বয়স যখন ১-৭ দিন

করেছে Sabiha Zaman

আফরোজা পারভীন সোমা: 

মাতৃত্বের স্বাদ অতুলনীয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ নারী মা হওয়ার পর এক অন্য রকম অনুভূতি পায়। একজন নারীর প্রসববেদনা যখন ওঠে, তখন সেই ব্যথার পরিমাণ থাকে ৫৭ ইউনিটের বেশি। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ ৪৭ ইউনিটের বেশি ব্যথা সহ্য করতে পারে না। এত কষ্টের সন্তান জন্ম দিলেই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শুরু হয় নতুন পথচলা। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে একজন মায়ের জন্য একেকটি চ্যালেঞ্জ। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রথম সাত দিন নিয়েই আয়োজনÑ

শিশুর খাদ্য গ্রহণ

যেহেতু নবজাতকের একমাত্র খাবার দুধ, তাই জেনে রাখা ভালো যে অনেক মায়ের ক্ষেত্রে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই বুকে দুধ আসে, আবার অনেক মায়ের ক্ষেত্রে বুকে দুধ আসতে অনেক বেশি সময় লাগে। তখন মাসহ পরিবারের সবার জন্য এটা একটা বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে অনেক ডাক্তার বলে থাকেন, প্রথম এক-দুই দিন বাচ্চার তেমন কোনো খাদ্যের (দুধের) প্রয়োজন পড়ে না। তখন অনেকে ফর্মুলা দুধ বাচ্চাকে দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাচ্চা একবার ফর্মুলা দুধে অভ্যস্ত হলে সে আর মায়ের দুধ খেতে চায় না। কারণ, ফিডারে দুধ সাক করতে বা টানতে কষ্ট কম হয় মায়ের দুধ টানার তুলনায়। তাই সেই সময় বাচ্চা আর কষ্ট করে মায়ের দুধ টানতে চায় না।
মায়ের বুকের দুধ বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হয়। প্রথমত, বাচ্চাকে বারবার খাওয়ানোর চেষ্টা করা অর্থাৎ বাচ্চা যখন বুকের দুধ সাক করে বা টানে, তখন মায়ের শারীরে একধরনের হরমোন তৈরি হয়, যা মায়ের দুধ তৈরিতে সাহায্য করে। বাচ্চা যত বেশি দুধ টানবে, তত বেশি হরমোন নির্গত হবে এবং তত বেশি দুধ উৎপাদিত হবে। নির্দিষ্ট সময় পরপর নয়, বরং বাচ্চাকে যতবার ইচ্ছা ততবার দুধ দেওয়া উচিত। ব্যাপারটা যেন এমন না হয় যে মা বুকের দুধ জমিয়ে রাখছে বাচ্চাকে পরবর্তীতে আবার দুধ দেওয়ার জন্য। দুধ জমিয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন পড়ে না এবং উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, মাকে প্রচুর পরিমাণ তরল খাবার খেতে হবে। তরল খাবার বুকের দুধ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তৃতীয়ত, বাচ্চাকে দুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে পজিশন ঠিক রাখা। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাচ্চাকে শুয়ে শুয়ে দুধ দেওয়া ঠিক নয়। মাকে অবশ্যই বসে, বাচ্চাকে বুকের সঙ্গে লাগিয়ে দুধ খাওয়াতে হবে। এতে বাচ্চা বেশি পরিমাণ দুধ পাবে।

নবজাতকের গোসল

মুরব্বিরা অনেকেই বলে থাকেন, বাচ্চার নাভি পড়ার আগে গোসল নয়। কিন্তু বাস্তবিক দিক থেকে তোমার বাচ্চা যদি সুস্থ থাকে অর্থাৎ কোনো অসুস্থতা নিয়ে জন্মগ্রহণ না করে থাকে বা প্রিম্যাচিউর না হয়ে থাকে, তাহলে তুমি তিন দিন পর থেকেই তাকে হালকা কুসুম গরম পানিতে দিনে একবার গোসল দিতে পারো। কোনোভাবেই গোসলের পানিতে ডেটল, স্যাভলন ইত্যাদি ব্যবহার করা ঠিক নয়। গোসলের পর বাচ্চার শরীর পাতলা সুতির কাপড় দিয়ে মুছে দেওয়া যায়। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে নাভির জায়গাটা যেন খুব সতর্কতার সঙ্গে আলতো করে মোছানো হয় এবং ঘরে যেন কোনো প্রবহমান বাতাস না থাকে। প্রিম্যাচিউরড বাচ্চার ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ, প্রিম্যাচিউরড বাচ্চার জন্য আলাদা পরিচর্যার প্রয়োজন পড়ে।

নবজাতকের জন্ডিস

নবজাতকের রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে জন্ডিস হয়। প্রায় ৬০ শতাংশ পূর্ণ গর্ভকাল নবজাতকের এবং ৮০ শতাংশ প্রিটার্ম বা অকালজাত নবজাতকের ২৪ ঘণ্টা থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে জন্ডিস শুরু হতে পারে। যদিও এর বেশির ভাগ ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস বা নির্দোষ জন্ডিস। এই জন্ডিসে ভয়ের কিছু নেই যদি কিনা একটা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে। প্রথমে নবজাতকের মুখ ও চোখ হলুদ হয়। ধীরে ধীরে হাত, পায়ের তালুসহ সারা শরীর হলুদ হয়ে যায়। নবজাতকের রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা অনেক বেড়ে গেলে শিশুকে ফটোথেরাপি দিতে হতে পারে। এ ছাড়া প্রতিদিন সকালে আধা ঘণ্টা করে রোদ পোহানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। সকাল ৮টা থেকে ১০টাÑ এই সময়ের রোদটা নবজাতকের জন্য খুব ভালো। দুপুরের পর থেকে রোদে না দেওয়া ভালো। অনেকে মনে করেন, আধা ঘণ্টা নয়, আরও বেশি সময় রোদে রাখলে বাচ্চার জন্ডিস তাড়াতাড়ি সেরে যাবে। এটা ঠিক নয়। কারণ কড়া রোদ ও অতিবেগুনি রশ্মি নবজাতকের ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। সাধারণত এই জন্ডিস দুই সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। তবে নবজাতকের জন্ডিস দেখা দেওয়ামাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

নবজাতকের নাভির যত্ন

নবজাতকের নাভির সঠিক যত্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম অবস্থায় যেহেতু নবজাতকের নাভি কাঁচা অবস্থায় থাকে, তাই সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অনেকেই ভাবেন, নাভিতে সরিষার তেল লাগানো ভালো, আবার অনেকেই ভাবেন অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বা পাউডারের কথা। আসলে নাভিতে এসব কোনো কিছুই দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নাভি কাটার পর যে পরিমাণ ক্লোরহেক্সিডিন লাগাতে হয়, তা প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীরাই লাগিয়ে দেন। এরপর আর কোনো কিছুই ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে না। সাধারণত নাভি ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই পড়ে যায়। অনেক বাচ্চার আবার এর চেয়ে বেশি সময় লাগে। এতে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। খেয়াল রাখতে হবে, নাভি যেন সব সময় শুকনো, পরিষ্কার ও খোলা থাকে। শিশুকে ডায়াপার পরানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে নাভি যেন কোনো অবস্থাতেই ঢেকে না যায়। স্বাভাবিকভাবে নাভি পড়ে গেলে নাভিতে খুবই সামান্য ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা দেখে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এটা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। এতে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। খেয়াল রাখতে হবে, নাভির চারপাশ লাল হয়ে যাচ্ছে কি না বা নাভি দিয়ে পুঁজ বা পানি বের হচ্ছে কি না? যদি হয়, তাহলে বুঝতে হবে নবজাতকের নাভি সংক্রমণ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য

প্রসব-পরবর্তীতে মায়েদের বেশ কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। বেশির ভাগ মা পোস্ট পার্টাম ব্লু ও পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনের শিকার হয়। পোস্ট পার্টাম ব্লু এ সমস্যাটা দেখা দেয় বাচ্চা হওয়ার চার-পাঁচ দিন পর থেকে। এই সময়ে তারা হীনম্মন্যতা, অনিদ্রা, একাকিত্ব বোধ, মুড সুইং, খিটখিটে মেজাজ, দুশ্চিন্তা ছাড়াও আরও অনেক মানসিক সমস্যায় ভোগে। এই সময়ে অনেকেই মায়ের এই আচরণ মেনে নিতে পারে না। বরং তাকে শুনতে হয় বিভিন্ন কটু কথা, যা মাকে মানসিকভাবে আরও অসুস্থ করে তোলে। এটা হয় মূলত মায়ের শারীরিক, মানসিক ধকল ও শরীরের হরমোনের পরিবর্তনের জন্য। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর জন্য কোনো ওষুধের প্রয়োজন পড়ে না। তবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবার ও কাছের মানুষের কাছ থেকে মানসিক সাহায্য, হাসিখুশি পরিবেশ। পাশাপাশি মা নিজে থেকেও চেষ্টা করবে এর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

মায়ের যত্ন ও খাবার

প্রসবের পর মাকে খুব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এই সময়ে কোনো ভারী কাজ বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং সেই সঙ্গে বেশি করে পুষ্টিকর ও তরল জাতীয় খাবার মাকে দিতে হবে। ডিম, দুধ, ফলের রস, শাকসবজি, লাউ, কালিজিরা, মাছ, মুরগি ইত্যাদি খাবার বুকের দুধ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মায়ের পোশাক

মাকে অবশ্যই ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক পোশাক পরা উচিত। এমন পোশাক পরা উচিত, যাতে বাচ্চাকে বুকের দুধ দিতে সুবিধা হয়।

মায়ের ঘরের পরিবেশ

স্যাঁতসেঁতে ও অন্ধকার ঘরে নানা রকম পোকামাকড়ের উপদ্রব বেশি থাকে। তাই মায়ের ঘরটি খোলামেলা ও প্রচুর আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে, এমন হওয়া উচিত। এতে মায়ের শরীর ও মন দুই-ই প্রফুল্ল রাখতে সাহায্য করবে।


ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রথম সাত দিনে করণীয়

* প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করা ও তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা।

* নবজাতকের ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া।

* প্রথম দিন বা সপ্তম দিন নবজাতকের সুন্দর ইসলামিক নাম রাখা সুন্নাত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নিজ নামে ও তোমাদের বাপ-দাদার নামে আহ্বান করা হবে, অতএব তোমরা তোমাদের (সন্তানদের) নাম সুন্দর করে নাও।

* সপ্তম দিনে নবজাতকের মাথার চুল ফেলা ও আকিকা দেওয়া। নবজাতকের মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজন পরিমাণ রুপা বা সেই পরিমাণ অর্থ দান করা। হজরত আনাস ইবনে মালেক রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সপ্তম দিন হাসান ও হুসাইনের চুল কাটার নির্দেশ দেন এবং চুলের ওজন পরিমাণ রুপা সদকা করেন।

বাচ্চা বা মায়ের কোনো সমস্যা হলে বা বাচ্চার কোনো বিষয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আল্লাহ সব মা ও শিশুকে সুস্থ ও শান্তিতে রাখুক। অনেক অনেক ভালোবাসা রইল মা ও শিশুদের জন্য।

আফরোজা পারভীন সোমা
ফেসবুক পেজ শিশুর মেধা বিকাশ

ছবি: ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

fifteen − 1 =