বিয়ের আইনকানুন

করেছে Rodoshee

ফেরদৌস আল হাসান, আইনজীবী জজকোর্ট

কেবল কবুল বলে সানাই বাজানো নয়! বউ সাজতে জানা থাকা চাই টুকিটাকি কিছু আইনকানুন।

আনন্দ-উল্লাস আর সানাই বাজিয়ে বিয়ের রীতি এ দেশে। এর মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে পরবর্তী প্রজন্ম। মানবজাতির গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার স্বত্বও নির্ধারিত হয় বিয়ের মধ্য দিয়েই। বাংলাদেশে মূলত মুসলিম ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বাস। এ দুই ধর্মের লোকের বিয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রীতিনীতি ও আইনকানুন আছে। রাঙামাটি, বান্দরবান আর কক্সবাজারে বেশ কিছু বৌদ্ধধর্মাবলম্বীকে বসবাস করতে দেখা যায়। তাদের বিয়ে ও তালাকসংক্রান্ত বিধিবিধানের সঙ্গে হিন্দুদের সঙ্গে কোনো তফাত নেই। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বেশ কয়েকটি রায়ে বলে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের বৌদ্ধরা হিন্দু পারিবারিক আইন মোতাবেক পরিচালিত হবে।

মুসলিম বিয়ে কী

মুসলিম শরিয়া আইনে বিবাহকে ‘নিকাহ’ বলা হয়। ‘নিকাহ’ শব্দটি আরবি। যার বাংলা অর্থ বিবাহ, শাদি। হাদিসে আছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারীর বিয়ে করা ফরজ। যাদের বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য রোজা রেখে সংযম করার আদেশ দিয়েছেন ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

Bangladeshi-Muslim Wedding, Sydney

ছেলে-মেয়ের বয়স

শরিয়তে পুরুষদের বিয়ের বয়স বালেগ হওয়া। ইমাম আবু হানিফার মতে, ছেলেরা ১২ বছরে বালেগ হয়। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে যখন তারা খেয়ারুল বুলুগে পৌঁছায়। ইমাম আবু ইউসুফের মতে, মেয়েরা ১৫ বছরে খেয়ারুল বুলুগে পৌঁছায়। কিন্তু শরিয়তে বিবাহের এই বয়স বাংলাদেশে বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯ অনুযায়ী মেয়েদের ১৮ আর পুরুষদের ২১ বছরের আগে বিয়ে করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে বিয়ে একবার সম্পন্ন হয়ে গেলে তা বৈধ হয়ে যাবে। কেবল যে কাজি বিয়ে সম্পাদন করেছেন বা ছেলে-মেয়ের অভিভাবকদের শাস্তি পেতে হবে।

Chobial Photography-2015 (259)

মুসলিম বিবাহের নিবন্ধন 

মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন, ১৯৭৪-এর ৩ ধারা অনুযায়ী অবশ্যই বিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। একই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী বিয়ের সময় কাজি উপস্থিত না থাকলে বিয়ের ৩০ দিনের মধ্য স্বামীকে সংশ্লিষ্ট কাজি অফিসে বিয়ে নিবন্ধন করাতে হবে, না হয় তার দুই বছরের জেল অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। তবে মনে রাখতে হবে, বিয়ে নিবন্ধন না করার কারণে বিয়ে অবৈধ হবে না।

wedding_night_2399

সর্বোচ্চ কতটি বিয়ে

পবিত্র কোরআনের ‘সুরা নিসা’য় আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা পুরুষেরা চারটি পর্যন্ত নিকাহ (বিয়ে) করতে পারবে।’ কিন্তু বাংলাদেশে ১৯৬১ সালে পুরুষদের বহুবিবাহের একচ্ছত্র অধিকারকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ-১৯৬১-এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনো স্বামী যদি তার বর্তমান স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, তবে স্বামীকে অবশ্যই তার এলাকার সিটি করপোরেশন অথবা পৌরসভা মেয়রের কাছে আর গ্রামের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে। চেয়ারম্যান বিবেচনা করে যদি যৌক্তিক মনে করে কেবল তখনই দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেবে। তবে উল্লেখ্য যে চেয়ারম্যান আবেদনকারীর বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে অনুমতি কোনোভাবেই দিতে পারবে না। স্বামী যদি স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত অথবা চেয়ারম্যান বা মেয়র যদি স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে বিয়ের অনুমতি দেয়, তবে স্ত্রী সংশ্লিষ্ট সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।

হিন্দু বিয়ে

বাংলাদেশের হিন্দু পারিবারিক আইন এখনো সেই আদি যুগে পড়ে আছে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সনাতন হিন্দু আইন বাতিল করে আধুনিক হিন্দু পারিবারিক আইন প্রচলন করেছে। যেমন, ভারতে ছেলেমেয়েরা সমান অংশ সম্পত্তি পায়। বিয়ের জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। স্ত্রী চাইলে যে কোনো সময় স্বামীকে তালাক দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানের হিন্দু স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের তালাক দিতে পারে না। বাবার সম্পত্তির পুরো অংশ সংসারের ছেলেরা লাভ করে। মেয়েদের কোনো স্থায়ী উত্তরাধিকারের সম্পত্তি নেই।

Image result for hindu marriage photography

হিন্দু বিবাহ কী  

হিন্দু বিবাহ একটি ‘স্যাকরামেন্ট’, যার বাংলা অর্থ অবিচ্ছেদ্য অংশ। আত্মার বন্ধন। সনাতন হিন্দু আইন অনুযায়ী হিন্দু বিবাহে কোনো তালাক নেই। এই বিয়ে একবার হলে পরজন্ম পর্যন্ত টিকে থাকে। হিসাব করলে হিন্দু বিবাহের নিয়মের কোনো শেষ নেই। তাই ঝামেলা এড়াতে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত ১৯৯৮ সালে এক রায়ের মাধ্যমে হিন্দু বিবাহের প্রধান দুটি শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর তা হলো সপ্তপদী ও বিভাহোমা। এই দুটি শর্ত পালন হলেই ধরে নেওয়া হবে হিন্দু বিবাহ বৈধ। সাত পাক বিয়ের মণ্ডপে প্রথমে বরকে আনা হয়। এরপর কন্যাকে পিঁড়িতে বসিয়ে আনা হয়। সাধারণত কন্যার জামাইবাবুরা পিঁড়ি ধরে থাকেন। কন্যা পানপাতা দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখেন। কন্যাকে পিঁড়িতে করে বরের চারপাশে সাতপাক ঘোরানো হয়। এটাকে বলা হয় সপ্তপদী। বর ও কন্যার আগুনের সামনে প্রার্থনাকে বলে বিভাহোমা।

ছেলে-মেয়েদের বয়স

হিন্দু সনাতন আইনে বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের কোনো বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। যে কোনো বয়সের ছেলে-মেয়ে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯ অনুযায়ী মেয়েদের ১৮ আর পুরুষদের ২১ বছর আগে বিয়ে করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে বিয়ে একবার সম্পন্ন হয়ে গেলে বিয়ে বৈধ হয়ে যাবে। কেবল যে বিয়ে সম্পাদন করেছে বা ছেলে মেয়ের অভিভাবকদের শাস্তি পেতে হবে।

হিন্দু বিবাহের নিবন্ধন 

২০১২ সালে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন নামে সরকার একটি আইন পাস করে। যেখানে হিন্দু বিবাহের নিবন্ধন করার ব্যবস্থা ও পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। তবে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো এই নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়নি। যার কারণে কেউ যদি বিয়ে করে নিবন্ধন না করে তবে তার কোনো শাস্তি হবে না এমনকি বিবাহ অবৈধও হবে না।

নিজেরা নিজেরা বিয়ে করলে

অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক দুজন ছেলেমেয়ে নোটারি পাবলিক বা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে গিয়ে বিয়ের হলফনামা সম্পন্ন করে বিয়ের ঘোষণা দেন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই পারিবারিক আইন অনুযায়ী বিয়ের নিয়মকানুন মেনে তবেই এই হলফনামা সম্পন্ন করতে হবে। মুসলমানদের ক্ষেত্রে অবশ্যই কাজি অফিসে গিয়ে কাবিননামা বিয়ের নিবন্ধন করে নিতে হবে। এতে ভবিষ্যতে আইনি ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

Image result for indian marriage

যদি দুই ধর্মের দুজন হয়

দুজনের ধর্ম আলাদা হলে ১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইন অনুযায়ী বিয়ের সুযোগ আছে। তবে এ ক্ষেত্রে দুজনকেই আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হলফনামা সম্পন্ন করতে হবে এবং হলফনামার সব শর্ত পূরণ করতে হবে। তিনজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিশেষ বিবাহ নিবন্ধকের মাধ্যমে বিয়েটি নিবন্ধন করাতে হবে। তবে আইন অনুযায়ী বিয়ে নিবন্ধনের ১৪ দিন আগে নিবন্ধকের বরাবর নির্ধারিত নোটিশ পাঠাতে হবে।

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

ten + 12 =