মন এবং মেডিটেশন

করেছে Sabiha Zaman

রেহনুমা তারান্নুম

জীবন সুন্দর। তবে অনেকে অল্পতেই হতাশায় পড়ে। ভাবতে থাকে এই জীবন রেখে কী হবে? আমি তো কিছুই পেলাম না! কী হবে? হাবিজাবি এই সব দুশ্চিন্তায় প্রচণ্ড খারাপ সময় কাটাতে থাকে। কিন্তু একটিবার ভেবে দেখো তো! যে জীবনে সব পেয়েছে, সে-ও কি শতভাগ সুখী? হয়তো নয়! কারণ সুখ আপেক্ষিক। তুমি চাইলেই আনন্দ বইয়ে দিতে পারো নিজের জীবনে। কীভাবে? সময় দাও নিজেকে। বারবার প্রশ্ন করো। তুমি আসলে কী চাও। তবে মনকে সুস্থ রাখতে, ভালো রাখতে মেডিটেশন কিন্তু খুব ভালো উপায়। বিশেষজ্ঞরাও তাই বলেন-

জীবন গতিশীল। সুখ-দুঃখ, আনন্দ, হাসি, কান্না নিয়েই আমাদের জীবন। হঠাৎ যখন প্রচণ্ড আনন্দ, হতাশা যখন ধেয়ে আসে, তখন দৈনন্দিন জীবনের গতি থমকে যায়। তবে সারা দিনের এই ক্লান্তি, হতাশা, মলিনতাকে পেছনে ফেলে পৌঁছে যেতে পারো সুস্থ-শান্ত পরিবেশে। শুধু সঠিক ডায়েট ও পর্যাপ্ত ঘুমই যথেষ্ট নয়। যদি নিয়ম করে রোজ সকালে বা সন্ধ্যায় সামান্য সময় দিতে পারো নিজের মনের সঠিক বিশ্রামের জন্য, তবে সাফল্য-সুখ-শান্তি ও সুস্বাস্থ্য থাকবে সমপরিমাণে।
কেউ যদি নিয়মিত মেডিটেশন করে, তাহলে সে সুস্থ সফল সুখী জীবনের অধিকারী হবেই এবং সে অনেকগুলো সমস্যা থেকেও দূরে সরে আসবে। যেমন ঘুম, দুশ্চিন্তা, মাইগ্রেন, উদ্যোগ ইত্যাদি থেকে মুক্তি পেতে পারে। এ ছাড়া নানা ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থেকেও রেহাই পাবে।


করোনার সময় মানুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ভয়, উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, একাকিত্বে মানুষ বেশি ভুগছে। অনেকে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বলা যায়, এখন পর্যন্ত এমন কোনো ওষুধ তৈরি হয়নি, যা দিয়ে মানসিক শক্তি বাড়ানো যায়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে মেডিটেশনের বিকল্প নেই। এমনকি মেডিটেশনের মাধ্যমে আমাদের জিনও পরিবর্তিত হয়, যার ফলে সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেকোনো ধরনের জীবাণু ধ্বংসের ক্ষমতা বাড়ানো যায়। সুতরাং বলা যায়, মেডিটেশনের মাধ্যমে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। আর যাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে, তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক বেশি থাকে, যা এই করোনার সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

মেডিটেশনের আগে

* সুতির আরামদায়ক যেকোনো পোশাকই মেডিটেশনের জন্য উপযোগী।
*পরিষ্কার পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে করতে পারো মেডিটেশন।
*ট্রাউজার বা ট্রাক স্যুটও চলবে।
*যেকোনো ঢিলেঢালা পোশাক পরতে পারো।
*শরীরে যেকোনো অলংকার না রাখাই ভালো।

যেভাবে করতে হবে মেডিটেশন

মেডিটেশন বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। তবে সহজ হলো ব্রিদিং মেডিটেশন। দিনে যদি দুই থেকে তিনবার ১০-১৫ মিনিট সময় বের করতে পারো, তাহলেই ব্রিদিং মেডিটেশন করা সম্ভব। সাধারণত মেডিটেশন করতে হয় পদ্মাসন, সুখাসন, অর্ধপদ্মাসন, স্বস্তিকা আসনে বসে।

দুই হাত থাকবে দুধারে, ধ্যানমুদ্রায়। কোমর, কাঁধ, মাথা একটি সরলরেখায় থাকবে। শিথিল করে রাখতে হবে কাঁধ। এই ভঙ্গিতে বসে কিছুক্ষণ অন্য সব চিন্তা দূরে সরিয়ে মনকে কেন্দ্রীভূত করো। দুর্বল, অসুস্থ শরীর মেডিটেশনের জন্য উপযোগী নয়। তাই সুস্থ হতে হবে আগে। বাদ দিতে হবে অতিরিক্ত ভোজন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘুম পরিহার করতে হবে। একটি শান্ত জায়গা খুঁজে নাও, যেখানে তুমি আরামে বসতে পারবে। দুই পা একটির ওপর আরেকটি তুলে ক্রুশ করে বসো। তবে পিঠ ও শিরদাঁড়া সোজা রেখে তুমি যেকোনো পজিশনে বসতে পারো। পিঠ সোজা করে না বসলে ঘুম পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। দুচোখ আধো বন্ধ করে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মনোনিবেশ করো। স্বাভাবিকভাবে নিশ্বাস নাও। নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে না। বোঝার চেষ্টা করো কীভাবে হাওয়া নাকের ভেতর দিয়ে ঢুকে ফুসফুসে যাচ্ছে। কীভাবে ফুসফুসে হাওয়া ভরছে আর তোমার বুক ওঠা-নামা করছে। একইভাবে যখন শ্বাস ছাড়ছ, সেই ব্যাপারটাও অনুভব করার চেষ্টা করো। কীভাবে হাওয়া তোমার নাকের ভেতর দিয়ে আবার তোমার শরীরের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে, এটা বোঝাও মেডিটেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শ্বাস-প্রশ্বাসের এই প্রক্রিয়া ছাড়া আর কোনো কিছুর ওপরই মনোযোগ দেবে না।

 

মনে রাখতে হবে

সারা দিনের কাজের চাপের কারণে তোমার মনে হতেই পারে যে মেডিটেশন তোমাকে আরও ব্যস্ত করে তুলেছে। তবে বাস্তব চিত্রটা একটু অন্য রকম। মেডিটেশন আসলে ভাবনার প্রতি আমাদের সচেতনতা বাড়ায়। মেডিটেশন করার সময় যতবার মন অন্যদিকে যাবে, ততবার শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মনোনিবেশ করবে। যত দিন যাবে, দেখবে যে তোমার মনঃসংযোগ বাড়বে এবং তুমি আরও বেশি মানসিক প্রশান্তি অনুভব করবে।

সুস্থ সফল সুখী জীবনের জন্য মেডিটেশন

মনকে শান্ত ও সুস্থ রাখতে মেডিটেশন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর চর্চা সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষ খুবই কম জানে। ফলে মানুষের মধ্যে আগ্রহও কম। কিন্তু বিশ্বজুড়ে এখন প্রায় ৫০ কোটি মানুষ নিয়মিত মেডিটেশন করে। মেডিটেশন হচ্ছে মনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় মেডিটেশনের তিনটি প্রধান সুফল উল্লেখ করেছে। এক. হার্টরেট স্বাভাবিক থাকা, দুই. মেন্টাল স্ট্রেস কমে যায় এবং তিন. উচ্চ রক্তচাপ কমে ও হার্ট নিয়ন্ত্রিত থাকে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা হৃদ্্রোগে আক্রান্ত হয়েছে, তারা এর দুই বা তিন মাস আগে কোনো না কোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পারিবারিক বিষয়ে মানসিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, মানসিকভাবে ভালো থাকলে হৃদ্্রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে।

সুস্থতা জীবন উপভোগ করতে সহায়তা করবে। চিন্তাভাবনাকে প্রসারিত করতে সহায়তা করবে। তাই নিজেকে সুস্থ এবং প্রাণোচ্ছল রাখতে নিয়মিত ইয়োগা এবং মেডিটেশন শুরু করতে হবে। চিন্তা করা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তবে দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ নিমেষেই কেড়ে নেয় মনের সুখ-শান্তি। যা জন্ম দেয় বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক রোগ। তাই ভালো থাকতে দুশ্চিন্তামুক্ত ও মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। না, কাজটি খুব কঠিন নয়। নিয়মিত ইয়োগা, মেডিটেশন, ব্যায়ামের মতো কিছু সু-অভ্যাসের মাধ্যমে খুব সহজেই শারীরিকভাবে সুস্থ এবং মানসিক চাপমুক্ত ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারো। হেমন্তের শীতের আমেজে চাঙা থাকতেও জাদুর মতো কাজ করবে ইয়োগা ও বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম।
হিম হিম শীতে শরীরের রক্তসঞ্চালন ঠিক রাখতে, কর্মচাঞ্চল্য ধরে রাখতে, রোগবালাই দূরে রাখতে এবং মনকে ফুরফুরে রাখতে টনিকের মতো কাজ করে ব্যায়াম। সঙ্গে শীতটাকেও করে তোলে উপভোগ্য। তাই বলে শুধু যে ব্যায়ামাগারে গিয়েই ব্যায়াম করতে হবে তা কিন্তু নয়, হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটাÑ এগুলো সবই শরীরচর্চার মধ্যে পড়ে। তাই সময় এবং সুযোগমতো করতে পারো এর যেকোনোটি।
শত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিদিন নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখো। আর এ সময়টা ব্যয় করো একদমই নিজের মতো করে। এ সময় গান শুনে, বই পড়ে, সিনেমা দেখে কিংবা ভালো লাগার যেকোনো কিছু করে সময় কাটাতে পারো। এ ছাড়া সম্ভব হলে প্রতিদিন খোলা আকাশের নিচে সবুজ প্রকৃতিতে কিছুটা সময় কাটাও।
একটানা কাজ না করে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ৫-১০ মিনিট বিশ্রাম নাও। আর লম্বা কাজের পর আয়েশ করে কিছুটা সময় বিশ্রাম নাও এবং প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমাও।

ছবি: ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

ten − 6 =