ভালো থাকুক নারীর মন

করেছে Rodoshee

‘নারীর মন বোঝা নাকি কম্ম নয় ঈশ্বরেরও। মানুষ কোন ছার’ কোনো কিছু হলেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এই মজাদার কৌতুক করে। শ্লেষমাখা কৌতুক। নারী কাঁদলে করে, হাসলে করে। নারীর বেদনা-বিরহ-আনন্দ-উচ্ছ্বাস সবকিছুতেই এই কমেন্ট আসে ‘মেয়েদের মন বোঝা দুষ্কর’! কিন্তু আসলে কি তাই! এই সমাজ কি আদৌ বুঝতে কখনো চেয়েছে নারীদের মনের কথা? নারীর মন কি কখনো ভাবিয়েছে অন্দরমহলের কাউকে। বাইরের পৃথিবী না হয় বাদই দিলাম। ওই সামন্ত সমাজ ঘরটাকে নারীর একমাত্র স্থান করে দিয়েছে। বাইরে বের হলেও সীমা করে দিয়েছে কতটুকু বের হতে পারবে। সেই সমাজ, সেই সীমারেখার ভেতরে থাকা মানুষগুলো কোনো দিন জানতে চেয়েছে, নারীর মন বলে কোনো বস্তুকে!

সেই মেয়েটার কথা আমাকে ভাবায়। ফতুয়া জিনস পরতে ভালোবাসত। রাস্তায় কোনো লোকের এক কুৎসিত কমেন্টে মেয়ের গা থেকে ফতুয়া খুলে ফেলতে হবে পরিবারের নির্দেশ এলে। কেউ সেদিন একবারেও বুঝতে চায়নি মেয়েটির ‘মন’। মেয়েটি কী চায়! কী ভালোবাসে! কুৎসিত কমেন্টকারী ওই মেয়েটার জীবনে কোনো অবদান রাখেনি! অচেনা ওই একটা রাস্তার লোকের কথায় মেয়েটা লাল ফতুয়া তুলে রেখেছিল আলমারিতে।

কী বোঝা গেল! নারীর মন নারী কন্ট্রোল করে না। কন্ট্রোল করে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। এখানে নারীর মন একটা ফ্যান্টাসি জিনিস যেটা কবিদের ভাবায়, শিল্পীদের রসদ জোগায়। কিন্তু কর্মে তার কোনো উপস্থিতি নেই। এই দেশের মেয়েদের হো হো করে হাসতে বন্ধ করে দেওয়া হয় ছোটবেলা থেকেই। এই দেশের মেয়েরা দূরপাল্লার বাসে নিজের মনমতো একা জার্নি করতে পারে না!
তাই নারীর মনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই এই সমাজের কাছে। ওটা একটা অদ্ভুতুড়ে!

তবু মন রয়েছে!
মানুষ তো, মন থাকবেই। মন আছে বলেই মানুষ। তো প্রতিটি নারী মাত্রই একটা মন নিয়ে জন্মায়। মানুষের মন। তারপর পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্ম, সংস্কৃতির সামাজিকীকরণের ফলে সেই মানুষের মন হয়ে ওঠে কেবলই ‘মেয়েদের মন’। তখন আসে কথা, ‘মেয়েদের মন বোঝা দায়’। কিন্তু কে-ই বা যেন বুঝতে চেয়েছে কোনো দিন!
২৯ সেপ্টেম্বরWorld Heart day। Heart তো মেডিকেলের ব্যাপার। Heart সুস্থ রাখার জন্য বাজারে কত-কী পানীয় আসছে, খাবার আসছে। স্পেশালভাবে আজকাল শুধু নারীর Heart ভালো রাখার জন্য পুঁজিবাদীর কম বায়নাক্কা করছে না। জিম, স্পা ছড়াছড়ি আজকের রাস্তায় রাস্তায়। কম তেলের রান্না এমনকি তেলটাও স্বাস্থ্যকর করা হচ্ছে। এসব ব্র্যান্ডিং হার্টকে সুস্থ রাখবেই। মানুষ ভালোভাবে বাঁচবে কারণ হার্ট সচল থাকবে! কিন্তু এই হার্টে হৃদয়ের জায়গা কই!

কম তেলে রান্না খেয়ে সুন্দর পালসে থাকা জীবন কি আসলেই সুস্থ জীবন! শরীরের সুস্থতা নিয়ে আমরা ভাবি অনেক। সেভাবে ভাবি না মনের সুস্থতা নিয়ে। শরীর ছোঁয়া যায়, কাটা যায়, ধরা যায় তাই তার বস্তুগত মূল্য রয়েছে। মন ছোঁয়া যায় না বলে মনের মূল্য নেই আমাদের কাছে।

আর তাই শরীরের সুঠাম সুস্থ থাকা মানেই সুস্থভাবে বেঁচে থাকা না।
সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য শরীরের পাশাপাশি চায় মন ভালো রাখা।
কিন্তু ‘নারীর হার্ট’ নিয়ে যত ভাবি, নারীর মন নিয়ে কি ততটা ভাবি?

নারীর মন : এক অদ্ভুত দোলাচল!
ফ্রয়েড নাকি জানেননি, নারীরা কী চায়! কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক ফ্রয়েড যা চেয়েছিল তা তার স্ত্রী ঠিক করেছিল। যেমন, পুতুল হয়ে থাকা সংসারে, কোনো বড় ডিসিশন না নেওয়া, ঘরকন্না দেখা, আর সন্তান জন্ম দেওয়া। ফ্রয়েড যা চেয়েছিল পইপই করে তার স্ত্রী সেটা করেছিল। তাই সে কখনো জানতে পারেনি তার নারী কী চায়? জানার চেষ্টাও কি করেছিল সে আদৌ?

নারীর মন অদ্ভুত দোলাচল। নারীর সাইকোলজি নিয়ে কিছু পড়তে চাইলে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ে রিসার্চ আসে যেটি সেটি হচ্ছে নারীর যৌনতা। যৌনতা কী করে নারী উপভোগ করতে পারে, সেটি পুরুষদের ভাবার একটা বিরাট জায়গায়। কারণ নারীর মন নারীর যৌনতার নিয়ন্ত্রক। তাই মন না এলে শরীরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারে না নারীরা। আর এই কারণেই নারীর সাইকোলজি নিয়ে পড়াশোনা করতে চাইলে অবধারিতভাবে চলে আসে নারীর যৌনতা। বিস্তারিতভাবে আসছি একটু পরে।

কিসে নারীর মন আর পুরুষ মনে পার্থক্য!
মনেরও বুঝি পার্থক্য থাকে! থাকে না। আমরা মন বলে যে অধরা বিষয়কে বলছি, সেটা তো সেই নিউরনই কন্ট্রোল করছে।
১. নারী ভাবছে যা তা ঠিকই ভাবছে!
বিজ্ঞান বলে পুরুষ কোনো বিষয়ে ভাবতে চাইলে সে কেবল ব্রেইনের ডান হেমিস্ফিয়ারকে ব্যবহার করে। আর নারী দুই পাশই ব্যবহার করে। তাহলে নারী যেটা ভেবে বের করে সেই রেজাল্ট হয় সাজানো, গোছানো এবং প্রায় সময় সঠিক ভাবনা। আমি খুব কম সময়ই মেয়েদের অগোছালো ভাবতে দেখেছি। খুব অস্থিরচিত্তের অগোছালো মেয়েটার ভাবনা কিন্তু অগোছালো হয় না।
২. ব্রেইন বড় পুরুষের! তা বলে কি তারাই স্মার্ট!
একদম নয়। ১০% বিশাল ব্রেইনের অধিকারী থাকলেও তারা যে মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছে তা না। আমি এই ফিচারটি লিখছি থট ক্যাটালগ নামে একটি সাইকোলজিক্যাল বিষয়ক পোর্টাল থেকে। সেখানে বলা হয়েছে, পুরুষের ব্রেইন ১০% বড় দেখেই তাদের গণিত একটু অল্প বেশি বোঝার প্রবণতা আছে যেখানে মেয়েদের আইকিউ এবং ভাষাগত দক্ষতা একটু বেশি ছেলেদের চেয়ে। যদিও গণিত, ভাষা দক্ষতা, আইকিউ প্রতিটি প্র্যাকটিসের মাধ্যমেই কেবল ভালো করা সম্ভব। এবং এটাই প্রমাণিত। মেয়েরা গণিতে কাঁচা এ রকম একটা বলার প্রবণতা এসেছে ১০% বড় ব্রেইনের কারণে। কিন্তু আসলেও কি তাই। কজন মেয়ে গণিতবিদের নাম বলা যাক। সোফি, এমি নদার, এড লভলেক, ক্যাথরিন জোনস এই নামের লিস্ট শুরু করলে শেষ হবে না।
৩. মেয়েরা আবেগী
এই বেলা একটু হেসে নিচ্ছে অনেকে। কারণ সবাই জানে মেয়েদের বদ(!) নাম আছে আবেগী হওয়ার। বাঙালিরা মেয়েদের চোখের জল দেখলে বলে উঠে ‘যত্তসব মেয়েলি সেন্টিমেন্ট’। কিন্তু বিশ্বাস করো, এই মেয়েলি সেন্টিমেন্ট ছাড়া কোনো দিন তোমার পৃথিবী সুন্দর হতো না। মেয়েদের মা হওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা প্রকৃতি তাকে দিয়েছে। শুধু জন্ম দিয়েই মা ক্ষান্ত হয় না, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর্তব্য নিয়ে বাচ্চাকে পালন করতে হয়। কিন্তু মায়েরা একা হাতেই সেটা করে একদম কারও সাহায্য ছাড়াই। বাচ্চা পালন করার সঙ্গে মায়া ব্যাপারটা জড়িত। যেখানে মায়া আছে, সেখানে আবেগ থাকবেই। এই আবেগের জন্য কেবলমাত্র মেয়েরাই পারে একটা ঘটনার বিভিন্ন রূপ দেখতে। তাই মেয়েদের বিচার করার প্রবণতা অনেক ভালো। তবে মজার একটা বিষয়, মেয়েদের এই আবেগটা সব মানুষের জন্য সমান থাকে। যদি সেই আবেগ নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে চায় মেয়েরা সহজে সে আবেগ কাটিয়ে উঠতে পারে। তাই আবেগ মেয়েদের দুর্বলতার জায়গা নয়। শক্তির জায়গা।

৪. আবেগী বলে কষ্ট বেশি পায়!
এটার সায়েন্স রিসার্চও আছে। সেরিবিয়াল হেমিস্ফিয়ারে বাদাম আকৃতির ধূসর বর্ণের এমিগডালা বলে একটি অংশ আছে। যেটা মানুষের আবেগ নিয়ে কাজ করে। এই অংশটি ছেলেদের ক্ষেত্রে ডান পাশটা বেশি অ্যাকটিভ আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বাম পাশটা অ্যাকটিভ। বাম পাশটা আবার ‘ইন্টারনাল ফাংশন’-এর সঙ্গে সংযুক্ত। তাই মেয়েদের ইমোশন অনুযায়ী মেয়েদের ব্যথাটাও বেশি।
৫. মেয়েদের মুড পরিবর্তন হয় বেশি
পুরুষের ব্রেইনে নারীদের চাইতে সেরেটেনিন বেশি তাড়াতাড়ি ক্ষরিত হয়। এই কারণে মেয়েদের মুড পরিবর্তন বেশি হয়। অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়ে মেয়েরা এবং তাই কোনো ট্রমা পরবর্তী অবস্থায় মেন্টাল ডিজঅর্ডার দেখা যায়।
৬. কিন্তু স্ট্রেস মেয়েরাই সামলায় বেশি
ছেলে-মেয়ে উভয়ের শরীর থেকে অক্সিটসিন হরমোন নিঃসৃত হয়। ফিমেল ইস্ট্রোজেন হরমোনের সঙ্গে এই হরমোন মিশে মেয়েদের শরীর স্ট্রেস প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। একটা শান্তির অনুভূতি বিরাজ করে স্ট্রেসের সময়েও। কিন্তু পুরুষ সেসব ক্ষেত্রে বেপরোয়া।
৭. মেয়েদের ইমপালস কন্ট্রোল শক্তিশালী
প্রতিহিংসাপরায়ণ, রাগ এই ব্যাপারগুলো ছেলেদের মধ্যেই দেখা যায় বেশি। কারণ, মেয়েদের এগুলোর নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বেশি। এ জন্য সারা বিশ্বে পুরুষের মধ্যেই অপরাধপ্রবণতা বেশি, মেয়েদের চেয়ে।

নারীর মন, নারীর যৌনতা
একটু আগেই বললাম যে নারীর সাইকোলজি নিয়ে স্টাডিজের বিশাল ক্ষেত্রজুড়ে রয়েছে নারীর যৌনতা। কেননা মন নারীর যৌনতার নিয়ন্ত্রক। পুরুষের যৌনতা যেখানে অনেকটাই সময়নির্ভর। নারীর কাছে সেটা পরিবেশনির্ভর। এবং এটা সত্যি যে যৌনতায় নারীর ভূমিকা সব সময় সচল। পুরুষের সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক ইরেকশনের আগ অবধি সে অচল।
যৌনতায় নারী কী চায়, সেটা শতকরা ৮০ ভাগ পুরুষ বোঝে না। সাইকোলজি টুডে ব্লগ ৫টি পয়েন্ট উল্লেখ করেছে কীভাবে একজন নারীকে যৌন সম্পর্কের আগে বুঝতে হবে!

নারী কি তোমার সান্নিধ্য চাচ্ছে?
সব পরিবেশ, সব সময় নারী সান্নিধ্য দেবে না পুরুষকে। তাই তার ইশারা, কথাবার্তা, কিছু চাহনি তোমাকে বোঝাবে যে সে সান্নিধ্য চাচ্ছে কি না। যদি সে সান্নিধ্যে যায় তবেই তুমি কানেক্ট করো। না হলে তাকে অস্বস্তিতে ফেলো না।
অনেক ঝামেলা! স্ট্রেস! সামলাও একটা শব্দ ‘সামলাও’ যেন অনেক কিছু। দেখা যায় অনেক পুরুষ, সংসারে স্ত্রীর প্রবলেমকে কোনো প্রবলেম মনে করে না বলেই ওই রকম স্ট্রেসের সময়েও সে শারীরিক সম্পর্ক করে। অথচ একবারেও ভাবে না, ‘নারীর মন’ তাতে আদৌ সায় দিচ্ছে কি না। তাই এসব ক্ষেত্রে ব্লগটি জানিয়েছে প্রবলেম সলভ করো। এভাবে শুরু করো, ‘কী হয়েছে আমাকে বলো! আচ্ছা আমি তোমাকে একটি সাজেশন দিতে পারি। দেখো তো কেমন হয়।’
তাকে অনেকগুলো সাজেশন দাও এবং কোনটা মানার জন্য চাপ দিও না এই সময়ে।

কোনো নারী যদি যৌনতায় কম আগ্রহী হয়!
তোমার স্ত্রী যদি কম আগ্রহী হয় যৌনতায়, সে ক্ষেত্রে ভেবে বসো না তার মন তোমাকে চায় না। বরং জানতে চাও, কোনো পুরোনো ক্ষত আছে কি না, যা তাকে এই আগ্রহ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
ক্লান্ত স্ত্রীকে জাগিও না
স্বামিগিরি ফলানোর জন্য অনেক স্বামীই স্ত্রীকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে যৌন সম্পর্ক করে। যেহেতু কাগজে-কলমে বৈবাহিক ধর্ষণের কোনো আইন নেই তাই এরা পার পেয়ে যায়। ভেবে দেখো তোমার স্ত্রী কত কাজ করে তোমার জন্য। এই ক্লান্ত শরীর না চাইতেই পারে আর কোনো চাপ। তাই ক্লান্ত স্ত্রীকে জাগিও না।
যে কথা বলতে পারছে না সে
অনেক কথা আছে সংসারে সে বলতে পারে না তোমাকে। হয়তো অনেক অপমান সইছে সে কিংবা দুঃখ পাচ্ছে কোনো কারণে। শেয়ারের জন্য বেছে নাও নিজেদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তকে। তখনোই জানো কি কষ্টে সে আছে। সেই সুন্দর মুহূর্তে তোমার সিম্প্যাথি এবং পাশে থাকা বাড়িয়ে দেবে তার ভরসা।

নারীর মন : জটিলতায় ভরপুর
খুব বেশি কষ্টে কিন্তু নারীর মন কাঁদে না। কাঁদে অল্প কিছু কারণে, যেটাকে পুরুষরা বলে ‘সিলি’। কিন্তু ভেবে দেখো, বড় সমস্যাগুলো থেকে আসলে নারীরা উত্তরণের পথ খুঁজে মাথা ঠান্ডা রেখে। কিন্তু সিলি সমস্যায় নারীরা আবেগী হয়। কারণ সেখানে মাথা ঠান্ডা রেখে উত্তরণের পথ খুঁজতে দরকার হচ্ছে না। আর নারী তো আবেগী সে তুমিও জানো।

ওই যে ঘরে খাটছে, বাইরে খাটছে মেয়েটি। জানতে চেয়েছো কখনো কিসে তার দুঃখ, কিসে তার সুখ। কিংবা পার্লার সাজা কন্যা, শপিংয়ের প্রতি তীব্র নেশা থাকা বউটির হাসি দেখে কি আদৌ কিছু বোঝা যায়? নারীদের আবেগ আছে, কিন্তু সেটাকে সে কন্ট্রোল করতে কিংবা সামলাতে পারে।

নারীর মন কখনো বুঝতে দেয় না পরিবেশের প্রভাব। এটা একটা বড় গুণ। আমাদের মায়েরা অনেক অভাবের মধ্যে থেকেও মেরুদন্ড সোজা করে থাকে।

নারীদের মন ত্যাগী। তারা সংসারের জন্য ত্যাগ করে, সমাজের জন্য করে, দেশের জন্য করে। আমরা ভুলে যাইনি ‘হাঙর নদীর গ্রেনেড’-এর সেই মাকে যে কি না মুক্তিযুদ্ধে নিজের ছেলেকে বলি দিয়েছিল পাকবাহিনীর হাতে। কিংবা আমরা কি ভুলতে পেরেছি গোর্কির ‘মা’কে! এরা সবাই নারী!

নারীর লিডারশিপ দক্ষতা রয়েছে। সামন্ত যুগের আগে নারীই পালন করত লিডারের ভূমিকা। বাচ্চাদের জন্ম দেওয়া, লালন পালন করা, দলের শিকার করা, কৃষিকাজ করা সবেতে চলত তাদের ডিসিশন। গ্রিক মিথলজি খেয়াল করলেই দেখবে সেখানে ছিল নারী দেবীদের আধিপত্য। কিন্তু সামন্ত যুগ আসার সঙ্গে সঙ্গে নারীকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ঘরে, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রভাবে। কিন্তু সেখানেও লিডারের ভূমিকায় সে থাকল। তাই নারী-মন কর্তৃত্ব করতে ভালোবাসে এবং এটা তার বড় একটি দক্ষতা।

ভালো থাকুক নারীর মন! পুরুষের দায়িত্ব!
নারীর মন ভালো রাখার দায় কেন একলা পুরুষের হবে? এটা নিয়ে একটা তর্ক হতে পারে। তবে আমি যখন আমাদের আশপাশের সোশ্যালাইজেশন নিয়ে একটু কথা বলব তখনই বুঝবে সমাজ বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিকতা সমাজ কীভাবে নারীর মনের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

আমাদের নারীরা কি সিকিউরড! না! বাসে ট্রামে কোথাও আমাদের নারীরা সিকিউরড নয়। এই অনিশ্চিত জীবন নারীর মনকে বেঁধে ফেলেছে ভয় আর সংকীর্ণতার বেড়াজালে। ছোটবেলা থেকে একটা ছেলে আর মেয়েকে এই সমাজ আলাদা করতে শিখিয়েছে। ছেলে করলে দোষ নেই, মেয়ে করলে দোষ এই সমাজ তা শিখিয়েছে। এই সমাজ জানিয়েছে ঘরকন্না করা, সংসার করা মেয়েলি কাজ। এগুলো ছেলেদের করতে নেই। ছেলেদের কাঁদতে নেই। ওটা মেয়েদের কাজ। মেয়েরা ইঞ্জিনিয়ারিং, সায়েন্স পড়তে পারবে না কারণ মেয়েদের বুদ্ধি কম। মেয়েরা সাজুগুজু করবে, ফিগার মেইন্টেইন রাখবে- এভাবে ছেলেদের জন্য তারা পসরা সাজাবে। ছেলেরা অফিস থেকে ফিরে এসে সেই সৌন্দর্য দেখে শান্তি পাবে। কিন্তু একটা মেয়ে কিসে শান্তি পাবে তা এই সমাজ দেখেনি। এই সমাজ বলেছে চাইবার মাত্র স্বামীর কাছে স্ত্রী তার শরীর সমর্পণ করতে বাধ্য থাকবে।

সমাজের শাসক আইন রাখেনি কোনো বৈবাহিক ধর্ষণের জন্য আইন। আইন একজন ধর্ষিতাকে দায়ী করে তার পোশাকের জন্য। আইন ভায়োলেন্সের শিকার হওয়া নারীকে বলে মেনে নিয়ে সংসার করতে। এই সমাজ ছাড়ে না বিধবা এবং ডিভোর্সি মেয়েকে কথা শোনাতে। এই সমাজের কাছে চক্ষুশূল স্বাবলম্বী মেয়েরা।

এই সমাজের এই মুহূর্তে শাসক ভূমিকায় আছে পুরুষেরা। আধিপত্য করছে পুরুষেরা। এখন যদি আমি নারীর মনকে মেরে ফেলার এই দায় পুরুষদের নিতে বলি। খুব ক্ষতি কি হবে? তাই বলছি ভালো থাকবে নারীর মন, যদি সেটা পুরুষেরা দায়িত্ব নেয়।
কীভাবে ভালো থাকবে নারীর মন!

একঘেয়েমি জীবন থেকে নারীকে মুক্তি দাও। ৩১ বছর ধরে আমার মা প্রতিদিন সকালে উঠে চাল বাছে, ভাত রান্না করে। আব্বু অনেক জব সুইচ করেছে, মাঝে মাঝে অফিস কামাই দিয়ে বাসায় থাকে। কিন্তু আমার মায়ের জীবনে ছুটি নেই। নেই এই প্রজন্মের অনেক মায়েদের, মেয়েদের। কিন্তু একটা মানুষ চিরকাল বন্দী জীবন কি কাটাতে পারে। এ রকম একঘেয়েমি পাথর ভাঙার জীবন!
তাই মেয়ে, বেরিয়ে এসো দূর থেকে। থাকুক ফেলে কিছুদিন ঘরের কাজ। বন্ধুদের সঙ্গে উদ্বেল হও। মন ভালো না থাকলে, এই মানবজন্ম আবার জন্ম নাকি?
প্রতিদিন নিজের জন্য সময় বের করো। এই সময় একান্তই তোমার। কেবল তোমার। নিজেকে ভাববার, জানবার। এই সময়ে অনুপ্রবেশ করিও না তোমার স্বামী, বাচ্চাকাচ্চা, মা বাবা কাউকে। নিজের মন ভালো রাখতে এই সময়টা খুব দরকার।
নতুন কিছু ভাবো মন ভালো রাখতে। নতুন কিছু করো। সেলাই করলে অনেক। দেখো দেখি! সে দিয়ে কোনো প্রদর্শনী করা যায় কি না। মন ভালো রাখার জন্য গান শিখতে পারো, বাদ্যযন্ত্র শিখতে পারো, আঁকাআঁকি শিখতেও পারো।
মন ভালো রাখতে উপভোগ করো যৌন জীবনকে। প্যাসিভ রোলে থেকে নিজেকে বঞ্চিত করো না এই আনন্দ থেকে। অ্যাকটিভ রোলে যাও। যেদিন যৌন সম্পর্ক করতে ইচ্ছে করবে না, মুখ ফুটে না বলো পার্টনারকে।
বন্ধু বানাও। ভালো বন্ধু। নিজেদের দুঃখের কথা শেয়ার করো। সোশ্যাল মিডিয়াকে নিজের প্রতিভা দেখানোর প্ল্যাটফর্ম বানাতে পারো।
সপ্তাহে এক দিন মুভি দেখার টাইম বের করো।
একঘেয়েমি কাজের সময় মিউজিক শোনো।
অফিস-বাসা, বাসা-অফিস। আর কত? হুট করেই ডুব দাও। ডুব থেকে ফিরে এসে দেখবে মন ফুরফুরে।
তবে সবার আগে পজিটিভলি ভাবতে শিখো। ভাবীদের গীবতে সময় নষ্ট না করে তাদেরও পজিটিভ ভাবতে শেখাও জীবনকে। মেয়েদের এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না অচলয়াতন ভাঙো। যারা করতে দিতে চায় না, সেটা তাদের অপরাধ এবং অন্যায় জোরজবরদস্তি। মানুষ হিসেবে তোমার পূর্ণ অধিকার আছে একটা জীবন নিজের মতো কাটানোর।

মন ভালো নেই! এটাও থাকুক!
ভালো লাগে না একটা বিশেষ রোগ মেয়েদের। মাসিকের আগে বা পরে প্রতিটি মেয়ের জীবনে প্রতিটি মাসে এই ভালো লাগে না রোগ আসে। আগেই বললাম না মেয়েদের মুড খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়। এটার সঙ্গে মেয়েদের মাসিকের একটি যোগসূত্র আছে।
আসলে মন ভালো না থাকাটাও জীবনে থাকা দরকার। কারণ সব পেলে নষ্ট জীবন। ‘মন ভালো নেই’ না থাকলে ‘মন ভালো আছে’ বুঝবে কী করে?
তবে সবার আগে তোমার মন ভালো রাখার জন্য জরুরি তোমার মন খারাপের কারণগুলোকে জীবন থেকে ছাঁটাই করা। সেটা শক্ত হাতে মেরুদ- সোজা রেখে ছাঁটাই করো। ভালোবাসা উজাড় করে দাও, কিন্তু অপাত্রে না। নিজের ডিসিশন নিজে নিতে শিখো। নিজেই হও নিজের ওপর নির্ভর।
মনের স্বাধীনতাই মনকে ভালো রাখতে পারে। তাই হৃদয় ভালো রাখতে গেলে হৃদয়কে অন্ধকার থেকে মুক্তি রাখাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। তবে আজ থেকেই চলুক, সেই আলোর পথের যাত্রা।
মন ভালো রেখো!

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 × 5 =