ভালোবাসি বলো বারবার

করেছে Wazedur Rahman

ইতিহাস, দর্শন ও বিজ্ঞান যুগে যুগে ভালোবাসার অসামান্য ব্যাখ্যা দিয়েছে। যুগে যুগে, কালে কালে ভালোবাসার টানে আকুল হয়েছে মানব-মানবী। গল্প, কবিতা, গান, উপন্যাসে, আখ্যানে-উপাখ্যানে যুগ-যুগান্তর ধরে ভালোবাসার সংজ্ঞা আর ব্যাখ্যা খুঁজে ফিরেছে মানুষ।

ভালোবাসার শব্দচ্ছেদ

উইকিপিডিয়ায় ভালোবাসাকে বলা হয়েছে, ‘মনের গভীর থেকে উত্থিত শক্তিশালী ইতিবাচক আবেগ, মানবিক অনুভূতি এবং আবেগকেন্দ্রিক একটি অভিজ্ঞতা। আবেগধর্মী ভালোবাসা সাধারণত গভীর হয়, বিশেষ কারও সঙ্গে নিজের সব মানবীয় অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া, এমনকি শরীরের ব্যাপারটাও এই ধরনের ভালোবাসা থেকে পৃথক করা যায় না।’

মারিয়াম ওয়েবস্টার ডিকশনারিতে ভালোবাসার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে, ‘ভালোবাসা হচ্ছে ব্যক্তি, বস্তু বা কোনো ঐশ্বরিক শক্তির প্রতি আত্মসমপর্ণ, তীব্র শরীরী আকর্ষণ এবং গভীর বন্ধন।’  আরবান ডিকশনারিতে সত্যিকার ভালোবাসার সংজ্ঞা হচ্ছে ‘মোহ, একাকিত্ব, হতাশা আবার কখনো বিষণ্নতা।’ কেমব্রিজ ডিকশনারিতে ভালোবাসাকে বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তির বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রেমময় ভাব ও শরীরী আকর্ষণ অথবা বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি শক্তিশালী অনুভূতি।’

ভালোবাসার বিজ্ঞান ও দর্শন

গ্রিক দার্শনিকেরা ভালোবাসাকে চারটি ভাগে ভাগ করেছিলেন, আত্মীয়তার জন্য ভালোবাসা (স্বজনপ্রীতি), বন্ধুত্বের জন্য ভালোবাসা (বন্ধুত্বপূর্ণ), বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ভালোবাসা (প্রেমময়) এবং ঈশ্বরের জন্য ভালোবাসা (স্বর্গীয়)। অন্যদিকে যেখানে অপরের কল্যাণ নিহিত, তাই অ্যারিস্টোটলের কাছে ভালোবাসা। ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের কাছে ভালোবাসা নিরঙ্কুশ, তিনি ভালোবাসাকে স্বজনকেন্দ্রিকতার ঘোর বিরোধিতা করেছেন। জীববিজ্ঞানী জেরেমি গ্রিফিথের মতে, ভালোবাসা হচ্ছে নিঃশর্ত নিঃস্বার্থতা। অন্যদিকে প্রতিটি ধর্মেই মানুষ, সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টিকে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে, যা স্বর্গীয় ও নিঃস্বার্থ।

প্রাচীন রোমানদের কাছে আবেগ মানেই প্রেম বা যৌনতা। চৈনিক সংস্কৃতিতে কনফুসিয়াসের মতে, ভালোবাসা হচ্ছে ‘কর্ম ও দায়িত্ব’। ভারতীয় সংস্কৃতিতে বেদ মোতাবেক ভালোবাসার আদি ব্যাখ্যা ‘কাম’, যা শুধুমাত্র যৌনতা নয়, পার্থিব যেকোনো ইচ্ছাকেই বোঝায়। পারসি সংস্কৃতিতে ‘ইশক’ শব্দটি পাওয়া যায়, যা বন্ধু, পরিবার, স্বামী-স্ত্রী এবং স্রষ্টার প্রতি ঐশ্বরিক ভালোবাসাকে বোঝায়।

আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী হেলেন ফিশার ভালোবাসাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন- কামনা, আকর্ষণ ও সংযুক্তি। ফিশারের মতে, প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক এই তিনটি ধরনের যে কোনো একটি দিয়ে শুরু হতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে তা পরিবর্তিতও হতে পারে। আবার একই সঙ্গে তিনটি ধরনই উপস্থিত থাকতে পারে। আধুনিক বিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম মেকানিকসে ‘স্ট্রিং তত্ত্ব’ নামে একটি সূত্র আছে। এই সূত্রটির মাধ্যমে বিশ্বের সবকিছুকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

‘স্ট্রিং’ হলো এমন একটি অদৃশ্য জিনিসের নাম, যা দ্বারা বিশ্বের সবকিছু গঠিত হয়। অর্থাৎ আলো, বাতাস, শব্দ, তরঙ্গ, বস্তু সবকিছুই এই অতি ক্ষুদ্র ‘স্ট্রিং’ নামক একক দ্বারা গঠিত। ভালোবাসাকেও এই স্ট্রিং দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। ‘স্ট্রিং তত্ত্ব’ অনুযায়ী ভালোবাসারও একটি স্বতন্ত্র স্ট্রিং সত্তা রয়েছে।

পোল্যান্ডের সমাজবিজ্ঞানী বাউমান বর্তমান ভালোবাসাকে ‘তরল ভালোবাসা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, শার্টের বুকপকেটে যেমন খুব বেশি দরকারি কোনো কিছু থাকে না এবং তা হারিয়ে গেলে খুব সহজেই সেটা পূরণ করা যায়, ভালোবাসা তেমনই। প্রথম দেখায় ভালোবাসার একটি বিশেষ আবেদন রয়েছে। এটি অহরহই ঘটতে দেখা যায়।

মানুষ বলে এটি সব সময়ই ঘটে। অনেকের কাছেই এটি হৃদয়ের গভীর থেকে উত্থিত কোনো এক স্বর্গীয় অনুভূতি, এক পলকেই যেখানে আটকে পড়ে প্রেমিক মন। কিন্তু এই আবেগ প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার ব্যক্তিত্ব, নীতি কিংবা আদর্শ নয়, শারীরিক বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতি তীব্র অনুভূতি থেকে সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান বলে, প্রথম দেখায় যে আবেগ বা প্রেমভাব অনুভূত হয় তা প্রকৃত অর্থে ভালোবাসা নয়। এটি গভীর আকর্ষণ যা সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি করে।

ভালোবাসার মনোবিজ্ঞান

প্রেম হলো ভালোবাসার উত্তেজনাপূর্ণ আবেগ বা অনুভূতি। মনোবিজ্ঞানী চার্লস লিন্ডহোমের মতে, ‘প্রেম হলো একটি প্রবল আকর্ষণ, যা কোনো যৌন আবেদনময় দৃষ্টিকোণ হতে কাউকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপর ব্যক্তির প্রতি একই সঙ্গে শক্তিশালী মানসিক এবং যৌন আকর্ষণ কাজ করে, দাম্পত্যের ক্ষেত্রে যৌন আকর্ষণের তুলনায় ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতি অধিক গুরুত্বের অধিকারী হয়।’ দার্শনিক বার্নার্ডশ প্রেমকে দেখেছেন ধ্বংসকারী উপাদান হিসেবে। তার মতে, ‘প্রেম হলো সিগারেটের মতো যার শুরু আগুন দিয়ে, আর পরিণতি ছাইয়ে।’

মার্কিন মনোবিজ্ঞানী রবার্ট জেফ্রি স্টার্নবার্গ ‘ভালোবাসার ত্রিভুজ তত্ত্বে’ বলেছেন, ভালোবাসা মূলত গভীরতা, যৌনতা ও প্রতিশ্রুতির সমন্বয়। ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বে সব প্রেমের উৎস হচ্ছে যৌনতা। নর-নারীর মধ্যকার প্রেমের সম্পর্ক ছাড়াও বিজ্ঞান ভালোবাসার নানা দিক দেখিয়েছে। ভালোবাসার আরেক প্রকাশ ফিলিয়া হলো ‘স্নেহের সম্পর্ক’ বা ‘বন্ধুত্ব’।

অ্যারিস্টোটল ফিলিয়া বলতে নবীন প্রেমিক, আজীবন বন্ধু, পাশাপাশি শহর, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক চুক্তি, পিতা-মাতা ও সন্তান, নাবিক ও সৈনিক সহকর্মী, একই ধর্মের অনুসারী, একই সম্প্রদায়ের সদস্য এবং একজন মুচি ও তার খদ্দেরের সম্পর্ককে বুঝিয়েছেন।

ভালোবাসার সবচেয়ে শুদ্ধতম প্রকার হলো প্লেটোনিক বা বায়বীয় ভালোবাসা, যেখানে কামনা-বাসনার কোনো স্থান নেই। প্লেটোর প্লেটোনিজম মতবাদে এই ভালোবাসায় প্রেমিক-প্রেমিকা ভালোবাসার সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রবেশ করবে কিন্তু এখানে শরীর নামক বস্তুটি থাকবে অনুপস্থিত। এ ভালোবাসা কামগন্ধহীন।

কোনো চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও প্রেমকে মনে হয় স্বর্গসুখ। কিন্তু সুখের অপর পিঠই যে জরা, ব্যাধি, মৃত্যু। তাই ভালোবেসে রোগাক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও কম নয়। এই রোগ মূলত ভালোবাসার সঙ্গে জড়িত মানসিক বেদনা। ইবনে সিনা বিষণ্নতাকে এই মানসিক পীড়ার প্রথম লক্ষণ হিসেবে দায়ী করেছেন।

ভালোবাসা, প্রেম ও যৌনতা

১৯ শতক থেকেই মুক্ত ভালোবাসা বা ফ্রি লাভ শব্দটি একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এটি বিয়ে ও সন্তানের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। ‘উন্মুক্ত যৌনতা’ শব্দটি ‘মুক্ত ভালোবাসার’ ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবে ব্যবহৃত হয়। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্বমতে শরীরের উপস্থিতি ছাড়া ভালোবাসার অস্তিত্ব অকল্পনীয় ও সব প্রেমের উৎস শরীরী আকর্ষণ। সফ্লোকিসের অমর সৃষ্টি ইডিপাস রেক্স থেকে ফ্রয়েড সৃষ্টি করেন তার মতবাদ ইডিপাস কমপ্লেক্স। যেখানে মাতার প্রতি পুত্রের আসক্তি ও পিতার প্রতি পুত্রের ঈর্ষাবোধ দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে গ্রিসের পৌরাণিক লোককাহিনি, যেখানে ইলেকট্রা নামে একজন নারী তার এক ভাইয়ের সঙ্গে মিলে নিজের মাকে হত্যা করে পিতাকে বিয়ে করেছিল, এটাকে কেন্দ্র করে ফ্রয়েড দাঁড় করান ইলেকট্রা কমপ্লেক্স। এখানে ফ্রয়েড দেখিয়েছেন কন্যাসন্তানের পিতার প্রতি থাকা একধরনের অবচেতন যৌনকামনা। কালের প্রবাহে এই থিওরি বিতর্কিত এবং এর বিপক্ষে শক্ত যুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু সত্যের সন্ধান করতে গিয়ে ইডিপাসের করুণ পরিণতি সমালোচক ভিন্ন পাঠকদেরও হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে। মাতাকে বিয়ে করে তার গর্ভেই বংশ উৎপাদন করা ইডিপাসের আর্তনাদ পাঠক অনুভব করেছে তীব্র বেদনার সঙ্গে।

ইডিপাসের বলা, ‘No one should be called happy until he died happily’ উক্তিটি আমাদের জীবনের করুণ রসের সন্ধান দেয়। কারণ, ফ্রয়েড যৌনতাকে আশ্রয় করে তত্ত্ব বানিয়েছিলেন, মস্তিষ্ককেই বাদ দিয়ে, মনকে বুঝতে চেষ্টা করে গেছেন ফ্রয়েড। তথাপি এখনো এই মতবাদের প্রভাব কম নয়, এখনো অনেকের কাছে প্রেম মানেই শরীর বা যৌনতা।

ইতিহাসে ভালোবাসা

ব্রিটিশ সম্রাট অষ্টম হেনরি ভালোবাসার প্রতি আত্মসমর্পণ করে বলেছিলেন, ‘হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে তোমার কাছে মিনতি করছি, তোমার মন আর আমাদের মধ্যকার ভালোবাসার সবটুকু আমাকে জানতে দিও।’ কোনো এক অসীম ক্ষমতার বলে সাহিত্য, শিল্প, দর্শন, ধর্ম, রাজনীতি, বিজ্ঞান প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই বিস্তার। মিসরীয় রানি ক্লিওপেট্রা আর তার সেনাপতি অ্যান্টনিওর প্রেমের বন্ধনে মিসর পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। গ্রিক প্রেমিকা পেনেলোপ ১০৮ রাজাকে প্রত্যাখ্যান করে ২০ বছর অপেক্ষা করেন প্রেমিক অডিসিয়াসের জন্য, যেখানে ভালোবাসার অপর নাম অপেক্ষা।

রানি ভিক্টোরিয়া স্বামী প্রিন্স আলবার্টের মৃত্যুর পর প্রায় ৪০ বছর পর্যন্ত তার জন্য শোক করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভিক্টোরিয়া শোকের কালো পোশাক পরিধান করতেন। অন্যদিকে মেরি ও তার স্বামী পিয়েরে কুরির প্রেম ছিল মানবতার কল্যাণে আর কাজের মধ্যেই। অনিন্দ্যসুন্দরী নর্তকী আনারকলির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রথম দর্শনেই তার প্রেমে পড়েন মোগল সম্রাট আকবরের পুত্র সেলিম। প্রেমের জন্য লড়াই করেন পিতার বিরুদ্ধে, পরাজিত হওয়ার পর সেলিমের চোখের সামনে জীবন্ত কবর দেওয়া হয় আনারকলিকে।

সাহিত্যে ভালোবাসা

স্বর্গে গিয়েও ভালোবাসার মানুষকে চাওয়ার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের আকুতিগাঁথা লিখে গিয়েছেন মধ্যযুগের ইরানি কবি নিজামী। লাইলি-মজনু অধরা প্রেমের এক বিয়োগান্ত গাথা। সত্য ঘটনাকে ঘিরে তৈরি কাব্য দান্তের অমর কীর্তি ‘ডিভাইন কমেডি’র দুই কিংবদন্তি চরিত্র পাওলো এবং ফ্রান্সেসকা। স্বামী জিয়ানসিয়োতোর ভাই পাওলোকে ভালোবাসার কথা প্রকাশ হয়ে পড়লে ফ্রান্সেসকা ও পাওলোকে হত্যা করা হয়।

ক্লিওপেট্রা এবং মার্ক অ্যান্টনির প্রেমের সত্য কাহিনি নিয়ে নাটক লেখেন বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্্সপিয়ার। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়া এই যুগলের বন্ধন মিসরকে ক্ষমতাশালী করে তুলেছিল। কিন্তু রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর ভুয়া খবর শুনে বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করেন অ্যান্টনিও।

অন্যদিকে অ্যান্টনির মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ক্লিওপেট্রাও আত্মহত্যা করেন। রোমিও-জুলিয়েট উইলিয়াম শেক্্সপিয়ার রচিত আরেকটি ট্র্যাজেডি রোমিও-জুলিয়েটের প্রেমের আখ্যান। সারা দুনিয়ায় যুগে যুগে পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে এ বিয়োগান্ত প্রেমকাহিনি। দুই পরিবারের শত্রুতার জেরে প্রাণ দেওয়া এই প্রেমিক যুগল ভালোবাসার আরেক প্রতিশব্দ। ত্রিস্তান আর ইসলদের ট্র্যাজিক প্রেমগাথা যুগ যুগ ধরে নানা কাহিনি আর পাণ্ডুলিপিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। মধ্যযুগে রাজা আর্থারের রাজত্বকালের ঘটনা এটি। মামি ইসলদের প্রেমে পড়া ত্রিস্তান ভগ্ন হৃদয় নিয়েই মারা যান।

অন্যদিকে পরস্পরের প্রতি গভীর আসক্তি ও ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও নেপোলিয়নের উত্তরাধিকারের উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণ করতে না পারায় জেসেফাইনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। সাহিত্যজগতে মার্গারেট মিচেলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ একটি অমর সৃষ্টি স্কারলেট ও’হারা ও রেট বাটলার। তিনি এখানে স্কারলেট ও’হারা এবং রেট বাটলারের ধারাবাহিক প্রেমের এবং ঘৃণার সম্পর্কের একটি নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন। উগ্র দ্বৈত অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে শুধু কামুকতা সৃষ্টি করেছে, কিন্তু কোনো স্থায়িত্ব সৃষ্টি করেনি।

ভালোবাসার অমর উপাখ্যান

গ্রিক পুরাণমতে, দেবী আফ্রোদিতি ভালোবাসা, সৌন্দর্য এবং যৌন পরমানন্দর দেবী। রোমানদের কাছে আফ্রোদিতি ভেনাস নামে পরিচিত এবং সেখানে তিনি প্রেম ও সুন্দরের দেবী। গ্রিক মিথলজিতে সাইপ্রাসের রাজা পিগম্যালিয়ন নিজের হাতে গড়া নারী মূর্তির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে দেবী ভেনাসের মন্দিরে মূর্তিটিকে স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করলেন। প্রেমের দেবী ভেনাস মঞ্জুর করলেন তার প্রার্থনা। ভালোবাসার শক্তিতে পাথরে ফিরে এলো প্রাণ। এই নারী মূর্তির নাম দেওয়া হয়েছিল গ্যালাতিয়া।

গ্রিক পুরাণের হেক্টর মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও মনুষ্যত্বের প্রতি ভালোবাসার কারণে দাঁড়িয়ে ছিলেন দানবের মুখোমুখি। রাজা মেনেলাসের স্ত্রী অপূর্ব সুন্দরী হেলেনের প্রেমে পড়েছিলেন প্যারিস। হেলেন তখন রাজা মেনেলাসের স্ত্রী। পরকীয়া প্রেমের শাস্তিস্বরূপ ধ্বংস হয়েছিল ট্রয় নগরী। প্রাচীন গ্রিকের অরফিয়াস প্রেমে পড়েন সাগর, বন, পর্বতের অধিষ্ঠানকারিণী উপদেবী ইউরিডাইসের। বিয়ে হয় দুজনের। আনন্দেই কাটছিল দুজনের জীবন। ভূমি এবং কৃষির দেবতা পরিস্টিয়াসের নজর পড়ে ইউরিডাইসের ওপর।

পরিস্টিয়াসের হাত থেকে বাঁচার জন্য ইউরিডাইস পালাতে গিয়ে সাপের বিষাক্ত ছোবলের শিকার হয়ে মৃত্যুর দেশে চলে যান। দেবতাদের বরে অরফিয়াসকে পাতালপুরি থেকে ইউরিডাইসকে নিয়ে আসার অনুমতি দেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পাতালপুরিতে ইউরিডাইসকে নিয়ে আসার সময় শর্ত অবজ্ঞা করে পেছনে তাকাতেই তার জীবন থেকে চিরতরে বিদায় নেয় প্রিয়তমা ইউরিডাইস।

এ ভালোবাসার শহর

যুগে যুগে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে পৃথিবীতে তৈরি হয়েছে অনেক স্মৃতির ভাস্কর্য। ভালোবাসার ধূম্রজালে মুগ্ধ হয়ে মানুষ দাঁড় করিয়েছে ভালোবাসার নানা সংজ্ঞা, সৌন্দর্য। সম্রাট শাহজাহান স্ত্রী মমতাজ মহলকে ভালোবেসে তৈরি করেছেন পৃথিবীর বিস্ময় তাজমহল। দেশ, কালের অতীত বিশ্বনন্দিত এই কীর্তির বিশালত্ব আর অসাধারণ সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় প্রেমিক হৃদয়। সত্যিই ‘এক বিন্দু নয়নের জল, কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল। এ তাজমহল।’

উইলিয়াম শেক্্সপিয়ারের বিখ্যাত রোমান্টিক উপন্যাস রোমিও-জুলিয়েটের স্মৃতিবিজড়িত ইতালির ভেরেনায় জুলিয়েটের বাড়িটি প্রেমিক যুগলের কাছে এক তীর্থস্থান। জুলিয়েটের বাড়িটির মূল ফটকের দেয়ালে পর্যটকেরা প্রেমের নানান সমস্যা, প্রিয় মানুষটিকে না পাওয়ার বেদনার কিংবা সম্পর্কের সুখ-শান্তি কামনা করে লিখে যান চিঠি-চিরকুট। প্যারিসের সিন নদীর ওপর শৈল্পিক ৩৭টি ব্রিজের রেলিংয়ে চোখে পড়ে ‘লাভ প্যাডলক’ নামে বিশেষ তালার। পৃথিবীজুড়ে প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজেদের নামের অক্ষর খচিত করে এই তালাগুলো ব্রিজের রেলিংয়ে বেঁধে চাবি ফেলে দেন সিন নদী।

নদীর কাছে আকুতি থাকে একটাই, এ বাঁধন যেন না ছিঁড়ে। ইউক্রেনের ক্লেভান শহরের কাছে অবস্থিত ‘টানেল অব লাভ’ প্রেমিক যুগলের কাছে আরেক তীর্থস্থান। সবুজ গাছপাতায় ঘেরা একটি ট্রেন টানেলের মাঝ দিয়ে চলে গিয়েছে রেললাইন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রেমিক যুগলেরা ও দম্পতিরা এই টানেলে বেড়াতে আসে। চুমু খেয়ে সম্পর্কের সুখ ও দীর্ঘস্থায়িতার প্রার্থনা করে তারা। প্রচলিত আছে, কোনো যুগল যদি এই পথটির ওপর দিয়ে হাত ধরে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত হেঁটে যায় এবং তারা যদি কোনো ইচ্ছাপোষণ করে তাহলে তা বাস্তবে পরিণত হয়। মিথ কিংবা সত্যি, ভালোবাসায় বাঁধা পড়া হৃদয় চলে তার নিজ গতিতেই পথের সন্ধান করে, খুঁজে নেয় তার পথ।

ভালোবাসার ন্যায়-অন্যায়

প্রেমকে কখনো মানুষের কাছে শুদ্ধতা-পবিত্রতার প্রতীক আবার কখনো তার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে পাপাচার ও কলঙ্কের দাগ। পৃথিবীর প্রথম নর-নারী আদম-হাওয়া পরস্পরের প্রেমে পড়েছিলেন। ঈশ্বরের নিষেধ উপেক্ষা করে সঙ্গিনীর প্রতি প্রেমে অন্ধ হয়ে গন্ধম খেয়েছেন আদি পিতা। এই প্রেমকে বলা হয় শাশ্বত প্রেম। হিন্দু পুরাণে শ্রীরামচন্দ্রের স্ত্রী সীতার প্রেমে পড়ে রাবণ তাকে অপহরণ করে সীতাকে দেহ-মনে পাওয়ার সব কলাকৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এই প্রেম কুটিল। কারণ, এটি একতরফা বলে। আবার দেবরাজ ইন্দ্র গৌতম মুনি সেজে মুনিপত্নী অহল্যার সঙ্গে সহবাস করেছেন। রাজা জনমেজয় সর্পযজ্ঞের পর যখন অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে শুরু করেন, তখন ইন্দ্র কৌশলে রানি বোপস্টুমার ধর্ম নষ্ট করেছিলেন।

রাধা ছিলেন কৃষ্ণের মামি-মা। কিন্তু তারাও অমর হয়েছেন এই সুধা পান করে। কৃষ্ণ কেন রাধাকে বিয়ে করেননি এটি নিয়ে রয়েছে অনেক বিতর্ক। কৃষ্ণ বলেন, যেখানে আত্মা এক সেখানে বন্ধনের প্রশ্ন কোথায়? নিজকে কি বিয়ে করা যায়? কৃষ্ণের প্রতি গোপিনীদের ভালোবাসা ও রাধার আত্মত্যাগ আজও এক রহস্য। এ রহস্যের সন্ধান কেবল জানে প্রেমিক হৃদয়, যা না মানে জাত-পাত-ধর্ম কিংবা শুদ্ধ-নিষিদ্ধের বিধিবিধান।

বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশ সমকামী সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু শত শত বছর আগে পুরুষ হয়ে পুরুষের প্রেমে পড়েছিলেন আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট। যা ছিল পাপ, নিষিদ্ধ। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে প্রেম এসেছিল বারবার। নার্গিস খানম, প্রমীলা দেবী, বেগম ফজিলাতুন্নেসা, রানি সোমসহ অনেকের প্রতি আসক্ত হয়েছিলেন তিনি। তারপরও প্রেমের বিরহে হয়েছেন বেদনাবিধুর। হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে একা ঝরা ফুল কুড়িয়ে গিয়েছেন।

কবিগুরুর মতে ‘যাকে আমরা ভালোবাসি তাকে হৃদয়ের সব পচা পুকুরে ডুবিয়ে-চুবিয়ে একাকার না করলে হয়তো ভালোবাসা পূর্ণ হয় না।’ রবিঠাকুরের জীবনে মৃণালিনী ও কাদম্বরী দেবীর দ্বন্দ্ব এক গোপন রহস্য। মৃণালিনী দেবীকে বিয়ের মাত্র চার মাস পরেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন কাদম্বরী দেবী। ‘জীবনস্মৃতি’তে কবি লিখেছিলেন, তার ‘চব্বিশ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়।’

প্রেম কবিকে হয়তো শান্তি দিতে পারেনি, তারই প্রকাশ পাওয়া যায় ‘সখী ভালোবাসা কারে কয়, সে কি কেবলি যাতনাময়’ এ। কবির এই জিজ্ঞাসা মনে করিয়ে দেয় শরৎচন্দ্রের দেবদাসের মাতাল হয়ে বিভ্রান্তের মতো ‘পারু পারু’ বলে ঘোরার দৃশ্যপট, যা কখনোই প্রেমিক হৃদয়ের প্রত্যাশিত জীবন হতে পারে না।  তারপরও ভালোবাসা আছে, ভালোবাসা ছিল, ভালোবাসা থাকবে।

পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছে, ভালোবাসা নিত্যসহিষ্ণু, ভালোবাসা স্নেহ-কোমল, তার মধ্যে নেই কোনো ঈর্ষা। ভালোবাসা কখনো বড়াই করে না, উদ্ধতও হয় না, রুক্ষও হয় না, সে স্বার্থপর নয়, বদমেজাজিও নয়। পরের অপরাধ সে ধরেই না। অধর্মে সে আনন্দ পায় না বরং সত্যকে নিয়েই তার আনন্দ।

সুতরাং ভালোবাসি বলো বারবার।

লেখা: লিহান লিমা 
ছবি: রোদসী  ও সংগ্রহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

2 × 1 =