বডি শেমিং : সভ্য সমাজে অসভ্যতার চর্চা

করেছে Suraiya Naznin

সাবিরা ইসলাম

কেউ কারও শারীরিক গঠন, আকৃতি ও বর্ণের জন্য দায়ী নয়। সুতরাং কারও শারীরিক উচ্চতা, রং বা আকৃতি নিয়ে কোনো কটাক্ষ করা অসভ্যতার নামান্তর। যদিও অহরহ আমরা তা করি। একজন মানুষের মূল্যায়ন হবে তার কাজে, মেধায়, মননে-

আমরা বলি মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। বিশ্বাস করি এ কথা। আবার লালনও করি। তবে স্রষ্টার কোন সৃষ্টিই-বা শ্রেষ্ঠ নয়? এমন একটি সৃষ্টি কি আছে, যা মানুষ সৃষ্টি করতে পারে? পারে না। মানুষ যা পারে তা হলো স্রষ্টার সৃষ্টিকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে। আরও সুন্দর করে উপস্থাপন করতে, সম্মান করতে, মর্যাদা দিতে। ভালো পোশাক, দামি অলংকার বা আনুষঙ্গিক আরও অনেক কিছু দিয়ে শরীরকে আবৃত করার নামই সাজ নয়। বরং একজন মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশও তার অবস্থানকে সাজিয়ে তোলা, উন্নত করা। আমরা অনেকেই তা করি না। করতে পারি না। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের মানসিক উচ্চতায় ত্রুটি বা ঘাটতি রয়েছে।

 

আজকের বিষয়টি বডি শেমিং নিয়ে। বডি শেমিং কী? সহজ ভাষায় বডি শেমিং হলো কারও শারীরিক গঠন, আকৃতি ও বর্ণ নিয়ে কটাক্ষ করা, আঘাত করা বা তাচ্ছিল্য প্রকাশ করা বা ব্যঙ্গ করা। মানসিকভাবে বিপন্ন করে তোলা।

আমাদের মানতে হবে, জগতের সব সৃষ্টি এক রকম নয়। এ জগৎকে সাজানোই হয়েছে বৈচিত্র্য দিয়ে। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনি একেকজনকে একেক রকম করে তৈরি করেছেন দুটি কারণে। এক. আমরা যেন সর্বাবস্থায় স্রষ্টার সৃষ্টিবৈচিত্র্য দেখে মুগ্ধ হই এবং দুই. আমরা যেন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে নিজের জন্য শুকরিয়া প্রকাশ করি। কিন্তু আমরা তা করি না। বরং স্রষ্টার সৃষ্টিকে অপমান করি, ব্যঙ্গ করি, তাচ্ছিল্য দেখাই।

স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে আমরা খুব সহজেই সহপাঠীর শারীরিক ত্রুটি নিয়ে কথা বলি। প্রকাশ্যে তাকে নানা ধরনের টাইটেল দিয়ে ফেলি। উ”চতায় কম হলে বাটলু, বাটুস, বাইট্টা, খাইট্যা, বামন এমন সব নামকরণ করি। আবার উচ্চতা বেশি হলে লম্বু, তালগাছ, কুতুব মিনার বলতেও ছাড়ি না। গায়ের রং কালো হলে নিগ্রো, কালাচান, ব্ল্যাক ডায়মন্ড এসব বলি। মোটা হলে কোন গুদামের চাল খায়, জলহস্তী, হাতি বলি। হালকা-পাতলা হলেও নিস্তার নেই। সে ক্ষেত্রেও তালপাতার সেপাই, রবিউল, শুঁটকি, জীবনেও কিছু খায় নাই ধরনের মন্তব্য করি। আমরা এসব নামে যাদের নামকরণ করি, তাদের মনোযাতনা আমরা কেউ বুঝি না বা বোঝার চেষ্টা করি না। এতে যে তারা নিজেদের হীন মনে করে, করতে পারে, মনে মনে কষ্ট পায়, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই।

মনে রাখতে হবে, কেউ কারও শারীরিক গঠন, আকৃতি ও বর্ণের জন্য দায়ী নয়। সুতরাং কারও শারীরিক উ”চতা, রং বা আকৃতি নিয়ে কোনো কটাক্ষ করা অসভ্যতার নামান্তর। যদিও অহরহ আমরা তা করি। একজন মানুষের মূল্যায়ন হবে তার কাজে, মেধায়, মননে।

ধর্ম কাউকে হেয় করার শিক্ষা দেয় না। বরং শারীরিক কোনো অসামঞ্জস্যের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন মানসিকভাবে নিজেকে ছোট মনে না করে, সেদিকে নজর রাখার কথা বলে। এটি প্রতিটি মানুষের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। প্রতিটি মানুষের কিছু না কিছু গুণ রয়েছে। সেই গুণগুলোকে সামনে তুলে আনা জরুরি। সেই কর্মক্ষমতা, সেই যোগ্যতাগুলোকে মূল্যায়ন করা উচিত।

 

 

আমাদের সমাজে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে নারীরা বেশি কটাক্ষের শিকার হয়। গায়ের রং কালো হলে তার পদে পদে হেনস্তা। পরিবার চিন্তিত হয় তার পাত্র¯’ করা নিয়ে, পাত্র¯’ করা গেলেও এর পেছনে অর্থনৈতিক দ- দিতে হয় প্রচুর। কারণ মা-বাবা অর্থ দিয়ে মেয়েটির সুখ কিনতে চায়, ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চায়, পাত্রপক্ষও তাদের দর একটু বাড়িয়েও রাখে। কিš‘ এতে আদৌ কি কোনো সমাধান হয়? বরং এতে পাত্রপক্ষের লোভের সলতে উসকে দেওয়ার পাশাপাশি মেয়েটির ওপর আরও বেশি মানসিক চাপ তৈরি করে দেওয়া হয়।

সংসারে বউ শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী কথা-কাটাকাটি হয় না এমন খুব কম পরিবারই আছে। এসব ক্ষেত্রেও দেখা যায় বডি শেমিং করা হয়। শিকার হয় নারীটিই। যদিও সাংসারিক কোনো দায়িত্ব পালনে নারীটি অক্ষম নয়। বর্তমান সময়ে অনেক নারী সংসার, সন্তান এবং চাকরি একা সামলাচ্ছে। তবু কখনো কখনো বডি শেমিংয়ের শিকার হচ্ছে। একটু চোখ-কান খোলা রাখলে এ রকম উদাহরণ মেলা কঠিন নয়।

তবে পুরুষ একদম বডি শেমিংয়ের শিকার হয় না, তা নয়। একজন কালো পুরুষের সুন্দরী বউ হতে পারবে না, একজন প্রতিষ্ঠিত পুরুষের কম বয়সী বউ হওয়া যাবে না, লম্বা পুরুষের ছোটখাটো বউ, খাটো পুরুষের লম্বা বউ হলেও কটু কথায় কেউ ছাড়ে না। কোনো দম্পতি নিঃসন্তান হতে পারবে না, কোনো দম্পতির একাধিক ছেলেসন্তান বা কন্যাসন্তান হতে পারবে না সবকিছু নিয়েই অন্যদের কথা বলতে হবে এবং আঘাত করেই তা বলতে হবে।
কিন্তু আমরা জানিও না, এসব বলার অধিকার আমাদের কারও নেই। অধিকার যে নেই, তা প্রতিষ্ঠিত করতে বিভিন্ন দেশে বডি শেমিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইনও রয়েছে।

 

 

* মালয়েশিয়ায় সামাজিক মাধ্যমে কারও শরীর নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করলে সর্বো”চ সোয়া ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা সর্বো”চ এক বছরের জেল কিংবা উভয় শাস্তি হতে পারে।
* ভারতে ২০২০ সালে এক নারী বডি শেমিং করায় তার স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগে তিনি বলেন যে ২০১৭ সালে বিয়ের পর থেকে তারা তার শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ে কথা বলতে থাকে।

* ইন্দোনেশিয়ায় বডি শেমিং করার অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাড়ে চার মাস জেল কিংবা সর্বোচ্চ সাড়ে চার হাজার ইন্দোনেশিয়ান রুপি জরিমানা হতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে বডি শেমিং করলে সর্বোচ্চ চার বছরের জেল কিংবা সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তি হতে পারে।

* বাংলাদেশে বডি শেমিংয়ের জন্য কেউ সরাসরি আইনের আশ্রয় নিতে পারে না। কারণ, এর সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। ২০২২ সালের মার্চে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী ৬৯.৯২ শতাংশ তরুণী শারীরিক অবয়ব নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হয়েছে। ৩৭.২৪ শতাংশ তরুণী আত্মীয়স্বজনের কথায় ও ইঙ্গিতে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে। বন্ধুবান্ধবের কাছে বডি শেমিংয়ের শিকার হয়েছে ২২ শতাংশ নারী। দেশে অন্যান্য যৌন হয়রানির ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বডি শেমিংয়ের বিষয়ে আইন স্পষ্ট নয়। অন্য আইনগুলো দিয়ে মামলা করা বা থানায় অভিযোগ করা যায়।

* যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্য ও সান ফ্রান্সিসকো, ম্যাডিসনের মতো কয়েকটি শহর ছাড়া বাকি সব জায়গায় চাকরিদাতারা মোটা হওয়ার কারণ দেখিয়ে কাউকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করতে পারে। এই বৈষম্য থেকে রক্ষা করার কোনো আইন নেই সেখানে। এক জরিপ অনুযায়ী প্রতি ২.৭২ কেজি ওজন বাড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে একজন নারী কর্মীর বেতন ঘণ্টাপ্রতি ২ শতাংশ কমে গেছে।

* অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ওজনধারী প্রায় ১৪ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকের বেশি তাদের ডাক্তার, পরিবার, বন্ধুবান্ধব, ক্লাসমেট ও সহকর্মীদের দ্বারা ফ্যাট-শেমিংয়ের শিকার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি (৭৬ থেকে ৮৮ শতাংশ) ফ্যাট-শেমিং করেছে পরিবারের সদস্যরা।

এর মানে বিশ্বজুড়েই বডি শেমিংয়ের চর্চা রয়েছে। তাতে যত উন্নত দেশই হোক না কেন। গবেষণা বলে, যারা বডি শেমিং করে, তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনো হতাশার মধ্যে আছে। যে কারণে তারা তাদের হতাশা বা ক্ষোভের প্রকাশ ঘটায় অন্যের ওপর মানসিক নির্যাতন চালিয়ে। যদি বিষয়টি এ রকমই হয়, তবে যারা এমনটি করে, তাদের মানসিক চিকিৎসার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে।

বডি শেমিং রোধে নানা দেশে নানা আইন রয়েছে। কিন্তু এতে মূল সমস্যার সমাধান কতটা হয়েছে? আমাদের কথা হলো, সর্বক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ ও কার্যকর সম্ভব হয় না। বডি শেমিং এমন একটি সামাজিক ব্যাধি, যার উৎপত্তি ও বসবাস মানুষের মগজে। একে রোধ করতে হলে পারিবারিক শিক্ষাটা অনেক জরুরি। পরিবার থেকেই শিশুদের শিক্ষা দিতে হবে কারও শারীরিক আকার-আকৃতি, বর্ণ নিয়ে কটাক্ষ করা মানবিক ও নৈতিক অপরাধ, মানসিক নীচতা। শিশুর উন্নত মানসিকতা, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ পরিবারকেই তৈরি করে দিতে হবে।

আগেও বলেছি, কোনো মানুষ তার শারীরিক কোনো ত্রুটির জন্য দায়ী নয়। সুতরাং তাকে সেসব বিষয়ে কথা শোনানো যাবে না। দুঃখের বিষয় হলো, এসব আমরা মানি না। সমাজের প্রায় সব স্তরেই বডিং শেমিংয়ের চর্চা হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষিত, মূর্খ কিংবা ধনী-গরিব নেই। সব স্তরে এর কম বেশি চর্চা হয়, হচ্ছে। অথচ সারা বিশ্বে ত্রুটিপূর্ণ শারীরিক গঠনসমৃদ্ধ মানুষের সাফল্য কম নয়। স্টিফেন হকিংয়ের নাম এখানে উল্লেখ করা যায়। পদার্থবিজ্ঞানের এই মহিরুহের নাম বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই, যারা শোনেনি।

সুরসম্রাট মোজার্টের সুর মূর্ছনায় মোহিত হয়নি এমন সুরপ্রেমী কি আছে কোথাও? অথচ তারা শারীরিকভাবে স্বাভাবিক ছিলেন না। বিশ্বে এ রকম বহু উদাহরণ রয়েছে, যারা তাদের শারীরিক ত্রুটিকে জয় করে নিজেকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে গেছেন এবং বিশ্ববাসীর জন্য রেখে গেছেন বিশেষ অবদান। আমাদের উচিত তাদের সেই সব অবদান স্মরণে রাখা। মূল্যায়ন করা। সেইমতো নিজেদের আগামীর পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

আমাদের দেশেও এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হলে আমরা এমন কিছু শিক্ষার্থীকে পাই, যারা তাদের নানা ধরনের শারীরিক ত্রুটি উপেক্ষা করে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেছে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা সাফল্য ছিনিয়ে এনেছে, আনছে। নিজের মুখ উজ্জ্বল করেছে। অন্যের অনুপ্রেরণার কারণ হয়েছে। সুতরাং মানুষের মূল্যায়ন হবে তার কর্মে। বডি শেমিং করে সভ্য সমাজে সভ্য মানুষের অসভ্যতার চর্চা বন্ধ করে নিজেকেও শুদ্ধ মানুষ প্রমাণ করার এটাই সময়। সঠিক আইন ও এর প্রয়োগ, পারিবারিক শিক্ষা এবং সচেতনতাই হতে পারে এর থেকে উত্তরণের পথ।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, গল্পকার।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

1 × 3 =