বিয়ের আগে ও পরে

করেছে Sabiha Zaman

প্রেমের মৃত্যু নাকি বিয়েতে! এমন নেতি দিয়ে শুরু করাটা কি ঠিক হলো? কিন্তু প্রেম করে বিয়ে করছেন যাঁরা, এ কথা তাঁদের চারপাশের মানুষজন হরহামেশাই যে বলে থাকেন। বিয়ের আসরে এটি জনপ্রিয়তম রসিকতাও বটে, যা অনুষ্ঠানের বাতাসে উড়তেই থাকে। আসলেই কি বিয়ের পর প্রেম উবে যায়? বিয়ের পর কি প্রেম হয় না? লিখেছেন আশরাফুল ইসলাম

শেষের কবিতা শুরুতে

প্রেম-বিয়ে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট বলেননি। শেষের কবিতায় প্রেমের মনস্তত্ত্ব বলেছেন অমিত রায়ের মুখে। প্রেমিকা লাবণ্যকে নয়, অমিত বিয়ে করেছে কেতকী ওরফে কেটিকে আর বলেছে ‘যে ভালোবাসা…আকাশে মুক্ত থাকে অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালোবাসা…প্রতিদিনের সবকিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।’ যখন অমিত বলে, ‘কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই; কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল…প্রতিদিন ব্যবহার করব আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার ভালোবাসা সে রইল দিঘি। সে ঘরে আনবার নয়…তখন শেষের কবিতার যতির মতো আমরাও কুণ্ঠিত হয়ে বলি, কিন্তু অমিতদা, দুটোর মধ্যে একটাকেই বেছে নিতে হয় না?

রবীন্দ্রনাথের উত্তর অমিতের মুখে যার হয় তারই হয়, আমার হয় না। কিন্তু আমরা যারা জনসাধারণ, তুর্কি-তরুণ, ভালোবাসছি-বেসেছি-বাসব; প্রেম করে বিয়ে করছি, বিয়ে করেও প্রেম করব, তাদের বেলায়?

প্রথম প্রেমের গান

সদ্য বিয়ে করেছে বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে চাকরিতে ঢোকা এক তরুণী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। বলল, বিয়ের আগে ভালোবাসা হয়নি। দূর থেকে চেনাচেনা (ফেসবুকের কল্যাণে) মানুষটিকে বিয়ে করেছে পারিবারিকভাবে। বিয়ের পর কাছাকাছি হয়ে মাস ছয়েকেই গভীর প্রেমে পড়েছে দুজনেই, তো বিয়ের পরও ‘প্রথম’ প্রেম হয়!

চল্লিশের মোহনা পেরিয়ে

পেশায় প্রকৌশলী। পারিবারিক বিয়ে। চল্লিশ পেরিয়ে আজও স্ত্রীর প্রতিটি খুঁটিনাটি, পছন্দ-অপছন্দ, ছোটখাটো শখ-চাওয়া-না বলা ইচ্ছে সব পূরণ করেন, মনে রাখেন আর মুগ্ধ করেন অর্ধাঙ্গিনীকে। কীভাবে? প্রশ্নের উত্তরে তার জবাব ভালোবাসা অনেকটা লাজুক লতার মতো, তাকে সারাক্ষণ আদর-যত্নে রাখতে হয়। আলাদা করে তার অর্ধাঙ্গিনীকেও প্রশ্ন করলে সেই একই উত্তর। আসলে মেলবন্ধনে দুজনেরই প্রেম জরুরি, নইলে হয় না।

বেঁচে থাক সর্দিকাশি

সাহিত্যে প্রেমের বৈচিত্র্যময় সব ছবি এঁকেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। শিরোনামটি তারই এক গল্পের। সেখানে জার্মানির শীতে সর্দি-কাশিতে পেরেশান তিতিবিরক্ত লেখককে তার প্রেমের গল্প বলছেন এক ডাক্তার। বলছেন সর্দি-কাশির ভালো দিকও আছে। কেননা, এই সর্দি-কাশিই তো মিলিয়ে দিয়েছিল তার প্রেমকে। পূর্ণতা পেয়ে প্রেম যে মোহনায় মেশে, তার নামই তো সংসার; সেখানে বিশ্বাস, সমানুভূতি আর দায়িত্বশীলতার পায়ে ভর করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় ভালোবাসা।

বিয়ের আগে

বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করে রাখা আদর্শ বা পারফেক্ট পাত্র বা পাত্রী খুঁজতে থাকে। অথচ পৃথিবীর কেউ পারফেক্ট নয়। এ ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থানের কথা মাথায় রেখে প্রত্যাশার একটা ন্যূনতম মান নির্ধারণ করে পাত্র-পাত্রী খোঁজা ভালো। পাত্র-পাত্রী খোঁজার সময় তাদের ব্যক্তিত্ব, পেশাগত কাজের ধরন, পারিবারিক সংস্কৃতি ও রীতিনীতি জানা প্রয়োজন।

তাকে দেখতে যাওয়া

বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীকে দেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাত্র-পাত্রীর নিজেদেরও পরিচিত হয়ে নেওয়াটা জরুরি। কিন্তু বারবার দেখতে এলে তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। বিয়ের পরও এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে।

ছবি দেখে ও খোঁজখবর নিয়ে পছন্দ হলে কোনো রেস্টুরেন্ট বা মার্কেটে পাত্রীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেখা করো এবং স্বাভাবিক সামাজিক কথাবার্তা বলে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করাটাই ভালো। সব দিক থেকে পছন্দ হলেই শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে পাত্র-পাত্রীর বাসায় যাওয়া উচিত। পাত্র বা পাত্রীকে দেখতে গিয়ে এমন কোনো প্রশ্ন বা মন্তব্য করবে না, যা তার জন্য অপমানজনক। কোনো তথ্য জানতে হলে কৌশলী হতে পারো।

বিয়ে ঠিক হলে    

বিয়ে ঠিক হলে পাত্র-পাত্রী নিজেদের একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে নিতে পারলে ভালো। একই সঙ্গে উভয় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অন্তত ফোনে হলেও কথা বলে সম্পর্কগুলো সহজ করে নেওয়া যেতে পারে। এ সময় সততার সঙ্গে তথ্যর আদান-প্রদান করা উচিত। বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী তার ভাবী স্ত্রী বা স্বামীকে একজন আদর্শ স্ত্রী বা স্বামী হিসেবে কল্পনা করতে পছন্দ করে।

শ্বশুর-শাশুড়িসহ সবাই তাকে আদর করবে, সবার সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক থাকবে। মনে রাখতে হবে, আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য থাকবে। কারণ কেউ সব দিক থেকে আদর্শ নয়। অন্যদিকে তাদের মধ্যে কিছু আশঙ্কাও কাজ করতে থাকে। মেয়েদের মধ্যে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেমন হবে, তাদের সঙ্গে মানাতে পারবে কি না, স্বামী তাকে বুঝবে কি না, এ ছাড়া তার প্রিয় পরিবেশ ছেড়ে যেতে হবেÑ এটার একটা কষ্ট তার মধ্যে দানা বাঁধতে থাকে। বিয়ের আগে ও পরে পাত্র-পাত্রীর একে অপরের আশঙ্কাগুলো বুঝে তাকে আশ্বস্ত ও সহায়তা করা উচিত।

বিয়ের দিন কনেকে ঠাট্টা নয়

বিয়ের দিন ঠাট্টা বা ঠকানোর বিষয়টি পুরোনো প্রচলন। ঠকানোর বিষয়টি অন্যদের ওপর তেমন প্রভাব বিস্তার না করলেও কনের ওপর অনেক প্রভাব ফেলে। কনে অনেক মানসিক চাপ, আশঙ্কার মধ্যে থাকে এবং তাকেই নতুন পরিবেশে যেতে হয়। এ কারণে তার মনের অবস্থা নাজুক থাকে। তাই সামান্য পিনের খোঁচা বুলেটের চেয়েও বেশি ব্যথিত করে। এটার প্রভাব মেয়েটির মনের অজান্তেই দীর্ঘদিন থেকে যায়।

এ জন্য বিয়ের দিন প্রথম দেখাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বউয়ের সঙ্গে ঠাট্টা না করে সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বললে তার সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

বিয়ের পর

বিয়ের পর স্ত্রী স্বামীকে আরও বেশি করে অনুভব করে এবং স্বামীও তার মতো করে প্রচণ্ড আবেগ দিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করার প্রত্যাশা করে। অনেকে এই আবেগকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মনে করে বিরক্ত হয়। অন্যদিকে সামাজিক কারণেই স্বামীকে অনেক দায়িত্ব নিতে হয়। স্ত্রীকে সম্মানজনক অবস্থায় রাখতে হবে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হবে ইত্যাদি। ফলে স্ত্রী মনে করে, স্বামী তাকে আর আগের মতো ভালোবাসে না। এ সময় সন্দেহের সুপ্ত বীজ উপ্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ছেলেটি যে মেয়েটিকে ভালোবাসে না তা নয়, কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারে না অথবা প্রকাশ করার প্রয়োজন অনুভব করে না। হয়তো স্ত্রী-সন্তানদের সুখ-স্বাছন্দে নিশ্চিত করার জন্যই সে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। এ সময় স্বামীর উচিত স্ত্রীর আবেগকে বোঝার চেষ্টা করা এবং স্ত্রীকে যথাসম্ভব সময় দেওয়া। একই সঙ্গে স্ত্রীরও বোঝা উচিত স্বামীর ব্যস্ততার অর্থ ভালোবাসা কমে যাওয়া নয়, এই পরিশ্রমের উদ্দেশ্য তাদের ভালো রাখার প্রচেষ্টা।

নবদম্পতি যৌথ পরিবার

যৌথ পরিবারে অনেক সময় দম্পতিরা একান্তে সময় কাটানো বা একটু কাছাকাছি আসতে কুণ্ঠা বোধ করে। ফলে তাদের মানসিক চাহিদা পূর্ণ হয় না। বরং একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। স্বামী হয়তো বাইরে গিয়ে অস্বস্তি কিছুটা কমিয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু স্ত্রীর মধ্যে দিনে দিনে অস্বস্তিটা জমাট বাঁধতে থাকে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এই অস্বস্তি সংযুক্ত হয়ে যায়। ফলে মেয়েটির মনের অজান্তেই পরিবারের সদস্যদের প্রতি বিরক্তিবোধ তৈরি হতে থাকে। একান্ত সময়গুলোতে যাতে সে অবাধে সারা দিনের আবেগ প্রকাশ করতে পারে, সেই সুযোগ দিতে হবে। তার আবেগের প্রতি অতিপ্রতিক্রিয়াশীলতা দেখানোর প্রয়োজন নেই, বরং তার আবেগকে স্বীকৃতি দিতে হবে। যৌথ পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত নবদম্পতিকে কিছুটা সময় একান্তে কাটানোর সুযোগ দেওয়া। মেয়েটি যাতে এই পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠতে পারে, এ বিষয়ে তাকে সহায়তা করা।

স্ত্রী পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা

বিয়ের পর ছেলেটিকে যে শক্ত কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয় তা হচ্ছে স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্য, বিশেষত মায়ের মধ্যে ব্যালান্স করা। ছেলেটির জন্য মা ও স্ত্রী তার দুই হাতের মতো; কোনোটিই তার বেশি আপন বা পর নয়। একইভাবে সে মা ও স্ত্রী উভয়েরই ভালোবাসার পাত্র, দুজনই তার কাছ থেকে যথেষ্ট মনোযোগ প্রত্যাশা করে, যা খুবই স্বাভাবিক। তাই ছেলেটিকে এ ক্ষেত্রে বিচক্ষণতার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে হবে। মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনতে হবে এবং কাউকে কষ্ট না দিয়ে বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে।

জীবনধারার পরিবর্তন

বিয়ের পর ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই তার লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে হয়। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় দেওয়া কমে যায় এবং খাওয়া, ঘুমসহ জীবনের নানা উপাদান নতুন মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে করতে হয়। এ ক্ষেত্রে উভয়কেই কিছুটা ছাড় দিতে হবে। খরচের হাত কিছুটা সীমিত করতে হয়। তবে মনে রাখা দরকার, হঠাৎ করে লাইফস্টাইল পরিবর্তন করা কঠিন। এ জন্য তাকে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত এবং উন্নতি হলে উৎসাহিত করা উচিত।

কিছু বোঝাপড়া

  • বিয়ে হলেই অবধারিতভাবে ভালোবাসা এসে ধরা দেবে তা নয়। ভালোবাসা তৈরি ও রক্ষার জন্য সব সময় দুজনেরই ভূমিকা থাকতে হয়।
  • নতুন জীবনের সঙ্গে তোমার লাইফস্টাইল অ্যাডজাস্ট করে নাও। যেকোনো সম্পর্কই ছাড় প্রত্যাশা করে।
  • স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে আনন্দদায়ক কিছু করো; যেমনÑ দূরে বেড়াতে যাওয়া, একসঙ্গে হাঁটা, মার্কেটে যাওয়া। তোমার কিসে ভালো লাগে তা সঙ্গীকে জানাও তার ভালো লাগাতেও গুরুত্ব দাও।
  • সঙ্গীর ভালো কাজের সত্যিকারের প্রশংসা করো।
  • মাঝেমধ্যে উপহার দাও, সারপ্রাইজ দাও এবং সৃজনশীল কিছু করো। যাতে দুজন দুজনার প্রতি যত্ন ও ভালোবাসা প্রকাশিত হয়।
  • মনের মধ্যে কষ্ট বা ভালো লাগা তৈরি হলে তা ইতিবাচকভাবে প্রকাশ করো। সঙ্গী প্রকাশ করলেও তার স্বীকৃতি দাও। রাগ সঠিকভাবে প্রকাশ করা শেখো। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে পছন্দনীয় কোনো নামে ডাকতে পারে।
  • পরিবারে কোনো সমস্যা তৈরি হলে খোলামেলা আলোচনা করে সমাধান করো। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো দুজনে মিলে আলোচনা করে নাও।
  • উভয় পরিবারকে শ্রদ্ধা করো এবং পরস্পরকে খোঁচা মেরে কথা বলা এড়িয়ে চলো।
  • নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া একে অপরকে সন্দেহ করা এড়িয়ে চলো। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো বারবার মনে করিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকো। পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গীকারগুলো রক্ষা করো এবং তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করো।

পাদটীকা : আনা কারেনিনা 

অবশ্য বিয়ের পরের প্রেম মানেই যে ধোয়া তুলসীপাতা, তা নয়। পরকীয়া, জানালার ওপাশে উঁকি দেওয়া মদির, নিষিদ্ধ রাতের মতো। তলস্তয় তার বিখ্যাত উপন্যাস আনা কারেনিনা শুরু করেছিলেন যে বাক্যে, উদ্ধৃতি হিসেবেও তা বিখ্যাত। পৃথিবীর প্রতিটি সুখী পরিবার একই রকমভাবে সুখী, প্রতিটি অসুখী পরিবার নিজের নিজের ধরনে অসুখী।’কিন্তু আমরা কি অসুখী হওয়ার জন্যই বিয়ে করি? সুখ সবারই চাই। আনাও চেয়েছিল। তবে সাধু সাবধান। তলস্তয়ের দিব্যদৃষ্টি ছিল। এর পরিণতি ভয়ংকর। তার চেয়ে ‘একই রকম’ভাবে সুখী হওয়াই শ্রেয় নয় কি!

লেখা : আশরাফুল ইসলাম

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

18 − 8 =