শত বাধা পেরিয়ে নুসরাত লোপার জীবন গড়ার গল্প

করেছে Sabiha Zaman

আমাদের দেশে ছোট কাজের মূল্যায়ন নেই। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। কেউ যদি আচার নিয়ে কাজ করে, তাহলে সে তার যোগ্যতায় করছে। আবার কেউ যদি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কাজ করতে চায়, করবে। কাজকে কাজই ভাবতে হবে। আর নারীকে নারী না ভেবে মানুষ হিসেবে কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। বললেন ফ্যাশন হাউস হুর নুসরাত-এর কর্ণধার নুসরাত লোপা। শত বাধা পেরিয়ে তিনি তার জীবন গড়ার গল্প বললেন রোদসীর সঙ্গে। লিখেছেন সাবিহা জামান।

প্রতিকূলতা পেরিয়ে পথের খোঁজ
ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম নিজেকে নিয়ে। আমরা চার বোন, কোনো ভাই নেই। তাই সামাজিকভাবে আমার বাবা-মাকে কিছুটা হেয় হতে হতো। তাদের অনেক সময় শুনতে হতো তারা কী করবে বৃদ্ধ বয়সে। মূলত সেখান থেকেই নিজেকে কিছু করার ইচ্ছা। কেন একটা মেয়ে মা-বাবার দায়িত্ব নিতে পারবে না? কেন একটা মেয়ে তার বাবা-মাকে দেখতে পারবে না? ছোট থেকে তাই আমি চাইতাম মেয়ে হয়েই বাবা-মাকে দেখব, তাদের পাশে থাকব। আমার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হব, সে স্বপ্ন নিয়ে আমি এসএসসির পর ঢাকায় আসি। থাকতাম ফুফুর বাসায়। ঢাকায় আসার পর বুঝতে পারলাম পৃথিবীটা অন্য রকম। কিন্তু সেসব পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম। আমি লালমাটিয়া মহিলা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমার বাবার ব্যবসায়িক অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে পড়ে। তবে এ সময়গুলোয় আমার বান্ধবী সালমা মানসিকভাবে আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছে, যা আসলে ভুলে যাওয়ার নয়। এরপর নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ি। ডাক্তার হওয়া আর হলো না। তখন আমি লালমাটিয়া কলেজের সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হই।

কিছুদিন পর আমার বিয়ে হয়ে যায় আর আমি বেবি কন্সিভ করি, কিন্তু পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছি। আমার হাজব্যান্ড আমার পড়াশোনার বিষয়ে সব সময় সাহায্য করেছে। গ্র্যাজুয়েশন শেষে গ্রামীণফোনে একটা জবে জয়েন করলেও হাজব্যান্ডের অনিচ্ছায় জবটা ছেড়ে দিই। পরে আমি সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের একটা প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলাম, যেখান থেকে আমি অনেক কিছু শিখি, কাজের প্রয়োজনেই আমি ফেসবুক পেজ ক্রিয়েট করি। একটা কুর্তি বানিয়ে পেজে ছবি আপলোড করি। এখানে আমার ৪৮টা অর্ডার আসে, মূলত সেখান থেকেই কাজ করা শুরু।

পরিশ্রম আমার সফলতার মূল চাবিকাঠি
প্রথমে আমার ফ্যামিলি আমাকে কাজে সাপোর্ট দিত না। কিন্তু আমি কাজ চালিয়ে গিয়েছি, প্রয়োজনে ৪৮ ঘণ্টা কাজ করেছি কিন্তু কাজ বন্ধ রাখিনি। এখন আমার অফিসে সাতজন স্টাফ, কারখানায় কাজ করে দেড় শর বেশি মানুষ। আমার স্কিনপ্রিন্ট, সুয়িং, এমব্রয়ডারির ফ্যাক্টরি আছে। এখন আমার ফ্যামিলিও কাজের বিষয়টি মেনে নিয়েছে। পরিশ্রম আমার সফলতার মূল চাবিকাঠি। আমার হাজব্যান্ড আমাকে এখন অনেক বেশি সাপোর্ট করে।

চারপাশে নেগেটিভ মানুষ থাকবেই
আমাদের চারপাশের অনেক নেগেটিভ মানুষ রয়েছে। কিন্তু ধৈর্য থাকলে বাধা কাটিয়ে তোলা সম্ভব। নিজের লক্ষ্যে স্থির থেকে, নিজস্ব পণ্য নির্মাণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তুমি একজন উদ্যোক্তা। আমার কাজের সঙ্গে অন্যদের জীবন জড়িত। তাই কাজকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তুমি যেটা ভালো পারো, সে বিষয় নিয়েই কাজ করো। আমি হাজব্যান্ডদের উদ্দেশে বলব, আপনার ওয়াইফকে সাপোর্ট দিন, পাশে থাকুন।

করোনাকালে কাজ
বিশ্বে করোনার প্রভাবে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আমার ব্যবসায়ও অনেক চ্যালেঞ্জ এসেছে। কিন্তু আমি কাজ থামিয়ে রাখিনি। আমার বিশ্বাস ছিল সময়টা পার করতে পারলে পরবর্তী সময়েও টিকে থাকতে পারব। যেহেতু আমাদের কাজ অনলাইনভিত্তিক, তাই চেষ্টা করেছি আমাদের কাজের মান আরও ভালো করতে, মানুষের কাজে সেবা পৌঁছে দিতে। করোনাকালে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছি।

কাজের প্রতিবন্ধকতা
আমার কাজে কম প্রতিবন্ধকতা ছিল না। যখন আমার সাপোর্ট দরকার ছিল, আমি কাউকে পাইনি। এখন আমি সব বাধা কাটিয়ে কাজ করছি আর আমার ফ্যামিলিও আমার কাজকে সাপোর্ট করছে। নিজের কাজে বিশ্বাসী হতে হবে, থেমে যাওয়া যাবে না। আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।
তরুণদের প্রতি
যারা নতুন কাজে আসতে চায়, তাদের উদ্দেশে বলব কাজ থামিয়ে রাখা যাবে না। তোমার নিজের কাজে ফোকাস করতে হবে, চারপাশের মানুষ কী বলছে এটা নিয়ে ভেবো না। ব্যবসায় লেগে থাকো আর ধৈর্য রাখো। যদি সামনে সমস্যা আসে, তবে সেটা মোকাবেলা করার সাহস থাকতে হবে।

নারী দিবসে যেমন প্রত্যাশা
আমাদের সমাজে নারীর ভূমিকা অনেক বেশি। নারীর কাজকে ছোট করে না দেখে গুরুত্ব দিতে হবে। নারী দিবসে আমার প্রত্যাশা, আমরা নারীরা একজন আরেকজন নারীর সঙ্গে থাকব। একে অন্যের সাহস হব, পাশে থাকব। নারীর ওপর যে অন্যায় হয়, তার প্রতিবাদ সবার আগে নারীরাই করব। আমাদের পুরুষদের সঙ্গে যুদ্ধ নেই, আমরা কাজ করতে চাই। আমরা সম-অধিকার চাই না। আমরা নিজেদের যোগ্যতা প্রকাশ করার সুযোগ চাই। নারীরা যেন নারীদের কষ্টের কারণ না হই।

ছবি :  ওমর ফারুক টিটূ

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

1 × 4 =