মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হওয়া জরুরি

করেছে Tania Akter

বর্তমানে ব্যস্তময় পৃথিবীতে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি। কারণ মানসিক অবসাদে ভোগা রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই। অথচ বেশির ভাগ রোগীই জানে না সে মানসিক অবসাদে ভুগছে। তাই মানসিক রোগের লক্ষণ জানা, চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া ও প্রয়োজনে সঠিক চিকিৎসাব্যবস্থা গ্রহণ করলে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে ভারসাম্য থাকবে।
রোদসীর এবারের আড্ডায় মুখোমুখি হয়েছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল ইসলাম

রোদসী : মানসিক চাপের কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি সম্পর্কে বলুন

ডা. মো. তাজুল ইসলাম : মস্তিষ্কে বিভিন্ন ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার, সার্কিট ও চ্যানেল আছে। এগুলোর ভেতর বিভিন্ন সূক্ষ্ম পরিবর্তন হয়। এ ছাড়া বংশগত, সামাজিক ও পারিবারিক কারণেও মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। ফলে মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে যায়। রক্তপাত হয়। রক্তনালি চিকন হয়ে ব্লক হয়ে যায়। ফলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে সে অংশটা নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে স্ট্রোক, প্যারালাইসিস এমনকি কেউ কেউ অন্ধও হয়ে যায়। এটা হয় মূলত মানসিক স্বাস্থ্যের কাঠামো অনেক দুর্বল অবস্থায় থাকলে অর্থাৎ যারা মানসিকভাবে অল্পতেই নার্ভাস হয়ে যায়, চাপ নিতে পারে না, বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, সহজে কোনো কথা ভুলতে না পারা এসব বিষয়ে মনের ওপর চাপ তৈরি হয়েই মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো হয়।

রোদসী : মানসিক অবসাদ বোঝার উপায় কী?

ডা. মো. তাজুল ইসলাম : জীবনে আনন্দ পাওয়ার কারণে আমরা বেঁেচ থাকি। কিন্তু এই আনন্দ যখন চলে যেতে শুরু করে, তখন কোন কাজ, কথা বা কোন স্থানে আনন্দ পাওয়া যায় তখন ক্লান্তি ও দুর্বলতা তৈরি হয়। নেতিবাচক নানা চিন্তা আসতে থাকে। অতীত উজ্জ্বল থাকলেও সব ব্যর্থ মনে হয়। বর্তমানে সব ঠিক থাকলেও মনে হতে থাকে কিছুই ভালো লাগছে না। ভবিষ্যতেও কোনো আশার আলো দেখে না। এত কষ্ট, এত দুঃখ অথচ বেঁচে কেন আছে এমন প্রশ্ন আসতে থাকা এসব লক্ষণে স্পষ্ট হয় সে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত।

রোদসী : অবসাদগ্রস্ত রোগীদের ভাবনাগুলো কেমন হয়?
ডা. মো. তাজুল ইসলাম : মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত থাকলে শারীরিক জটিলতাসহ আক্রান্ত রোগীর বেঁচে থাকাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ মানসিক অবসাদের গুরুতর অবস্থায় যখন কেউ পৌঁছায়, তখন তার মনে হতে থাকে বেঁচে থাকা অর্থহীন। মৃত্যু মানেই মুক্তি। সব অবসাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার আনন্দে আত্মহননের পথ পর্যন্ত বেছে নেয়। এমন অনেক রোগীর স্বজনেরা জানায় মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তারা খুবই প্রফুল্ল থাকে। দেখে মনে হয় সব ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু কয়েক দিন পরেই নিজেকে হত্যা করে ফেলে! এই রোগীদের বেঁচে থাকার সামর্থ্য থাকে না, আবার চেষ্টাও থাকে না। এটা হলো গুরুতর মানসিক অবসাদ। আর এক ধরনের মানসিক অবসাদ রয়েছে, যা বেশির ভাগ মানুষেরাই আক্রান্ত। তাদের ভাবনাগুলো বেশির ভাগ আর্থিক ও পারিবারিক দায়িত্বের বিষয় নিয়ে থাকে। এটি এতটা গভীর না হলেও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকর।

রোদসী : মানসিক রোগীদের গুরুতর অবস্থা থেকে বের হওয়ার ওষুধের কোনো চিকিৎসা রয়েছে কি?

ডা. মো. তাজুল ইসলাম : অবশ্যই মানসিক রোগীদের গুরুতর অবস্থা থেকে বের হওয়ার চিকিৎসা রয়েছে। আমাদের দেশে এখন অনেক ভালো মানের চিকিৎসা রয়েছে। এই চিকিৎসাগুলো নিলে শতভাগ সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু প্রচারের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের থেরাপিও দিতে হয়। তবে দুটো থেরাপি দিতে হবে সিবিটি বা কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি আরেকটি হলো ইন্টার পার্সোনাল থেরাপি বা আইপিটি। ওষুধ চিকিৎসার পাশাপাশি মনোবিদ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

রোদসী : মানসিক রোগ থেকে বাঁচতে পরিবারের ভূমিকা কতটা?
ডা. মো. তাজুল ইসলাম : মানসিক রোগ থেকে বাঁচতে পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। কারণ, গুরুতর মানসিক অবস্থার বাইরে যারা সাধারণভাবে অবসাদগ্রস্ত, তাদের যে সময়টা ভালো লাগছে না সেই মুহূর্তেই এটি চিহ্নিত করতে হবে যে কেন ভালো লাগছে না। নিজের পাশাপাশি নিকটজনের ভূমিকা বেশি। তাদের প্রিয়জনদের মনের খোঁজ রাখতে হবে। কারণ, এক দিনেই কেউ রোগী হয়ে যায় না। তাদের ডাক্তারের কাছে না নিলেও চলে। তাই পরিবারের বা প্রিয়জনদের যারা আবেগের দিক থেকে দুর্বল, তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। হতাশার গর্তে পড়তে দেওয়া যাবে না। ঘুরে দাঁড়ানোর মনোবল দিতে হবে। পরিবারে অভিভাবকেরা সন্তানের লালন-পালনের সঠিক কারণ না জানা ভয়াবহ ক্ষতি হয়। শুধু আর্থিকভাবে সহায়তা দিলেই হবে না, তার মানসিক অবস্থা জেনে সঠিক জীবনের দিক নির্দেশনা দিতে হবে।

রোদসী : শিক্ষাব্যবস্থায় মানসিক বিষয় থাকাটা কতটা জরুরি?
ডা. মো. তাজুল ইসলাম : মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া জরুরি। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই এই বিষয়ে শেখাটা গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য জরুরি কিছু টিপস প্রায়োগিক ভাষায় লেখার মাধ্যমে কারিকুলামে যুক্ত করতে হবে। আমাদের মনোবিদদের সংগঠন এ বিষয়ে সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি করে যাচ্ছি।

রোদসী : সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ
ডা. মো. তাজুল ইসলাম : এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পেরে ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ আপনাকেও।

লেখা: রোদসী ডেস্ক

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

four × 1 =