মাস্কের সাতসতেরো

করেছে Sabiha Zaman

করোনার প্রকোপ আবার বেড়েছে। কিন্তু থেমে নেই জীবনযাপন। সময়ের সঙ্গে সবই চলছে। তবে মানুষ এখন সচেতন। বর্তমানে প্রয়োজনের তালিকায় মাস্ক সবার ওপরে। অন্য কিছু ভুলে গেলেও মাস্ক নিয়ে বের হতে কেউ ভুলছে না। তবে ফ্যাশনপ্রিয়দের কাছে মাস্ক হয়ে উঠছে ফ্যাশন অনুষঙ্গও। আসছে ঈদ, তাই উৎসবকে কেন্দ্র করে ফ্যাশন ডিজাইনাররা বাহারি মাস্ক তৈরি করছেন। যেহেতু গরম, তাই সুতি কাপড়ের ওপর দেখা মিলছে নান্দনিক মাস্ক। লিখেছেন লিজা নাজনীন।

বাজারে এসেছে নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে জুতসই সব মাস্ক। গঠনগতভাবে মূলত তিন ধরনের মাস্ক এখন বাজারে চলছে। থ্রিডি কাটিং, নরমাল কাটিং আর ত্রিভুজ কাটিং। বর্ণের দিক দিয়ে নানা ধরনের কাপড়ের ওপর বিভিন্ন কাজ করা, সব রঙের মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। বাটিক প্রিন্ট, বুটিক প্রিন্ট, এমব্রয়ডারির কাজ, সিল্কের ওপর প্রিন্টের সব বাহারি মাস্ক তো আছেই। এমনকি, বিয়ের মতো অনুষ্ঠানে উজ্জ্বল পোশাকের সঙ্গে পরার মতো মানানসই, রঙিন পাথর বসানো মাস্কও পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এ ধরনের কাপড়ের মাস্ক করোনা প্রতিরোধে কতখানি উপযুক্ত, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে চিকিৎসকেরা বলছেন, ‘মাস্ক সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। আর যেহেতু এসব মাস্ক সব ক্ষেত্রে স্তরযুক্ত কি না, তা পরীক্ষিত নয়, তাই আগে একটি সার্জিক্যাল বা পরীক্ষিত মাস্ক পরে তার ওপর এ ধরনের মাস্ক পরা উচিত।’

শিশুদের জন্য রঙিন মাস্ক
শিশুদের ব্যবহার উপযোগী চমৎকার কিছু মাস্কের কথা জানাচ্ছে ‘লস অ্যাঞ্জেলেস’ ম্যাগাজিন। বিভিন্ন ধরনের গ্রাফিকস, কার্টুন ও প্রাণীর ছবিসংবলিত মাস্ক বাজারে আনে ইতালিয়ান এক ডিজাইন হাউস।

প্রিন্টের মাস্ক
বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন হাউস ‘জনি ওয়াজ’ বাজারে এনেছে প্রিন্টের মাস্ক। ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান লা সুপার্ব প্রাণী ও ফুলের নকশা তুলে এনেছে মাস্কে।

লম্বা ফিতাওয়ালা মাস্ক
নিউইয়র্কের ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘কোলিনা স্ত্রাদা’ লম্বা ফিতাওয়ালা মাস্ক নিয়ে এসেছে বাজারে। এগুলো টেনে ইচ্ছেমতো বেঁধে নেওয়া যায় মাথা বা কানের পেছনে। মাস্কগুলোও চমৎকার রঙিন।

কারুকার্য করা মাস্ক
চুমকি, পুঁতি কিংবা পাথর বসানো মাস্কের প্রচলন নতুন নয়। কেবল করোনাভাইরাসের কারণে নয়, অনেক দেশের মানুষই দূষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে মাস্ক পরে আসছে বহু আগে থেকে।

চলছে যেগুলো
করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এখন কমবেশি সবাই সতর্ক। তাই মাস্কের চাহিদা এখন বেড়েই চলেছে। উৎসব মাথায় রেখে ক্রেতারা বিভিন্ন বুটিকের তৈরি নানান রংবাহারি নকশাকাটা মাস্ক যেমন পছন্দ করছে, সে রকম আবার অনেকেই আস্থা রাখছে ব্র্যান্ডেড মাস্কে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য (রিইউজেবল), ছয় লেয়ারের মাস্ক, একবার ব্যবহারযোগ্য (ডিসপোজেবল) মাস্ক বিক্রি বেড়েছে বহুগুণ। অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট, মিন্ত্রার মতো অনলাইন কেনাকাটার সাইটগুলোতে বিক্রি হচ্ছে দেশি-বিদেশি নানান ব্র্যান্ডের মাস্ক। ওয়াইল্ড ক্রাফট নিয়ে এসেছে ধুলা, দূষণ, ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধক ৯৫ মাস্ক। ওয়াইল্ড ক্রাফট হাইপা শিল্ড ৯৫ মাস্ক ৬টি লেয়ারে তৈরি। যেকোনো আবহাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য এ মাস্কে রয়েছে ট্রিপল পার্টিকল ফিল্টারেশন সিস্টেম। ৩০ বার পর্যন্ত পানিতে ধুয়ে ব্যবহার করা যায়। গোদরেজ প্রোটেক্ট নিয়ে এসেছে রিইউজেবল মাস্ক। এ মাস্কে রয়েছে ৬টি লেয়ারের জার্মস শিল্ড টেকনোলজি। ৯৫ শতাংশ ব্যাকটেরিয়ারোধক এ মাস্কের ভেতরের দেয়ালে রয়েছে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।

দেশীয় ঘরানার
ব্র্যান্ডের একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে কিংবা নিজের পছন্দের মাস্কটি পরতে অনেকে ঘরে বসেই বানিয়ে ফেলছে ফ্যাশনেবল মাস্ক। তা ছাড়া দেশীয় বুটিক হাউসগুলো আনছে বৈচিত্র্যপূর্ণ মাস্ক। এগুলো হচ্ছে কলমকারী, বাটিক, আজরাখ, লেস বা সুতার নকশা করা থেকে পোলকা ডটস, চেক মাস্ক বিক্রি করছে বিভিন্ন বুটিক। ফ্যাশন ডিজাইনাররা এনেছেন চেক প্যাটার্ন। খাদি, লিনেন, সুতির রঙিন কাপড় কেটে নানান স্তরে সাজিয়ে সেলাই করে মাস্কে আনা হচ্ছে নতুনত্ব। জামা তৈরির সময়ে অনেকেই অতিরিক্ত কাপড় কিনছে মানানসই মাস্ক পেতে। জামাকাপড় বানানোর পাশাপাশি দরজির কাছে একই কাপড়ের রং মিলিয়ে মাস্ক তৈরির বায়নাও আসছে অহরহ। আবার যাদের প্রতিদিন কাজে বেরোতে হয়, তাদের অনেকেই ইউটিউব দেখে ঘরে বসে মাস্ক বানিয়ে নিচ্ছে একটু বদলের জন্য।

আছে মাস্কের ইতিহাসও
মহামারির সময় আমরা যে মাস্ক পরতে শিখেছি, তার কারণ হলেন মালয়েশিয়ার পেনাং শহরে জন্মানো চীনা চিকিৎসক উ লিয়ান থে। তার আসল নাম ‘গো লেয়ান টাক’। লিভারপুলে ‘স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন’-এ স্যার রোনাল্ড রসের অধীনে এক বছর পোস্টগ্র্যাজুয়েট রিসার্চ করেন তিনি। তারপর ম্যালেরিয়া ও টিটেনাস নিয়ে গবেষণা করেন প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউটে। ১৯১০-১১ দুই বছর চীনে ‘মনচুরিয়ান প্লেগ’ নামে এক মহামারি চলে। কেমব্রিজ পাস তরুণ উ লিয়ান থে প্লেগ আক্রান্ত এলাকা কিছুদিন সরেজমিনে ঘুরে দেখলেন। তারপর যে বার্তা দিলেন, তাতে অনেক চিকিৎসক-বিজ্ঞানীর ভ্রু কুঁচকে গেল। হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত এই তরুণ চিকিৎসক প্রথম বলেন, ‘মাস্ক পরলেই আটকানো যাবে মহামারি।’


উ লিয়ান বুঝতে পেরেছিলেন যে মানুষের মধ্যে রোগটি কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি জানালেন, ‘এই প্লেগের বৈশিষ্ট্য অন্য প্লেগ থেকে ভিন্ন। এটা অসুস্থ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে এলেও রোগ ছড়ানোর জন্য এখন মানুষবাহক আর দরকার হচ্ছে না। বাতাসে ছড়াচ্ছে রোগ। এটা নিউমোনিক প্লেগ। রোগ আটকাতে নাক-মুখ ঢাকতে হবে। মাস্ক পরতে হবে।’ লিয়ান অল্প বয়সী হওয়ার কারণে প্রায় সব চিকিৎসক তাকে অবজ্ঞা ও অপমানিত করেছিলেন। এদিকে মহামারি আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর পুরো এলাকাজুড়ে চিকিৎসকেরা মাস্ক না পরেই রোগীদের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ফরাসি চিকিৎসক জারাল্ড মেসনি। তিনি মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাস করতেন না, তিনি উ লিয়ানকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন এবং বর্ণবাদী আচরণ দিয়ে অপমান করেছিলেন। মেসনি প্লেগ হাসপাতালের অসুস্থ রোগীদের সেবা দিতেন, কিন্তু মাস্ক না পরেই। ফল হিসেবে মেসনি এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন কিছুদিনের মধ্যেই। চিকিৎসক মেসনির মৃত্যুতে গোটা চিকিৎসক সম্প্রদায় হতবাক হয়ে পড়ল। এরপর মাস্ক ব্যবহারের পক্ষে সমর্থন দ্রুত বাড়তে থাকে। চিকিৎসকেরা সতর্ক হওয়া শুরু করলেন, মাস্ক পরা শুরু করলেন। এর সাত মাস পর প্লেগ নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। মনচুরিয়ান প্লেগ মহামারি চলার সময় উ লিয়ানের নকশা করা গজ মাস্ক পরতেন চিকিৎসকেরা।

ছবি: সংগৃহীত।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

9 + 10 =