বাংলাদেশি তারকাদের রহস্যময় মৃত্যু

করেছে Shaila Hasan

শায়লা জাহান

মৃত্যু এক ধ্রুব সত্য। আজ হোক কিংবা কাল, সবাইকে এর স্বাদ অনুভব করতে হবে। কিন্তু এমন কিছু অস্বাভাবিক মৃত্যু আছে যার কোন সুরাহা আজো পর্যন্ত কেউ করতে পারেনি। রহস্যময়ে ঘেরা এই মৃত্যুগুলো আজীবন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েই থাকবে।

আলো ঝলমলে দুনিয়া আর চাকচিক্যময় শোবিজ পাড়া সকলেরই আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তারকাদের কর্মজীবন এবং তাদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সকলেরই জানার আগ্রহ থাকে অনেক। তাদের চাল-চলন, লাইফস্টাইল অনেকেই অনুসরণ করতে চায়। কিন্তু এসব প্রিয় তারকাদের যখন আকস্মিক মৃত্যু ঘটে ,যা জন্ম দেয় অসংখ্য প্রশ্নের। এসব কূল- কিনারাহীন মৃত্যুর সারসংক্ষেপ আত্মহত্যা বলেই ধরে নেয়া হয়। আজ এমন কিছু তারকাদের রহস্যময় মৃত্যু দেখে নিই-

ডলি আনোয়ার

সত্তর দশকের জনপ্রিয় টিভি ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ডলি আনোয়ার ছিলেন বুদ্ধিজীবী, শিক্ষানুরাগী ও সাহিত্যিক ড নীলিমা ইব্রাহিমের মেয়ে। আন্তর্জাতিক চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেনকে বিয়ে করে হোন ডলি আনোয়ার। তবে তাঁর পরিচয়ের আরেকটি বড় দিক হল তিনি ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ র জয়গুন, যে চরিত্রের জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার। এছাড়াও আরো বেশ কিছু চরিত্রপ্রধান ছবিতেও তাঁর দেখা মেলেছে। সাল ১৯৯১, ৩ জুলাই হঠাৎই গুঞ্জন উঠে ডলি আনোয়ার আর নেই। বিষপান করে আত্মহত্য্যা করেছেন। পরিবার, সম্পদ, যশ, খ্যাতির যার কোন কিছুতেই কমতি ছিলোনা; সেই কিনা আত্মহত্যা করলো? এই ঘটনার পর নানারকম গুজব শোনা যায়। বলা হয়, ডলি আনোয়ার স্বামী আনোয়ার হোসেন থেকে তালাকনামা পেয়েছেন, যা দেখে সহ্য করতে না পেরে বিষপান করেছেন। যদিও পরবর্তীতে এই গুজবের কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি, ফলে এই অস্বাভাবিক মৃত্যু অসামাধান অবস্থায় রয়ে যায়।

 

সালমান শাহ

এলাম, দেখলাম, জয় করলাম- এই প্রবাদের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্য যার নাম তিনি হলেন সালমান শাহ। ক্ষণজন্মা এই উজ্জ্বল নক্ষত্র টেলিভিশন নাটক দিয়ে তাঁর অভিনয়জীবন শুরু করলেও ১৯৯০ এর দশকে চলচ্চিত্রে অন্যতন জননন্দিত শিল্পী হয়ে উঠেন। মাত্র ৪ বছরে তাঁর ক্যারিয়ার জীবনে ২৭টি ছবি করেছিলেন, যার অধিকাংশই ছিল ব্যবসা সফল। তাঁর স্টাইল, অভিনয় সবকিছুই সবাইকে বুঁদ করে রাখত। খ্যাতির শীর্ষে থাকা অবস্থায় ১৯৯৬ সালে তিনি মারা যান। ঢাকার ইস্কাটনে তারা নিজ বাসভবনে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ থাকলেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা থেকে যায়। অনেকেই সালমান শাহের মৃত্যুর জন্য তাঁর স্ত্রী সামিরার দিকে আঙুল তোলেন, এমনকি পরবর্তীকালে সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে স্ত্রী সামিরা ও আরো কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। যদিও ২০২০ সালে পুলিশের তদন্ত বিভাগ জানায় যে সালমান শাহ আত্মহত্যাই করেছিলেন কিন্তু তাও দর্শকমনে আজও সালমানের মৃত্যু নিয়ে রহস্য থেকেই আছে।

সোহেল চৌধুরি

বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের আরেক সুদর্শন নায়ক ছিলেন সোহেল চৌধুরি। যিনি আশি ও নব্বই দশকের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন। অভিজাত ও ধনী পরিবারের সন্তান সোহেল চৌধুরি ১৯৮৪  সালে নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে দেশীয় চলচ্চিত্রে পদার্পন করেন। তিনি ৩০ টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ব্যক্তিগত জীবনে চিত্রনায়িকা দিতির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যদিও নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৯৮ সালে বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবের সামনে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন সোহেল চৌধুরি। এর পেছনে বিতর্কিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই মৃত্যুর কোন সুরাহা হয়নি।

মডেল তিন্নি

সৈয়দা তানিয়া মাহবুব, যিনি বিনোদন জগতে তিন্নি নামেই পরিচিত ছিলেন। গ্ল্যামারাস এই মডেল ১৯৯৯ সালে র‍্যাম্প মডেলিং দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু করেন। তার প্রথম টিভি বিজ্ঞাপন হেনোলাক্স ক্রীম দিয়ে পরিচিতি পান। তারপর স্টারশিপ কনডেন্স মিল্ক, লিজান মেহেদী, গন্ধরাজ তেল, এলিট পেইন্ট বিজ্ঞাপন দিয়ে জনপ্রিয়তা পান। কয়েকটি টিভি নাটকেও অভিনয় করেছিলেন। ১০ নভেম্বর, ২০০২ সালে ঢাকার পোস্তগোলার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর (বুড়িগঙ্গা সেতুর) নিচে একটি পিলারের ফাউন্ডেশনের উপর তিন্নির মৃতদেহ পাওয়া যায়। উৎসুক জনতার ভীড় জমলে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুরতহালের পর ময়নাতদন্ত করে। চারদিন পরে অজ্ঞাত হিসেবে জুরাইন কবরে লাশ দাফন করা হয়। পরবর্তীতে তিন্নির লাশ সনাক্ত করার মাধ্যমে পুরো দেশ তার এই মর্মান্তিক মৃত্যুর কাহিনী জানতে পারে। এই হত্যার পেছনে একমাত্র আসামী, এক সময়ের আলোচিত-সমালোচিত ছাত্রনেতা গোলাম ফারুক অভি। কিন্তু সে পলাতক থাকার কারনে তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাই অন্যদের মতই এই হত্যার বিচারব্যবস্থাও অন্ধকারে পরে রয়েছে।

মিতা নূর

টিভি নাটকে অত্যন্ত প্রিয় ও পরিচিত মুখ মিতা নূর। টিভি নাটকে অভিনয় ও মডেলিংয়ের পথ ধরে ২০১১ সালে নাট্য নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সফল ও সদাহাস্যময় এই অভিনেত্রীকে  ২০১৩ সালে তার নিজের বাসায় ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পারিবারিক কলহের জের ধরে এই ঘটনার সুত্রপাত হয়েছে বলে মনে করা হলেও মিতা নূরের বাবা তার মেয়ের মৃত্যুর জন্য মেয়ের জামাইকে দায়ী করেন। পরবর্তীতে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আত্মহত্যার প্রমান পাওয়া যায়। তবে শোবিজের প্রায় কেউই এই আত্মহত্যার খবরটি মেনে নিতে পারেনি। তারা মিতা নূরকে স্বামীর পরকিয়ার বলি বলে উল্লেখ করে থাকেন।

লাক্স তারকা রাহা

‘আমাকে একটা বাচ্চা হাতি কিনে দিবে?’ লাক্স তারকা রাহাকে যারা চিনে তারা তার এই  নাটকের ডায়লগের সাথেও পরিচিত। লাক্স তারকা হিসেবে তার আগমন ঘটলেও অনন্ত জলিলের ‘খোঁজ দ্য সার্চ’ ছবিতে পাশ্ব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য আলোচনায় আসেন। ২০১৩ সালে নিজ ফ্ল্যাটে তাকে গলায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। কি কারনে এই আত্মহত্যা তার কোন কারন এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তার উপর তার মৃত্যু নিয়ে পরিবারের একেক জনের একেক রকম তথ্য অনেক রহস্যের জন্ম দেয়।

-ছবি সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 × 4 =