মোবাইলে দীর্ঘ সময় নয়

করেছে Wazedur Rahman

কাজে-অকাজে মোবাইল ব্যবহার এখন সাধারণ ঘটনা। উঠতে-চলতে-বলতে মোবাইল ছাড়া এক মুহূর্তও আমাদের অর্থহীন মনে হয়। তবে অতিমাত্রায় এই নির্ভরতা ডেকে আনছে চরম বিপদ। চিকিৎসকেরা রাশ টানতে বলেছেন এই অভ্যাসের।

দরকারে-অদরকারে মোবাইলে চোখ, ঘন ঘন সোশ্যাল মিডিয়ায় উঁকি। সারাক্ষণ হয় মাথা ঝুঁকিয়ে আঙুল চলছে মোবাইলে, নয়তো চোখের কাছে মোবাইল এনে ঘাড় ঝুলিয়ে ভিডিও বা সিনেমা দেখা। চারপাশে চোখ চালালে এই অভ্যাস আমাদের প্রায় সব সময়ই চোখে পড়ে। আমরাও ব্যতিক্রম নই। চিকিৎসকেরা এই অভ্যাস নিয়ে বহুবার সতর্ক করলেও টনক নড়েনি। তবে এবার বায়োমেকানিকসের এক নয়া গবেষণা আবারও শঙ্কিত করছে তামাম চিকিৎসা মহলকে।

একটা ছোট্ট যন্ত্র আর এতেই মানবদেহের কঙ্কাল বদলে যাচ্ছে অজান্তেই। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সানশাইন কোস্টের (ইইউএসসি) গবেষকেরা এবার দাবি করলেন এ রকমটাই। তাদের মতে, ঘাড় ঝুঁকিয়ে সারাক্ষণ মোবাইল স্ক্রিনের ওপর চোখ রাখায় ‘শিং’ গজানোর উপক্রম তৈরি হচ্ছে মাথার পেছনের অংশে। কেমন তা?

বিজ্ঞানীদের দাবি, অতিরিক্ত মোবাইলের ব্যবহারে ঘাড় ও মাথাসংলগ্ন অঞ্চলের হাড় উঁচু হয়ে পাখির বাঁকানো ঠোঁট, হুক বা শিংয়ের মতো উঁচু হয়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, মাথা ঝুঁকিয়ে মোবাইল স্ক্রিনে নজর রাখতে রাখতে কাঁধের দিক থেকে ওজন সরাসরি মেরুদণ্ডের ওপর না পড়ে চলে আসছে ঘাড় ও মাথার পেছনের পেশিতে। ফলে ঘাড় ও মাথার সংযোগস্থলকে বেশি চাপ বহন করতে হচ্ছে ক্রমাগত। সেখানে থাকা টেন্ডন ও লিগামেন্টের ওপর কুপ্রভাব ফেলছে সেই চাপ। দিনের পর দিন সেই চাপ পেতে পেতে শরীর চাপের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে সেখানের চামড়া শক্ত করে ফেলে তৈরি ফেলছে এই গ্রোথ।

‘নেচার’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে গবেষকেরা জানিয়েছেন, তরুণ প্রজন্মের ব্যবহারিক জীবনের ওপর প্রযুক্তির এই প্রভাব ভবিষ্যৎকে যে পথে ঠেলে দিচ্ছে, তা বেশ শঙ্কার।

এ বিষয় নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ের প্রধান গবেষক ডেভিড শাহার জানান, হঠাৎ করে এই পরিবর্তন আসে না। বছরের পর বছর একইভাবে মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে এই সমস্যা তৈরি হয় শরীরে। মূলত ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত মোবাইল ঘাঁটার ‘অসুখ’ থেকেই এই রোগের জন্ম। সারাক্ষণ মোবাইল হাতে বুঁদ হয়ে থাকা মানুষ, বিশেষত তরুণ প্রজন্মই এর প্রধান শিকার। অস্ট্রেলিয়ায় এই সমস্যাকে ইতিমধ্যেই হেড হর্ন, ফোন বোনস বা উইয়ার্ড বাম্পস নামেও ডাকা হচ্ছে।

বছরের পর বছর একইভাবে মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে সমস্যা তৈরি হয় শরীরে কিন্তু কীভাবে এমন এক সিদ্ধান্তে এলেন গবেষকেরা? ইউএসসির গবেষকেরা মোট দুদফায় এই পরীক্ষা চালিয়েছেন। প্রথম দফায় কেবল লাম্পের হদিসটুকু মিললেও তার বিস্তারিত কারণ বোঝার জন্যই পরের দফার সাহায্য নেন বিজ্ঞানীরা। প্রথম দফায় অত্যন্ত বেশি সময় ধরে মোবাইল ব্যবহার করেন এবং ১৮-৩০ বছরের মধ্যে বয়স- এমন ২১৮ জনকে নিয়ে চলে পরীক্ষা। এক্স-রে করা হলে প্রায় ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রেই উঁচু হয়ে ওঠা অংশের সন্ধান পান বিজ্ঞানীরা।

করোটির পেছনে তৈরি হওয়া এই লাম্পের উচ্চতা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। এর গ্রোথ মোটামুটি এক থেকে তিন সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রথম দফায় পাওয়া ফলের ওপর ভর করে চলে দ্বিতীয় দফার সমীক্ষা। ১৮-৮৬ বছর বয়সী প্রায় ১ হাজার ২০০ জনের ওপর চলে পরীক্ষা। সেখানে ফলাফল তো বদলায়ই না, উল্টো দেখা যায়, এবার কয়েকজনের শরীরে এই লাম্বের উচ্চতা আরও বেশি। এর পরেই করোটির অস্থি, মাথার পেছনের পেশি ও ঘাড়ের স্নায়ুগুলোর ওপর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান বিজ্ঞানীরা। আর তাতেই ‘ভিলেন’ হিসেবে উঠে আসে মোবাইল!

এ প্রসঙ্গে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ সমর চৌধুরীর মতে, মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস নতুন নয়। ইদানীং এই প্রজন্মের হাতে সেই অভ্যাসই বদভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। যার ফলস্বরূপ এই ধরনের সমস্যা ধেয়ে আসে। টেক্সটিং থাম্বও এমনই এক সমস্যা। এ নিয়ে নানা গবেষণা চলছে। সারাক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপ-মেসেঞ্জারে কিংবা ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট করতে গিয়ে টেক্সট করতে থাকে মানুষ। এর ফলে আঙুল অবশ হয়ে নানা স্নায়বিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যথা তো বটেই, অনেক সময় অস্ত্রোপচারও করতে হয়। আমাদের শরীরে যেসব পরিবর্তনশীল অসুখ রয়েছে, তার মধ্যে এগুলো অন্যতম। এখনো সচেতন না হলে এর চেয়ে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

অস্থিবিশেষজ্ঞ শহিদুল হকও এই ভাবনায় সহমত পোষণ করেছেন। তাঁর মতেও, ‘প্রযুক্তির এই বাড়াবাড়ির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আসলে আমাদের শরীরের ভেতর কিছু পরিবর্তন হতেই থাকে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এত মাইগ্রেন, চোখের সমস্যা, মাথা ধরা, মানসিক চাপ, ডিপ্রেশন সবই কিন্তু কমবেশি এ ধরনের প্রযুক্তিগত কারণেও হয়। সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকায় ঘর্ষণজনিত কারণে কড়া পড়ে ত্বকে। পুরু হয় চামড়াও। কিন্তু এত কুপ্রভাবেও টনক নড়ছে কই?’
তাহলে উপায়?

মোবাইল ব্যবহার করবে না এমন কথা বলার কোনো মানেই হয় না বলে দাবি চিকিৎসকদেরই। তবে এই ব্যবহারে রাশ টানার পক্ষপাতী সবাই। তাদের মতে, কাজের সূত্রে খুব মোবাইল ঘাঁটতে হলে ফিটনেস এক্সপার্ট ও চিকিৎসকদের পরামর্শমতো অবসরে কিছু ব্যায়াম করো। ফিঙ্গার এক্সারসাইজ ও ঘাড়ের কিছু ব্যায়ামে কিছুটা বিপন্মুক্ত হওয়া যায়। কাজের বাইরে মোবাইল ব্যবহারে রাশ টানতেই হবে।

মোবাইল ব্যবহারের সময় মাথার সোজাসুজি মোবাইল রাখো, ঘাড় যেন বেশি না ঝোঁকে। উঁচু কিছুর ওপর মোবাইল স্ট্যান্ড রাখো। এতে ফোন রেখে শুয়ে শুয়ে বা সোজা বসে সিনেমা বা দীর্ঘ ভিডিও দেখতে পারবে। প্রতি ১০ মিনিট অন্তর ফোন থেকে চোখ সরিয়ে ঘাড়ের কিছু সহজ ব্যায়াম অভ্যাস করো। যেসব ভিডিও ল্যাপটপে বা কম্পিউটারেও দেখা সম্ভব, সেগুলো সেভাবেই দেখো। ল্যাপটপও উঁচু জায়গায় রাখো।

 

লেখা: আশরাফুল ইসলাম 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

19 + seventeen =