রোদসীর আড্ডায় আমেনা সুলতানা বকুল

করেছে Rodoshee

আমেনা সুলতানা বকুল। নানাভাবেই তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া চলে। তিনি একাধারে রাজনীতিক, সমাজসেবী এবং সফল উদ্যোক্তা। তবে এত পরিচয়ের বাইরে সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো- তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরের রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন। যুদ্ধ শেষ হলেও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যুদ্ধে এখনো নিজেকে সমানভাবে সক্রিয় রেখেছেন তিনি। রোদসী’র এবারের আড্ডায় মুখোমুখি হয়েছেন  এই বীর সৈনিক।

রোদসী : ভিন্নধর্মী কিছু করতে ভিন্ন মানসিকতার দরকার হয়। সে জন্য দরকার উপযুক্ত পরিবেশ। ছোটবেলায় আপনি তেমনি কোনো পরিবেশ পেয়েছিলেন? অর্থাৎ কেমন ছিল আপনার ছোটবেলার পরিবেশ?
আমেনা সুলতানা বকুল : আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন দেশের অবস্থা ভালো ছিল না। সময়ের প্রয়োজনেই আমার মানসিকতা সে রকম হয়ে গিয়েছিল। আর আমার বাসার পরিবেশে বিশেষ কিছু ছিল না। অন্য দশটা পরিবারের মতোই ছিল আমার পরিবার। আমাদের স্কুলে ‘কচি-কাঁচা’ নামে একটি সংগঠন ছিল। সেটা পরিচালনা করতেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের বড় ভাইবোনেরা। তারা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। তারাই আমাদের নিয়ে মিটিং-মিছিল করতেন।
রোদসী : আপনি যে এই সংগঠনে যেতেন, এটা কি আপনার পরিবার জানত?
আমেনা সুলতানা বকুল : হ্যাঁ, জানত। কিন্তু তারা বাধা দিত না। আমি লেখাপড়া ঠিকমতো করতাম। আমার ওপর তাদের বিশ্বাসও ছিল। সংগঠন থেকে মিছিলে যেতাম, কিন্তু বুঝতাম না মিছিল কী। সবাই যায়, আমিও যেতাম। এখানে বাধা দেওয়ার কিছু ছিল না। তখন মিটিং-মিছিল ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
রোদসী : তখন মেয়ে হয়ে মিছিলে অংশ নিতে কোনো সমস্যা হতো না?
আমেনা সুলতানা বকুল : না। মেয়েদের প্রতি সবার অনেক সম্মান ছিল, শ্রদ্ধাবোধ ছিল। আমরা ছেলেদের সঙ্গে মিছিলে যেতাম, রাত করে বাসায় ফিরতাম, আমাদের কোনো প্রকার ভাবনাই ছিল না যে কখনো বিপদে পড়ব।
রোদসী : আপনি কীভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হলেন?
আমেনা সুলতানা বকুল : আমরা কখন যে এই মহাসড়কে উঠে গেছি, নিজেরাই বুঝিনি। রাজনৈতিক ট্রেনিং দেওয়ার জন্য আমার মতো কয়েকজনকে নির্বাচিত করেছিলেন সংগঠনের বড় ভাইয়েরা। এভাবেই ধীরে ধীরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যাই। তখন কিন্তু আমাদের যা খুশি তা করার স্বাধীনতা ছিল না। একটি দেশের আইন অগ্রাহ্য করে আমরা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছি। স্লোগানে বলছি, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা।’ পরে জেনেছি, এসব স্লোগান তৈরি করেছেন তৎকালীন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতারা। তখন ওপেন প্ল্যাটফর্মে ছিল আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ, আর ওপর প্ল্যাটফর্মে ছিলেন ভিন্ন কিছু মানুষ, যারা মূল রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন, প্রভাবিত করতেন, সিদ্ধান্ত নিতেন, তারাই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তৈরি করেছেন, তারাই স্বাধীন বাংলার পতাকা তৈরি করেছেন। তারা ছিলেন ‘নিউক্লিয়াস’।
রোদসী : অর্থাৎ তখন পরিকল্পনাই ছিল আলাদা একটা দেশ গড়ার?
আমেনা সুলতানা বকুল : হ্যাঁ, আর সে লক্ষ্যেই আমাদের আন্দোলন এগিয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ী হওয়ার পেছনে ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই সময়ে এমন নিরঙ্কুশ বিজয় ছিল একপ্রকার অসম্ভব ব্যাপার, কিন্তু এটাকেও সম্ভব করেছে সেই সংগ্রামী ছাত্রসমাজ।
রোদসী : আপনি জাতীয় চার নেতার কুচকাওয়াজে ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর হাতে পতাকাও দিয়েছেন। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।
আমেনা সুলতানা বকুল :আমরা ছাত্রলীগের কর্মীরা ২৩ মার্চ মিছিল থেকে পল্টনে জাতীয় চার নেতাকে গার্ড অব অনার দিই।
রোদসী : গার্ড অব অনার কেন দেওয়া হলো?
আমেনা সুলতানা বকুল : ২ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের যে পতাকা তৈরি হলো, আমরা সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করব, এটাই আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তখন কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা প্যারালাল গভর্নমেন্ট চালু হয়ে গেছে। শুধু ছাত্ররা হাতে পতাকা নিয়ে মিছিল করলেই তো আর এই অথরিটি প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাই আমরা এটাকে আরেকটু প্রকাশ্যে আনতে চাইলাম। সে জন্য আমরা চার ছাত্রনেতাকে গার্ড অব অনার দিয়ে পল্টন থেকে মিছিল নিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলাম। সেখানে মিছিল নিয়ে সবাই বসে থাকল, আমাদের নেতা যারা ছিলেন, তারা পতাকা নিয়ে এগিয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধু দোতলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, ওনার বাসার সামনের গেটে উঠে আমাদের এক ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধুর হাতে পতাকা তুলে দেন। এটা এখনো ছবিতে দেখা যায়।
রোদসী : এরপর তো যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আপনি ট্রেনিং নিয়েছিলেন কোথায় ও কীভাবে?
আমেনা সুলতানা বকুল : তৎকালীন ইকবাল হলের ভেতর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে বড় ভাইয়েরা ডামি রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং দিতেন। তারা যুদ্ধের জন্য আমাদের তৈরি করছিলেন। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে আমাদের কী করতে হবে, কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখব, সবকিছুর জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছিল।
রোদসী : অর্থাৎ আপনারা বুঝে গিয়েছিলেন যে সামনে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী।
আমেনা সুলতানা বকুল : হ্যাঁ, আমরা বুঝে ফেলেছিলাম, যুদ্ধ ছাড়া দেশ স্বাধীন করা সম্ভব নয়। ওই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যা যা করা প্রয়োজন আমরা তা করব। সে জন্যই আমাদের ট্রেনিং নেওয়া।
রোদসী : কতজন ছিলেন সেখানে বা কত মানুষ সম্পৃক্ত ছিল এর সঙ্গে?
আমেনা সুলতানা বকুল :তখন এর সঙ্গে ছাত্ররা ছাড়াও সাধারণ মানুষও সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানের নেতাদের দেনদরবার চলছিল, পাকিস্তানিরা আসলে ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করছিল। কারণ, তারা তখন ভেতরে ভেতরে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু সে সময় এ দেশের ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মনেও স্বাধীনতার চেতনা জেগে উঠেছে। তারাও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ২৫ মার্চও সারাদিন আমরা ট্রেনিং করেছি।
রোদসী : তখন আপনার বয়স কত ছিল? আপনার কি বিয়ে হয়েছিল?
আমেনা সুলতানা বকুল : না। তখনো আমার বিয়ে হয়নি। বয়সও আঠারোর নিচে।
রোদসী : আপনার পরিবার কি জানত যে আপনি যুদ্ধের ট্রেনিং করছেন?
আমেনা সুলতানা বকুল : আসলে আমার বাবা-মা থাকত কুমিল্লা, আমি থাকতাম ঢাকায় বড় খালার বাসায়। এই কাজগুলো খুব একটা বলে করতাম না। তাই কেউই সেভাবে প্রশ্ন করেনি যে কী করছি।
রোদসী : ২৫ মার্চের ঘটনাটা বলবেন?
আমেনা সুলতানা বকুল : আমি তখন ইডেন কলেজে পড়তাম। আমার খালার বাসা ছিল নাখালপাড়ায়। ২৫ মার্চ রাতে আমি বাসায় থেকেই জানতে পারলাম পাক হানাদারদের আক্রমণ শুরু হয়েছে। সবাই খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আমি জানতাম, আক্রমণ হতে পারে যে কোনো দিন। আমাদের আগে থেকেই নির্দেশনা দেওয়া ছিল, হামলা হলে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সবাই সুরক্ষিত জায়গায় চলে যাবে। পরদিন আমরা গ্রামের বাড়ি চলে গেলাম। আমার এক বোন সঙ্গে ছিল, সে ছিল প্রেগন্যান্ট। নারায়ণগঞ্জের কাছে গেলে তার ব্যথা শুরু হয়ে যায়। তখন রাস্তার পাশেই এক বাড়িতে অবস্থান করি। সেখানে তার বাচ্চা জন্মের পর বাচ্চাকে কোলে নিয়েই আবার হাঁটা শুরু করি।
রোদসী : যুদ্ধে যোগ দিলেন বা আপনারা সংগঠিত হলেন কীভাবে?
আমেনা সুলতানা বকুল : গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আমি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাই। সেখানে যুদ্ধের জন্য একটি ক্যাম্প ছিল, থানা কমান্ডার ছিল আমার মামাতো ভাই। তার সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখতাম। প্রায় দুই মাস ওই ক্যাম্পের তত্ত্বাবধানে থাকলাম। সেখানে আশপাশে যারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে চায়, যাদের যাওয়ার সামর্থ্য আছে, তাদের সংগঠিত করতে থাকলাম। প্রথমে গেলাম শাহাপুরে, আমার ছোট খালার বাসায়, সেখান থেকে আগরতলা। আগরতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতাম। সেখানে একটি হাসপাতাল ছিল, যুদ্ধাহতদের সেখানে নিয়ে আসা হতো। আমরা তাদের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতাম। এরপর সেখানে আমরা যুদ্ধের ট্রেনিং নিই প্রায় দেড় মাস।
রোদসী : আপনি সরাসরি কোনো অপারেশনে গিয়েছিলেন?
আমেনা সুলতানা বকুল : হ্যাঁ। ট্রেনিং শেষ করে মেলাঘর থেকে আমরা একটা অপারেশনে যাই। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর অ্যামবুশে পড়ে আমাদের এক সহযোদ্ধা গুরুতর আহত হয়। তার পেটের ভেতর বোমার স্প্রিন্টার ঢুকে গিয়েছিল। তখন তাকে গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসি।
রোদসী : সেখানে আপনার ভূমিকা কী ছিল?
আমেনা সুলতানা বকুল : যুদ্ধের ময়দানে প্রত্যেকের দায়িত্বই ভাগ করা থাকে। আমারও ছিল। সেখানে আমি সরাসরি অস্ত্র হাতে শত্রুর মুখোমুখি হয়েছি।
রোদসী : আপনার কি যুদ্ধের এমন কোনো স্মৃতি আছে, যা এখনো নাড়া দেয়?
আমেনা সুলতানা বকুল : ডিসেম্বর মাসে কসবায় আমরা একটা ফিল্ডে ছিলাম। সেখানে দু-তিনবার শত্রুর মোকাবেলা করে আমরা চলে আসছিলাম। পথে একটা জায়গায় আমরা হঠাৎ অদ্ভুত আওয়াজ শুনলাম। মানুষ খুব কষ্ট বা ব্যথায় কাতরালে যেমন আওয়াজ হয়, তেমন আওয়াজ শুনলাম। আমরা শব্দের উৎস খুঁজতে লাগলাম। একটা গর্তের ভেতর থেকে আওয়াজটা আসছিল। আমরা সেদিকে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি পাঁচ-ছয়জন নারী, সবাই সম্পূর্ণ উলঙ্গ, গায়ে এক টুকরো কাপড় নেই। তাদের সারা শরীরে ক্ষতচিহ্ন। ওরা আমাদের দেখেও ছিল ভাবলেশহীন, হতবিহ্বল। তারা কাউকে চিনতে পারছে না, কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। তারা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক অবস্থায় ছিল। তাদের সেখান থেকে উঠিয়ে আমরা উদ্ধার ক্যাম্পে নিয়ে আসি। একটা মেয়ে হিসেবে ওদের ওই অবস্থায় দেখে আমার মন দুর্বল হতে পারত। কিন্তু না, আমার আরও জেদ বেড়ে গেল। আমি আরও সাহস নিয়ে যুদ্ধ করলাম।
রোদসী : যখন বিজয়ের ঘোষণা এলো তখন আপনি কোথায়? কী করছিলেন?
আমেনা সুলতানা বকুল : আমি ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ঘোষণা শুনতে পাইনি। আমি শুনেছি ১৭ তারিখে। যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ঘোষণা শুনে ঢাকায় আসতে আসতে ১৯ তারিখ লেগে যায়।

DSC_8607 - Copy

আমেনা সুলতানা বকুলের সাথে রোদসী’র সম্পাদক সাবিনা ইয়াসমীন

রোদসী : যুদ্ধে আপনার পরিবারের কোনো ক্ষতি হয়েছিল কি?
আমেনা সুলতানা বকুল : আমাদের বাড়িটা পুড়িয়ে দিয়েছিল। সৌভাগ্যবশত বাড়িতে কেউ ছিলেন না।
রোদসী : আপনার পরিবারের আর কেউ কি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে?
আমেনা সুলতানা বকুল : আমি ছাড়াও আমার দুই চাচাতো ভাই যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। ওরা আমার চেয়ে দু-তিন বছরের বড়। তখন তারাও কলেজে পড়ত। আর মামার বাড়িতে মামাতো ভাই কমান্ডার হিসেবে ছিল।
রোদসী : তখন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য নারীদের সাড়া কেমন ছিল?
আমেনা সুলতানা বকুল : বর্তমানে নারীরা যতটা স্বাধীন, তখন তো পরিস্থিতি এমন ছিল না। তখন মেয়েরা রান্নাবান্না আর সন্তানের যত্ন ছাড়া আর কোনো কিছু তেমন একটা বুঝত না। একটা সময় পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও তারপর বিয়ে দিতে হবে এমনই ছিল ধারণা। মেয়েরা যে পড়াশোনা করে চাকরি করবে বা সংসারের বাইরে এসে কিছু করবে, সেটা অতটা সহজ ছিল না। আমি তো ভালো একটা পরিবেশ পেয়েছি, সুযোগ পেয়েছি, তাই সহজেই সরাসরি যুদ্ধে আসতে পেরেছি। কিন্তু সমগ্র সমাজের চিত্র সে রকম ছিল না।
রোদসী : আপনি কী কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন?
আমেনা সুলতানা বকুল : না। আমাকে কোথাও কেউ বাধা দেয়নি। এমনকি যুদ্ধকালে একটা মেয়ের জীবনযাপন কী ছিল, খুব সংগত কারণেই প্রশ্নটা আসে। কিন্তু তখন আমি যে এতটা অনিশ্চিত পরিবেশে থেকেছি, দেখা যাচ্ছে আমি একা একটা মেয়ে, আর সঙ্গে সাত-আটজন ছেলে। কিন্তু তখন কারোরই মনে হয়নি যে আমি একটা মেয়ে, বা আমারও মনে হয়নি ওরা ছেলে। সবারই একটা কথা মনে হয়েছে, সবাই মুক্তিযোদ্ধা। একে অপরের সহযোদ্ধা। সেখানে ছেলেমেয়ে কোনো বিভেদ ছিল না।
রোদসী : দেশ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আমেনা সুলতানা বকুল : দেশ স্বাধীন করা আমাদের অনেক বড় একটা অর্জন। কিন্তু সেই পরাজিত শক্তিকে আমরা শেষ করতে পারিনি। তারা দীর্ঘ সময় পর নিজেদের গুছিয়ে বা সংগঠিত হয়ে মাঠে নেমেছে। সেই তুলনায় আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তিরা নিজেদের এখনো সংগঠিত করতে পারিনি। পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর দেশ এমন একটা পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, যেখানে আমি যে একজন মুক্তিযোদ্ধা, সেটা কাউকে বলতে পারিনি। ফলে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খুব বেশি জানে না। এই ব্যর্থতা আমাদের। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তিরা চায় না আমাদের দেশ এগিয়ে যাক। তারা দেশকে সেই আগের জায়গায় নিয়ে যেতে চায়। তারা সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের রুখতে স্বাধীনতার সপক্ষের মানুষ এখনো একজোট হতে পারিনি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এটা আমার অনেক বড় ব্যর্থতা। সেই যুদ্ধের সময় আমাকে কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়নি, কিন্তু আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও আমাকে অনেক বেশি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আজ ঘরে-বাইরে কোথাও কেউই নিরাপদ নয়।
রোদসী : এটা থেকে মুক্তির উপায় কী?
আমেনা সুলতানা বকুল : আমরা যারা স্বাধীনতার সপক্ষের মানুষ, তারা যদি একজোট হতে পারি, সোচ্চার হতে পারি, তবেই এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে একা এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এটা হচ্ছে একপ্রকার সামাজিক অবক্ষয়। সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই হবে এর থেকে মুক্তির উপায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আমি এখনো মিছিল-মিটিং, সমাবেশে অংশ নিই। কিন্তু আমার এই কাজ তো যথেষ্ট নয়। কারণ, বিরোধীরা কাজ করছে আধুনিক উপায়ে, তারা কম্পিউটারের বাটন টিপে হাজারো লোকের কাছে মেসেজ পৌঁছে দিচ্ছে। আর আমি একটা মানববন্ধন করলাম, কিন্তু সেটা কতজনে দেখছে বা জানছে।

IMG_0001

(একাত্তরের রণাঙ্গনে সহযোদ্ধাদের সাথে…)
রোদসী : বর্তমান সময়ের মেয়েরা কি ঠিক পথে চলছে?
আমেনা সুলতানা বকুল : আমি এখনকার মেয়েদের নিয়ে আশাবাদী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চে যেসব মেয়েকে দেখেছি, ভেবেছিলাম তারা শুধু কম্পিউটার, ইন্টারনেট, টক শোতেই আছে। কিন্তু না, সেই ২০১৩ সাল থেকে তারা এখনো মাঠেই আছে। তবে তারা সংঘবদ্ধ নয়। তাদের সংঘবদ্ধ করে যদি একটি আওয়াজ তুলে দেওয়া যায়, তবেই সাফল্য আসবে। উনিশ শতকে যেভাবে আন্দোলন হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে, সেটা এ যুগে সম্ভব নয়। যুদ্ধের সেক্টর বদলাতে হবে, কৌশল বদলাতে হবে। প্রতিপক্ষ যে কৌশলে লড়ছে, আমাদের সে পথেই জবাবটা দিতে হবে। অন্যথায় এই সংকট থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারব না।
রোদসী : মেয়েদের উদ্দেশে কিছু বলার আছে?
আমেনা সুলতানা বকুল : মেয়েদের ভাবতে হবে, আমিও মানুষ। মানুষ হয়ে মানুষের জন্য লড়াই করব। গোটা পৃথিবীটাই আমার এলাকা। নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখায় বন্দি করে রাখা যাবে না। সে যদি ইচ্ছা করে, তার ইচ্ছা যদি মানুষের ভালোর জন্য হয়, তবে সে ইচ্ছা অবশ্যই পূরণ হবে।

রোদসী/আরএস

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

12 + fifteen =