ব্যবহৃত জিনিসের ভবিষ্যৎ তৈরি করে ‘রিসাইকেলবিন’

করেছে Suraiya Naznin

প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে কমবেশি সবার। দামি একটা শাড়ি পরে ফেসবুকে একবার ছবি পোস্ট করলে পরে আর ওই শাড়ির প্রতি আগ্রহ থাকে না। কিন্তু এত দামি দামি জিনিসের ভবিষ্যৎ কী? এমন ধারণা থেকেই রিসাইকেলবিনের জন্ম। কথা হলো রিসাইকেলবিনের ফাউন্ডার অ্যাডমিন ফ্লোরিডা শারমিন সেতুর সঙ্গে। কথা বলে লিখেছেন সুরাইয়া নাজনীন-

ফ্লোরিডা শারমিন বললেন, ‘আমাদের জীবনযাপন এখন হয়ে গেছে অনলাইননির্ভর। অনলাইনে যেমন কিছু পছন্দ হলে কিনে ফেলছি, তেমনি অনলাইনে ছবি পোস্ট করলে সেই জিনিস আর পরেরবার পরছি না। দু-একবার পরা জিনিস কাউকে উপহারও দেওয়া যায় না। আমি এমন সমস্যায় ছিলাম আর ভাবছিলাম আসলে এসব জিনিস তো ওয়েস্ট হয়ে যাচ্ছে। কী করা যায়? এমনটা ভাবতে ভাবতে এক রাতে সিদ্ধান্ত নিলাম এই রকমই একটা গ্রুপ খুললে কেমন হয়। আমি ভাবতেও পারিনি এমন সাড়া পাব।’

অনেকে ৩০-৪০ হাজার টাকা দিয়ে জামদানি, গাদোয়াল, মসলিন কিনছে কিন্তু পরছে হাতে গোনা দু-এক দিন। দু-এক দিন পরা সেই দামি শাড়িটাই যদি ১০-১৫ হাজারে পাওয়া যায়, তাহলে হয়তো কারও স্বপ্নপূরণও হতে পারে। আবার ঘর সাজানোর জিনিস কেনার শখ থাকে অনেকের কিন্তু সাধ্য থাকে না, আবার কেউ কেউ কয়েক দিন পরপরই ইন্টেরিয়র পরিবর্তন করে, তারা হয়তো সেই জিনিসগুলো বিক্রি করার মাধ্যম খুঁজে পায় না।

অনেকে দেশের বাইরেও চলে যায় তখন সবকিছু বিক্রি করেও দিতে চায় কিন্তু প্ল্যাটফর্ম পায় না। তাই আমরা সেই মাধ্যমটাই তৈরি করেছি, যা দুই পক্ষের জন্যই উপযোগী বললেন ফ্লোরিডা। যারা দরিদ্র তারা তাদের প্রয়োজনে মানুষের কাছে সমস্যার কথা বলে জিনিস নিতে পারে কিন্তু যারা মধ্যবিত্ত তারা চাইতে পারে না। প্রয়োজনটা ঠিকঠাক বলতেও পারে না। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবাকে সন্তানের জন্য একটি ভালো টেবিল কিনতে হলে কিছুদিন ধরে টাকা জমাতে হয়। কিন্তু রিসাইকেলবিন কিছুটা হলেও সেসব মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছে বলে মনে করেন ফ্লোরিডা। করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। চাকরি নেই অনেকের। সেই সময় কম দামে প্রয়োজনীয় পণ্যটি কিনতে পেরেছে বা পারছে রিসাইকেলবিন থেকে।

ফ্লোরিডা শারমিন সেতু

রিসাইকেলবিনের ট্যাগলাইন হলো ‘ড্রপ ইয়োর নিডলেস থিংকস’ কেন এই ট্যাগলাইন? আমাদের গ্রুপের বৈশিষ্ট্যই হলো কারও জন্য যেটা অপ্রয়োজনীয়, অন্যের জন্য সেটি প্রয়োজনও হতে পারে। সে জন্যই আমাদের ট্যাগলাইনটা ঠিক এমন, বললেন ফ্লোরিডা। আমাদের গ্রুপে প্রথম দিকে নিয়ম ছিল ৩০ জনকে ইনভাইট করে সেলপোস্ট দেওয়া কিš‘ ১৫ দিনের মধ্যে আমরা এই নিয়ম উঠিয়ে দিয়েছি, কারণ এত বেশি মেম্বার হয়ে গেছে, কুলাতে পারছিলাম না। প্রথম মাসে হয়েছে ৩ লাখ মেম্বার, পরের মাসে ৬ লাখ। বর্তমানে ১১ লাখ সদস্যের গ্রুপ রিসাইকেলবিন। রিসাইকেলবিন এখনো বেবি গ্রুপের পর্যায়ে রয়েছে। কারণ, মাত্র আট মাস বয়স এই গ্রুপের, তবে চাহিদা অনেক বেশি। আমরা মানুষের প্রয়োজনটা ধরতে পেরেছি। এত এত সদস্যের চাহিদা দেখে মনে হয়েছে আমাদের দেশে এই রকম গ্রুপের ভীষণ প্রয়োজন। তবে এখন আমরা একটু কড়া নিয়মে এসেছি। কোনো নতুন ফেসবুক আইডি আমরা অ্যাকসেপ্ট করি না কিংবা ফেক আইডি আমরা প্রচুর যাচাই-বাছাই করে অ্যাকসেপ্ট করি।

 

ফ্লোরিডা আরও বলেন, কয়েক দিন আগে এক কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট সেল হয়েছে। এটা আমার কাছে দুর্দান্ত সাড়া বলে মনে হয়। শখের বশে খোলা একটি গ্রুপে এমন সাড়া পাব ভাবিনি। আবার অনেকে আছে, নতুন সংসার শুরু করেছে। সাধ থাকলেও সাধ্যের জন্য সংসার গোছাতে পারছে না। তারা রিসাইকেলবিন থেকে ফার্নিচার কিনে সংসার শুরু করেছে। আমাকে ইনবক্সে ধন্যবাদ দিয়েছে তারা। আবার করোনায় চাকরি হারিয়ে আমাদের গ্রুপে গাছ বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছে। এ বিষয়গুলো খুব ইতিবাচক মনে হয় ডিজিটাল উন্নয়নে। এ রকম প্ল্যাটফর্ম থাকলে মানুষের অজানা অনেক স্বপ্ন পূরণ হওয়া সম্ভব।

ফ্লোরিডা ব্যক্তিগত জীবনে একজন ফার্মাসিস্ট। তিনি সাত বছর চাকরি করে, সন্তান হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেন। ফেসবুকের সঙ্গে আগে এত সম্পৃক্ততা ছিল না। কিš‘ তার নিজের প্রয়োজন থেকে ভাবেন এই রকম একটা গ্রুপ থাকলে বোধ হয় কার কারও সুবিধা হতো। যেই ভাবা, সেই কাজ। গ্রুপ খোলার পর এত সাড়া পড়বে, তিনি বুঝতেও পারেননি। তবে আমরা যে প্রযুক্তিটাকে গ্রহণ করছি, তা মানুষের হুমড়ি খাওয়া দেখলেই বোঝা যায়। তবে এটা অবশ্যই ইতিবাচক।

কিছু মানুষ আছে, যারা ভালোটাকে খারাপে রূপ দিতে সদা ব্যস্ত থাকে। রিসাইকেলবিনেও ঢুকেছিল তারা। কেউ সেলপোস্ট দিলে তাদের খারাপ মন্তব্য করত নিয়মিত কিন্তু রিসাইকেলবিনের অ্যাডমিন প্যানেল তাদের প্রতিহত করতে পেরেছে। তবে আলাদা কোনো পলিসি থাকলে কিংবা ডিজিটাল আইনের কড়া বাস্তবায়ন থাকলে আমরা আরও স্মুদলি সামনে এগোতে পারব বলে মনে করেন ফ্লোরিডা।

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

13 + seventeen =