বিয়েতে নারীর পছন্দ!

করেছে Rodoshee

আবহমানকাল থেকে বিষয়টা একই নিয়মে চলে আসছে। ছেলেরা মেয়ে (কনে) দেখতে যাবে। বিয়ের ব্যাপারে সাধারণত ‘ছেলের সিদ্ধান্তই প্রধান!’

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একটা পরিবারে, বাবা-মা যখন একটা মেয়ে সন্তানকে ছোট থেকে বড় করে, সেখানে কিন্তু একটা ছেলের চেয়ে তারা আলাদা করে বড় করে না। অথচ! ওই মেয়েটাই যখন বিয়ের উপযুক্ত হয় তখন বাবা-মা-ই চায়, ‘আমার মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসুক!’ ছেলেপক্ষ এসে আমার মেয়েকে পছন্দ করুক বা আশীর্বাদ করুক। কখনোই মেয়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মূল্য দেয় না।
পরিবারে মেয়েকে বড় করার সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়া কিংবা অন্যান্য কাজে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও বিয়ের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আজও মেয়ের মতামত গ্রাহ্য করা হয় না।
আচ্ছা! ভাবো তো, একটা ছেলে যদি চাইতে পারে, তার শিক্ষিত, সুন্দরী মেয়ে লাগবে। সে ক্ষেত্রে একটা মেয়েও তো তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশ করতে পারে! অনেক সময় সামাজিক সংজ্ঞা অনুযায়ী টাকাপয়সার জোরে অনেক ছেলেই একটা মেয়ের পছন্দের বিপরীতে গিয়ে বিয়ে করতে পারে। কারণ, সেখানে মেয়ের পরিবারের সায় থাকে।
কিন্তু একটা মেয়ে যত শিক্ষিতই হোক আর তার যত টাকাপয়সাই থাকুক, তার পছন্দমতো ছেলেকে সে নিতে পারে না। তার বেলাতেও কিন্তু ছেলের পক্ষকেই পছন্দ করতে হবে। সেখানেও মেয়েকে ছেলের পছন্দের স্বীকার করে নিতে হবে।
আমরা হরহামেশাই দেখা যায়, বিয়ের সময় মেয়ে পছন্দ করতে প্রথমে মেয়ের বাড়িতে ছেলেপক্ষই গিয়ে থাকে। সেখানে পছন্দের ব্যাপারে ছেলের পক্ষই প্রধান। যদি ছেলে মেয়েকে পছন্দ করে তাহলে মেয়ের পক্ষ ছেলের বাড়িতে আসতে পারে। না হলে মেয়ের বাড়ি থেকে কারও ছেলেপক্ষের বাড়ি যাওয়ার রেওয়াজই নেই।  এই ব্যাপারটাই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে! কিন্তু এটা মেনে নেওয়া কতটা যৌক্তিক? যুগের পরিবর্তন এসেছে। মেয়েরাও বাইরে কাজকর্ম করছে, উচ্চপদস্থ কর্মচারী হচ্ছে। মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাচ্ছে। চাইলেই একটা মেয়েকে জোরপূর্বক একটা ছেলের জীবনে জড়ানো যায় না। তাই বিয়ের ব্যাপারে একটা ছেলে যেমন একটা মেয়েকে প্রস্তাব পাঠাতে পারে, তেমনি একটা মেয়েও একটা ছেলেকে প্রস্তাব পাঠাতে পারে। দেখার পরে ছেলে যেমন পছন্দের কথা বলতে পারে! মেয়েও তেমনি পছন্দের কথা বলবে। আর দুজনের পছন্দ এক হলেই কেবল সানাই বাজবে।
যুগে যুগে মেয়ের বাবা-মা বিয়ের ব্যাপারে যে চিন্তিত, সেটাও যেন একেবারে উবে যায় এখন থেকেই। বিয়ের চিন্তায় মেয়ের বাবা-মায়ের এক্সট্রা একটা টেনশন কাজ করে। পাত্রপক্ষ আসবে। পান থেকে চুন খসলেই তো না হয়ে যাবে। কিন্তু মেয়েরা পাত্র দেখতে যাওয়া শুরু করলে এই একপাক্ষিক টেনশন কমবে। বিয়ে জিনিসটা আরও সুখকর এবং মধুর প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে। এখন থেকে মেয়েরাও শুরু করুক ছেলের বাড়িতে যাওয়া। মন্ডা-মিষ্টি নিয়ে, বর দেখতে। বিয়ের প্রস্তাব দিতে। আর এটাই একসময় ট্র্যাডিশন হয়ে দাঁড়াবে। আর তাহলেই না ইকুয়েল ইকুয়েল ঘটবে সবেতে!

বিয়ের ব্যাপারে একটা মেয়েকে মর্যাদা দেওয়া দরকার। কিন্তু সেটা আমাদের সমাজে কই? শর্ত দেওয়া হয়, বিয়ের পরে মেয়েদের নিজের বাড়ি হবে ‘শ্বশুরবাড়ি’ অর্থাৎ ছেলের বাড়ি! ছোট থেকে বড় হওয়া এক বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়িকে নিজের বাড়ি ভাবতে হবে! কই, ছেলেদের তো এমন কোনো শর্ত দেওয়া হয় না?
যদিও অনেকাংশে এখন ছেলেরা উদারমনস্ক হয়েছে। মেয়ের বাড়িও ছেলেরা নিজের বাড়ি ভাবছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তো নয়! কিছু কিছু ক্ষেত্রে।
দেখা গেছে, একটা ছেলে অনেক সময় মেয়ের বাবার টাকাপয়সা দেখে বিয়ে করতে রাজি হয়। হতে পারে মেয়েটা কম শিক্ষিত। দেখতেও ততটা ভালো নয়। কিন্তু জীবনসঙ্গী হিসেবে ছেলেটা মেয়েটাকে চিন্তা করে না। তার চিন্তা থাকে কীভাবে মেয়ের বাপের টাকাপয়সা হাতড়ে নেবে। এমনকি প্রকাশ্যে যৌতুকও চেয়ে বসে। এই ছেলেরা নামমাত্র বিয়ে করে। এই ছেলেরা বউ এবং সন্তানের কোনো দায়ভার গ্রহণ করে না। তারা তখন বিয়ে নামের বিষয়টা মুলতবি করতেও দ্বিধাবোধ করে না। অথচ সেখানেও ঘটা করে পাত্রী দেখা কম হয় না!
দেশের অনেক পরিবারেই মেয়ে শিক্ষিত ও যোগ্যতম হওয়া সত্ত্বেও বিয়ের পর চাকরি করতে দেওয়া হয় না। সেসব পরিবারের ছেলেপক্ষ বাড়িতে এসে তাদের এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়! আজ অবধি কোনো ছেলেকে কোনো দিন বিয়ের পরে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে এসব সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় না। কি বিয়ে, কি সংসার! সব ক্ষেত্রেই ছেলেরাই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। মেয়ে দেখা থেকে শুরু করে, বিয়ে করার ক্ষমতা, সন্তানের গার্জিয়ান হওয়া। এমনকি সংসারে তদারকি করা সবকিছুই। এমন একটা সময় ছিল যেখানে, সন্তানের গার্জিয়ান হিসেবে মায়ের কোনো ভূমিকাই ছিল না। বাবাই প্রধান। বাবার নাম ছাড়া সন্তানের আর কোনো পরিচয় নেই। এর কারণ ছিল বাবাই একমাত্র সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
এখন যুগ পাল্টেছে। ঘরে ঘরে বাবা-মা উভয়ই শিক্ষিত। উভয়ের নামের পরিচয়েই সন্তান বেড়ে ওঠে। উভয়েই সংসারের খরচ শেয়ার করে।
আর তাই বিয়ের ব্যাপারে ছেলের একপেশে মতামত দেওয়ার দিন শেষ। এখন মেয়েও জানাতে পারবে নিজেদের পছন্দ। ছেলের বাড়িতে গিয়ে দেখতে পারবে ছেলের পরিবার বা পাত্রকে।
এই স্বাধীনতাটুকু একজন মেয়ের ওপরই ছেড়ে দিতে হবে। তবেই একটা সুন্দর, সুশীল সমাজ গড়ে উঠবে। তাই এখন থেকে শুধু পাত্রী দেখা নয়। ‘পাত্র দেখা চাই’ এই স্লোগানটাও সমানভাবে হোক।

লেখাঃ ফরিদা ইয়াসমিন রীনা

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

18 − five =