মেঘের রাজ্যে আমরা

করেছে Wazedur Rahman

বাংলামোটরের জ্যামে বসে জীবনের কতটুকু মূল্যবান সময় এই জ্যামে নষ্ট হয়েছে তার হিসাব কষছিলাম আর ফেসবুক স্ক্রল করছিলাম। এমন সময় চোখ আটকে গেলো একটা ফেসবুক ইভেন্টে, ‘Spa Tour De Rainbow Season 3 স্পা ট্যুর দি রেইনবো সিজন ৩।’ স্পা ড্রিংকিং ওয়াটার আকিজ ফুডস এন্ড বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেডের একটি পণ্য, তাদের আয়োজিত একটি ফটোগ্রাফি কম্পিটিশন। ১৫ জন বিজয়ী পাবে শিলং-চেরাপুঞ্জি ঘুরে আসার সুযোগ। বেশ বড় আয়োজন, এই নিয়ে তৃতীয়বার তারা এই কম্পিটিশনের আয়োজন করছে এবং আগের দুইবারই দেশের অনেক বিখ্যাত ফটোগ্রাফাররা বিজয়ী হয়েছেন।

প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারদের পাশাপাশি শখের ফটোগ্রাফারদেরও জন্যেও বেশ ভালো একটা সুযোগ। তাই, কোনো উচ্চাশা না নিয়েই ছবি সাবমিট করে দিলাম। এর কয়েকদিন পর যখন নির্বাচিত ফটোগ্রাফারদের লিস্টে আমার নাম দেখে যতোটা না অবাক হয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি অবাক হলাম যখন বিজয়ী পনের জনের ভেতর আমার নাম ঘোষণা করা হলো। বেশ খুশি খুশি লাগছিলো। পুরষ্কার হিসেবে দেশবরেণ্য ফটোগ্রাফারদের সাথে ঘুরে আসতে পারবো মেঘের রাজ্য মেঘালয়ে, আর কি চাই! নির্বাচিত বাকি ফটোগ্রাফারদের সাথে পরিচিত হলাম সেই সাথে চলতে থাকলো মেঘালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি।

অক্টোবরের ২৪ তারিখে আমাদের ট্যুর চুড়ান্ত করা হলো। এর ভেতরেই যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ২৪ তারিখ রাতে বাসে উঠে ডাউকির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমরা মোট ১২ জন। উইনারের পাশাপাশি আছেন স্পা’র দুইজন কর্মকর্তা সাদিব ভাই এবং রেজা ভাই, ভিডিওগ্রাফার রুদ্র দা, সাংবাদিক তানজিদ ভাই এবং ফটোগ্রাফি মেন্টর হিসেবে যাচ্ছেন আসাফাদ্দৌলা ভাই এবং শ্রদ্ধেয় কিরণ স্যার। পরদিন সকালে ডাউকি বর্ডার অতিক্রম করে আমাদের গাইড বাবলু ভাইয়ের সাথে পরিচিত হলাম। বাবলু ভাই বেশ মজার মানুষ, অল্পক্ষণেই সবার সাথে জমিয়ে ফেললেন। সবাই ঝটপট উঠে পড়লাম বাবলু ভাইয়ের মিনিবাসে। শুরু হলো আমাদের ট্যুর।

বিখ্যাত ঝুলন্ত ব্রীজ। ছবি কৃতজ্ঞতা: এম.এস.প্রত্যয়

প্রথমেই আমরা গেলাম স্নোনেংপেডেং এ। উমগট নদী বয়ে চলেছে এখানে, শীতকালে একদম কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানি দেখা যায়। এখানে নামার আগে রেজা ভাই একটা ছোটখাটো ব্রিফ দিলেন পুরো আয়োজনের ব্যাপারে আর রুদ্র দা এই ফাঁকে কিছু শট নিয়ে নিলেন। নেমেই প্রথমে আমরা বিখ্যাত ঝুলন্ত ব্রিজ ঘুরে দেখলাম। উপর থেকে স্বচ্ছ নদী, নদীর তীরের ক্যাম্পিং এর দৃশ্য অসাধারণ লাগছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে হয়ে গেলো টিপটিপ বৃষ্টি। বরহিলস ঝর্না দেখা শেষে এরপর আমাদের গন্তব্য মাউলিলং ভিলেজে। মাঝে রাস্তায় গাড়ী থামানো হলো জৈন্তা হিলস ভিউ পয়েন্টে।

এখান থেকে দূরে বাংলাদেশ দেখা যায়, আর নিচে তাকালে দেখা যায় ঘন নীল পানিতে রঙ বেরঙের নৌকা নিয়ে মাছ ধরছে জেলেরা। এ এক অসাধারণ দৃশ্য।

মাউলিলং ভিলেজকে স্থানীয়রা বলে ঈশ্বরের নিজের বাগান, কারণ এই গ্রামটি এশিয়ার সবচে পরিষ্কার গ্রাম।

গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আছে হোমস্টে’র ব্যবস্থা। এখানে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে বের হতে না হতেই আবার বৃষ্টি। রেস্টুরেন্টে বসে চা খেতে খেতে গল্প-গুজবে মেতে উঠলাম আমরা। আসাফ ভাই আর রেজা ভাইয়ের মজার মজার গল্প শুনতে শুনতে সময় কেটে গেলো ভালোভাবেই। বৃষ্টি থামলে আমরা চলে আসলাম লিভিং রুট ব্রিজ দেখতে। রুট ব্রিজ দেখে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো সাথে ঠান্ডা বৃষ্টি তো আছেই। এরপর রওনা হলাম শিলং-এর পথে। এখান থেকে শিলং প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে, পুরো পথের সময়টাতেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি হলো।

স্বচ্ছ পানিতে রঙ বেরঙের নৌকার সমাহার। ছবি কৃতজ্ঞতা: লেখক।

বাইরে বৃষ্টি আর গাড়ির ভেতরে সাদিব ভাই গান বাজিয়ে সবাইকে মাতিয়ে রাখলেন। প্রায় চার ঘণ্টা পর আমরা শিলং-এর দেখা পেলাম। পাহাড় দিয়ে ঘেরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫২৫ মিটার উঁচু এই সুন্দর শহরকে বলা হয় প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড। হোটেলে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে ডিনারে আসলাম সবাই নিচে। পেট ভরে খাওয়া দাওয়ার পর বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই হারিয়ে গেলাম ঘুমের রাজ্যে।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলাম নাস্তার জন্য। সবাই বেশ হাসিখুশি, টানা ঘুম দিয়ে সেই সাথে শিলং-এর স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার ফলে উৎফুল্ল সবাই। হাসি ঠাট্টায় নাস্তা শেষ করে বাইরে গিয়ে দেখি শিলং-এর সেই বিখ্যাত টিপটিপ বৃষ্টি। বাবলু ভাই ইতোমধ্যে গাড়ি নিয়ে হাজির। প্রথমেই আমরা গেলাম ক্যাথেড্রাল অফ মেরী চার্চে। স্থাপত্যকলার সুন্দর এক উদাহরণ এই চার্চ। বৃষ্টি এবং কুয়াশার মতো হালকা মেঘে কেমন একটা গুরুগম্ভীর পরিবেশ। চার্চের পাশেই আবার বাচ্চাদের স্কুল, লাল ইউনিফর্ম পরে সবাই আসছে স্কুলে।

ঘন ঘন শাটার পড়ছে সবার, সুন্দর পরিবেশে ছবি তোলার এই তো সুযোগ। বেশ ভালো সময় এখানে কাটিয়ে আমরা গেলাম গ্লাস মসজিদ হিসেবে খ্যাত মদিনা মসজিদে। কিছু সময় কাটিয়ে এরপর সবাই গেলাম এলিফ্যান্ট ফলস দেখতে। এটা বিরাট বড় ঝর্না, বৃষ্টিতে ফুলে ফেঁপে ভীষণ আকার ধারণ করেছে। পানির ছাঁটের জন্য ভালো করে দেখাই যাচ্ছে না কিছু। এখানে কিছু শ্যুট শেষে লাঞ্চের জন্য রওনা করলাম আমরা।

গাড়িতে আসাফ ভাই একটা জায়গার কথা বললেন যেখানে খুব ভালো ভিউ পাওয়া যায় শিলং-এর। কিন্তু কিছুতেই নাম মনে করতে পারছিলেন না। গাড়ি চলছে এমন সময় হঠাৎ চিৎকার করে বললেন, এইতো পাইছি! বামে তাকাতেই দেখি এক অপরুপ দৃশ্য, মেঘের কোল ঘেঁষে শুয়ে আছে শিলং শহর। লুমডেং ভিউ পয়েন্ট এটা, শিলং-এর আসল রুপ যেন দেখলাম এখানে। অনেকক্ষণ এখানে থেকে লাঞ্চ করে নিলাম শহরে গিয়ে। এরপর সাদিব ভাই বললেন আজকের মতো আমাদের ঘোরাঘুরি শেষ, সবাই কিছু কেনার থাকলে সেরে নাও কালকে সময় পাওয়া যাবে না। হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বের হলাম পায়ে হেঁটে শহরের অলিগলি দেখতে সেই সাথে কিছু শপিং সেরে নিতে।

জলপ্রপাতের নৈসর্গিক সৌন্দর্য। ছবি কৃতজ্ঞতা: লেখক।

শিলং-এ বেশ কিছু মজার স্ট্রিট ফুড আছে বিশেষ করে মোমো, ডাম্পলিং বেশ মজার। বাজারে ঘুরাঘুরির সাথে সাথে এসব খাবারও চেখে দেখলাম আমরা। সেদিন আবার ছিলো দিওয়ালির আগের দিন, কিছুক্ষণ পরপরই আকাশে আতশবাজি ফুটছিলো। লোকে লোকারণ্য বাজারে হেঁটে, এটা ওটা কিনে আর একেকজনের ভুলভাল হিন্দিতে দামাদামি দেখে হাসতে হাসতে কেটে গেলো সময়। হোটেলে ফিরে ডিনার সেরে আমরা আবার ক’জন বের হলার গভীর রাতের শহর দেখতে। কিছুক্ষণ আগের মানুষে ভর্তি বাজার এখন একদমই নিশ্চুপ। শীতের কুয়াশায় যেনো ঘুমিয়ে পড়েছে গোটা শহর।

পরদিন খুব ভোরে উঠেই নাস্তা করে গাড়িতে উঠে পড়লাম আমরা, যাচ্ছি চেরাপুঞ্জিতে, পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্রতাপূর্ণ জায়গায়। যদি রংধনুর দেখা মেলে! প্রথমেই নামলাম লাইটলুম উপত্যকায়। খাসিয়া পাহাড় শ্রেণির অপরূপ দৃশ্য দেখা যায় এখানে। ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা শেষে আবার রওনা হলাম। এসবের ভেতরেই তানজিদ ভাই আমাদের সবার টুকটাক অনুভূতি জেনে নিচ্ছিলেন আর নোট নিচ্ছিলেন আর্টিকেলের জন্য। ওইদিকে রুদ্র দা আমাদের জার্নির ভিডিও করে যাচ্ছেন। শিলং থেকে চেরাপুঞ্জির পুরোটা রাস্তা যেনো এক টুকরো স্বর্গ। মন মাতানো দৃশ্য দিয়ে ভর্তি। বাইরে গুরুগম্ভীর পাহাড়ের হাতছানি আর গাড়ির ভেতর আসাফ ভাই, কিরণ স্যারের খুনসুটি। রেজা ভাই আর বাবলু ভাইয়ের গানের সাথে গলা মিলিয়ে গান গেয়ে সুন্দর সময় পার করছিলাম আমরা।

নোকালিকাই ফলস-এ এসে দেখি মেঘে কুয়াশায় একাকার। ভর দুপুরেও হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালানো লাগছে। ঘন মেঘের জন্য ঝর্না দেখা যাচ্ছে না, আমাদের চারপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মেঘের পাল। অনেকক্ষণ এখানে কাটিয়ে ইকো পার্কে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু দূরেই গেলাম সেভেন সিস্টার্স ফলসে।

ছোট্ট এক গ্রামের পাশের গিরিখাতে এই ঝর্না বিস্ময়কর সুন্দর। অনেক উপর থেকে পানির ধারা ছিটকে পড়ছে গিরিখাতে। নিচে পাহারা দিয়ে আছে ঘন সাদা মেঘের দল। উপর থেকে অনেক নিচে ছবির মতো দু-তিন খানি গ্রাম দেখা যাচ্ছে, আর উপরে উড়ছে মেঘ। মেঘের দেশ যেনো একেই বলে।

ঝর্নার ঠিক পাশের একটি হোমস্টেতে আমাদের রাতে থাকার ব্যবস্থা হলো। আলো থাকা পর্যন্ত আমরা উপভোগ করছিলাম ঝর্নার দৃশ্য। সাদিব ভাই তাড়া দিলেন ফ্রেশ হয়ে নেয়ার জন্য রাতে বারবিকিউয়ের সাথে আছে নানা রকম মজার ইভেন্ট। আমাদের কেউ কেউ রুমে বসে গল্প করছিলো কেউ কেউ বাইরের সুন্দর পরিবেশে হাঁটছিলাম। সময় হতেই সাদিব ভাই ডাকলেন উপরে আসার জন্যে। গিয়ে দেখি উইনারদের জন্য নানা রকম মজার খেলা। সেই সাথে উপহারের ও ব্যবস্থা করে রেখেছেন তারা। ছাদের উপরে মেঘ ভেসে আসছে যেনো মেঘের ভেতর বসে আছি। এর ভেতরেই খেলাতে সবার মজার কর্মকাণ্ড দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ার অবস্থা।

শিলংয়ের সৌন্দর্য। ছবি কৃতজ্ঞতা: লেখক

পুরস্কার বিতরণ শেষে রেজা ভাই ছোট্ট একটা বক্তব্য দিলেন কিভাবে স্পা এবং আকিজ ফুডস ফটোগ্রাফির এই ইভেন্টকে সামনে এগিয়ে নিতে চান। সবশেষে বারবিকিউ ডিনার করে যে যার রুমে গেলাম। একটু পরেই আমাদের রুমে এলেন আসাফ ভাই। আমাদের সবার সাথে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিলেন, গল্পে হাসিতে পাশের রুমে কেউ ঘুমাতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। পরদিন একদম ভোরে আমরা উঠেই ছাদে গেলাম সূর্যদয়ের সময় সেভেন সিস্টার্স ফলস দেখার জন্য। মেঘ না থাকায় নয়নাভিরাম ফলসটা দেখা যাচ্ছিলো পরিষ্কার। পাহাড়সাড়ি চলে গিয়েছে দূর থেকে দূরে। আশ মিটিয়ে এই অপরূপ দৃশ্য দেখে গ্রামটার আশেপাশেও ঘুরে দেখলাম ভোরের আলোয়। এরপর নাস্তা করে উঠে পড়লাম গাড়িতে।

এবার বিদায় জানাতে হবে মেঘের রাজ্যকে। এই তিনটা দিন স্পা’র কল্যাণে স্বপ্নের মতো কাটলো। খাবার দাবার। পেশাদারিত্ব। রেজা ভাই সাদিব ভাইয়ের বড় ভাই সুলভ আচরণ। আসাফ ভাই কিরণ স্যারের মতো শিক্ষকদের কাছে থেকে দেখা এবং শেখা। এছাড়াও নানা রকম  সুযোগ-সুবিধা সব মিলিয়ে অসাধারণ এক আয়োজনের স্বাক্ষী হয়ে রইলাম।

মেঘাদল ট্যুরে আমাদের দল। ছবি কৃতজ্ঞতা: লেখক।

ভবিষ্যতে এমন আয়োজন আরো হোক, যারা শখের বশে ছবি তোলো বা প্রফেশনাল তাদের জন্য স্পা’র এই ইভেন্টই হতে পারে তাদের কাজের শ্রেষ্ঠ মূল্যায়ন। নিজেদের ভেতর একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়ে গেছে এই ট্যুরে সেটা ঢাকায় নেমে সবার থেকে বিদায় নেয়ার সময় টের পেলাম। স্বল্প পরিচিত হয়ে সবার সাথে ট্যুরে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে পেলাম কিছু বন্ধু, কিছু বড় ভাই এবং কিছু শিক্ষককে।

এই অভিজ্ঞতা অসাধারণ। আশা রাখি, সামনের সময়ে এই ইভেন্ট আরো বড় পরিসরে হবে। আরো বেশ কিছু ভাগ্যবান মানুষ সুযোগ পাক মেঘের রাজ্যে বা অন্য কোনো অপরূপ জায়গা হতে ঘুরে আসতে।

লেখা: আশিকুল ইসলাম
স্পা ট্যুর দি রেইনবো ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার বিজয়ী
ফিচার ইমেজ: রিও ট্রাভেলার্স

 

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

nine + seventeen =