বডি শেমিং কোনো রসিকতা নয়

করেছে Suraiya Naznin

জহুরা আকসা

অন্যের শারীরিক গঠন, চেহারা, আকার, আকৃতি বা গায়ের রং নিয়ে রসিকতা করা আমাদের সমাজের আদিতম চর্চাগুলোর একটি। সমাজের লোকেরা এসব করে মজা পায়। এগুলো যে বডি শেমিং এবং অন্যায়, সে বোধ সমাজের লোকজনের নেই। তাই তো যুগ যুগ ধরে রসিকতার নামে বডি শেমিং কোনো রকম বাধানিষেধ ছাড়াই সমাজে চর্চিত হয়ে আসছে।

বেশির ভাগ মানুষ নিজের অজান্তে বা জেনেবুঝেই অন্য মানুষকে তার শারীরিক গঠন নিয়ে কটাক্ষ করে থাকে। যেমন দেখা হলেই কাউকে মুটকি, ভুটকি, বাট্টু-পাতলু ইত্যাদি বলে সম্বোধন করা। কিংবা বলা আরে তুমি এত কালো হয়ে গেছ? তোমার মুখে এত দাগ কেন? ডাক্তার দেখাও! তোমার তো বিয়ে হবে না! এই কথাগুলো বডি শেমিংয়ের মধ্যে পড়ে। অথচ মানুষ এগুলো এতটা সাবলীলভাবে বলে যে মনে হয় সামনের জন বুঝি অনুভূতিশূন্য মানুষ!

 

 

আসলে ছোট থেকেই আমরা কত কিছু শিখি কিন্তু এই শিক্ষা পাই না যে কাউকে তার শারীরিক গঠন নিয়ে তাচ্ছিল্য করাটা অপরাধ। বরং সামাজিকভাবে আমরা অন্যের খুঁত নিয়ে রসিকতা করার শিক্ষা নিয়ে থাকি।

অবশ্য এমন আচরণের পেছনে দায় কেবল সাধারণ মানুষের তা নয়। প্রতিদিন পেপার-পত্রিকা খুললেই বা টেলিভিশন অন করলেই মোটা থেকে চিকন হওয়া বা কালো থেকে ফরসা হওয়ার এত এত বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে যে আমরা ধরেই নিই যে চিকন আর ফরসা মানেই সুন্দর। এ ছাড়া টিভি সিরিয়ালগুলোতে স্বাস্থ্যবান মানুষদের যেভাবে ভাঁড় বানিয়ে দেওয়া হয়, তাতে বাস্তব জীবনের মোটা মানুষদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। তাদের নিয়ে হাসাহাসি করা, রসিকতা করা সবাই যেন সমাজের বিনোদনের একটা অংশ মনে করে। রসিকতার নামে এই অসভ্যতা বিশ্বব্যাপী চলে।

 

সাম্প্রতিক অস্কারের মঞ্চে সেটাই দেখা গেল। আমেরিকান বিখ্যাত স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান ক্রিস রক, রসিকতার ছলে অভিনেতা উইল স্মিথের স্ত্রী জেডা পিঙ্কেট স্মিথের কামানো মাথাকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘জেডা, “জিআই জেন টু”-এর জন্য আমার আর তর সইছে না।’ ক্রিস রক মূলত ১৯৯৭ সালের সিনেমা ‘জিআই জেন’- এর প্রসঙ্গ টেনেছিলেন, যেখানে অভিনেত্রী ডেমি মুরের চুল খুব ছোট করে ছাঁটা ছিল। অথচ জেডা পিঙ্কেট স্মিথ তার আগেই অ্যালোপেশিয়া অসুখের কারণে তার চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, এই চুল কমে যাওয়ার বিষয়টা নিয়ে জেডাকে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য শুনতে হয় বলে এটা তার একটা অস্বস্তির জায়গা। আর মঞ্চে যখন ক্রিস রক তাকে নিয়ে রসিকতা করছিলেন, তখন জেডার চেহারায় সেই অস্বস্তি সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। মূলত সেদিন অস্কারের মঞ্চে ক্রিস রক যা বলেছিলেন, তা বডি শেমিংয়ের নামান্তর। নিশ্চয় মানুষের অসুস্থতা কখনো কোনো রসিকতার বিষয় হতে পারে না।

কিন্তু এর প্রতিবাদে উইল স্মিথ যা করেছেন, সেটাও সমর্থনযোগ্য ছিল না। কাউকে এভাবে চড় মারা বা শারীরিকভাবে আঘাত করা যায় না। প্রতিবাদের আরও অনেক মাধ্যম আছে। গায়ে হাত তুলে কেন প্রতিবাদ করতে হবে? মুখে কথা বলেও তো প্রতিবাদ করা যেত।

তবে পুরো ঘটনায় একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো ছিল। আর তা হলো, যখন ক্রিস রক জেডাকে নিয়ে রসিকতা করেছিলেন, আর উইল স্মিথ যখন প্রতিবাদস্বরূপ ক্রিসকে চড় মারছিলেন, এই দুই সময়েই কিš‘ দর্শকেরা একইভাবে হেসে যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ বডি শেমিং এবং সহিংসতা দুটোই তাদের কাছে রসিকতা মনে হয়েছে। আর এটাই হলো সমাজের বাস্তবতা। সমাজ রসিকতা করতে ও দেখতে পছন্দ করে। কিš‘ এই রসিকতার কারণে কেউ কষ্ট পেল কি না বা কারোর আত্মসম্মানে আঘাত করা হলো কি না, তা ভেবে দেখার তাদের সময় নেই।

 

শুধু অস্কারের মঞ্চে নয়, টিভির যত জনপ্রিয় কমেডি অনুষ্ঠান আছে, সেখানেও কিš‘ অবলীলায় সেক্সিস্ট এবং বডি শেমিং-জাতীয় রসিকতা করা হয়। মানুষের আকার, আকৃতি, চেহারা নিয়ে রসিকতা করা, মোটা ও কালো মানুষদের নিয়ে মজা করা, পঙ্গু বা খোঁড়া মানুষদের হাঁটা নিয়ে রসিকতা করা, ইত্যাদি চলে। অনেক সময় স্ট্যান্ডআপ কমেডি যারা করেন, তারা মিমিক করতে গিয়ে ট্রান্সজেন্ডারদের গলার স্বর নকল করেন। ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে হাসাহাসি করেন। এতে কিন্তু পুরো একটি কমিউনিটিকে অসম্মান করা হয়। অথচ বডি শেমিং বা কমিউনিটি শেমিংয়ের এই বিষয়গুলো নিয়ে মিডিয়ার বা অনুষ্ঠানের সঞ্চালকের তেমন কোনো মাথাব্যথা থাকে না। উল্টো মিডিয়া নিজেদের টিআরপি বাড়াতে এই ধরনের কনটেন্টগুলোকেই বেছে নেয়। কারণ, সমাজের লোকেরা এগুলোই খায় বেশি। জনপ্রিয় হতে হলে সমাজের কাছে এসব কনটেন্ট বেচা সহজ। যে কারণেই দিনে দিনে এসব রসিকতা আরও বাড়ছে।

 


অথচ প্রত্যেক মানুষ আলাদা; আলাদা তাদের গঠন, স্কিন কালার। এটাই স্বাভাবিক ও প্রকৃতির সৌন্দর্য। তাই আমাদের কোনো অধিকার নেই নিজেদের সৌন্দর্যের মাপকাঠি দিয়ে অন্যের সৌন্দর্য মাপা। আধুনিক সভ্য মানুষ হিসেবে আমাদের সবার উচিত একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আমাদের বোঝা উচিত রসিকতার নামে বডি শেমিং, যা অন্যকে দুঃখ দেয়, কষ্ট দেয়, ছোট করে, তা কখনো কোনো সুস্থ বিনোদনের বিষয় হতে পারে না।

 

ছবি: সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

6 + 19 =