ভালোবাসার চোখে জল

করেছে Sabiha Zaman

কিছুই ভাবতে পারছে না তপন। মাথার রগ দুটো দপদপ করছে বারবার। প্রচণ্ড ব্যথায় কী যেন একটা বেরিয়ে যেতে চাইছে হৃদয় থেকে। সম্পূর্ণ সত্যি হলেও আজ স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে  সবকিছু। শুকনো ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠছে বারবার রমা, তুমি কেমন করে বদলে গেলে?

পুরোনো স্মৃতিগুলো আজ এক এক করে সব মনে পড়ছে তপনের। সেদিন জানালার কাছে বসে কী যেন ভাবছিল তপন। হঠাৎ হাজির হলো রমা। রোজই রমা এ পথ দিয়ে স্কুলে যায়। আজও স্কুলে যাওয়ার পথে তপনকে দেখে ও দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর ভেজা দুটো ঠোঁট কাঁপিয়ে বলল তপন দা, একটু বাইরে আসুন, কথা আছে।

একই পাড়ার মেয়ে রমা। চেহারাটা এত সুন্দর, এত আকর্ষণীয় সহজেই মুগ্ধ করত সবাইকে। তাই তো অনেকেই ভালোবাসতে চেয়েছে ওকে। তপনেরও ভালো লাগত ওকে খুব। ভালো লাগবে না-ইবা কেন! সুন্দরের পূজারি সবাই। কিন্তু মুখ ফুটে তপন বলেনি কোনো দিন ওকে ভালোবাসার কথা। বলার সাহসও হয়নি কোনো দিন। আজ রমা স্বয়ং এসে ডাকাতে ত্বরিতগতিতে বাইরে বেরিয়ে এল তপন বীর সৈনিকের মতো। আজ যেন সবকিছুকে জয় করে ফেলেছে সে খুব সহজে। তবু মনের গভীর কোণে একটা জিজ্ঞাসা কী বলবে রমা!

হ্যাঁ, এবার চলুন।

কোথায়? অবাক কণ্ঠে তপনের জিজ্ঞাসা।

এই তো, একটু হাঁটব।

রমার সঙ্গে হাঁটবে তপন। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি হওয়ার মতো অবস্থা। একটা অপূর্ব আনন্দের মিশ্রিত ঘামে ভিজে পাশাপাশি হেঁটে চলেছে তপন। মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক সবুজ পাখি উড়ে গেল কিচিরমিচির করে। ঝোপ জড়ানো পাশের বিলটায় খেলা করে উঠল দুটো হাঁস পরম তৃপ্তিতে। তপনের মনের গহিনে কী যেন একটা ঢেউ খেলে ওঠে অজান্তে।

কিছুদূর হাঁটার পর একটি নির্জনে এসে দাঁড়ায় রমা। কাছের বাঁশঝাড় হতে ভেসে আসছে মৃদু শনশন শব্দ। গাছে বসা কয়েকটি পাখি নীরব ঠোঁটে পালক ঝাড়ছে। পাশের গাছে বাঁধা সাদা গরুটা বাছুরটার গায়ে পরম আদরে জিহ্বা দিয়ে আদর করছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর লজ্জাজনিত কণ্ঠে রমা বলল, ‘আমি…আমি আপনাকে ভালোবাসি তপন দা।’

রমার মুখ থেকে হঠাৎ করে যে কথাটি বেরিয়ে এল কোনো ভূমিকা না রেখে, তাতে বেশ অবাক হয় তপন। অনেক দিনের প্রত্যাশার পাখিগুলো যেন ওর হৃদয়াকাশে গান গেয়ে উঠল প্রচণ্ড উল্লাসে। রমা…! বিস্ময়ভরা অস্পষ্ট কণ্ঠে ডেকে ওঠে তপন।

‘হ্যাঁ তপন দা। আমি অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছি কথাটা আপনার মুখ থেকে শুনব বলে। কিন্তু….. কিন্তু…… আর পারলাম না। লজ্জা-দ্বিধা ভুলে নিজেই আমার মনের কথাটা আপনাকে জানালাম। কী, ফিরিয়ে দিবেন না তো?’

তপনের জন্য যে এটা কত বড় পাওয়া, তা একমাত্র ও ছাড়া আর কে জানে! ফিরিয়ে দেওয়া, সে তো প্রশ্নই আসে না! তপন শুধু অবাক চোখে উৎফুল্ল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রমার অপরূপ সুন্দর মুখটির দিকে। একটা অপূর্ব তৃপ্তি আর আনন্দে ওর বুকটা যেন ফুলে ওঠে যুদ্ধে জয়ী হওয়া বীর সৈনিকের মতো।

দিন খসে পড়ছে একটির পর একটি। বেড়ে চলল ওদের হৃদ্যতা। ‘আপনি’ কথাটা আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে এখন স্থান নিয়েছে ‘তুমি’ নামের অত্যন্ত আপন শব্দটি। রমা এরপর থেকে রোজই চলে আসে তপনদের বাড়ি। খুব চঞ্চলা মেয়ে। সরাসরি সব বাধা উপেক্ষা করে ও তপনের রুমে ঢুকে পড়ে। শুরু হয় কত ধরনের কথাবার্তা। মিষ্টি হাসিতে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো ঘর। শরীরের নরম ভাঁজগুলাতে অঙ্কিত হয় ভালোবাসার মানচিত্র। এই তো প্রেম, এই তো ভালোবাসা! আঃ! কী শান্তি! এত সুখ কোথায় ছিল এত দিন?

তপন ভাবেওনি কোনো দিন রমা ঠিক এভাবে তাকে ভালোবাসবে! নরম জঘনে মাথা রেখে দেখবে রঙিন স্বপ্ন! আজ যেন ওর মতো সুখী আর কেউ নেই। না চাইতেই যেন সবকিছু পেয়ে গেছে সে। রমা শুধু আমার হবে, শুধুই আমার।

কী ভাবছ? তপনের ঢেউ খেলানো চুলগুলোতে রমার কোমল আঙুলের মৃদু সাঁতার।

ভাবছি আমাদের ভালোবাসার কথা। যদি তুমি আমার কাছ থেকে কখনো হারিয়ে যাও!

ওসব অলক্ষুণে কথা বলো না তো! আমি তো তোমারই! সারাজীবন তোমারই থেকে যাব। এই তোমার গা ছুঁয়ে শপথ করছি।

গভীর এক প্রশান্তিতে কেটে যাচ্ছে ওদের দিন। তারপর মাস। একটি বসন্তও পেরিয়ে গেছে সুখস্বপ্নে বিভোর থেকে। কত না স্বপ্নের জাল বুনিয়েছে ওরা দুজন।

একদিন সকালে তপনের সঙ্গে দেখা হলো রমার। কেমন যেন মনে হলো ওকে দেখে! বিশাল এক পরিবর্তনের ছোঁয়া ওর গোটা মুখটাতে

লেগে আছে। আগের মতো হৃদয় জয় করা হাসি নেই, ভালোবাসার আহ্বান নেই। অবাক হয় তপন। তবে কী ওর শরীরটা ভালো নেই!

এমনি কিছু ভাবনার মধ্যে যখন বিচরণ করছিল তপন, ঠিক সে মুহূর্তে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রমা বিরক্তিকর একটা ভঙ্গি এঁকে বলে উঠল তপন, এত দিন আমি তোমার ছিলাম; আজ থেকে আমাকে ভুলে যাও।

রমার মুখে হঠাৎ এভাবে অপ্রত্যাশিত এমন একটি কথা শুনে থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে তপন নিথর পাথরের মতো। এত দিনের ভালোবাসা

তাহলে কি নিঃশেষ হয়ে গেল এক মুহূর্তে!

রমার এই আকস্মিক অবাঞ্ছিত কথাটা লোহার তীক্ষ্ণ খণ্ডের মতো বিঁধে গেল তপনের হৃদয়ে। লজ্জা-ঘৃণা আর অপমানে সারাটা মাথা ঝিম ধরে গেছে। দপ দপ করছে মাথার রগগুলো এলোপাতাড়িভাবে। কপালের ঘামগুলো এদিক-ওদিক গড়িয়ে পড়ছে। এভাবে রমা ওর সঙ্গে প্রতারণা করতে পারল!

গোধূলির কালো আবছা ছায়া যখন গাঢ় অন্ধকারে পরিণত হয়েছে, তখনো কথাগুলো একমনে ভেবে চলেছে তপন। কী একটা অচেনা পাখির বিরক্তিকর ডাকে একসময় তার কল্পনার রাজ্যে বাধা পড়ল। কিছুই ভালো লাগছে না। বারবারই ভীষণ ছোট মনে হচ্ছে নিজেকে। প্রচণ্ড জোরে একটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায় ওর সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে।

ব্যর্থতা আর নিষ্ঠুরতার বিশাল সমুদ্রে হাবুডুবু খেয়ে এভাবে দিন কাটছে তপনের। বিমূঢ় বিস্ময়ে শুধু ভেবেই চলেছে একাকী। এ কী করে সম্ভব? ওকে যে আমি ভালোবাসি ভীষণ ভালোবাসি।

এক নিস্তব্ধ বিকেলে সেদিন রমার সঙ্গে দেখা হয় তপনের। সেই একই জায়গায়, যেখানে রমা প্রথম ওকে বলেছিল ভালোবাসার কথা। গাছের ডালে টিয়ে পাখিটা পালকের ভাঁজে মাথা গুঁজে নীরবে বসে আছে। তপ্ত বাতাসে শ্রান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে দুটি কুকুর। আজ রমা একা নয়। ওর সঙ্গে রয়েছে এক সুদর্শন যুবক। অবশ্য এ সুদর্শন যুবকটি আর কেউ নয়, তপনেরই বন্ধু রাহুল। একান্ত ঘনিষ্ঠ না হলেও একই সঙ্গে লেখাপড়া করেছে ওরা। কিছুদিন আগে বিদেশ থেকে এসেছে বিরাট অঙ্কের টাকা নিয়ে। তবে কি ওর জন্যই রমার এ নিষ্ঠুর পরিবর্তন? কিš‘ কেন? অর্থের প্রলোভনেই কি সে এত দিনের সাজানো সব স্বপ্ন ভেঙে তছনছ করে দিল? স্মৃতির পর্দায় রঙিন সেই অতীতগুলো বিষাক্ত অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরল তপনকে। কাঁদাল ভীষণভাবে।

রাহুলের সঙ্গে রমাকে দেখার পর থেকে না খেয়ে এবং অর্ধাহারে সময় কাটছে তপনের। অ্যাশট্রেতে সাজানো সিগারেট একটির পর একটি পুড়ে মরে নির্বিবাদে। বাড়ির কেউ বুঝতে পারে না, চঞ্চল ছেলেটার হঠাৎ কেন এ নীরবতা, কেন এ পরিবর্তন।

রমাকে হারানোর ব্যথা কিছুতেই সইতে পারছে না তপন। নির্লজ্জ বেহায়ার মতো তাই সে একদিন এগিয়ে আসে ওর কাছে ভালোবাসার দাবি নিয়ে। ঘৃণার সঙ্গে তপনের ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করে রমা। তপনকে ফিরিয়ে দিয়ে নিজেকে যেন খুব বড় মনে করল রমা। ওর চোখের সামনে এখন রাহুলকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন খেলা করছে। তপনকে নিয়ে সাজানো দিনগুলোর কথা একটিবারও মনে হয় না রমার। অপ্রত্যাশিত নিষ্ঠুর এ ব্যবহার তপনকে আহত করে ভীষণ।

সেই সকালে স্কুলের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এখনো ফেরার নামটি পর্যন্ত নেই। অথচ স্কুল ছুটি হয়েছে অনেক আগেই। বান্ধবীর কাছ থেকে জানা গেছে রমা আজ স্কুলেও যায়নি। তাহলে কোথায় গেল? রমার বাবা-মা সবাই বেশ  চিন্তিত। এদিক-ওদিক, এমনকি আত্মীয়স্বজনের বাড়ি খোঁজ নিয়েও কোনো খোঁজ মেলে না ওর। এক এক করে পাড়ার সবাই জেনে যায় ব্যাপারটা। জেনে যায় তপনও। একটা সন্দেহ ওকে ঘিরে ধরে তখনই গভীরভাবে। তাহলে কী…!

তখন সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। লোকমুখে প্রচার হয়ে যায় রমা এসেছে। সঙ্গে এসেছে রাহুল। ব্যাপার কী, বোঝার জন্য সবারই কৌতূহল জেগে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই সবাই জেনে যায়, রমা কাউকে না জানিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করে এসেছে। সারা মহল্লায় এ নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোড়ন।

আকস্মিক এ ঘটনায় বাবা-মা এবং বাড়ির সবাই প্রথমে একটু আপত্তি জানালেও পরে খুব সহজেই মেনে নেয় ওদের এ বিয়ে। এতগুলো মুহূর্ত একমাত্র মেয়ের জন্য যে বিপুল ব্যস্ততা ছিল, তা খুব সহজেই স্বাভাবিক হয়ে যায়। ওদের এ অনাকাক্সিক্ষত শুভকাজে সবাই যেন পরিতৃপ্ত। মনে হয়, তারা যেন সবাই মনে মনে এমনটিই চেয়েছিল।

সম্পূর্ণ না জানলেও এই কয়েকটি দিনে মোটামুটি কয়েকজন অনুমান করতে পেরেছিল তপন আর রমার মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারটা। রাহুলও কিছুটা ধারণা করতে পেরেছিল। অবশ্য এ নিয়ে তেমন মাখামাখি বা উল্টো কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। সবাই এখন রমার বর্তমানকে নিয়ে ব্যস্ত। আনন্দের রোল পড়ে যায় বাড়িটাতে। একটা কাক সেই সকাল থেকে একটানা ডেকে একটু আগে উড়ে গেল।

রমা চন্দনাছন্ন মুখে লাল শাড়ির ঘোমটা টেনে বধূবেশে বসে আছে। ফুল দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই সাজানো হয়েছে খাট। সুগৌর কপালের ওপর সিঁদুরের লাল টকটকে টিপ জ্বলজ্বল করছে। সিঁথিতে সিঁদুরের জ্বলন্ত আঁচড়। সেই ইদানীং তৈরি করা যুবকটি একটু পরই ওকে এসে আদর করবে। অট্টহাসিতে দুজনে মাতিয়ে তুলবে সাজানো ফুলশয্যা। অথচ রমার পাষণ্ড হৃদয়ে একটিবারও ব্যথা দিচ্ছে না অতীত স্মৃতি। তপনকে দেওয়া কষ্ট, অবহেলা তাকে কাঁদাচ্ছিলো না একটিবারও।

টেবিলের অ্যাশট্রেতে অসংখ্য সিগারেট জ্বলছে নির্বিবাদে। হুইস্কি ও ক্যারোজের বোতল দুটো শূন্য হয়ে যেন উপহাস করছে।

ছটফট করছে তপন। চোখের সামনে বারবারই ভেসে আসছে রমার রঙিন ফুলশয্যা বাসররাতের অনাবিল আনন্দ। এ যেন তার জন্য বিরাট লজ্জা! বিরাট অপমান! মাথার রগ দুটি দপ দপ করে লাফাচ্ছে। ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে চুলগুলো। শুধু পায়চারি করে চলেছে বারবার রমা, তুমি কেমন করে বদলে গেলে! আমি যে তোমাকে ভালোবাসি ভীষণ ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না…।

দেয়ালঘড়িটা একসময় অ্যালার্ম দিয়ে জানিয়ে দিল রাত দুটো বাজার সময়সংকেত। টেবিলের অ্যাশট্রেতে অসংখ্য সিগারেট জ্বলছে নির্বিবাদে। হুইস্কি ও ক্যারোজের বোতল দুটো শূন্য হয়ে যেন উপহাস করছে। কী করবে তপন! প্রচণ্ড ব্যথা আর ব্যর্থতায় বেঁচে থাকার স্বপ্ন তো মরে গেছে ওর জীবন থেকে! রাতের নিঝুম পরিবেশ আর হৃদয়ের কঠিন অস্থিরতায় তপন কিছুই ভাবতে পারে না আর। চোখের সামনে বারবারই রমাকে নিয়ে সুখের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠে কষ্ট দিতে থাকে ভীষণভাবে।

লেখা : প্রদীপ সাহা

 

 

 

 

 

 

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 × 4 =