মানিয়ে চলো রে…

করেছে Sabiha Zaman

রোদেলা নীলা: চোখের নিচে দগদগে কালো দাগ নিয়ে ক্লাসরুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীলা। সে ভেবেছিল আজ আর ক্লাস নেবে না; কিন্তু সামনে বাচ্চাদের ফাইনাল পরীক্ষা। ক্লাস মিস করলে তার যোগ্যতা নিয়ে ভীষণ রকম প্রশ্ন উঠবে। এমনিতে স্বামীর অমতে স্কুলের চাকরি কোনো রকম চালিয়ে যাচ্ছে। গেল রাতে এই বাইরে কাজ করা নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে কর্তা তার গায়ে হাত তোলে। অল্পের জন্য চোখ বাঁচিয়ে সকালে ফেস মেকআপ দিয়ে কালো দাগ সামলিয়ে স্কুলে এসেছে। প্রিন্সিপাল ম্যামকে দেখেই সে মুখ লুকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে সালাম দিল। ম্যাডামের চোখ এড়াল না, কী হয়েছে তোমার গালে? প্রশ্নটা শুনে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেল নীলা। প্রথমে আমতা-আমতা করে, পরে ধীরে ধীরে সব ঘটনা বলে দিল, ম্যাডাম ভীষণভাবে রেগে গেলেন। বললেন আইনের মাধ্যমে পুরো ব্যাপার নিষ্পত্তি করতে।
নীলা ঘাবড়ে গেল। নারী সহকর্মীকে খুলে বলতেই সে খুব বিরক্ত হলোÑ এইসব কথা তোমাকে বাইরে কে আনতে বলেছে। ছেলেদের অমন রাগ হয়ই। তারা কথায় কথায় দু-চারটা চড়-থাপ্পড় দেবে আর অমনি বউ সেটা রাষ্ট্র করে বেড়াবে, তা তো হয় না।
নীলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল  ওকে মোবাইলে রাতের বেলা অন্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করলে সে রাগ হয় আর আমাকে স্কুলে কাজ করতে দেবে না বলে।

ছবি: ছায়াছবি

সহকর্মী আরও অবাক তুমি নিষেধ করতে যাও কেন, ছেলেদের এমন নারীসঙ্গ একটু-আধটু কমবেশি সবারই থাকে; স্বামীই তো আমাদের সব, তাদের মানিয়ে আমাদের সংসার করতে হবে, তুমি বিদ্রোহী হলে কি সংসার টিকবে?
খুব কঠিন একটা প্রশ্ন নারী সহকর্মী নীলার মুখের ওপর ফেলে উঠে যায়। আসলেই তো নারী জন্মের শুরু থেকেই তো মানিয়ে নাও নয়তো মেনে নাও বাণীতে জর্জরিত এই উপমহাদেশের নারীরা। কিশোরী বয়সে যখন ইচ্ছা ছিল পুরো কলোনি সাইকেল চালিয়ে বেড়ানোর, তখন মা ঘরের ভেতর খিল দিয়ে বলেছিলেন ধামড়ি মেয়ে, বাইরে লাফ পাড়া যাবে না। নীলা মানিয়ে নিয়েছিল। যেদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস শুরু হয়; বড় ভাইকে ল্যাপটপ কিনে দেওয়া হয় আর নীলা হাজারবার কান্নাকাটি করেও তা পায়নি, তখন মা বলেছিলেন ল্যাবে গিয়ে কম্পিউটার চালাও সবার সঙ্গে ভাগ করে। নীলা মানিয়ে নিয়েছিল। বিয়ের পর স্বামী যখন বাসররাতে বলে দিলÑ আগে মঞ্চে কাজ করেছ, করেছ, কিন্তু বিয়ের পর আর কোনো কাজ নয়। মাকে ওকথা বলতেই মা উত্তর দিয়েছিলেনÑ স্বামীর অবাধ্য হবে না। নীলা মঞ্চনাটক ছেড়ে দিয়েছিল। এমন অনেক অনেক মানিয়ে নেওয়ার গল্প এই ৩০ বছরের জীবনে নীলার হয়ে গেছে, তাই তো মানিয়ে নাও বা মেনে নাও বাণীগুলো তার কাছে অন্তত নতুন নয়। এগুলো সমাজের দেওয়া নারীর জন্য ভ্যাকসিন, যাতে অন্তত সংসার টিকে থাকে।

বিয়ের পর নতুন পরিবারে পা রাখার পর অনেকটা হিমশিম খেতে হয় মেয়েদের; বিশেষ করে যৌথ পরিবারে। বড় পরিবারে নানান মতের মানুষ, স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, দেবর, ননদ এই এতগুলো মানুষের মনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে বেশির ভাগ সময় ছাড় দিতে হয় একা নতুন বউটিকে। কিন্তু ঘটনাটা উল্টো ঘটার কথা ছিল, পরিবারে নতুন সদস্য বউ হয়ে এলে তার জন্য ঘরের পরিবেশটা তার অনুকূলে রাখা দরকার যেন সে সেখানে জীবন কাটাতে আরাম বোধ করে। আধুনিক চিন্তার ছেলেরা স্ত্রীকে নতুন সংসারে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে, সকালের নাশতার কাজে তাকে সাহায্য করে, ঘর গোছানো, স্ত্রী স্টুডেন্ট হলে তাকে পড়তে দেওয়া, স্ত্রীর বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে সংবেদনশীল হওয়া, এমন অনেক কিছু যেটা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাহায্য করা উচিত। শ্বশুরবাড়ি যেন ভীতিকর না হয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়, তাহলেই জোর করে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টা কোনো মেয়ের মগজে আর জোরপূর্বক পুশ করতে হবে না, সে পরিবারকে ভালোবেসে তার যা যা করণীয় নিজ থেকে বুঝে করবে।

ছবি: ছায়াছবি
মেয়েদের যেভাবে যতবার মানিয়ে নাও, মেনে নাও বলা হয় তার সিকিটাও যদি ছেলেদের বলা হতো, তাহলে তাদের মধ্যে সংযত আচরণবোধ থাকত। তারা বড় হতে হতে দেখে তার নিজের মা পরিবারের অনেক দুর্ব্যবহার মেনে নিচ্ছে, মুখ গুঁজে সহ্য করে যাচ্ছে সব, সেই ছেলেটা ধরেই নেয় নারীমাত্রই সহ্যশীল। তার সঙ্গে যা ইচ্ছা করা যায়। সে ধীরে ধীরে সেই ব্যাপারটি আত্মস্থ করে ফেলে; বড় হয়ে অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে অতীতে দেখা নেতিবাচক আচরণ প্রয়োগ করে। মেয়েটি প্রতিবাদ করলে তার কাছে মনে হয় উক্ত মেয়েটি ভালো না আর যদি মেয়েটা চুপ করে থাকে তাহলে সেসহ সমাজের আর দশজন মেয়েটাকে লক্ষ্মী উপাধি দেয়। নারীরা তাদের জীবনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে অধিকাংশ সময়ই মেনে নিতে বাধ্য হয়। কখনো পরিবারের মানুষগুলোর কথা ভেবে, কখনো সন্তানের কারণে। কখনো তাদের জীবনের অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকার পরও এসব সামাজিক দায়ভার বহন করে চলতে হয়। আর যারা শিক্ষিত হওয়ার পরও স্বাবলম্বী হতে পারছে না পরিবারের জন্য, তাদের জীবনটা আরও দুঃসহনীয়।
অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকার পরও পারিবারিক ও সামাজিকভাবে নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই তার জীবনের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। বেশির ভাগ সময় তাদের চলতে হয় অন্যের পছন্দে; অন্যের মতামতের ভিত্তিতে। মেনে নিতে নিতে একটা সময় নারীরা হয়ে যায় সামাজিকতার ঘেরাটোপে বন্দী।
বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় করোনাকালে ধর্ষণের পরই সবচেয়ে বেশি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত বছর ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৬২৭ জন নারী এবং ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয় ৫৩ জন। একই সময়ে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে ৫৫৪ জন নারী। এর মধ্যে ৩৬৭ জনের মৃত্যু হয় এবং আত্মহত্যা করে ৯০ জন। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয় ২১৮ জন নারী। যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের শিকার হয় ২০১ জন নারী। ২০১৯ সালে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয় ৪২৩ জন নারী। ওই বছর ধর্ষণের শিকার হয় ১ হাজার ৪১৩ জন নারী।
২০২১ সালের প্রথম দুই মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেও ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে ১৬৪টি ধর্ষণ, এর মধ্যে ৮টি ধর্ষণের পর হত্যা, ৬৪টি পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক ২০টি এবং যৌন হয়রানির ১৭টি ঘটনা ঘটেছে। পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে ৪৮ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বামীর হাতে হত্যার শিকার হয়েছে ২৯ জন। ১২ জন নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে এবং ৭ জন শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হাতে হত্যার শিকার হয়েছে।
এটা যে শুধু বাংলাদেশে ঘটেছে তা নয়। এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছিলেন, লকডাউনের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পারিবারিক সহিংসতা ভীতিকর রকমে বেড়ে গেছে।
তথ্য : বিবিসি


তোতা পাখির মতো ‘মানিয়ে নাও’ বুলিটা যদি ঘরে ঘরে প্রত্যেক ছেলেকে শিখিয়ে দেওয়া যেত, তাহলে বোধ করি মেয়েদের ওপর সহিংসতা কিছু কমত। সেই কিশোর বয়স থেকে ছেলেরা দেখে আসছে পর্দা করা বা সংযত থাকা মেয়েদের দায়িত্ব, যদিও সেটা একেবারেই ভুল। লজ্জা এবং নমনীয়তা একটা মানসিক অনুভূতি, এটা যেকোনো বয়সে যে কারও হতে পারে। মেয়েদের মতো লজ্জা পাচ্ছেÑ কথাটা বলে পরিবারের লোকেরাই ছেলেসন্তানকে হিংস্র হতে উৎসাহ দেয়। বেশির ভাগ পরিবার থেকে তারা প্রথম শেখে পুরুষ মানেই শাসক । কিন্তু একজন পুরুষ যে সহনশীল হতে পারে, কম্প্রোমাইজিং হতে পারে তা তারা দেখে বড় হয় না, তাই শেখেও না। পরিবারের যেকোনো বিষয়ে ছেলেদের মানিয়ে নিতে জানতে হবে, নিজের কাজ নিজে করা শিখতে হবে, সঙ্গীকে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি পরিবার তাকে বোঝাতে হবে। বিয়ে মানে হচ্ছে দুজনের জীবন একত্রকরণ সেখানে প্রত্যেক ব্যাপারে কেবল মেয়েরা ছাড় দিয়ে আসবে, ছেলেদের দিতে হবে নাÑ এই গণ্ডি থেকে বের হয়ে এলে মেয়েদের মগজে আর মানিয়ে নাও ভ্যাকসিন পুশ করতে হবে না।
স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং, কোনো জায়গায় ছেলে বা মেয়ের মধ্যে আলাদা করে সিলেবাস নেই। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আমরা ছেলেদের কাজ এবং মেয়েদের কাজ নাম দিয়ে ঘরের বাইরের কাজকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করি। বিদ্যাপীঠের সিলেবাস যেভাবে এক করে দেওয়া হয়, ‘মানিয়ে নাও অথবা মেনে নাও’ বাক্যটির ব্যবহার এই দুই শ্রেণির জন্য সমানভাবে উপভোগ্য করে দিলে নারীর ওপর জুলুম কমত। তখন নারীদের সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য এই ভ্যাকসিন নেওয়ার আর প্রয়োজন পড়বে না, পুরুষেরাও পাশাপাশি এই ভ্যাকসিন নিতে থাকবে।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

19 − 17 =