বিয়ের আগে বর-বধূর মেডিকেল টেস্ট জরুরি

করেছে Rodoshee

দ্রুতগতিতে বয়ে চলেছে সময়। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রয়োজনীয়তা ও সমাজ। যা বিজ্ঞান নয় তাই কুসংস্কার আর কুসংস্কারকে পায়ে মাড়িয়ে যাওয়াই আধুনিক সময়ের প্রয়োজনীয় সাহসী পদক্ষেপ। একটা সময় ছিল যখন মনে করা হতো কোনো দম্পতির সন্তান না হওয়ার কারণ স্ত্রী। ভাবা হতো পুত্রসন্তান না হওয়ার পেছনের কারণটিও স্ত্রী, যার দরুন অকথ্য নির্যাতন সইতে হতো ওই স্ত্রীটিকে। আজ সময় বদলেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি প্রমাণ করেছে বন্ধ্যাত্ব কেবলই নারীর সমস্যা নয়, পুরুষেরও।

নারী-পুরুষের নানা শারীরিক সমস্যার কারণে বিবাহ-পরবর্তী সময়ে বন্ধ্যাত্বসহ অনেক জটিল পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। এসব পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, তার জন্য প্রয়োজন বিবাহ-পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা। বিয়ের আগেই বর-বধূ নিজেদের পরিবারের স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত তথ্য যাচাই-বাছাই করেই বিয়েতে সম্মত হলে একটি সুন্দর পরিবার তৈরি করা সম্ভব হবে এবং তাদের সন্তান-সন্ততিরাও সুস্থ হয়ে জন্ম নেবে এবং অনেক ধরনের রোগ থেকেই মুক্ত থাকবে। এমনটাই মনে করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তফা কামাল চৌধুরী আদিল। তিনি বলেন, বিয়ের আগে মেডিকেল টেস্ট কতটা জরুরি তা আগের প্রজন্ম না জানলেও এই সময়ের আধুনিক ছেলেমেয়েদের উপেক্ষা করার অবকাশ নেই। এটা ছেলে বা মেয়েকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর রাখার একটি অনন্য প্রয়াস।

ডা. মোস্তফা কামাল চৌধুরী বলেন, বিয়ের আগে অবশ্যই কিছু সুর্নিদিষ্ট টেস্ট করা আবশ্যক। যেমন রক্তরোগ। বিয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলো রক্তরোগ ও রক্তের গ্রুপ নির্ণয়। রক্তের গ্রুপের ভিন্নতার কারণে পারিবারিক জীবনে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে। যাদের রক্তে আরএইচ ফাক্টর নেই, তাদের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ ধরা হয়। যেমন এ নেগেটিভ বি নেগেটিভ ইত্যাদি। নেগেটিভ রক্তবহনকারী কোনো নারীর সঙ্গে পজিটিভ রক্তবহনকারী কোনো পুরুষের বিয়ে হলে তাদের সন্তান জন্মদানের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে গর্ভপাত এমনকি শিশুটির মৃত্যুও হতে পারে।
গাইনোকলজিক্যাল টেস্ট : গাইনোকলজিস্টের কাছে গিয়ে পাত্রীর একবার পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া উচিত ইউটেরাস, ওভারিতে কোনো সমস্যা আছে কি না। থাকলে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে পাত্রের পৌরুষত্ব, বীর্যপাতজনিত সমস্যা বা পুরুষাঙ্গে কোনো সমস্যা আছে কি না, তা আগেই পাত্রটির টেস্ট করে জেনে নেওয়া উচিত। থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।
থ্যালাসেমিয়া : থ্যালাসেমিয়া জাতীয় হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি টেস্ট করে জেনে নেওয়া উচিত যে সে থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা। যদি কোনো ছেলে এই রোগের বাহক হয়ে থাকে তাহলে তাকে দেখতে হবে তার স্ত্রীও যেন এই রোগের বাহক না হয়। দুজনেই বাহক হলে অনাগত শিশু এই রোগে আক্রান্ত হবে। এটি এমন ধরনের রক্তের অসুখ, যাতে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায়। ফলে রোগীকে প্রতি তিন থেকে আট সপ্তাহ পর পর ব্লাড নিতে হতে পারে এমনকি সারাজীবন ধরে নিয়ম করে ওষুধ খেয়ে যেতে হতে পারে। নিয়মিত রক্ত নেওয়ার ফলে রক্তে বাড়তে পারে আয়রন যার ফলে হার্ট, লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন হলে বিশেষ থেরাপির সাহায্য নিয়ে শরীর থেকে আয়রন কমাতে হয়। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক না হয়, সে জন্যই বিয়ের আগে এই টেস্ট করা জরুরি। সঠিক সময়ে জানা সমস্যাটি ধরা পড়লে বিয়ের পর সন্তান নেওয়ার সময় বংশানুক্রমে অনাগত শিশুটির মধ্যে এই রোগটি চলে আসার আশঙ্কা থাকবে না। যদি বিয়ের আগে না জানা থাকে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক তাহলে অবধারিতভাবে তাদের নানামুখী সমস্যায় পড়তে হবে। এ ক্ষেত্রে ডাক্তাররা পরামর্শ দিয়ে থাকেন বাচ্চা না নিতে।
হেপাটাইটিস : বিয়ের আগে টেস্ট করে জেনে নেওয়া উচিত লিভার ফাংশন ঠিক আছে কি না। হেপাটাইটিস এ, বি, সি ঠিক আছে কি না জানা অত্যন্ত জরুরি। হেপাটাইটিস এ সেরে গেলেও কোনো পাত্রী যদি হেপাটাইটিস বি বা সিতে আক্রান্ত হয় তাহলে তার থেকে তা সংক্রমিত হয়ে স্বামী ও সন্তানের শরীরে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিয়ের আগেই দুজনের হেপাটাইটিস এ ও বি ভ্যাকসিন নিয়ে রাখা ভালো।
কিডনি : ইউরিয়া টেস্ট করে দেখা উচিত কিডনির কোনো সমস্যা আছে কি না। ইউরিয়া বেশি থাকলে তার থেকে তার বাচ্চার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
থাইরয়েড এনিমিয়া টেস্ট : থাইরয়েডে সমস্যা থাকলে পরবর্তী সময়ে সন্তান জন্মদানের সময় সেটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ছাড়া এনিমিয়ায় আক্রান্ত পাত্রীরও বিয়ের পর সন্তান নিতে গেলে অনেক সময়ই সমস্যায় পড়তে হয়।
এইডস/এইচআইভি : এটি আমাদের দেশের জন্য যদিও খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবু সমাজে এই রোগের বিস্তার ক্রমেই বাড়ছে। তাই বিয়ের আগে এটিরও টেস্ট করিয়ে নেওয়া উচিত।
বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর এতসব টেস্ট করা মানে তাদের ভবিষৎ কতটা সুরক্ষিত হবে তার বিবেচনা এবং তাদের অনাগত সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে এগিয়ে থাকা। সব অন্ধ ধারণা এবং সংকোচ ঝেড়ে ফেলে সব হবু বর-কনের উচিত হবে নিজেদের পারস্পরিক শারীরিক এবং মানসিক সমস্যাগুলো জেনে বিয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়া।

লেখাঃ অলকানন্দা রায়

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

four − one =