বিউটি সেক্টরেও ডিজিটাল বিস্ময়

করেছে Sabiha Zaman

সুরাইয়া নাজনীন

চলছে অনলাইন সাইক্লোন। যে কোনো পণ্য আমরা ঘরে বসেই কিনতে পারছি। তবে এখন বেড়েছে দুর্দান্ত প্রতিযোগিতা। এটা অবশ্য ডিজিটাল বিপ্লবই বটে! ফ্যাশনে হোক আর বিউটি সেক্টরেই হোক, মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি রুচিশীল। তাই উদ্যোক্তারা সময়ের প্রয়োজনে অনলাইন পেজগুলো আপডেট রাখে প্রতি মুহূর্তেই।

বিউটি সেগমেন্টের ক্ষেত্রে অনলাইন অনেক উপযোগী হয়ে উঠেছে। সত্যি বলতে গেলে বর্তমানে মানুষ অনলাইন পেজ থেকেই বিউটি সেগমেন্টের প্রোডাক্ট বেশি কিনে সাধারণ দোকানের তুলনায়। ফলে কাস্টমার যে রকম অনেক বেশি, কম্পিটেশনও অনেক বেশি। বলছিলেন ছুমন্তর পেজের কর্ণধার সাজিয়া আফরিন। তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ সাধারণ দোকানের পরিবর্তে অনলাইন থেকে বিউটি প্রোডাক্ট কেনা শুরু করেছে। তার কারণই হলো সাধারণ দোকানগুলোতে তারা মানসম্পন্ন প্রোডাক্ট পেত না। ফলে আমার মনে হয় অনলাইনে যারা ভালো করছে, তারা আসল মানের প্রোডাক্টই দিচ্ছে। এ কারণেই মানুষ অনলাইন থেকে এখন বেশি কিনছে। আমরা যেমন আমাদের বেশির ভাগ প্রোডাক্ট সাধারণত অস্ট্রেলিয়া ইমপোর্ট করি। ক্রেতারা চাইলে আনুমানিক সময় নিয়ে তাদের ভালো প্রোডাক্ট দেওয়ার চেষ্টা করি। বেশির ভাগ বিউটি প্রোডাক্টের মধ্যে বারকোড থাকে এবং বারকোড ব্যবহার করে কাস্টমার নিজেই চেক করে নিতে পারবে প্রোডাক্টটা অথেনটিক কি না।’

ছুমন্তরের কর্ণধার সাজিয়া আফরিন, তিনি থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। তিনি একজন প্রবাসী উদ্যোক্তা হয়ে দেশের মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশ কোনো বাধা নয়, তবে টেকনোলজির বিষয়টি ভালোভাবে আয়ত্ত করা জরুরি, বললেন সাজিয়া। পণ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, পণ্য যে দেশেরই হোক না কেন, বারকোড ব্যবহার করে সহজেই অথেনটিসিটি সম্পর্কে জানা সম্ভব, সুতরাং সব মানুষেরই বারকোডের মাধ্যমে কীভাবে পণ্যের অথেনটিসিটিটা বের করতে হয়, সেটা জেনে রাখা ভালো। তার মাধ্যমে আসল প্রোডাক্টের মান, নিশ্চয়তা সম্পর্কে খুব সহজে এ ধরনের সমস্যা এড়িয়ে চলা সম্ভব।

রামিসা, মেকআপ আরটিস্ট-ছুমন্তর

বর্তমানে অনলাইন বিউটি সেক্টরটা সবার জন্যই উপযোগী হয়ে উঠেছে। আগে যেমন বিউটি স্যালন ছাড়া বিশেষ বিশেষ কাজ করা যেত না। সাজ নিজে করার কথা ভাবাই যেত না। আর এখন প্রযুক্তির কল্যাণে ভালো মানের কিছু প্রোডাক্ট থাকলেই ঘরে বসে চট করে সেজে নেওয়া যায়। এতে সময় আর অর্থ দুটোই সঞ্চয় হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এক্সপেরিমেন্টেরও সুযোগ থাকছে। এ ছাড়া আগের তুলনায় মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। কী প্রোডাক্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রোডাক্টের মান কী রকম, কেমিক্যালের হার কেমন, এগুলো অর্গানিক কি না, এসব ব্যাপার নিয়েও তারা অনেক সচেতন হয়েছে।

ছুমন্তরের একজন প্রতিনিধি বলেন, ‘আমরা আমাদের পেজে বৈচিত্র্য রাখার চেষ্টা করেছি যেন মানুষ সব ধরনের স্কিন কেয়ার ও বিউটি রিলেটেড জিনিস আমাদের পেজে পায়। আমাদের যেহেতু অস্ট্রেলিয়ান বেইজড পেজ, তাই অস্ট্রেলিয়ার যে লোকাল ভালো ভালো কিছু ব্র্যান্ড আছে, যে ব্র্যান্ডগুলো বাজেট ফ্রেন্ডলি। আমাদের পেজে শুধু মেয়েদের প্রোডাক্ট পাওয়া যায় তা নয়, আমাদের পেজে মেয়েদের প্রোডাক্ট ছাড়াও ছেলেদের কিছু কিছু প্রোডাক্ট এখন নিয়মিত আছে, যদি তার চাহিদা সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে তাহলে আমরা আরও বিস্তারিত ভাবব। এ ছাড়া আমাদের একটা পরিকল্পনা আছে, সেটা হলো আমরা শুধু স্কিন কেয়ার ও বিউটি রিলেটেড প্রোডাক্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সব জিনিস আমাদের পেজে আমরা নিশ্চিত করতে চাই।
আগামীর পৃথিবীটাই অনলাইনকেন্দ্রিক হয়ে যাবে, এখন আমরা যে রকম অনলাইনে শুধু অর্ডার করছি কিন্তু বিভিন্ন্ন সার্ভিসের জন্য এখনো মানুষ বাইরে যাচ্ছে কিন্তু আস্তে আস্তে এমন একটা সময় চলে আসবে, যখন মানুষ যে কোনো ধরনের সার্ভিসের জন্যই অনলাইনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে। যে কোনো ধরনের সার্ভিসের জন্য একটা ফোনকল করলে বা বললেই সেটা বাসায় এসে করে দিয়ে যাবে, এই ট্রেন্ডটা যদিও এখনই শুরু হয়ে গেছে, সামনেরটা আরও সমৃদ্ধ হবে এবং মানুষ আরও বেশি ব্যবহার করা শুরু করবে, আগামী দিনে আমরা আরও বেশি অনলাইন নির্ভরশীল একটি জীবনের মধ্যে চলে যাব। সুতরাং অনলাইনের সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক বেশি সমৃদ্ধ হবে।’

সাজিয়া আফরিন, স্বত্বাধিকারী,ছুমন্তর

‘অনলাইন বিজনেস কমিউনিকেশন যেহেতু একেবারেই ভার্চ্যুয়ালি হয়, সে কারণে মাঝে মাঝে কিছু কমিউনিকেশন গ্যাপের সৃষ্টি হয়। আর সাধারণ দোকানে পণ্য বিক্রি করা এবং কেনার জন্য কনভিন্স করা যতটা সহজ, অনলাইন বিজনেসে অনেক মানুষের কাছে প্রোডাক্ট পৌঁছালেও, মানুষকে প্রোডাক্টটা কেনার জন্য কনভিন্স করা একটু কঠিন। এ ছাড়া পধংয-ড়হ-ফবষরাবৎু ক্ষেত্রে যেহেতু আমাদের ডেলিভারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ডিলিংস থাকে, তবে মাঝে মাঝে একটু সমস্যা হয়। এ ছাড়া এফ-কমার্স দিন দিন অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এস-কমার্স রিলেটেড ফিচার এবং সুবিধা যদি সৃষ্টি করা হয়, তাহলে আমার মনে হয় ই-কমার্সের জগতে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন আসবে এবং মানুষ আরও বেশি উৎসাহিত হবে এবং যারা কাজ করছে তাদের কাজ করার ধরন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রসারিত হবে,’ বললেন সাজিয়া।

সুমাইয়াস বিউটি বক্সের কর্ণধার সুমাইয়া সুমু

ই-কমার্স সেক্টর এখন সব কাজের ক্ষেত্রেই সুফল বয়ে আনছে, বিউটি সেক্টরেও এই সিস্টেমটা এখন উপযোগী ভূমিকা পালন করছে। করোনায় বিউটি পারলার সব থেকে মহামারির ধাক্কা সামলাতে পিছিয়ে ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছুটা হলেও তারা সামলে উঠেছে এবং এক্সপার্টরা অনলাইনে তাদের কাজকে তুলে ধরতে সক্ষম হচ্ছে, অনেকে তো আবার অনলাইনে বিউটি সেক্টরের বিভিন্ন কোর্সও করাচ্ছেন।
করোনা মহামারিতে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, পারলারের ৯৯ ভাগ কর্মী নারী। করোনার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিকভাবে বিউটি সেক্টরের লোক, মানে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি এবং হচ্ছেও বললেন বিউটি এক্সপার্ট সুমাইয়া সুমু। তিনি আরও বলেন, এখন মানুষ পারলারে গিয়ে সার্ভিস নিতে ভয় পায় এবং এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেশি থাকায় কাস্টমারও কমে গেছে। আগে বিয়েতে মেয়েরা পারলার থেকে সাজত, করোনা পরিস্থিতিতে বেশির ভাগই বাসায় নিজেরা যতটা পাওে, ততটা মেকআপ করেই বিয়ের পিঁড়িতে বসছে।

সুমাইয়াস বিউটি বক্সের কর্ণধার সুমাইয়া সুমু বলেন, ‘মানুষের চাহিদা সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন ফ্যাশনপ্রিয় মানুষেরা নিজেরাই তাদের চাহিদা অনুযায়ী ইউটিউব দেখে মেকআপ করে, এটা তারা পছন্দ করে। নিজেদের সময়টাও অনেক ক্ষেত্রে বেঁচে যায়। এটাতে খরচ কম, এটা আসলে বলা চলে না। কারণ, ব্র্যান্ড মেনে যদি কেউ প্রোডাক্ট ইউজ করে, তাহলে খরচ কম এটা কেউ বলতে পারবেন না।’

সুমাইয়া সুমু

ই-কমার্স সাইট এখন যেভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তাতে আমি মনে করি, সামনের পৃথিবীতে আসলে প্রতিটি কাজ অনলাইনভিত্তিক হয়ে যাবে। তবে অনলাইনে ঘরে বসে সব সুবিধা পাওয়া যায় না, সরাসরি কিছু সার্ভিস থাকে, যেগুলোর জন্য সশরীর উপস্থিত হতে হয়। যেমন চুল রিবন্ডিং, ফেসিয়াল, ব্রাইডাল মেকওভার এসব কাজের ক্ষেত্রে অনলাইন সেবা প্রদান সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে অনলাইন সার্ভিস দেওয়া আসলে সম্ভব হয় না।
অফলাইন বিউটি সেক্টর এখন আগের থেকে অনেক উন্নতি করেছে, এখন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন সার্ভিসে হাতের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস মেশিন ব্যবহার করা হয়, যেগুলো আগে ছিল না। এ ছাড়া যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজেও ভিন্নতা এসেছে।
শুধু বিউটি সেক্টর নয়, দেশ-বিদেশের সব সেক্টরই একসময় অনলাইনে ডাইভার্ট হয়ে যাবে, এমনটাই ধারণা ডিজিটাল বিশেষজ্ঞদের।

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

10 − 3 =