বিশেষ বিয়ে

করেছে Rodoshee Magazine

ভালোবাসায় বেঁধে যাওয়া মুহূর্ত কি কেউ মনে করতে পারে? ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাওয়া, হৃদয় মাতানো অনুভূতি আর প্রিয়জনের হাতে হাত রেখে গভীর প্রশান্তি। যে চোখে থাকে আস্থা, যে কাঁধে পাওয়া যায় নির্ভরতা আর যে হাতে রাখা যায় নির্দ্বিধায় বিশ্বাস সেই মানুষটির বর্ণ, ধর্ম কিংবা জাত নিতান্তই যে নগণ্য। এই ভালো লাগা, প্রেম আর ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ায় বিয়েবন্ধনে। সামাজিক স্বীকৃতির প্রয়োজনে দুটি মানুষ নিয়মনীতি মেনেই বিয়ে করে। বলা হয়ে থাকে, নিয়ম ভাঙা না হলে যে নিয়ম তৈরিই হতো না, নিয়ম মূলত তৈরিই হয় তা ভাঙার জন্য। প্রচলিত রীতি ভেঙে তাই প্রিয় মানুষটির হাত ধরার সংখ্যা অগণিত। সাধারণ মানুষ থেকে বিখ্যাতজনেরাও ভালোবাসার এই অমোঘ সুতোর টান থেকে বের হতে পারেননি।

ঐতিহ্যের বাইরে রাজকীয় বিয়ে

২০১১ সালে প্রথমবারের মতো কোনো ব্রিটিশ রাজপুত্র অভিজাত বংশের বাইরে গিয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে কেট মিডলটনকে বিয়ে করায় সারা দুনিয়ায় সাড়া পড়ে গিয়েছিল। এ বছর প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে হলিউড অভিনেত্রী, আফ্রো-আমেরিকান ও ডিভোর্সি ও বয়সে বড় মেগান ম্যার্কেলের বিয়েও আলোড়ন সৃষ্টি করে। ব্রিটিশশাসন থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে তরুণ বিপ্লবী রাসবিহারি বসু ছদ্মবেশে জাপানে আশ্রয় নেন। দৃঢ়, দৃপ্ত, সাহসী আর সংগ্রামী বসুকে ভালো লেগে যায় জাপানি তরুণী তোশিকো সোমার। রক্ষণশীল জাপানি সমাজে একঘরে হওয়ার আশঙ্কার মুখেও তোশিকো বিয়ে করেন পুলিশের তাড়া খেয়ে বেড়ানো এক বিদেশি বিপ্লবীকে। অক্টোবরের শুরুতে হিব্রুভাষী আরব সংবাদ পাঠিকা লুসি আহারিশ বিয়ে করেন আরবিভাষী ইহুদি জাচি হালেভিকে। ইহুদি জাতি-রাষ্ট্র ইসরায়েলের চরম ডানপন্থীদের তোপের মুখেও নিজেদের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি এই সাহসী দম্পতি।

‘জাত গেল জাত গেল বলে’

লালন সাঁইয়ের এই গানটার অনেক অনেক পরেও জাত রক্ষার নামে অনার কিলিংয়ের শিকার হয়েছে অনেক তরুণ-তরুণী। ভারতে হিন্দু-মুসলিম বিয়ে নিয়ে সাম্প্রদায়িক জটিলতা ও তীব্র অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মুখে এই বছরই দেশটির আদালত প্রাপ্তবয়স্কের বিয়ের পূর্ণ স্বাধীনতার রায় দেয়। বাংলাদেশে, বিশেষ বিয়ে আইনে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন অনেকে। তারপরও সমাজের মধ্যে এখনো গেঁথে আছে জাত-পাত দ্বিধা। হিন্দু বিয়ে রীতিতে এক জাতের সঙ্গে অন্য জাতের বিয়ে সিদ্ধ নয়। যদিও আধুনিক ও মুক্তমনা তরুণ-তরুণীরা এর ধার ধারছে না। ভালোবাসা দিয়ে তার ঘুুচিয়ে দিচ্ছে জাত-পাত বিভেদ।

দ্বিতীয়বার বিয়ে!

দ্বিতীয়বার বিয়ে শুনলে অনেকেরই চোখ কপালে ওঠে। তবে নিশ্চয়ই কেউ সাধে দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে পা রাখে না। জীবনবোধের মধ্যে টানাপোড়েন থাকে। অনেক অপূর্ণাঙ্গতা আর অসম্পূর্ণতা নিয়ে বাস করে মানুষ। সঙ্গীর সঙ্গে মনের দোলাচল কিংবা হাতে হাত রেখে পথ চলতে না পারার দ্বন্দ্ব নিয়েই ছাড়াছাড়ি। কখনো প্রিয় মানুষকে হারিয়ে হতাশায় ঢেকে যায় পৃথিবী। তবু মানুষ ভালো থাকে। ভালো থাকার মঞ্চে সে যেন এক অভিনেতা। নিজের প্রকৃতি, সত্তা আর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে কজন মানুষ ভালো থাকতে পারে! নারী কিংবা পুরুষ, দিন শেষে মানুষ খুঁজে বেড়ায় প্রশান্তি, অনেক কথা খুলে বলা কিংবা কারও কাঁধে মাথা রেখে অনাবিল নির্ভরতা।

বিশেষ বিয়ের বিশেষ আইন

ব্রিটিশ শাসনামলেই মূলত ‘বিশেষ বিবাহ’ আইন প্রণয়ন হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে যেকোনো ধর্মের লোকই বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী অন্য যেকোনো ধর্মের মানুষকে বিশেষ বিবাহ আইন অনুযায়ী বিয়ে করতে পারবে।
বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২-এর ২ ধারা অনুযায়ী বিয়ে অনুষ্ঠানের বেশ কিছু শর্ত রয়েছে। প্রথমত, স্বামী বা স্ত্রী থাকা অবস্থায় কেউ বিশেষ বিবাহ আইনের অধীন বিশেষ বিবাহ করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, বিবাহ করতে ইচ্ছুক পুরুষ ব্যক্তির বয়স ২১ বছর এবং নারীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হতে হবে। তৃতীয়ত, পাত্র-পাত্রী রক্ত সম্পর্কে বা বৈবাহিক সম্পর্কে সম্পর্কযুক্ত হতে পারবে না। বিবাহ আইন, ১৮৭২-এর ৪ ধারায় বলা আছে, বিয়ের দুই পক্ষের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষ রেজিস্ট্রারের কাছে ১৪ দিন আগে বিয়ের নোটিশ পাঠাবেন। যদি এই সময়ের মধ্যে কেউ আপত্তি না করে, তবে বিয়ে সম্পন্ন করা যাবে। বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২-এর অধীন বিয়ে একটি দেওয়ানি চুক্তি সুতরাং সম্মতি অত্যন্ত জরুরি। এর ১১ ধারায় বলা আছে, বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে রেজিস্ট্রার এবং ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদানকারী তিনজন সাক্ষীর সামনে।

লেখা: লিহান লিমা

রোদসী/আরএস

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

15 + ten =