বিচিত্র কসমেটিক উপাদান

করেছে Rodoshee

বয়স লুকানোর চেষ্টা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এতে শামিল নারী-পুরুষ উভয়েই। এ জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে বয়সের ছাপ ঢাকতে চাই আমরা। এমন পদ্ধতিগুলোর মধ্যে অন্যতম কসমেটিকস। যেমন শ্যাম্পু, নেইলপলিশ, লিপস্টিক, লিপ বাম, সানস্ক্রিন, পারফিউম, লোশন, ক্রিম প্রভৃতি। রূপসজ্জায় এসব পণ্যের বিকল্পও নেই। কিন্তু জানো কি, অনেক প্রাণীর প্রত্যঙ্গ কিংবা নির্যাস থেকে তৈরি হয় জনপ্রিয় কিছু কসমেটিকস সামগ্রী। এমনই কয়েকটি প্রাণীর টুকিটাকি দেখে নিতে পারো

মাছের আঁশ
অনেক শ্যাম্পু, আই শ্যাডো, লিপস্টিক, নেইলপলিশের পেছন দিকে লেখা থাকে ঈও ৭৫১৭০। তোমার প্রিয় শ্যাম্পু কিংবা নেইলপলিশের পেছনে এটা লেখা রয়েছে কি না দেখতে পারো। লেখাটি প্রমাণ করে পণ্যটি তৈরিতে মাছের আঁশ ব্যবহৃত হয়েছে। অনেক নামকরা বিউটি ফার্মস তাদের পণ্যে মাছের আঁশ ব্যবহার করে থাকে। আমেরিকান মেকআপ ব্র্যান্ড মেবিলিনের বিভিন্ন পণ্যে উপাদানটি সব সময়ই রাখা হয়। কেননা ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে বিশেষ প্রয়োজন মাছের আঁশ। অর্থাৎ কসমেটিকস সামগ্রী চকচকে করার জন্য দরকার মাছের আঁশ।

গোবর
শুনলে অবাক হবে, ত্বকের যত্নে গোবরের ব্যবহার শতাব্দী প্রাচীন। শুরুর দিকে ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করে সৌন্দর্য পিয়াসীরা ত্বকে গোবর ব্যবহার করত। সময়ের সঙ্গে এর উপকারিতা নজরে আসে কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার প্রতিষ্ঠানের। যেমন বিশ্বখ্যাত ক্রিমি ডে লা মারের মতো স্কিন কেয়ার কোম্পানি এই উপাদানটি তাদের অনেক পণ্যে ব্যবহার করে। গোবরের গন্ধ এবং ত্বকে এর প্রভাব নিয়ে জাপানের গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তারা গোবরের সুইট ভ্যানিলা গন্ধটি আলাদা করতে পেরেছেন। ২০০৬ সালে তারা ঘোষণা দেন, নির্দিষ্ট তাপের মাধ্যমে গোবর থেকে ভ্যানিলিন বের করেছেন। ভ্যানিলা বিনের চেয়ে এর উৎপাদন খরচ অনেক কম। তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এই ভ্যানিলিন খাবারে ব্যবহার করা যায় না। বরং কসমেটিকসের সুগন্ধি হিসেবে এর কার্যকারিতা রয়েছে। বিশেষ করে শ্যাম্পু ও সাবানে এই উপাদানটির বহুল ব্যবহার হয়।

 

মৌমাছির বিষ
মৌমাছির বিষ অ্যাপিটক্সিন নামে পরিচিত। অ্যান্টি অ্যাজিং এই উপাদানটি। ডাচেস অব কর্নওয়াল ক্যামিলা মৌমাছির বিষযুক্ত ফেসিয়ালের বড় ভক্ত। শুধু সে-ই নয়, ডাচেস অব কেমব্রিজ কেট মিডলটনও এটি ব্যবহার করেন। হলিউডের জনপ্রিয় তারকা গিনেথ প্যালট্রো ফেসিয়াল মাস্ক হিসেবে এটি পছন্দ করেন। ত্বকের চিকিৎসায় প্রয়োজন পড়ে এ দ্রব্যের। অ্যামিনো অ্যাসিডের তৈরি কোলাজেন নামক প্রোটিন জাগিয়ে তোলে এ বিষ, যা ত্বকের যত্নে বিশেষ উপকারী। কে-বিউটির অনেক পণ্যের নাম ক্লেইবি। তারা পণ্যের গায়ে উল্লেখ করে দেয়, ক্লেইবি হাই কনটেন্ট মাস্ক প্যাক, হাই কনটেন্ট এসেন্স, হাই কনটেন্ট স্কিন ক্রিম প্রভৃতি।

সাপের বিষ
সাপের বিষের বহু গুণ রয়েছে, এটা আমাদের জানা। সেলিব্রেটিদের মধ্যে ক্রেজ তৈরি করেছে এই বিষ। অ্যামাজন ডট কমের একটি জনপ্রিয় পণ্য ক্লেইবি ভেনম ফেস ক্রিম। ত্বকের বলিরেখা দূর করতে সাপের বিষের সুনাম রয়েছে জগৎজুড়ে। একই সঙ্গে ত্বক টানটান করে এটি। তবে বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ত্বকের যত্নে এটি অন্যতম উদ্ভট উপাদান। শেরিল কোল, ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম, কেট মসের মতো তারকাদের কাছে সাপের বিষ দিয়ে হয় তৈরি এমন কসমেটিকস খুব প্রিয়।

শামুকের শ্লেষ্মা
সৌন্দর্য চিকিৎসায় শামুকের শ্লেষ্মা এক অলৌকিক আবিষ্কার। দক্ষিণ আমেরিকার নামকরা কসমেটিকস ব্র্যান্ডগুলো রীতিমতো কৃতজ্ঞ এ পদার্থের প্রতি। বলা হয়, এ শ্লেষ্মায় প্রচুর পরিমাণে এনজাইম রয়েছে। মুখমন্ডল ও গলার ফুসকুড়ি, কালো আঁচিল কিংবা মেছতা দূর করতে প্রয়োজন এনজাইম। বলিচিহ্ন ও চামড়ার অন্য দাগ দূর করতে তাই কোম্পানিগুলো ব্যবহার করে শামুকের শ্লেষ্মা। এলিসিনা ইকো ক্লেইল ক্রিমটি যুক্তরাষ্ট্রে ভীষণ জনপ্রিয়। আরও আছে ক্লেইল রিপেয়ার আই ক্রিম। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় সব বিউটি পণ্যে শামুকের শ্লেষ্মা ব্যবহার করা হয়।

হাঙরের যকৃতের তেল
এই তেলে রয়েছে স্কুয়ালেন নামক পদার্থ। অন্য অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যেও রয়েছে প্রাকৃতিক এই পদার্থটি। আমাদের ত্বকেও রয়েছে স্কুয়ালেন। ত্বকের শুষ্কতা রক্ষায় এটি কাজ করে। তবে হাঙরের যকৃতের তেল স্কিনকেয়ার পণ্যে তুলনামূলক বেশি ব্যবহৃত হয়। বলা যায়, কসমেটিকস পণ্যে বহুল ব্যবহৃত একটি উপাদান হাঙরের যকৃতের তেল। কেননা ত্বকের সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে উপাদানটি। সানস্ক্রিন, লোশন, লিপ বাম প্রভৃতি তৈরিতে প্রয়োজন এই তেল। বলা হয়, চামড়ার বাইরের ঠাটবাট বজায় রাখে স্কুয়ালেন। ফেসিয়াল ময়েশ্চারাইজে বেশি লাগে এ তেল। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান জীববৈচিত্র্য বিবেচনায় এই তেল ব্যবহার থেকে সরে আসছে।

তিমির বমি ও মল
তিমির বমি ও মলে অ্যামবারগ্রিস নামে একধরনের উপাদান পাওয়া যায়। এটি অনেকটা মোমের মতো, থাকে তিমির অন্ত্রে। মূলত তিমির দেহে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তারা এগুলো উগরে দেয়। এরপর বছরের পর বছর ধরে তা সাগরে ভাসতে থাকে। অনেক সময় সমুদ্রসৈকতে চলে আসে। ধীরে ধীরে তা কসমেটিকস তৈরির উপাদান হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পারফিউমের গন্ধ দীর্ঘস্থায়ী করে এটি। তাই পারফিউমেই বেশি ব্যবহৃত হয় দ্রব্যটি। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও আইকনিক পারফিউম শ্যানেল নম্বর ৫-এর অন্যতম উপকরণ তিমির বমি। তা ছাড়া খাবারে বিশেষ স্বাদ দিতে প্রয়োজন এ উপাদানের।

ষাঁড়ের শুক্রাণু
কে জানত ষাঁড়ের বীজে লুকিয়ে রয়েছে ঝলমলে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুলের রহস্য! তাই ষাঁড়ের শুক্রাণু ব্যবহার করে অনেকে চুলের যত্নে নেয়। তারা হাতেনাতেই পায় আশ্চর্যজনক ফল। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন। ফলে কন্ডিশনার হিসেবে দারুণ কাজ করে। ইউরোপের অনেক সেলুন তাদের ক্লায়েন্টদের চুল ও ত্বকের যত্নে ষাঁড়ের শুক্রাণু ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকে। নরম ও ময়েশ্চারাইজড চুলের জন্য লন্ডনের হেয়ারড্রেসাররা এই উপাদান দিয়ে তৈরি কসমেটিক ব্যবহার করে থাকে।
নাইটিঙ্গেল পুরিষ
বহুকাল ধরে জাপানে সৌন্দর্যচর্চায় নাইটিঙ্গেল পুরিষ বা মল ব্যবহার হয়ে আসছে। এতে রয়েছে নাইট্রোজেন, যা ত্বকের জন্য বিশেষ উপকারী। জাপানের বিখ্যাত গেইশা ফেসিয়াল ক্রিমে ব্যবহৃত হয় নাইটিঙ্গেলের মল। এর দাম বেশ চড়া। এক হিসাবে বিশ্বের অন্যতম দামি ফেসিয়াল তৈরি হয় এই মল থেকে। বর্তমানে বিশ্বের সবখানে এই মল দিয়ে তৈরি ফেসিয়াল পাওয়া যায়। হলিউড হার্টথ্রব টম ক্রুজের অন্যতম প্রিয় প্রসাধন এটি। জেনে রাখো, ত্বক চকচকে করে নাইটিঙ্গেল পুরিষ। মরা চামড়া তুলে ফেলতে এর জুড়ি মেলা ভার।

মুরগির অস্থিমজ্জা
অনেক কসমেটিকস তৈরি হয় মুরগির অস্থিমজ্জা দিয়ে। অনেক ক্রিম ও ময়েশ্চারাইজার তৈরি হয় এ উপাদান থেকে। এতে রয়েছে গ্লুকোসামিন, যা ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়া দূর করে। এটি অ্যান্টি-ফ্লাম্যাটোরি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি ত্বকে নতুন কোষ তৈরি করে। তা ছাড়া মুরগির অস্থিমজ্জায় রয়েছে অ্যাসিড ও তেল। এগুলো ত্বকের ময়েশ্চারাইজার ধরে রাখতে সহায়তা করে। প্রসঙ্গত, গ্লুকোসামিনের অন্য অনেক উৎস রয়েছে।

গর্ভপরিস্রব
সাইপ্রাসের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান প্লাজান কসমেটিকসের সব পণ্য তৈরি করা হয় গর্ভপরিস্রব থেকে। কিন্তু কেন?
উচ্চমাত্রায় প্রোটিন ও খনিজের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে এতে। বিশেষ করে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ও প্রোটিন হাইড্রোলাইসেট রয়েছে। এসব উপকরণ চামড়াকে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও সজীব রাখে। ত্বকের কোষ বাড়তে সহায়ক এসব উপাদান। বলিরেখাও দূর করে। পপ ডিভা ম্যাডোনা ও জেনিফার লোপেজ গর্ভপরিস্রব ফেসিয়ালের বিশেষ ভক্ত।
ফেলে দেওয়া ভোজ্যতেল
বিজ্ঞানী ও কসমেটিকস প্রস্তুতকারকেরা কসমেটিকস পণ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়া ভোজ্যতেলের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। তারা দেখেছেন, এতে করে অনেক পণ্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব বেড়ে যায়। ফলে তা ভঙ্গুর চামড়া টানটান করে। এই গুণের কারণে অনেক বিউটি হাউস ও কসমেটিকস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে থেকে এটো ভোজ্যতেল সংগ্রহ করছে। পরিবেশবাদীরা আশাবাদী, এ কারণে অনেক প্রাণীর ওপর থেকে নজর সরিয়ে নেবে কসমেটিকস প্রতিষ্ঠান।

লেখক: রাহুল সরকার 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

twenty − 12 =