ভালোবাসা বিষয়টি ইউনিভার্সাল

করেছে Wazedur Rahman

প্রচলিত আছে যে, ফ্রয়েড একবার এক হল থেকে বক্তৃতা দিয়ে বেরোচ্ছেন, তখন তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এরিক ফ্রম???। একটু হেসে বললেন, আপনি যেখানে শেষ করলেন, আমি সেখান থেকে শুরু করব।  ফ্রয়েডের যৌনতার বিরুদ্ধে এরিক ফ্রম ঘোষণা করলেন, The soul has no sex.

আমি এ পর্যন্ত যত অসাধারণ কথা শুনেছি, তার মধ্যে এটি একটি। আমরা ততদূর পর্যন্ত আমাদের মনকে বিকশিত করতে পারি, যতদূর পর্যন্ত আমরা জানি। আসলেই তো তাই। আত্মার তো কোনো লিঙ্গ নেই। আমরা মানুষকে শুধু যৌনতার মাপকাঠিতে ভালোবাসি না। যদিও ফ্রয়েডের তত্ত্ব বড় বেশি যৌনতানির্ভর। ফ্রয়েড এমনও বলেছেন, যার সঙ্গে মানুষের যৌন সম্পর্ক যত গভীর, তাকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

তাহলে আমরা একটা পশুপাখি কিংবা গাছের পাতাকে কেন ভালোবাসি! দূর আকাশের একটি নক্ষত্রের জন্য কেন আমাদের মন হাহাকার করে ওঠে? কারণ আমরা জানি, যে পৃথিবীতে আমরা আছি, সেখানে আমরা একদিন থাকব না। মৃত্যুর বিপরীতে আমরা জীবনের একটা অর্থ দাঁড় করানোর জন্য আমরা সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ভালোবাসি। ভালোবাসাই আমাদের অস্তিত্বের একমাত্র অর্থ।

ভালোবাসা বিষয়টি কী? আসলেই কেন মানুষের মনে ভালোবাসা মতো পবিত্র একটি অনুভূতি জাগ্রত হয়? ভালোবাসার কী দরকার? ভালো না বাসলে কী হয় তা নিয়ে প্রচুর আধ্যাত্মিক, মনস্তাত্ত্বিক, বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সখী, ভালোবাসা কারে কয়/ সে কি কেবলই যাতনাময়? সে কি কেবলই চোখের জল? সে কি কেবলই দুঃখের শ্বাস?

শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন। আসলেই কি এর কোনো উত্তর আছে? বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য বের করা সম্ভব, কিন্তু, প্রেম-ভালোবাসা যে কী জিনিস, তার রহস্য বের করা অসম্ভব! আসলেই কি তাই। ব্যাপারটা কিছুটা রহস্যময় হলেও মানুষ তার আদ্যোপান্ত-নাড়ি-নক্ষত্র খুঁজে বের করার জন্য পিছিয়ে নেই। আদিমকাল থেকেই মানুষ তার জীবনের একটা অর্থ খুঁজে বেড়িয়েছে। মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করেছে, আমি কে? কোত্থেকে এলাম? এই পৃথিবীতে আমার কী কাজ? এই সমস্ত প্রকৃতি, বিশ্বচরাচরের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? এর সমস্ত উত্তর মানুষ খুঁজে পেয়েছে একমাত্র ভালোবাসার মধ্যে।

আদিমকাল থেকেই মানুষ তার জীবনের একটা অর্থ খুঁজে বেড়িয়েছে।

ভালোবাসাই মানুষের একমাত্র আশ্রয়। অসীমের দিকে চোখ মেলে মানুষ খুঁজে পেয়েছে ঈশ্বরকে। ঈশ্বর হচ্ছেন সেই ধারণা, যার নামে সমস্ত মানুষ অনন্ত অসীমের সঙ্গে এক হয়। ঈশ্বর হচ্ছেন ভালোবাসার অপর নাম। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, প্রাচীন ধর্ম-দর্শনের হাত ধরেই মানুষের মনে ভালোবাসার বোধ জাগ্রত হয়েছে। এটা শুধু শারীরিক কোনো ব্যাপার না। এর সঙ্গে যুক্ত আছে আত্মিক বিকাশ, বোধ ও মনন। পরবর্তীকালে বিবর্তনবাদী দার্শনিকেরা এসেও আবিষ্কার করেছেন কেন মানুষের মনে ভালোবাসা জেগে ওঠার প্রয়োজন হলো? এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা রয়েছে। মানুষ একটা কেমিক্যাল পদার্থ বটেই। তবে শুধু হরমোনগত কারণেই যে মানুষ ভালোবাসে, তা না।

ভালোবাসা সত্যিই বাস্তব বোধবুদ্ধিবহির্ভূত এক অনন্ত রহস্যময় অনুভূতির নাম। মানুষ যাকে ভালোবাসে, তাকে তো আবার ঘৃণাও করে। মানুষ তো নিজেকেও ঘৃণা করে। অন্যকে ঘৃণা করে বলেই নিজেকে ঘৃণা করে, আবার নিজেকে ঘৃণা করে বলেই অন্যকে ঘৃণা করে। সাবজেক্ট ও অবজেক্টের এ এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব। প্লেটো তার সিম্পোজিয়ামে বলেছিলেন, মানুষ সুন্দরকে ভালোবাসে। মানুষ যেহেতু অন্য কোনো সুন্দরকে ভালোবাসে, তার মানে হচ্ছে সে নিজে সুন্দর নয়, কিংবা তার মধ্যে সুন্দরের কিছু অপূর্ণতা আছে বলেই সে অন্য কোনো সুন্দর কামনা করে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে চায়।

কিন্তু নার্সিসাস তো নিজেকেই ভালোবেসেছিল, সে অধিক সুন্দর বলে। কিন্তু না, নার্সিসাসও আসলে ভালোবেসেছিল অন্যকেই। লেকের জলে নিজের ছায়া দেখে সে ভেবেছিল এ বোধ হয় অন্য কেউ। সেই অন্য কারও সৌন্দর্য দেখতে দেখতেই সে লেকের পাশে বসে থাকতে থাকতে না খেয়ে শুকিয়ে মরল। গ্রিক মিথের গল্পটি এখানেই শেষ হয়ে যায়, নার্সিসাসের মৃত্যুতে।

কিন্তু পাওলো কোয়েলহো তার ‘অ্যালকেমিস্ট’ উপন্যাসে গল্পটির আরেকটু সংযোজন করেছেন। নার্সিসাসের মৃত্যুর পর একদিন জঙ্গলে আসেন দেবীরা, যারা নার্সিসাসের প্রণয়প্রার্থী ছিলেন। তারা লেকটি খুঁজে পান। দেখেন লেকের পাশে সুন্দর একটি ফুল ফুটে আছে। তারা লেকটিকে বলেন, আহা, তুমি কী ভাগ্যবান! তুমি একা নার্সিসাসের সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করছ! লেকটি বিস্মিত হয়ে বলে, নার্সিসাস কি দেখতে খুব সুন্দর ছিল!

দেবীরা বলেন, তোমার চেয়ে ভালো তা আর কে জানে! তোমার তীরে বসে থেকেই তো সে জীবন শেষ করে দিল। তুমি একাই তার সৌন্দর্য উপভোগ করেছ। লেকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, নার্সিসাস সুন্দর ছিল কি না, সেটা আমার কখনো খেয়াল করা হয়নি। তার চোখে তো আমি কেবল আমার নিজের সৌন্দর্যই ঝকমক করতে দেখেছি!

আসলেই তো তাই। আমরা অপরকে ভালোবাসি তো কেবল নিজের সৌন্দর্যই অবলোকন করার জন্য। ভালোবাসা তো একটা জাদুর আয়না, যেখানে কেবল নিজেকেই দেখা যায়।

ভালোবাসা সত্যিই বাস্তব বোধবুদ্ধিবহির্ভূত এক অনন্ত রহস্যময় অনুভূতির নাম।

ভালোবাসা প্র্যাকটিসের বিষয়

ভালোবাসা সম্পর্কে সবাই দু-চার কথা বলতে পারে। অন্তত বয়ঃসন্ধিকাল যার অতিক্রম হয়েছে তার এই অভিজ্ঞতা মোটামুটি আছে যে ভালোবাসা কী, ভালোবাসার কী দরকার। সামাজিক, পারিবারিক কারণেই মানুষ তা পেয়ে যায়। তারা ভালোবাসানির্ভর অসংখ্য চলচ্চিত্র দেখছে। তারা প্রতিনিয়ত ভালোবাসা নিয়ে দুনিয়ার গান শুনছে। তারপরও ভালোবাসা যে শিখতে হয়, এটা নিয়ে খুব অল্প লোকই ভাবে।

বেশির ভাগ মানুষই শুধুু ভালোবাসা পেতে চায়, ভালোবাসতে চায় না। এর জন্য নিজেকে যতখানি আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় করে তোলা সম্ভব, তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যায়। একজন নারী নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য নিজের শরীরের দিকে মনোযোগ দেয়, হাল-জামানার বাজার চলতি ফ্যাশন নিয়ে মাতামাতি করতে থাকে, আর একজন পুরুষ সেই নারীটিকে জয় করার জন্য নিজেকে সেই নারীটির যোগ্য করে তোলার জন্য মনোযোগ দেয় অর্থ রোজগারের দিকে।

তারপর তারা যখন এক হয়, পরস্পরকে ভালোবাসে, সেটা একটা বাজারি ভালোবাসা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে প্রকৃত ভালোবাসা বলে কিছু থাকে না। কারণ, তারা কেউ কাউকে ভালোবাসে না, তারা শুধু ভালোবাসা কিনতে চায়। কিন্তু ভালোবাসা তো পণ্য নয়। ভালোবাসা একটা শিল্প। তাই অন্যান্য শিল্পের মতোই ভালোবাসা শিখতে হয়। নিরন্তর চর্চার মধ্য দিয়েই তা অর্জন করতে হয়।

এরিক ফর্ম???? তার ‘আর্ট অব লাভিং’ বইয়ে বলছেন, সংগীত, নাট্যকলা, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র যে কোনো শিল্পেরই দুটো দিক : একটা হচ্ছে তাত্ত্বিক, আরেকটা হচ্ছে প্রায়োগিক। ভালোবাসার শিল্পকলাও সে রকম, প্রথমে জানতে হয় কীভাবে ভালোবাসতে হয়, তারপর সেটা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হয়, আমি কাকে কতটুকু ভালোবাসি সেটা প্রমাণ করতে হয়।

‘ভালোবাসা’ শুধু একটা শব্দমাত্র না, ভালোবাসা হচ্ছে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব-কর্তব্য। কোনো মা যদি তার সন্তানকে দুধ না খাওয়ায়, কোলে নিয়ে ঘুম না পাড়ায়, আদর-যত্ন না করে তাকে কি আমরা কোনো দিন মায়ের ভালোবাসা বলব? কেউ যদি বলে, ‘আমি ফুল ভালোবাসি’, কিন্তু, ফুলগাছের প্রতি সে কোনো যত্ন নিল না, তাকে আমরা ভালোবাসা বলতে পারি না। ঈশ্বর জোনাহ্কে বলছেন, যেখানে ভালোবাসা আছে, সেখানে কিছু পরিশ্রমও আছে, যেখানে পরিশ্রম নেই, যেখানে কোনো ভালোবাসা নেই।

‘ভালোবাসা’ শুধু একটা শব্দমাত্র না, ভালোবাসা হচ্ছে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব-কর্তব্য।

দায়িত্ব-কর্তব্যের সঙ্গে ভালোবাসার মধ্যে আরেকটা ব্যাপার যুক্ত আছে, সেটা হচ্ছে শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা মানে হচ্ছে যে যে রকম তাকে সেভাবেই গ্রহণ করা, তাকে সেভাবেই থাকতে দেওয়া, সেভাবেই ভালোবাসা। যখনই ভালোবাসার মানুষকে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা চলে আসে, তখনই শ্রদ্ধা নষ্ট হয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণের ব্যাপার আসে অধিকারবোধ থেকে। অধিকারবোধ আসে নিজের প্রয়োজনের চাহিদা থেকে। অর্থাৎ তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, আমার প্রয়োজনে তোমাকে থাকতে হবে, আমার কথামতো চলতে হবে। তখনই ভালোবাসায় শর্ত আরোপ হয়ে যায়। তার মানে যখনই ভালোবাসায় শ্রদ্ধার ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই সেটা প্রকৃত নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থাকে না।

শিশুতোষ ভালোবাসা হচ্ছে এ রকম যে সে মনে করে, আমাকে সবাই ভালোবাসে বলেই আমি সবাইকে ভালোবাসি। কিন্তু প্রকৃত যথার্থ ভালোবাসা হচ্ছে আমি ভালোবাসি বলেই আমাকে সবাই ভালোবাসে। অবুঝরা বলবে, তোমাকে আমার প্রয়োজন বলেই আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু যারা বুঝে তারা বলবে, না, তোমাকে আমি ভালোবাসি বলেই তোমাকে আমার প্রয়োজন।

একজন স্বার্থপর মানুষ শুধু নিজেকেই ভালোবাসে, সে শুধু নিজের সম্পর্কেই আগ্রহী, সে শুধু নিজের জন্যই সবকিছু চায়, অপরকে কিছু দেওয়ার মধ্যে তার কাছে কোনো আনন্দ নেই, তার সব আনন্দ নিজে পাওয়ার মধ্যে। প্রকৃত অর্থে, সে আসলে নিজেকেও ভালোবাসে না, আসলে সে নিজেকে ঘৃণা করে। কাউকে ভালোবাসাটা শুধু কোনো অনুভূতির ব্যাপার না, এটা একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার, বিচারের ব্যাপার, প্রতিজ্ঞার ব্যাপার। নানা রকম অনুভূতি আসতেও পারে, যেতেও পারে, কিন্তু বিচারবহির্ভূত সিদ্ধান্ত ছাড়া আমি কীভাবে জানব যে এই অনুভূতি সত্যিই চিরদিন থাকবে!

মা যখন তার সন্তানকে ভালোবাসে, তখন এই সিদ্ধান্তটা নেয় যে সন্তানের প্রতি তার কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে হবে। সত্যি বলতে, সন্তান জন্মের আগেই মা এই দায়িত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়, তার কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে। যখন দুজন নারী-পুরুষ একত্রিত হয়, বিয়ে করে, সংসার করে, তারাও তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।

পারিবারিক পছন্দের অনেক বিয়েতে স্বামী-স্ত্রী বিয়ের পর উভয়কে ভালোবাসতে শুরু করে, কারণ, তারা সিদ্ধান্ত নেয়, যেহেতু তাদের বিয়ে হয়েছে, বাকি জীবন একসঙ্গে পাশাপাশি থাকতে হবে সেহেতু পরস্পরকে ভালোবাসতে হবে। আমি রাস্তায় কাউকে দেখলাম আর বললাম, তার জন্য পাগল হয়ে গেছি, তাকে না পেলে মরে যাব…এর মধ্যে ভয়ংকর যৌনাভূতি থাকতে পারে, কোনো ভালোবাসা নেই।

কাউকে ভালোবাসাটা শুধু কোনো অনুভূতির ব্যাপার না, এটা একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার, বিচারের ব্যাপার, প্রতিজ্ঞার ব্যাপার।

ভালোবাসার বিভিন্ন দৃষ্টান্ত

এই কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা নিউজ ভাইরাল হয়েছে, উঁচু বিল্ডিংয়ের জানালার কার্নিশ থেকে পড়ে যাওয়ারত এক শিশুকে জীবনবাজি রেখে বিল্ডিং বেয়ে উঠে বাঁচিয়েছে এক যুবক। তারপর গত বছর জুলাই মাসে থাইল্যান্ডের গুহায় আটকে পড়া কিশোর ফুটবল দলকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন এক ডুবুরি। শেষ পর্যন্ত সব শিশুকেই উদ্ধার করা গেছে। এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে পৃথিবীজুড়েই।

বিপদে পড়লে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানবতার সেবায় মানুষের এগিয়ে আসার নজির আমরা দেখি। শীতে-বন্যায়-ভূমিকম্পে যখন একটি অঞ্চল বিপর্যস্ত হয়ে যায়, তখন অসংখ্য মানুষ এগিয়ে আসে মানবতার সেবায়। এসবই অনন্য ভালোবাসার দৃষ্টান্ত। ভালোবাসা ছাড়া মানুষ একদিনও টিকতে পারত না।

মানুষের গল্প তার ভালোবাসার গল্প। ভালোবাসা ছাড়া তার কোনো গল্প নেই। মানুষের ইতিহাস তার ভালোবাসার ইতিহাস। কত বাধাবিপত্তি পার হয়ে, কত ঝড়-ঝঞ্ঝা, কত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে মানুষ আজকের পর্যায়ে এসেছে ভাবলে গা শিউরে ওঠে। ঝড়-তুফান-বৃষ্টি-খরা-ভূমিকম্প-বন্যা-মহামারি কত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন। তাদের অমানুষিক শ্রমের বিনিময়েই আজকে আমরা এই সভ্যতা পেয়েছি। আজ আমরা বেঁচে আছি এ জন্য যে আমাদের পূর্বপুরুষেরাও বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করেছিলেন।

পাথর ঠুকে ঠুকে আমাদের পূর্বপুরুষেরা আগুন জ্বেলেছিলেন বলেই আজ আমরা ম্যাচের কাঠির একটি ঠোকায় খুব সহজেই আগুন জ্বেলে ফেলতে পারি। আমাদের জীবনের সমস্ত সুবিধার জন্য আজ আমরা আমাদের পূর্বপূরুষদের কাছে ঋণী। এই ঋণ আমরা কী করে শোধ করব? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ে দিয়ে। এটা আমাদের দায়। এবং এটাই হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে মানুষের ধারাবাহিক ভালোবাসা। যদি এই মানবসভ্যতার কোনো অর্থ থাকে তা একমাত্র এই ভালোবাসায়।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে মানুষের ধারাবাহিক ভালোবাসা। যদি এই মানবসভ্যতার কোনো অর্থ থাকে তা একমাত্র এই ভালোবাসায়।

পরিবারের প্রতি ভালোবাসা

পরিবার একটি প্রাচীন সংগঠন। মানুষের মায়া-মমতা-ভালোবাসার উৎস পরিবার থেকেই। পরিবারের বন্ধন আমাদের কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে। পরিবারই মানুষের প্রথম ও শেষ আশ্রয়। আমরা যখন বুঝতে শিখিনি, হাঁটতে-চলতে শিখিনি, তখনই মা-বাবা, বড় ভাই-বোন আত্মীয়স্বজন আমাদের হাত ধরেন। তারা আমাদের হাত ধরে হাঁটতে শেখান। জীবনের চলার পথে পথ দেখান। মায়ের ভালোবাসার সঙ্গে আসলে আর কিছুই তুল্য নয়। জগতে একমাত্র নিখাদ, নিঃস্বার্থ, নিঃশর্ত ভালোবাসা হচ্ছে মায়ের ভালোবাসা। জগতের সমস্ত ভালোবাসাই প্রথমে বিচ্ছিন্নতা থেকে এক হওয়ার চেষ্টা করে, একমাত্র মায়ের ভালোবাসাই প্রথমে এক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

জগতের প্রতিটি মানুষ তার মায়ের বিচ্ছিন্ন সত্তা। এই বিচ্ছিন্ন সত্তার শূন্যতা পূরণ করার জন্যই মানুষের আজন্ম সাধনা : ভালোবাসার মধ্যে আশ্রয় খোঁজা। আমরা সবাই বিচ্ছিন্ন সত্তা, আমরা সবাই একা, ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আমরা একাত্ম হতে চাই। ভালোবাসা হচ্ছে বিশ্বমায়ের একটা বিরাট কোল, সেখানে আমরা সবাই শিশুর মতো ঘুমিয়ে থাকি। বাবার ভালোবাসার মধ্যেও কিছুটা শর্ত থাকে। বাবা বলেন, তোমাকে আমার মতো হতে হবে, আমার সব স্বপ্ন তোমাকে পূরণ করতে হবে। কিন্তু মা তার সন্তানের ওপর কোনো শর্ত আরোপ করেন না। সন্তান যেমন, মা তাকে সেভাবেই গ্রহণ করেন।

পরিবারই প্রথম আমাদের এ শিক্ষাটা দেয় যে তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারো না। পরিবারে কিছু নিয়মশৃঙ্খলা আছে, কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য আছে, তোমাকে অবশ্যই সেগুলো পালন করতে হবে। তুমি যখন অবুঝ ছিলে, তোমাকে পেলেপুুষে যেমন অন্যরা বড় করেছে, বড় হওয়ার পর তোমাকেও তেমন অন্যদের দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবারই আমাদের সমজ-সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখে। আমরা একটি ব্যক্তির প্রতি যতটা না অনুরাগ প্রকাশ করি, তার চেয়ে অনেক বেশি অনুভূতি ধারণ করি পুরো একটা পরিবারের প্রতি। কোনো পরিবারের কোনো তরুণ সদস্য রোগে ভুগে বা দুর্ঘটনায় মারা গেলে আমরা পুরো পরিবারটার জন্যই হাহাকার করে উঠি, আহা, পরিবারটার এখন কী হবে! পরিবার মানুষের সমস্ত অবলম্বন।

আমাদের সব আশা-আকাক্সক্ষা-স্বপ্ন পরিবারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। আমরা চাই আমাদের নিজের পরিবারটি যেমন সুন্দর থাকুক, অন্যের পরিবারটিও তেমন সুন্দর হোক। পরিবার সুন্দর না হলে কোনো মানুষের জীবনই সুন্দর হতে পারে না। পরিবারের সৌন্দর্যই সভ্যতার কল্যাণে ভূমিকা রাখে। দিন শেষে আমরা যার যার ঘরে ফিরি। ঘর মানেই আপন কিছু মানুষজন। যার ঘর নেই, একমাত্র সেই জানে ঘর হারানোর যন্ত্রণা। বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট তাই বলছেন, হোম ইজ দ্য প্লেস হোয়ার/ হোয়েন ইউ হ্যাভ টু গো দেয়ার/ দে হ্যাভ টু টেক ইউ ইন।

বিচ্ছিন্ন সত্তার শূন্যতা পূরণ করার জন্যই মানুষের আজন্ম সাধনা : ভালোবাসার মধ্যে আশ্রয় খোঁজা।

বন্ধুমহলের প্রতি ভালোবাসা

পরিবারের পরেই মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা যারা রাখে তারা বন্ধুবান্ধব। এমন অনেক কথা আছে, যা পরিবারে বলা যায় না। মানুষের একান্ত কিছু অনুভূতি আছে যা বন্ধু ছাড়া আর কারও কাছে শেয়ার করা যায় না। জীবনে এমন কিছু সমস্যা আসে, যখন পরিবারকেও পাশে পাওয়া যায় না। পরিবার যেমন নিখাদ ভালোবাসার একটি জায়গা, তেমনি কিছু স্বার্থেরও জায়গা। একমাত্র গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্কটি সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে। কিছু বন্ধুবান্ধব আমাদের থাকে, যারা পরিবারের সদস্যদের মতোই আপন।

পরিবার যদি হয় একটি ঘর, বন্ধুবান্ধব হচ্ছে সেই ঘরের একেকটি জানালা। যেসব জানালা দিয়ে আমরা সারা বিশ্বটাকে দেখি। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রেও আমরা সেসব বন্ধুর দেখা পাই। পরিবার নিয়ে আমরা সারাক্ষণ চলতে পারি না। আমার প্রতিটি চলার পথে পরিবার সঙ্গী হয় না। কিন্তু জীবনের প্রতি পদে পদেই একজন বন্ধু দরকার। বন্ধুরা আমাদের কাজের অনুপ্রেরণা। আমাদের সব দুঃখের সঙ্গী। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জায়গা।

বন্ধুবান্ধবের প্রতিও আমাদের অলিখিত কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য থাকে। সে আমার জন্য যা করেছে, আমিও যদি তার জন্য তা না করি তাহলে সে আমার জন্য থাকবে কেন! অলিখিত বলেই হয়তো বন্ধুত্বের সম্পর্কটি চিরন্তন। বন্ধুত্বের সম্পর্কেও নানা ভুল-বোঝাবুঝি, কথা-কাটাকাটি হয়। এমন অনেক বন্ধু আছে, যার সঙ্গে অনেক দিন দেখা হয় না। কিন্তু একদিন রাস্তায় চকিতে দেখা হয়ে গেলে, সুমনের গানের মতো আমাদের হৃদয় হাহাকার করে ওঠে, হঠাৎ রাস্তায় অফিস অঞ্চলে, হারিয়ে যাওয়া মুখ চমকে দিয়ে বলে, বন্ধু, কী খবর বল?

বন্ধুরা আমাদের কাজের অনুপ্রেরণা। আমাদের সব দুঃখের সঙ্গী। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জায়গা।

লেখা: কামরুল আহসান 
ছবি: রোদসী 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

four × three =