বাঙালিয়ানার ৫০ বছর

করেছে Sabiha Zaman

বাঙালিয়ানার ৫০ বছরের যাত্রা, দেখতে দেখতে ৫০টি বছর পাড়ি দিল বাংলাদেশি বাঙালিরা। সময় অতিবাহিত হয়েছে, একেকটি অধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত দিন গুনে। দিন বদল হয়েছে, বদলে গেছে প্রচলিত প্রথা। সব বদলের মাঝে আত্মতৃপ্তির জায়গা করে নিয়েছে রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতা। এবার ৫০-এ দাঁড়িয়ে আমরা বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির দরজায় কড়া নাড়ছি। বাংলাদেশি বাঙালিয়ানার ৫০ বছর নিয়ে আয়োজন রেখেছি  লেখায়। লিখেছেন কানিজ ফাতিমা

বাংলা ভাষার রদবদল
বাঙালির ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের কিন্তু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য অনেক পুরোনো। কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়েছে। বাঙালি জাতি একটি সংকর জাতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম জাতির অন্যতম। প্রায় ১৫০০ বছর আগে আর্য-অনার্যমিশ্রিত প্রাকৃত ভাষা থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক ব্রাহ্মী লিপি থেকে সিদ্ধম লিপির মাধ্যমে আধুনিক বাংলা ভাষার উৎপত্তি। বর্তমান বাঙালির নৃতাত্ত্বিক গঠন শুরু হয় মূলত পাল শাসনামলে। বাংলাদেশ, আসাম বলে আমরা যে বাঙ্গালাহকে চিনি, সেটা একসময় কোনো ভূখণ্ড ছিল না। ১৩৩৮ সালে স্বাধীন সুলতানি আমলে পূর্ব বাংলা, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ মিলে ‘বাঙ্গালাহ’ ভূখণ্ড হিসেবে অস্তিত্ব লাভ করে। শুরুতে চট্টগ্রাম এর বাইরে ছিল, পরে সুবাদার ইসলাম খাঁর সময়ে সেটি একত্র করা হয়। ধীরে ধীরে জাতির পরিবর্তনের সঙ্গে ভাষারও পরিবর্তন হতে থাকে।

আর্যদের মৌখিক ভাষা সম্পর্কে খুব একটা তথ্য পাওয়া না গেলেও তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ  বৈদিক ভাষা লক্ষণীয়। এই বৈদিক ভাষার পরিবর্তন বা সংস্কারের ফলে পাওয়া যায় সংস্কৃত ভাষা। অনেকের মতে, সংস্কৃত ভাষা শুধু ব্রাহ্মণেরা ব্যবহার করতেন, এটা ছিল লেখ্য ভাষা। বাংলার আদি স্তর হলো ‘প্রাকৃত ভাষা’। সুকুমার সেনের মতে, মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের কাব্যগ্রš’ ‘বঙ্গবাণী’তে বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ব করার প্রমাণ পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার প্রথম কাব্যগ্রš’ হলো ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, যার রচয়িতা হলেন চণ্ডীদাস। বর্তমানে আমরা যে ভাষায় কথা বলি, সেটা ১৮০০ সালে ইংরেজদের ¯’াপিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের মুদ্রণযন্ত্রের অবদান।

দিনপঞ্জির পরিবর্তন
ভাষার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, আচার-অনুষ্ঠানেও পরিবর্তন হতে থাকে। ধীরে ধীরে বাংলা সনের শুরু হয়, দিন-তারিখের পরিবর্তন আসে। আগে সৌরপঞ্জিকা অনুযায়ী বারো মাস পালিত হতো, যা কিনা শুরু হতো এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে। কিন্তু পরে বাংলা দিনপঞ্জি উদ্ভব করা হয়। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, সপ্তম শতকের রাজা শশাঙ্ককে বাংলা দিনপঞ্জি উদ্ভাবনের কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন অনেকে। সম্রাট আকবরের শাসনামলে তিনি দিনপঞ্জি পরিবর্তন করেন খাজনা বা কর আদায়ের সুবিধার্থে। কারণ মোগল শাসনামলে হিজরি সাল অনুযায়ী কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করা হতো, কিন্তু হিজরি সন চাঁদ নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সময়ের সঙ্গে মিলত না। যার কারণে অসময়ে কৃষকদের খাজনা দিতে হতো। এরই ফলশ্রুতিতে সম্রাট আকবর বর্ষ পঞ্জিকায় সংস্কারের আদেশ দেন। আকবরের রাজকীয় সৌরবিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজী সৌরসন ও হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সনের নিয়ম নির্মাণ করেন। এই গণনাপদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের পর থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ‘ফসলি সন’। পরে এর নাম পরিবর্তন করে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ রাখা হয়। বাংলা সনের মূল নাম ছিল তারিখ-ই-ইলাহি। তারিখ-ই-ইলাহিতে বারো মাসের নাম ছিল কারবাদিন, আরদি, বিসূয়া, কোদারদ, তীর, আজুর, বাহার, আবান, ইস্কান্দার মিজ ও বাহাম। কবে যে এইগুলো পরিবর্তিত হয়ে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র হয়ে গেছে সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ধারণা করা হয়, বারোটি নক্ষত্রের নামানুসারে পরে বাংলা মাসের নামকরণ করা হয়। যেমন বিশাখা থেকে বৈশাখ, জায়ীস্থা থেকে জ্যৈষ্ঠ, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, আশ্বায়ীনি থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রাহায়ণ থেকে অগ্রহায়ণ, পউস্যা থেকে পৌষ, চিত্রা থেকে চৈত্র, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন।

ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যগুলোতে যে দিনপঞ্জি ব্যবহার করা হয়, তা মূলত সংস্কৃত গ্রহ’ ‘সূর্য সিদ্ধান্ত’-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যার কারণে ভারতে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয় ১৫ এপ্রিল। দিনপঞ্জির হিসাব অনুযায়ী এটা হয়ে থাকে। কিš‘ বাংলাদেশে ১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পুরোনো দিনপঞ্জি সংশোধিত করেন। এখানে প্রথম পাঁচ মাসকে ৩১ দিন, বাকি মাসগুলোকে ৩০ দিন করা হয়। এবং প্রতি অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ৩১ দিন করা হয়। ১৯৮৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে এই দিনপঞ্জি গ্রহণ করা হয়। এরপর থেকে জাতীয় দিনপঞ্জির সূচনা ১৪ এপ্রিল হয়ে থাকে। ১৪২৬ বঙ্গাব্দে গ্রেগরির বর্ষপঞ্জির সঙ্গে বাংলা বর্ষপঞ্জির বিশেষ দিনগুলোর সমন্বয় আনতে বাংলা একাডেমি দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধন করে। নতুন বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিনÑ এই ছয় মাস ৩১ দিন হবে। ফাল্গুন ছাড়া বাকি ৫ মাস ৩০ দিনের হবে। শুধু অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস হবে ২৯ দিনের।

পহেলা বৈশাখের সূচনা
আকবরের শাসনামল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্্যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেক বছরের চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে কৃষকদের সকল প্রকার খাজনা, কর, শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকেরা তাদের প্রজাদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করত। এই দিন উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। কালের বিবর্তনে এই সব উৎসব সামাজিক আচার-অনুষ্ঠনে পরিণত হয়, যা কিনা বর্তমানেও প্রচলিত আছে। ওই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান ছিল ‘হালখাতা’। হালখাতা বলতে নতুন হিসাবের খাতাকে বোঝানো হয়। মূলত এটা হলো বছরের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব খোলার নতুন প্রক্রিয়া। ব্যবসায়ীরা এই দিনে ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। গ্রামে-গঞ্জে, শহরে এখনো এই ‘হালখাতার’ অনুষ্ঠান পালন করা হয়।

আকবরের সময়কাল থেকে শুরু হওয়া পহেলা বৈশাখ বর্তমানেও পালিত হচ্ছে। সর্বপ্রথম আধুনিক নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপিত  হয় খুব সম্ভবত ১৯১৭ সালে। তারপর থেকে নিয়মিতভাবে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে। কালের বিবর্তনে উৎসব অনুষ্ঠানেও অনেক পার্থক্য চোখে পড়ে। ৪০-৫০ বছর আগে ছোট ছোট নানা উৎসবের মধ্য দিয়ে পালিত হতো দিনটি। স্কুল-কলেজে থাকত গানবাজনার অনুষ্ঠান। হাটবাজারগুলোতে চলত হালখাতার উৎসব। সারা বছরের দেনা-পাওনা মিটিয়ে দিত ক্রেতারা। বাড়িতে রান্নার ধুম পড়ে যেত। সকালবেলা, ভর্তা দিয়ে গরম ভাত, ভর্তা, মিষ্টি, মুড়ি-মুড়কি খাওয়া যেন একটা উৎসবের মতো ছিল। গ্রামে-গঞ্জে, মফঃস্বল শহরে মেলা, যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতো। এই দিনে দেশের ঐতিহ্যবাহী কিছু গ্রামীণ খেলার আয়োজন করা হতো। যেমন নৌকাবাইচ, হাডুডু, লাঠি খেলা, কুস্তি প্রভৃতি।

নিষিদ্ধ করা হয়েছিল পহেলা বৈশাখের বিভিন্ন অনুষ্ঠান
পাকিস্তান আমলে রেডিও, টিভি, বইপুস্তকসহ সবখানে রবীন্দ্রসাহিত্য চর্চা ও অন্যান্য প্রগতিশীল চর্চা নিষিদ্ধ করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে পহেলা বৈশাখের উৎসবে চালু হয় নানা ধরনের অনুষঙ্গ, যা কিনা পরে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। ঢাকার পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্রবিন্দু  হচ্ছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মিলিত সংগীতানুষ্ঠান। ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের প্রতিবাদে রমনার বটমূলে ১৯৬৭ সাল থেকেই সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হতো, যেটা এখনো পালিত হয়। পাকিস্তান সরকার পহেলা বৈশাখকে ‘হিন্দুয়ানি’ অনুষ্ঠান বলে আখ্যায়িত করছিল। বিভিন্ন জায়গায় এই পহেলা বৈশাখের বিভিন্ন অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করেছিল পাকিস্তানি শাসকেরা। ১৯৭১ সালে পহেলা বৈশাখের সরকারি ছুটি জরুরি অবস্থার কারণে বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকাসহ সারা দেশে নববর্ষের সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আবহমান বাংলার উৎসব
ঢাকার বর্ষবরণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য এবং আবশ্যিক অংশ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকা ও রাস্তা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হয়। গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং আবহমান বাংলার বিভিন্ন রূপ ফুটিয়ে তোলা হয় এই শোভাযাত্রায়। নারী, পুরুষ, শিশু, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ এ শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। ১৯৮৯ সাল থেকে প্রতিবছর এই মঙ্গল শোভাযাত্রা উদ্্যাপিত হয়ে আসছে। তবে শোভাযাত্রার সূত্রপাত কিš‘ হয়েছিল যশোরে। ১৯৮৭ সালে যশোরের উদীচী সমিতির আয়োজিত এক বর্ষবরণ এ শুরু হয়েছিল এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় যশোরের সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল।

আর সোনারগাঁওয়ে প্রতিবছর নববর্ষে ভিন্নধর্মী মেলা হয় যার নাম ‘বউমেলা’। ধারণা করা হয়, প্রায় ১০০ বছর ধরে পাঁচ দিনব্যাপী এ মেলা চলে আসছে। প্রাচীন এক বটবৃক্ষের নিচে এ মেলা বসে। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের নানা ধরনের পূজা-অর্চনাও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা এই দিনে ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। ত্রিপুরাদের বৈসাবি। মারমাদের সাংগ্রাই, চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে এই তিন সম্প্রদায় সম্মিলিতভাবে এই উৎসব পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম ‘বৈসাবি’। এই উৎসবেরও নানা দিক আছে, যার মধ্যে মারমাদের ‘পানি উৎসব’ খুব জনপ্রিয়।

বদলে গেছে উৎসবের ধরন
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বৈশাখী উৎসব পালনের ধরন ও ধারাবাহিকতা পাল্টে গেছে। আগে বৈশাখী উৎসব বেশির ভাগই ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। আগে বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে অনেক খেলা ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। নববর্ষকে মাথায় রেখে ছোট-বড় মেলা হতো। মেলার মূল আকর্ষণ ছিল পুতুলনাচ, লোকগান। এখনো মেলা হয়, তবে সেখানে এসেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। এখন শপিংমলগুলোতে বৈশাখী মেলা উপলক্ষে বিভিন্ন পণ্যের ওপর ছাড় থাকে। পারস্পরিক ভাববিনিময়, সম্প্রীতির ক্রয়-বিক্রয়ের অনুষ্ঠান ছিল বৈশাখী মেলা। সারা বছরের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এসব মেলা থেকেই কেনা হতো। মেলা উপলক্ষে কৃষিজ দ্রব্য, মৃৎশিল্প, বাঁশ, বেত, মাটির জিনিস তৈরির ধুম পড়ে যেত গ্রামে-গঞ্জে। বর্তমানে দেশজ পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি ও আধুনিক পণ্যেরও ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে, যেটা আগে ছিল না। উৎসবমুখর ঘরোয়া আমেজ থাকত আগের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। নতুন জামাকাপড় পরিধান করে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, বিভিন্ন মেলায় ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি করেই কেটে যেত সেকালের বৈশাখ। এখন সবকিছুই কেমন যেন বাণিজ্যকেন্দ্রিক। নতুন বছরে নতুন পোশাকের রেওয়াজ থাকলেও লাল-সাদা পরার নিয়ম হয়েছে সম্প্রতি। পান্তা- ইলিশ নিয়ে বাণিজ্য করার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বেশ কিছু অতি উৎসাহী ব্যবসায়ীর কারণে এই পান্তা-ইলিশের ব্যবসা চালু হয়েছিল এবং বেশ কিছু বছরের প্রসারও বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু অতিরিক্ত দাম, অসময়ের ইলিশ ধরা ইত্যাদি নানাবিধ কুফলের কারণে সরকারিভাবে এটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তা ছাড়া গ্রামীণ সংস্কৃতিতে কোথাও পান্তা-ইলিশের উল্লেখ নেই।

আগের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকজ সংস্কৃতি তুলে ধরার প্রয়াস ছিল। হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন জিনিস তুলে ধরার সর্বাত্মক চেষ্টা থাকত। এখনকার বর্ষবরণে এসব এখন নেই বললেই চলে। লোকগান উঠে গিয়ে এখন মাঝেমধ্যে উদ্ভট কিছু হিন্দি গান চলতে থাকে। ঢাকার রাস্তায় মাঝেমধ্যে পিক-আপভ্যানে, ট্রাকে ফুল ভলিউমে গান বাজতে থাকে। বৈশাখের প্রথম দিনে জমিদারেরা কর আদায় করে কৃষকদের আপ্যায়ন করতেন। দেনা-পাওনার সঙ্গে আপ্যায়নের বিষয়টি বহুকাল থেকেই চলে আসছে। তবে দিন দিন এই প্রথা উঠে যা”েছ। গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা বর্ষবরণে লেনদেনের এই প্রথা ধরে রাখলে ও নগরজীবনে এই প্রথা একেবারেই উঠে গেছে। শহরে এখন আর হালখাতার অনুষ্ঠান হয় না। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হালখাতার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে এনেছে। তবে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, চকবাজারের ব্যবসায়ীরা এখনো হালখাতার অনুষ্ঠান উদযাপন করে থাকেন। সেকালের বর্ষবরণের খাবারের সঙ্গে এখনকার খাবারের অনেক অমিল। আগের দিনে বৈশাখী মেলায় মুড়ি, মুড়কি, মিষ্টি, আচার, বিভিন্ন ধরনের দেশীয় খাবার থাকত। কিন্তু এখনকার মেলায় এসব খাবারের প্রচলন উঠে যাচ্ছে। বরং বিদেশি খাবারে ভরপুর থাকে বৈশাখী মেলা। ধীরে ধীরে দেশীয় খাবার, সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে দেখে দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে গত ৯-১০ বছর ধরে বাংলা একাডেমি প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল ২১ এপ্রিল পর্যন্ত বৈশাখী মেলার আয়োজন করে আসছে। এই মেলায় লোকসংগীত, পুতুলনাচের ব্যবস্থা থাকে। দেশীয় খাবার, পোশাক, বাঁশ, কাঠের জিনিস, মাটির জিনিস, হাতের কাজের জিনিস প্রভৃতি জিনিস পাওয়া যায়।

বিবিয়ানার ফ্যাশন ডিজাইনার লিপি খন্দকারের মতে, আশির দশকের শেষের দিকে বর্ষবরণের উৎসব এত বাণিজ্যিক ছিল না। সেই সময় হালখাতা, স্কুলে ছোট ছোট অনুষ্ঠান, বাড়িতে মজার মজার খাবার রান্নার মধ্য দিয়েই পালিত হতো তখনকার বৈশাখ। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে আড়ং, নিপুণ রঙের মতো ডিজাইন হাউসগুলো বৈশাখকে কেন্দ্র করে পোশাক ডিজাইন শুরু করে। এবং সবাই যাতে বৈশাখের পোশাক কিনতে পারে, সেভাবেই দাম নির্ধারণ করা হতো। তিনি আরও বলেন, এই সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পোশাক ডিজাইনের প্রতিযোগিতা হতো। তার মতে, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার পর থেকেই আসলে পহেলা বৈশাখ পালনে এত ব্যাপকতা এসেছে। তিনি বলেন, তার সময়ের বৈশাখের আচার-অনুষ্ঠান, খাবার, পোশাকের সঙ্গে এখনকার অনেক পার্থক্য রয়েছে। এখনকার নতুন প্রজন্ম বৈশাখ পালনে বেশি আগ্রহী। তিনি মনে করেন, আমাদের দেশে ঈদের থেকেও বেশি ব্যাপকভাবে নববর্ষ পালন করা হয়।

এখনো প্রতিবছর খুব আয়োজন করে নববর্ষ পালন করা হয়, যত সময় যায় তত আনুষ্ঠানিকতার মাত্রাও বাড়তে থাকে। কিন্তু নিত্যনতুন আয়োজনে হারিয়ে যাচ্ছে লৌকিকতা, গ্রামীণ সংস্কৃতি। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে আনন্দের ধরন, উৎসব উদযাপন ধরন। তাই হয়তো এখন মানুষ হাজার হাজার টাকা খরচ করে বড় বড় রেস্টুরেন্টে গিয়ে পান্তা-ইলিশ খায়। অনেক জায়গায় বাংলা গানের পরিবর্তে বাজতে থাকে কুরুচিপূর্ণ হিন্দি গান। তবু নিজের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে অনেকেই নানা ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। পিঠা মেলা, বৈশাখী মেলা, পুতুলনাচ ইত্যাদি ছোট ছোট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে আমাদের পুরোনো ঐতিহ্য।
বহু বছর ধরে আমাদের দেশে পালিত হয়ে আসছে পহেলা বৈশাখ। হয়তো আগের মতো করে পালিত হয় না। আচার-অনুষ্ঠানে, খাবারে, পোশাকে, গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রভাব কম থাকে তবু বর্ষবরণ বাঙালিয়ানার একটা বড় অংশ। আজও নববর্ষ আমাদের কাছে অনেক অর্থবহ।

ছবি : সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

1 × 5 =