রেডিও জকি

করেছে Wazedur Rahman

প্রাক্-টিভি আর ইন্টারনেট যুগে খবরের কাগজ আর খাতা-কলমের বাইরে রেডিওই ছিল মানুষের ঘরে বসে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। আমাদের জীবনে টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের এন্ট্রির পর রেডিও তার আবেদন খানিকটা হারাল বটে, তবে খুব শিগগিরই একাধিক বেসরকারি সংস্থা এফএম রেডিও চালু করে তার হৃতগৌরব ফিরিয়ে এনেছে দারুণভাবেই।

সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত, চড়াই-উতরাই থাকলেও, রেডিও তার স্বাভাবিক জৌলুশ কখনো হারায়নি বিশেষ। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলাই যায়, গানবাজনা যাদের প্যাশন, সেসব ছেলেমেয়ের পক্ষে এই মুহূর্তে রেডিও জকিইয়িংয়ের মতো এক্সাইটিং, প্রমিসিং এবং চ্যালেঞ্জিং ক্যারিয়ার খুব কমই আছে।

কাজটা কী?

রেডিও জকিরা (সংক্ষেপে আরজে) মূলত রেডিও সংগীতানুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। শ্রোতারা যাতে গান শুনে এবং সঞ্চালকের বক্তব্য শুনে অনুষ্ঠানটা উপভোগ করেন, সেই পুরো দায়িত্বই থাকে একজন আরজের কাঁধে। রেডিও মানে যেহেতু পুরোটাই কানে শোনাসংক্রান্ত ব্যাপারস্যাপার, এই পেশায় তাই তোমার পরিচিতি (যদি কখনো হয়, তাহলে) হবে তোমার গলার স্বরে। অনুষ্ঠান পরিচালনার মধ্যে থাকে শ্রোতাদের অনুরোধ শুনে সেইমতো গান শোনানো, অতিথিদের ইন্টারভিউ নেওয়া, কনটেস্ট ম্যানেজ করা, গান সম্পর্কে শ্রোতাদের তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি আবহাওয়া ও সেদিনের ট্রাফিক সম্পর্কে তাদের অবহিত করার মতো একগুচ্ছ কাজ।

এই পেশায় মাথা ঠান্ডা রেখে অত্যন্ত সপ্রতিভ হয়ে কাজ করার ক্ষমতা তো চাই-ই চাই, উপরন্তু প্রয়োজন প্রচণ্ড খাটুনি করার মানসিকতা। এ তো গেল রেডিও জকির পেশায় পা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় গুণগুলোর কথা। তার পাশাপাশি এই পেশায় যদি নাম করতে চাও, সে ক্ষেত্রে কিন্তু দরকার নিজস্ব স্বতন্ত্র ও অনন্য স্টাইল অফ কমিউনিকেশন। আদর্শ রেডিও জকি সেই, যার সঙ্গে সত্যি সত্যিই ‘কথায় পেরে ওঠা মুশকিল’। তা বলে শ্রোতাদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও কি অন্যকে বলার সুযোগ না দিয়ে আর জে একাই বলে যাবে যা বলার? উত্তরটা, বলাই বাহুল্য, ‘না’! রেডিও জকিকে তাই শ্রোতা বুঝে সেইমতো হতে হবে ব্যালান্সড।

এই পেশায় পুঁথিগত লেখাপড়ার চেয়ে অনেক বেশি কদর করা হয় আরজে হিসেবে প্রার্থীর প্রতিভার। তবে প্রথাগত শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেওয়া হলেও একখানা গ্র্যাজুয়েশন কিংবা অন্তত উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডিটুকুও না পেরোলে কিন্তু কাজ পাওয়া চাপের। একজন রেডিও জকির পক্ষে সবচেয়ে জরুরি হলো বিভিন্ন অকেশন অনুযায়ী কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গি পাল্টেপাল্টে ফেলা। তা বাদে একজন আরজের উচ্চারণ স্পষ্ট হওয়া উচিত, যে ভাষায় সে কথা বলছে, তার ওপর তার যথেষ্ট দখল এবং অনর্গল কথা বলে যেতে পারার ক্ষমতা, চাই এসবও।

রেডিও এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে একজন আরজেকে সাত থেকে সত্তর, যে কারও সঙ্গেই ইন্টার‌্যাক্ট করতে হতে পারে। এই কথাটা মাথায় রেখে ইনডিভিজ্যুয়াল শ্রোতার সঙ্গে আরজেকে মিশতে হয় এক্কেবারে আলাদা আলাদা রকমভাবে। সফল ও বিখ্যাত আরজে মানেই তার সেন্স অফ হিউমার হওয়া চাই সবার সেরা। এ বাদে রেডিও জকিকে হতে হয় ঠান্ডা মাথার। উল্টো দিকের শ্রোতার কাছ থেকে যত প্ররোচনাই আসুক, মেজাজ হারিয়ে একবার বাগ্্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়লেই আরজে হিসেবে তোমার গ্রহণযোগ্যতাও মানুষের মনে কমতে বাধ্য!

কী ধরনের কাজ পাওয়া যায়?

যে অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব কোনো রেডিও জকিকে দেওয়া হচ্ছে, তার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে রেডিও জকিকে নিজেকে পাল্টে পাল্টে ভেঙেচুরে আবার নতুন করে সাজাতে হয়। কোনো এক রেডিও জকির নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান মানুষের কতটা পছন্দ হবে, তা কিন্তু প্রায় পুরোটাই নির্ভর করে একান্তভাবে সেই আরজের দক্ষতার ওপর।

আশপাশের দিন-দুনিয়ায় কোথায় কী হচ্ছে, রাজনীতি থেকে খেলাধুলা, বিনোদন থেকে বিজ্ঞাপন, সবটা সম্পর্কেই একজন আরজেকে হতে হয় ওয়াকিবহাল। আরজের একটা গুরুদায়িত্ব যেহেতু শ্রোতাদের জন্য গান বাজানো, তাই মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট এবং কম্পিউটারেও তাদের হতে হয় স্বচ্ছন্দ।

 

কাজটা পাব কী করে?

আরজে হিসেবে কাজ পাওয়া যেতে পারে বাংলাদেশ বেতার থেকে শুরু করে দেশজোড়া আরও একাধিক রেডিও স্টেশনের যেকোনোটিতেই। কাজ পেতে হলে আবেদন করার উপায় দুটো। হয় রেডিও স্টেশনের ডাকে অডিশনে গিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে, নইলে যোগাযোগ করতে রেডিও সফটওয়্যার প্রডিউসার কোম্পানির সঙ্গে। অনেক রেডিও স্টেশনেরই নিজস্ব ওয়েবসাইটে রিক্রুটমেন্টের নিজস্ব পরিসর থাকে।

আবেদন করা যায় সেখানে গিয়েও। একবার কাজে ঢুকে পড়ার পর দু-তিন বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিতে পারলে তারপর টেলিভিশন এবং রেডিওর বিজ্ঞাপনে ডাবিং করে দুই পয়সা উপার্জন করা যায়।

তা বাদে আরজের কাজ করতে করতে কথাবার্তায় যত তুমি চোস্ত হবে, বিভিন্ন লাইভ শোতে অ্যাঙ্করিংয়ের সুযোগও ততই ছুটে ছুটে আসবে তোমার সামনে।

ব্যস, এই আরকি। রেডিও জকিইয়িং নিয়ে লেখাপড়া করা যেতেই পারে চাইলে। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে নানা রকম ছোট-বড় কোর্স করানো হয়। সেসবের খোঁজ এই লেখায় থাকল না এই কারণেই যে আরজে হতে চাইলে ওই কোর্সগুলো কখনোই বাধ্যতামূলক নয়।

একান্তই যদি তোমার প্রতিভা থাকে আর থাকে সফল আরজে হওয়ার জন্য অসম্ভব জেদ, তাহলেই এই পেশায় তোমার যুগপৎ এন্ট্রি ও উন্নতি কেউ ঠেকায় সাধ্যি কী!

 

লেখা: রোদসী ডেস্ক 
ছবি: সংগ্রহীত 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

fourteen − two =