বাস্তবতাই আমার সাহিত্যের ভিত্তি

করেছে Rodoshee

মুখোমুখি: শওকত আলী

বাংলা কথাসাহিত্যের অগ্রগণ্য লেখক শওকত আলী। বর্তমানে প্রবল অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। তাঁর সৃষ্টির পরিসর বিচিত্র ও ভাবনা বিস্তার দীর্ঘ। সমালোচকদের দৃষ্টিতে তার রচিত ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বাংলা সাহিত্যে নতুন এক মাত্রার সংযোজন। যা দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি দখল করে নিয়েছেন স্থায়ী আসন। সময়ের এই শক্তিমান কথাসাহিত্যিক বেশ আগে এক আড্ডায় কথা বলেছিলেন তার জীবন এবং সাহিত্য সম্পর্কে। ‘রোদসী’র পাঠকদের জন্য এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো।

প্রশ্ন : আপনার বেড়ে ওঠা, আপনার শৈশব নিয়ে কিছু জানতে চাই।
শওকত আলী : আমার জন্ম বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জ নামের এক থানাশহরে। সেখানেই কেটেছে আমার শৈশব। আমার জন্মের আগেই দাদা মারা যান। দাদি আমাকে খুব আদর করতেন। রাতে দাদির কাছেই থাকতাম। বাবা লেখাপড়ার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন। প্রচুর বই ছিল। মা-ও লেখাপড়ার দিকে আগ্রহী ছিলেন। ইংরেজি শেখার জন্য মা ইংরেজি স্কুলের একজন দিদিমণিকে রেখেছিলেন। স্মৃতি যত দূর যায়, শিশু বয়সে ওই গাছপালা, বাগান, প্রকৃতি দেখতাম আর দাদির কোলে বসে কাহিনি শুনতাম। জন্মের পর থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত রায়গঞ্জেই ছিলাম। তারপর শ্রীরামপুর। হুগলি জেলায়। সেখানে টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটে মা ভর্তি হলেন ডিপ্লোমা করতে। স্কুলজীবন শুরু হয় শ্রীরামপুর মিশনারি স্কুলে। পরে আবার রায়গঞ্জে ফিরে আসি। ভর্তি হই রায়গঞ্জ করোনেশান স্কুলে। ওখান থেকেই মেট্রিক পাস করি।

প্রশ্ন : আপনার এখনকার রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে চাই।
শওকত আলী : আমি কোনো দলের চিন্তা করি না। রাজনীতিক কর্মসূচিও দেখি না। সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা যেখানে বলা আছে, সাধারণ মানুষের জীবনের পরিবর্তন যাতে আসে এবং সাধারণ মানুষের যাতে ভালো হয় সেটাই সমর্থন করি।
প্রশ্ন : দেশভাগের সময়টাতে স্বচক্ষে আপনি সেটা অবলোকন করেছিলেন। এর জন্য ছেড়ে আসতে হয়েছিল আপনার জন্মস্থান। দেশভাগের এই ব্যাপারটি কি আপনার লেখাকে প্রভাবিত করেছে?
শওকত আলী : জন্মস্থান হারানোর এই বেদনা তো অপরিসীম। সেটা ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। এ বিষয়টি আমার লেখালেখিতে বিচ্ছিন্নভাবে এসেছে।
প্রশ্ন : আপনার ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ ব্যাপক আলোচিত একটি উপন্যাস। অনেকেই এটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে চিহ্নিত করেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
শওকত আলী : এটাকে ঠিক ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যাবে না। বলতে পারেন এটি ঐতিহাসিক একটি সময় বা পর্যায়ের উপন্যাস। কারণ, আমি তো তাতে সময় বা ঘটনার প্রামাণিক কোনো কিছুকে উপস্থাপন করিনি। প্রদোষকাল মানে দিন ও রাত্রির মাঝামাঝি সময়। হিন্দু শাসন চলে যাচ্ছে, মুসলমান শাসকেরা আসছেন, এই মাঝামাঝি সময়ে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা, তারা কী ভাবছে এটিই উপন্যাসের উপজীব্য। ওই উপন্যাসে কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার কোনো কথা নেই। সাধারণ মানুষের যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, তা-ই উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রশ্ন : ‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘কুলায় কালস্রোত’ এবং ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’ যেগুলোকে ত্রয়ী উপন্যাস বলা হয়, সেটার জন্য তো আপনি ফিলিপস্ পুরস্কার পান। ওই উপন্যাসে যে জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ দেখি, সে সম্পর্কে কিছু বলুন।
শওকত আলী : ষাটের দশকের মানুষের মধ্যে চিন্তাভাবনার যে পরিবর্তন আসছে, সেটাই ‘দক্ষিণায়নের দিন’ যার মানে হচ্ছে শীতকাল আসছে। ‘কুলায় কালবস্রোত’ হচ্ছে পরিবর্তন যেখানে আঘাত করছে। আর ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’ হচ্ছে নতুন সময়টি আসার একেবারে আগের সময়টি। মূলত ষাটের দশকে আমাদের মধ্যবিত্ত এবং সমগ্র সমাজব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসে। নতুন একটা চিন্তাচেতনা দ্বারা আলোড়িত হয় পুরো সমাজ। ধ্যানধারণা চালচলন জীবনব্যবস্থায় একটা পরিবর্তনের সুর বেজে ওঠে। সেসবই উপন্যাসে আনতে চেয়েছি। ‘দক্ষিণায়নের দিন’ উপন্যাসে দেখা যায় নায়িকা রাখিকে ভাইয়ের বন্ধু-যে একজন বিপ্লবী, তার সঙ্গে মিলিত হতে। যদিও রাখি তার স্বামী কর্তৃক প্রতারিত। আমার সব লেখাতেই শুধু কল্পনা করে আমি কিছু লিখিনি, আমি বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই লিখেছি।
প্রশ্ন : বিবাহবহির্ভূত এ রকম দৈহিক মিলন কি আপনি তখন সমর্থন করেছিলেন, নাকি প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে ফেলার জন্য অথবা নায়িকাকে প্রতিবাদী হিসেবে দেখানোর জন্য এই কাহিনির নির্মাণ?
শওকত আলী : উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণ-তরুণীদের মধ্যে তখনই কিন্তু একটা ভিন্নবোধেরও সূচনা হয়েছিল। বিভিন্ন পার্টিতে যাওয়া, হোটেলে যাওয়া- এসবের শুরু কিন্তু তখনই হয়েছিল। ওই সময়ের আমার চেনাজানা সার্কেলের মধ্যে এবং আধুনিক তরুণ-তরুণীর কাছেও চিন্তা ছিল শুধু বিবাহিত হলেই দৈহিক সম্পর্ক আর বিবাহিত না হলে এমন সম্পর্ক হবে না- এগুলো পুরোনো সংস্কার। বিয়ে কি আর থাকছে? যাকে ভালো লাগে, তার কাছাকাছি হবে। ঘনিষ্ঠ হবে। এগুলোই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন : কলকাতার সাহিত্যচর্চার সঙ্গে আমাদের সাহিত্যচর্চার পার্থক্যটা কী?
শওকত আলী : আগে শুরু হওয়া আর পরে শুরু হওয়া। পূর্ববঙ্গে যে সাহিত্যচর্চা হতো, তার কোনো স্বীকৃতিই ছিল না। কলকাতায় যারা সাহিত্যচর্চা করতেন, তারাই উজ্জ্বল ছিলেন। সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা পুরোটাই কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল। এখান থেকে যারা কলকাতা গিয়েছিলেন চল্লিশের দশকের শেষে বা পঞ্চাশের দশকের শুরুতে, যারা আবার ফিরে এলেন তারা সাহিত্যচর্চা শুরু করলেন, এখানে সাহিত্যচর্চার যে ধারা ছিল তাকে বিকশিত ও বেগবান করলেন। বিষয়, আঙ্গিক, ভাষা- এসব উপাদানের ক্ষেত্রে নতুন ধারার সৃষ্টি হলো, ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চাও খুব ভালোভাবেই শুরু হলো। ঢাকা একটা কেন্দ্র হলো। এখন ঢাকাই মূলত বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন : ‘নারী লেখক’ বিষয়টি নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? এই ধরনের অভিধা কি আপনি মানেন?
শওকত আলী : লেখক লেখকই। নারী-পুরুষে কিছু আসে যায় না। তবে নারীদের জন্য বাধাটা পুরুষদের চাইতে বেশি। সে রকম বাধা অতিক্রম করে যে নারীরা লিখেছেন এবং সুফিয়া কামালের মতো কবি এবং অন্য লেখকেরা বেরিয়ে এসেছেন, এটাই আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি।
প্রশ্ন : এখন বছরে অনেক ঈদসংখ্যা হচ্ছে। এসব সংখ্যার জন্য ছোট সাইজের উপন্যাস লেখা হচ্ছে। বলা যায়, পৃষ্ঠা গুনে এসব ফরমায়েশি উপন্যাস লিখতে হচ্ছে। লেখক তাঁর স্বাধীনতা অনুযায়ী বা বিষয়কে ধারণ করতে উপন্যাসের কলেবর যা হওয়া উচিত, সেভাবে লিখতে পারছেন না। আমাদের দেশের বড় বড় লেখকেরাই এভাবে লিখছেন। এ ধরনের উপন্যাস সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
শওকত আলী : একটা উপন্যাস বা গল্প সে যা-ই হোক, কোনো বিষয় বা জীবনকে প্রকাশ করতে যতটুকু প্রয়োজন হবে, ততটুকুই তার কলেবর হতে হবে। কোনো উপন্যাস ছোটও হতে পারে। কিন্তু ওই উপন্যাসের জন্য হয়তো এটাই সাইজ। ঈদসংখ্যার জন্য এ ধরনের ফরমায়েশি উপন্যাস আমিও লিখেছি, তবে আমি মনে করি যদি আগে থেকেই হিসাব করে লেখা হয়, কয় পৃষ্ঠা লিখে, তাতে সৃষ্টিটা পরিপূর্ণতা পায় না। লেখা বা সৃষ্টির জন্য এটা শুভ নয়।
প্রশ্ন : জনপ্রিয় লেখক-সিরিয়াস লেখক এবং জনপ্রিয় উপন্যাস- সিরিয়াস উপন্যাস- এমন একটা বিভাজনের বিষয় দেখা যায়। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
শওকত আলী : জনপ্রিয় লেখা-সিরিয়াস লেখা- এটা সব সময় সব দেশেই ছিল। আমাদের দেশে আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এভাবে বিভাজন করতে চাই না বা বিশ্বাস করি না। উপন্যাস হলো কি না, এটাই বড় কথা। সৃষ্টি পাঠক বা পাঠকের মনকে স্পর্শ করতে পারছে কি না, সেটাই বিবেচ্য। অনেক সিরিয়াস উপন্যাসও অনেক জনপ্রিয় হতে পারে। আবার অনেক জনপ্রিয় উপন্যাসও হয়তো পাঠক একসময় আর পড়ছে না। ফলে এ রকম জনপ্রিয় উপন্যাস বা পাঠক বিশ্বজুড়েই আছে। এটি সমগ্র সাহিত্যচর্চারই একটা অংশ।
প্রশ্ন : আপনার অনেক লেখাতেই আমরা নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং যৌনতার বিষয়গুলোর উপস্থাপন দেখি। সাহিত্য বা শিল্পে কতটুকু যৌনতা আনা সমীচীন?
শওকত আলী : আমি আমার লেখায় যৌনতাকে এনেছি। যে জায়গায় আনা প্রয়োজন, সেখানেই তা এনেছি। যে পরিবেশে এলে এ ধরনের বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক, যে পরিবেশ বা পরিস্থিতি হলে ওই ঘটনাটা ঘটবে এবং কাহিনি যেটা দাবি করে, সেটা জঙ্গলে, বনে বা কুটিরে- যেখানেই হোক, ওই পরিবেশ বর্ণনা করতে গিয়েই যৌনতা আনতে হয়েছে। যৌনতা ততটুকু আনতে হবে, যেটা গল্পের জন্য প্রয়োজন। গল্পের মূল অথবা চরিত্রের মূল প্রকাশ করার জন্য যতটুকু দাবি করে। যদি আমি মানবসভ্যতার আগের কোনো কাহিনি লিখতে চাই, তাহলে কী লিখব? সে সময়ে নারী-পুরুষের যে সম্পর্ক, তা তো আমাকে লিখতে হবেই, তাই না!

প্রশ্ন : গল্পের প্রয়োজন ছাড়া অকারণ যৌনতার বর্ণনাকে কি সাহিত্যে অশ্লীলতা সৃষ্টি- বলা যাবে?
শওকত আলী : এক অর্থে তো বলা যাবে। কাহিনিতে অকারণ যৌনতাকে আনা হলে বোঝা যাবে, সে জীবনকে ধারণ করতে চায় না। জীবনবিরোধী বোধ এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ ঘটাতে চায়। সাহিত্যকে, শিল্পকে বুঝতে হলে এর জন্য প্রেম প্রয়োজন। প্রেম তো প্রয়োজন আছে জীবনের জন্যও। প্রেম না হলে জীবন হয় না। জীবনের কথা যে লিখতে চায়, জীবনকে যে সামনে আনতে চায়, তার লেখায় তো প্রেম আসবেই। আর প্রেমেও যৌনতা থাকবে। তবে প্রেমপূর্ণ যৌনতা প্রেমে পূর্ণতা আনে আর অকারণ যৌনতা প্রেমকে পরিপূর্ণতা দেয় না বরং বিকৃত করে।
প্রশ্ন : এতটা জীবন কাটিয়ে এলেন। ইতিহাসের অনেক ভাঙা-গড়া দেখেছেন। জীবনে অনেক সৃষ্টি করেছেন, অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, লেখার স্বীকৃতিও পেয়েছেন। এখন এই জীবনসায়াহ্নে এসে জীবন সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি কী?
শওকত আলী : জীবনে উপলব্ধি হচ্ছে, যত দিন বাঁচি, বাঁচতে হবে। আনন্দকে গ্রহণ করতে হবে। আমি জীবনকে উপভোগ করেই বাকিটা সময় বাঁচতে চাই। জীবনের মূল লক্ষ্য জীবনকে উপভোগ করা হলে আমার মনে হয় সেটিই সঠিক সিদ্ধান্ত।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ইরা সামান্তা
ছবি : সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

1 + 9 =