মাদকাসক্তের ঝুঁকিতে নারী ও শিশু : ইকবাল মাসুদ

করেছে Tania Akter

নারীদের মাদক গ্রহণপ্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। মাদক গ্রহণের ফলে স্নায়ুতন্ত্রেরই ক্ষতি হয় না, কমে আসে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা। এতে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে মাদকাসক্ত নারী ও তার শিশু। রোদসীকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানিয়েছেন ইকবাল মাসুদ, পরিচালক, স্বাস্থ্য ও ওয়াশ সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন। আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর থাকছে রোদসীর পাঠকদের জন্য।

রোদসী : কারা বেশি আসক্ত হয়?

ইকবাল মাসুদ : আমাদের দেশে এ বিষয়ে তেমন কোনো স্টাডি নেই। অবজারভেশন থেকে বলা যেতে পারে, ১৮-৩৫ বছর বয়সীদের মাদকসেবন প্রবণতা অনেক বেশি। শুরু করার সময়টা হচ্ছে ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সের মধ্যে। কেউ ৪০ বছর বয়সে মাদক সেবন বা গ্রহণ শুরু করে না। আমাদের দেশের মেয়েরা আগের থেকে অনেক বেশি মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে। আগে দেখা যেত বিশেষ শ্রেণির নারীরা হেরোইন সেবন করছে, বিশেষ বিশেষ গোত্র বা পেশার মানুষেরা মাদক সেবন করত, এখন ইয়াবা আসার পর থেকে এ চিত্র আর নেই, সর্বস্তরের নারীদের মাদক গ্রহণ প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।

রোদসী : নারীরা সাধারণত কী ধরনের মাদক গ্রহণ করে?

ইকবাল মাসুদ : সিগারেট, মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, পেথেডিন এবং ড্যান্ডি গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়। মাদকাসক্ত নারীদের মধ্যে শুরুর দিকে অনেকে মাদক হিসেবে ঘুমের ওষুধ সেবন করে থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে সিগারেট, মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, পেথেডিন এমনকি ড্যান্ডি গ্রহণ করতেও দেখা যায়।

 

রোদসী : নারীদের মাদকাসক্ত হওয়ার কারণ কী?

ইকবাল মাসুদ : সায়েন্টিফিক কারণ আছে দুইটা। একটা হলো বংশগত কারণ আরেকটা হলো পরিবেশগত কারণ। বংশগত কারণ নিয়ে অনেক গবেষক বলছেন যারা মাদক নির্ভরশীল, তাদের মধ্যে শতকরা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ জিনগতভাবে আসক্ত। এ ছাড়া পরিবেশগত কারণে হয়ে থাকে। পরিবেশগত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক কলহ, বন্ধুবান্ধবের উৎসাহ, মিসকনসেপশনও রয়েছে। কেউ হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মেয়েকে বলছে তুমি এনজয় করতে পারো, স্লিম হতে পারো, রাত জেগে পড়াশোনা করতে পারো এভাবে একজন আরেকজনকে মাদকনির্ভর করে তুলতে পারে। বড় সমস্যার মধ্যে আরেকটি হচ্ছে প্যারেন্টিংয়ের সমস্যা। স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার একটা প্রধান কারণ পরিবার বা বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না থাকা বা বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাদের প্রত্যাশামতো সময় না পাওয়া। বিশ্বায়নের এই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ছেলেমেয়েদের মাদকাসক্তির হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর যে ছেলেমেয়েদের অভিভাবকদের প্যারেন্টিং স্কিল দুর্বল, তাদের মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কিছু ক্ষেত্রে যে পরিবারগুলো অশান্তি নিয়ে কাজ করে, সেখানে শিশুরা ঠিকমতো বড় হয়ে উঠছে না। এসব পরিবারের কন্যাশিশুদেরও মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

 

রোদসী : মাদক গ্রহণকারী কী ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়?

ইকবাল মাসুদ: মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে মাদকাসক্ত নারী ও তার শিশু। যেহেতু নারীর শারীরিক ঝুঁকি পুরুষের চেয়ে বেশি, আবার বাংলাদেশে মেয়েদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও খুব দুর্বল থাকে, এ জন্য নারী মাদকাসক্ত অনেকে অপুষ্টিতে ভোগে। মাদক সেবন করলে প্রধানত দুই ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলার কারণে মানসিক সমস্য তৈরি হয়, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। এটা মনে করার কারণ নেই যে আসক্ত ব্যক্তি একা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্যরা, আত্মীয়স্বজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ আসক্ত ব্যক্তির যখন টাকার দরকার হয়, তখন সে পরিবারের সদস্যদের বিরক্ত করে। ফলে দেখা যায় যে আসক্ত ব্যক্তির দুই-তিন ভাইবোন আছে; তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়ে যায়। পরিবার থেকে যখন মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যক্তি কাছের বন্ধুবান্ধব বা প্রতিবেশীদের শরণাপন্ন হয়। এভাবে ব্যক্তি সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এই সুযোগটা অনেকে নেয়। নারী মাদকাসক্তদের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায় যে নেশাগ্রস্ত করে দিতে পারলে তাদের মিস ইউজ করতে পারে। একটা মেয়েকে যদি ইয়াবা বা নেশাজাতীয় কোনো কিছুর জোগান দেওয়া যায়, তাকে একরকম বন্দী করে ফেলা যায়। একসময় দেখা যায় সে সেক্স সেল করতে বাধ্য হয়! ওয়েলআপ বা ধনী পরিবারের অনেক ছেলেমেয়েরা ডিজে করে, অনেক পার্টি করে এসব পার্টির সঙ্গে কিছু মেয়েকে ইনটেনশনালি যুক্ত করে তারা উপভোগ করে। নেশাগ্রস্ত একটি মেয়েকে তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে বলে মেয়েদের মাদকদ্রব্যের জোগান নিশ্চিত করে।

রোদসী : প্রতিরোধ কীভাবে সম্ভব?

ইকবাল মাসুদ : একটি ছেলে মাদক গ্রহণের পরও সমাজে যেভাবে মিশে যেতে পারে, একটি মেয়ে সেভাবে পারে না। তাকে সেভাবে কেউ সাহায্য করে না। লক্ষ করা গেছে, যেসব মেয়ে মাদক গ্রহণ করে, তারা অর্থ সংগ্রহ করতে অনেক সময় বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে মাদক গ্রহণের জন্য মেয়েদের অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ করতেও দেখা যায়। পরিবারের সদস্য, কাছের বন্ধুবান্ধব, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে মাদকাসক্তি একধরনের রোগ। যা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়। আসক্ত ব্যক্তির একান্ত প্রচেষ্টা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে এটা প্রতিরোধ করা যায়। আসক্ত ব্যক্তির জন্য প্রয়োজন সুস্থ পারিবারিক-সামাজিক পরিবেশ।

রোদসী : ঢাকা আহছানিয়া মিশন, মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নারী মাদক নির্ভরশীলদের নিয়ে কাজ করছে, সে সম্পর্কে জানতে চাই।

ইকবাল মাসুদ : বাংলাদেশের শুধু ঢাকা শহরে নয়, দেশর বিভিন্ন স্থান থেকে মাদকাসক্ত নারীরা ঢাকা আহছানিয়া মিশন, মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্র থেকে সেবা গ্রহণ করছে। বেশির ভাগই স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ জীবনে ফিরে যেতে সক্ষম হচ্ছে। তবে সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কম হলে অনেকে আবার মাদক নির্ভরশীল হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সবার আগে প্রয়োজন সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ, সমাজ এবং রাষ্ট্র। মাদক নির্ভরশীলদের চিকিৎসায় পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সহযোগিতা এবং ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা মাদক নির্ভরশীলদের সমন্বিত চিকিৎসা করে থাকি।

 

ইকবাল মাসুদ

পরিচালক, স্বাস্থ্য ও ওয়াশ সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

12 + 9 =