে, সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনায় সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছিল সেদিনের মিছিল।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে সারা দেশে মাত্র দুটি প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছিল।

 

তাদের মধ্যে ছিলেন ন্যাপের তরুণ নেতা ভূমেন্দ্র ভৌমিক দোলন (যিনি বর্তমানে গণতন্ত্রী পার্টির কিশোরগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি), কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি গোলাম হায়দার চৌধুরী, ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট আমিরুল ইসলাম, আবদুল হামিদ (যদিও তিনি তখন ঢাকায় এমপি হোস্টেলে ছিলেন।)

এই তরুণেরাই সেদিন দিকনির্দেশনার জন্য ছুটে গিয়েছিলেন রাজনৈতিক দলের বর্ষীয়ান নেতাদের কাছে। তারা কোনো দিকনির্দেশনাই সেদিন দিতে পারেননি বরং তারা বলেছিলেন, ‘বাবারা, তোমরা তরুণ, তোমরা ভেবে দেখো কিছু করতে পার কি না। আমরা এই দেখো ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি গ্রেপ্তারের জন্য।’অনেকে তাদের গালিগালাজও করেছেন। সেদিনের সেই প্রতিবাদ মিছিল তারা শেষ করেছিলেন এগারোটা নাগাদ। ততক্ষণে পুরো দেশ তথা বিশ্ববাসীই জেনে গিয়েছে সদ্য স্বাধীন দেশের কান্ডারিকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করেছে সেনারা। দেশের বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানেরা এই হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করতে শুরু করেছেন এক এক করে। তারা ঘোষণা করছেন খন্দকার মোশতাকের প্রতি আনুগত্য।

মিছিল নিয়ে যখন তারা আবার সেই জাহিদের চায়ের দোকানে ফিরে আসেন, তখন সেনাবাহিনীর টহলরত গাড়িও তাদের আশপাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের কাছাকাছি এসে থামিয়েও ছিল। নেমে  এদিক-ওদিক দেখে আবার চলে গিয়েছিল। এমন দেখেই তারা বুঝে নিয়েছিলেন তারা গ্রেপ্তার হতে পারেন। এ কারণেই তারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আত্মগোপনের কথা ভাবেন এবং তারা যে যার মতো করে বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে চলে যান। কথা হয় কিশোরগঞ্জ শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে তালজাঙ্গা গ্রামে তাদের জন্য জরুরি খবর দেওয়া থাকবে। এই তরুণদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা থাকলেও শেষ অবধি তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। সেই তরুণ প্রতিবাদীদের একজন ছিলেন হালিম দাদ খান।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে সারা দেশে মাত্র দুটি প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছিল। তার একটি কিশোরগঞ্জ জেলায় আর যারা এটি সংগঠিত করেছিলেন তাদের একজন আজকের হালিম দাদ খান।

অন্যটি বরগুনা জেলায়। বরগুনায় এসডিওসহ অন্যান্য অফিসার তাদের একজন ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভুসহ আরও অনেকে মিলে দৃঢ়ভাবে সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ চালিয়েছিলেন। সেই প্রতিবাদটি চলেছিল প্রায় তিন দিন অবধি। সেদিন এই প্রতিবাদের মূলমন্ত্র ছিল শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা। এই মহান নেতার সঙ্গে হয়তো অন্যান্য দলের মতানৈক্য ছিল, কিন্তু‘ ভালোবাসায় তিনিই ছিলেন মধ্যমণি।

হালিম দাদ খান বলেন, ‘সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন আমাদের প্রতিনিধি। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন ১৯৭২ সালে যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, সেখানে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সেখানে স্বাক্ষর করেননি। কারণ তিনি ও তার দল চেয়েছিল আরও ভালো সংবিধান। শেখ মুজিবের সাথে তাদের এই দূরত্বটুকু থাকলেও দলটি মনে-প্রাণেই ধারণ করত শেখ মুজিব হলেন স্বাধীনতার নেতা এবং তাকে হত্যা করা মানে স্বাধীনতার ওপর আঘাত। সেই আঘাত এই দেশ আজও বয়ে বেড়াচ্ছে।’

’৭৫-এর জানুয়ারিতে বাকশাল ঘোষণার ফলে বাকশালের নিয়মানুযায়ী দেশে আর কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নেই। সেই অর্থে সব রাজনৈতিক দল তখন বাকশালের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু‘ সেই তরুণ যুবাদের সবাই ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের একনিষ্ঠ কর্মী। দলের কোনো কাজ নেই, তখন ফলে সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকেন।

নিজের দেখা ১৯৭২-৭৫-এর প্রেক্ষাপট নিয়েই লিখেছেন বাংলাদেশের রাজনীতি নামক বইটি। একটি রাজনৈতিক পরিমণ্ডল নিয়ে লেখার স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত যুক্তি-বিশ্লেষণ সবটা নিয়ে এই বইটি। এই বইটি ঘিরে ২০১১ সালে তৈরি হয় ব্যাপক সমালোচনা। তার নেপথ্যের ঘটনা এমন, প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ২০১১ সালের মাঝামাঝিতে রচনা করতে শুরু করেন তার রাজনৈতিক উপন্যাস দেয়াল’। এই বইটির পটভূমিও সেই ১৯৭৫ সাল এবং তার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী ঘটনাসমূহ। এই উপন্যাসটি যখন তিনি লিখছিলেন, তখন এটি অন্যদিন’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। সে সময়ই সমালোচনার ঝড় ওঠে বইটিতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার বিবরণে তথ্যগত ভুল রয়েছে। এমন অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতের নজরে এনেছিলেন।

আদালত উপন্যাসটির সংশোধনের নির্দেশ দেওয়ার প্রশ্নে কারণ দর্শানোর নোটিশও জারি করেন এবং এই মর্মে আশাও প্রকাশ করেন যে বইটির ভুল সংশোধন করে বইটি প্রকাশ করা হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে জানিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিবরণে শেখ রাসেলকে হত্যার বর্ণনা সঠিকভাবে দেওয়া হয়নি। এবং বঙ্গবন্ধু হত্যায় মোশতাক আহমেদ জড়িত ছিলেন বলে সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে এসেছে কিন্তু‘ মোশতাক আহমেদ কিছুই জানতেন না, এমনটাই এই উপন্যাসে উঠে এসেছে।

আদালতের এমন অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে হুমায়ূন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, লেখার জন্য তিনি যে সোর্স ব্যবহার করেছেন, সে বইটার নাম বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫’ অর্থাৎ হালিম দাদ খানের বইটির কথাই তিনি বলেছেন।

কিন্তু‘আদালত যে যে অভিযোগ হুমায়ূন আহমেদের লেখায় এনেছিলেন, আর হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন ওই বিষয়গুলো তিনি হালিম দাদ খানের বই থেকে পেয়েছেন। সেটা ছিল ভুল। বইটিতে হালিম দাদ খান যেমন করে বিধৃত করেছেন আর হুমায়ূন আহমেদ তার উপন্যাসে যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তাতে রয়েছে বেশ খানিকটা পার্থক্য।

হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন ওই বিষয়গুলো তিনি হালিম দাদ খানের বই থেকে পেয়েছেন।

হালিম দাদ খানের ভাষ্যমতে, হুমায়ূন আহমেদ বইটির কোথাও তার বইয়ের রেফারেন্স ব্যবহার না করলেও তিনি যাদের রেফারেন্স ব্যবহার করেছিলেন, তাদের রেফারেন্স উল্লেখ করেছেন। কিন্তু‘ যখন ঘটনা বর্ণনায় ভুল ব্যবহার নিয়ে আদালত এবং পাঠকেরা সরব হলেন, তখন তিনি বললেন, বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫ বইটায় তিনি এই রকম তথ্য পেয়েছেন।

হালিম দাদ খান নিভৃতচারী একজন লেখক। মাত্র চার-পাঁচটি বই তিনি লিখেছন। ফলে সে সময়ের আলোচনায় উনি যখন তার বই নিয়ে, বইয়ের তথ্য নিয়ে তার নিজস্ব বিবৃতি তুলে ধরেন এবং পত্রপত্রিকায় পাঠান, কেউ সেটা আমলে নেয়নি। কেউ ছাপেনি লেখক হালিম দাদ খানের আত্মপক্ষ সমর্থনের সেই বিবৃতি।

নিভৃতেই করছেন লেখালেখি, সমাজসেবামূলক কাজ। আছেন হাওরবাসীর জনকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে, পবা আন্দোলনের সঙ্গে। এ ছাড়া আরও অনেক জনসেবামূলক কাজের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সুনামগঞ্জের দিরাই কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে। এরপর যোগ দিয়েছিলেন মুন্সিগঞ্জের কলেজে, পরে হয়েছিলেন প্রিন্সিপাল। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবেন না বলে আজকের বিকল্পধারার বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ওপর রাগ করে ছেড়ে দেন প্রিন্সিপালের পদ। তারপর চলে যান মালয়েশিয়া। সেখানে কাজের পাশাপাশি পিএইচডি করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ওপর। সেখান থেকে ফিরে এসে কাজ করেন নানান এনজিও প্রতিষ্ঠানে।

তিনি মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসার পরে মুক্তিযুদ্ধ ও গোলাম আযম’ নামে আগামী প্রকাশনী থেকে প্রথম বই লেখেন।

মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসার পরে মুক্তিযুদ্ধ ও গোলাম আযম’ নামে আগামী প্রকাশনী থেকে প্রথম বই লেখেন। বইটি লিখিত হয়েছিল রাজাকার গোলাম আযম দেশে ফিরে এলে এক ছাত্র পত্রিকায় একটি চিঠি লিখেছিলেন, সেই চিঠির ওপর ভিত্তি করে। দ্বিতীয় বই হলো বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫’ এবং তৃতীয় বই হলো মৈমনসিংহ গীতিকার সহজপাঠ’, চতুর্থ বই হলো মনিরুদ্দিন ইউসুফ’। এ ছাড়া রয়েছে কয়েকটি সম্পাদনামূলক বই। সামনের দিনগুলোতে আরও কিছু বই প্রকাশের অপেক্ষায় অনবরত লিখে চলেছেন নিভৃতের লেখক, রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা হালিম দাদ খান।

লেখা: অলকানন্দা রায়

ছবি: শরিফুল ইসলাম

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

5 + 18 =