লাল-নীল সংসার

করেছে Sabiha Zaman

বিয়ে সারা জীবনের পরিকল্পনা, জীবনভর মানসিক প্রস্তুতি। বিয়ের পর বর-কনের চাই সুখের নীড়। ছোট ছোট মধুর স্মৃতি দিয়ে গড়ে ওঠে লাল-নীল সংসার। সেই জন্য দরকার শৈল্পিক কিছু অনুষঙ্গ। নতুন সংসার গোছাতে একটু ভেবেচিন্তেই পা ফেলতে হয়। অনেকগুলো বিষয় এখানে জড়িয়ে থাকে। নতুন সংসার গোছাতে কী কী জানা প্রয়োজন, তা নিয়েই আমাদের এবারের প্রস্তুতি-

নবদম্পতিরা চায় নিজের মতো করে নতুন ফার্নিচার দিয়ে সংসার সাজাতে। বাসা সুন্দর আর আকর্ষণীয় করে তুলতে চাইলে জানতে হবে বাসা সাজানোর আলাদা ধরন। থাকতে হবে সবার চেয়ে আলাদা করে বাসা সাজিয়ে তোলার জ্ঞান। খুব সহজেই নিজের ঘর সুন্দর আসবাবের ব্যবহারে সাজিয়ে তোলা যেতে পারে। তবে এ জন্য ঘর সাজানোর বিষয়ে হতে হবে মনোযোগী। নিজের রুচি, চাহিদা আর সামর্থ্যরে সম্মিলন ঘটিয়ে তবেই বেছে নিতে হবে আপন ঘরের জন্য ফার্নিচার।
তবে নতুন সংসার সাজানো তো আর মুখের কথা নয়। ব্যয়বহুল কাজ তাই প্রথমে প্রধান আসবাবপত্র কিনে তারপর আস্তে ধীরে বাকি জিনিসগুলো কিনে ফেললেই হলো। এতে একসঙ্গে বেশি চাপও বহন করতে হবে না। আসবাবপত্রের পরে আসা যাক সাজগোছের ব্যাপারে। নতুন সংসারে বসবাস শুরুর পর থেকে একটু একটু করে নিজেদের মনমতো সাজিয়ে নেওয়া যেতে পারে, যাতে ঘর দেখতে  আরও নান্দনিক হয়ে ওঠে।


ঘরের খালি কোনাগুলোতে ইনডোর প্ল্যান্ট আর মাটির শোপিস রাখা যেতে পারে। বারান্দায় কিছু টবে গাছ লাগানো যেতে পারে। শোবার ঘরে খাটের পাশে একটি টেবিল ল্যাম্প রাখতে পারো। এতে যেমন ঘরের সৌন্দর্যবর্ধন হবে, তেমনি রাতে লাইট জ্বেলে বইও পড়তে পারবে। এতে সঙ্গীর ঘুমেরও ব্যাঘাত হবে না। ঘর সাজাতে কম দামে নানা রকমের শোপিস পাওয়া যায়। যেগুলো দিয়ে ঘর সাজালে ঘরের

সৌন্দর্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
ঘরের দেয়ালে হালকা রং করো, এতে ঘর বেশ উজ্জ্বল দেখাবে। ঘরের আরেকটি বিশেষ অনুষঙ্গ হলো পর্দা। ঘরের দেয়ালের রং, আকার, আয়তন বুঝে পর্দা নির্বাচন করো। এরপর কিছু পেইন্টিং এবং ছবি বাঁধাই করে ঝুলিয়ে দিতে পারো ঘরের দেয়ালে। ড্রয়িং রুমের মাঝে একটি ঝাড়বাতিও ঝোলাতে পারো।
টিভি, ফ্রিজ ছাড়া যেন সংসার পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে না। তবে এসব ইলেকট্রনিকস সামগ্রী ব্যয়বহুল। যারা একেবারে কিনতে পারবে, তারা তো কিনলেই, কিন্তু যারা একবারে মূল্য পরিশোধ করতে পারবে না, তারা কিস্তির মাধ্যমে নিতে পারো এসব সামগ্রী। টিভি, ফ্রিজ ছাড়াও রয়েছে সিলিং ফ্যান, লাইটের মতো বেশ কিছু প্রয়োজনীয় ইলেকট্রিক সামগ্রী।

দুজনেই চাকরিজীবী হলে বিয়ের আগে থেকেই অল্প অল্প করে জিনিসপত্র গোছাতে পারো। একটু একটু করে শখের থালাবাটি, কুশন, কুশনকাভার, বুকশেলফ ইত্যাদি নানা জিনিস গুছিয়ে নিতে পারো।

অতি প্রয়োজনীয়
সবার আগে ঠিক করতে হবে বাসা। বিয়ের আগে থেকেই বাসা খুঁজে রাখা ভালো। বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে অন্তত দুই মাসের অ্যাডভান্স দিতে হয়। তাই বাসা ভাড়া এবং অ্যাডভান্সের টাকা সবার আগে হিসাব রাখতে হবে।
বাসা নেওয়ার পর সবার আগে প্রয়োজন সব ঘর, বারান্দা, বাথরুম এবং রান্নাঘরের বাতির ব্যবস্থা করা। সব ঘরের জন্য একটা করে বৈদ্যুতিক পাখাও প্রয়োজন।
একটা দুই বার্নারের গ্যাসের চুলা এবং ফ্রিজ। ফ্রিজ চাইলে কিস্তিতেও কেনা যায়। একটা পানির ফিল্টার। দুজনের সংসারে শুরুতেই বড় ফ্রিজ অতটা কাজে লাগবে না। তবে এসব জিনিস যেহেতু দীর্ঘদিন টেকে, তাই বুঝেশুনে একটু ভালো ব্র্যান্ডের কেনাই ভালো হবে।
রান্নার জন্য কয়েক সাইজের হাঁড়ি, কড়াই, প্রেশার কুকার, গামলা, বাটি, খুন্তি। রান্নার পাত্র একবারে ননস্টিক কিনতে পারলে ভালো, টিকবেও অনেক দিন, পরিষ্কারের ঝামেলাও কম। আর খাবার খাওয়ার জন্য অন্তত এক সেট করে প্লেট, বাটি, চামচ, জগ, গ্লাস ইত্যাদি। নিউমার্কেট, চন্দ্রিমা, গুলশান ডিসিসি, তালতলা, মৌচাক, ইস্টার্ন প্লাজা ইত্যাদি মার্কেটে এসব জিনিস কিনতে পারো।রান্নাঘরে বিল্ট ইন র‌্যাক না থাকলে থালাবাটি ও হাঁড়ি কড়াই রাখার জন্য র‌্যাক। নিউমার্কেটেই পেয়ে যাবে মনের মতো র‌্যাক।
শোবার জন্য খাট কেনার টাকা না থাকলে ম্যাট্রেস বা তোষক, বালিশ আর কিছু কুশন কিনতে পারো। নীলক্ষেত কিংবা নিউমার্কেটে পাবে এসব। বিছানার জন্য অন্তত দুই সেট চাদর আর ব্যবহারের জন্য তোয়ালে। বেশ কয়েকটা পাপোশ লাগবেই। ওয়াশরুমের জন্য বালতি, মগ, বদনা, বেসিনের তোয়ালে, পেস্ট ব্রাশ রাখার হোল্ডার, সোপকেস, বাসা পরিষ্কারের জন্য ঘর মোছার মপ, টয়লেট এবং কমোড পরিষ্কারের জন্য কয়েকটা ব্রাশ। আয়রনও জরুরি।

নতুন ফার্নিচার সাজানোর জন্য ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পরামর্শ

  •  ফার্নিচার কেনার সময় ঘরের আকারের দিকে রাখতে হবে পরিপূর্ণ মনোযোগ। ঘরের আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফার্নিচার কিনলে ঘরের ভেতর অনেক জায়গা বের হবে এবং খোলামেলা থাকবে।
  •  বসার ঘরে বাড়তি জিনিসপত্র না রাখাই ভালো। এক সেট সোফা, একটি কফি টেবিল, একটি ইজি চেয়ার, টিভি ও মেঝেতে ছোট্ট একটি কার্পেট রাখা যেতে পারে। ঘরের দেয়াল যদি বড় হয়, তবে দুটি বড় ক্যানভাস, একটি ঘড়ি ও কার্পেটের সঙ্গে মিল রেখে জানালায় পর্দা এবং সোফার ওপরে কুশন রাখলে বেশ সুন্দর দেখাবে।
  •  শোবার ঘর সাজাতে প্রথমে লক্ষ রাখতে হবে জানালা কোন দিকে। যেদিকে জানালা থাকবে, তার পাশেই ড্রেসিং টেবিল রাখা উচিত। এতে করে সাজগোছ করার সময় আলো নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না। ড্রেসিং টেবিলের পাশে কাপড় রাখার জন্য আলনা বা কাপবোর্ড রাখা যেতে পারে।
  •  শোবার ঘরে জানালার পর্দা যেন একটু ভারী থাকে, ঘুমানোর সময় ঘরে আলো কাম্য নয়। বিছানার চাদরে একটু রঙের ছাপ এবং ঘরের পর্দা শান্ত রঙের রাখা উত্তম।
  •  অতিথির জন্য যদি খালি ঘর থাকে, তাহলে সেখানে একটি বেড, ড্রেসিং টেবিল, ওয়ার্ডরোব বা আলমারি রাখা যেতে পারে। তবে এসব কিছু করার আগে দেয়ালের রঙের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেক সময় মানানসই রং না হলে ঘর সুন্দর ও পরিপাটি মনে হয় না। হালকা রং সব জায়গাই ব্যবহার করা উচিত।
  •  বাড়ির বারান্দায় সাইজ অনুযায়ী দুটি চেয়ার বা ইজি চেয়ার ও একটি কফি-টেবিল রাখলে আকর্ষণীয় মনে হবে। চারপাশে সতেজ ফুলের টবের সামনে বিকেলে প্রিয়জনের সঙ্গে আরাম করে কফি পান করার অনুভ‚তিই আলাদা। এ ছাড়া সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় বসে এক কাপ কফি হাতে নিয়ে ভোরের মিষ্টি হাওয়ায় খবরের কাগজ বা ম্যাগাজিন পড়া যেতে পারে। এতে নবদম্পতির মানসিক সখ্য আরও মধুর হবে।

আর্থিক পরিকল্পনা হোক দুজন মিলেই 
সংসারের দায়িত্ব শুধু একজনকে না দিয়ে উভয়কেই আর্থিক পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করা উচিত। এতে করে একজনের ওপর চাপ কমবে এবং আর্থিক ব্যাপারগুলো সঠিক ও সুস্থমতো চলবে। যদি স্বামী এবং স্ত্রী তারা দুজনই রোজগারি হয়, তবে তো সংসারের অর্থ খরচের পরিকল্পনা আরও সহজ হয়ে উঠবে।

  •  মাসে কী কী খরচ করবে, কীভাবে কী করবে, কী কী কিনবে তা তোমার সাধ্যমতো অর্থের একটি বাজেট তৈরি করো। আর অবশ্যই তা তোমার সঙ্গীর সঙ্গেই করো। একা এটা করতে গেলে অনেক কিছুই বাদ পড়ে যেতে পারে, যা কি না পরবর্তী সময়ে আরও বেশি অর্থ খরচের কারণ হতে পারে।
  •  বাজার করো সঙ্গীর সঙ্গেই কারণ যেটা আমরা জানি একসঙ্গে যেকোনো জিনিস বেশি করে কিনলে লাভ হয়, খুচরা কিনলে দামে বেশিই পড়ে। সঙ্গে যদি একজন থাকে কিছু কিনতে ভুলেও যাওয়া যাবে না, কারণ তোমার সঙ্গীর চোখে পড়তে পারে। তাই বাজার একসঙ্গে করার পরিকল্পনা করতে পারো।
  • কোন খাতে কে কত খরচ করবে, তা আগে থেকেই ভেবে দেখো। সংসার তোমার, শুধুই তোমার নয়। সংসার খরচের দায়িত্ব দুজনেরই। তাই কার উপার্জন কেমন তার ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা করো কে কোন খাতে খরচ করবে। যার উপার্জন বেশি, তাকে একটু বেশি খরচের খাতে, আর যার উপার্জন অপেক্ষাকৃত কম, তাকে কম খরচের খাতে দেওয়াই ভালো।
  •  সংসারে যেসব বড় বড় খরচ রয়েছে, তা দুজন মিলেই করার চেষ্টা করো। এতে করে যেকোনো একজনের ওপর চাপ পড়বে না। মন-মেজাজও ভালো থাকবে। তাই বড় খরচে দুজনেরই সমান সমান ভাগ থাকুক।

লেখা :  রোদসী ডেস্ক

ছবি :  সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

18 − 10 =