শব্দের জাদু

করেছে Sabiha Zaman

শারমিন শামুন: প্রায় সব মা-বাবাই চায় সন্তানেরা তাদের নির্দেশনা মেনে চলুক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা শিশুদের দিয়ে কোনো কাজ করানোর জন্য বা কোনো কথা শোনানোর জন্য সাধারণত নেতিবাচক প্রকধাশভঙ্গির সাহায্য নিয়ে থাকি। আমরা ভাবি তাতে বুঝি আমরা আমাদের উদ্দেশ্যে বেশি সফল হব। কিন্তু তাতে আসলে হিতে বিপরীত হয়। কয়েকটি প্রেক্ষাপটের সাহায্যে বিষয়টি পরিষ্কার করছি :
১. শিশু শীতের কাপড় পরছে না বা পরতে চাইছে না, আমরা বলিÑ সোয়েটার পরো নয়তো ঠান্ডা লাগবে, জ্বর হবে, শরীর খারাপ করবে।
২. শিশু পড়তে না চাইলে বলি না পড়লে তুমি পরীক্ষায় খারাপ করবে, জীবনে ভালো কিছু করতে পারবে না, না পড়লে সবাই পচা বলবে।
৩. খেতে না চাইলে বলি…না খেলে বড় হবে না, রোগা হয়ে যাবে, বাঘ, ভালুক ও কালো ভূত আসবে।
৪. কোনো অনাকাক্সিক্ষত আচরণ করলে, চিৎকার করলে, জেদ করলে বলি…এমন করে না, এমন করলে সবাই পচা বলবে, অমুকে পচা বলবে।
৫. শিশু গোসল করতে না চাইলে আমরা বলি…তোমার গা থেকে গন্ধ হবে, তোমাকে ময়লা দেখাবে, লোকে খারাপ বলবে।
মোটকথা কোনো কাজ না করলে, কোনো কথা না শুনলে পরিণাম কী হতে পারে, আমরা সাধারণত শিশুকে তাই বলে থাকি। কিন্তু পরিণামের কথা বারবার বলে প্রত্যাশিত কোনো কাজ বা আচরণ করানো এক অর্থে ভয় দেখিয়ে করানো। কোনো কাজ না করলে কী পরিণতি হবে, সেটা বলার চেয়ে কাজটি করলে কী সুফল পাবে, সেটা বলাই কি বেশি জরুরি নয়? আমরা যদি আমাদের শিশুদের একই বিষয়ে ইতিবাচকভাবে নির্দেশনা দিই, তবে তা হবে তাদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক।
একটি ২, ৩, ৪ বা ৫ বছরের শিশু লম্বা-চওড়া বক্তব্য বোঝে না, তাদের রিজনিং পাওয়ারও কম থাকে, তাই ওরা আমাদের বক্তব্যের জটিলতা বুঝতে পারে না। এখন মনে প্রশ্ন আসতে পারে, কীভাবে এই বিষয়গুলোতে শিশুকে নির্দেশনা দিতে পারি?

ইতিবাচক নির্দেশনা কী হতে পারে?

১. শিশু শীতের কাপড় পরছে না বা পরতে চাচ্ছে না…বলা যেতে পারে সোয়েটার পরলে তোমার আরাম লাগবে, তোমার ভালো লাগবে।
২. শিশু পড়তে না চাইলে বলা যেতে পারেÑ পড়লে তুমি অনেক কিছু শিখতে পারবে, জানতে পারবে, অনেক বড় হতে পারবে, সবাই তোমাকে পছন্দ করবে। সবগুলো যে একবারেই বলতে হবে তা নয়। বারবার ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন সময় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলা যেতে পারে।
৩. শিশু গোসল করতে না চাইলে বলা যেতে পারেÑ গোসল করলে তুমি পরিষ্কার বা ক্লিন বেবি হবে, তোমাকে খুব ভালো লাগবে, সুন্দর দেখাবে, তুমি সুস্থ থাকবে।
৪. শিশু চিৎকার করলে, জেদ করলে বলা যেতে পারেÑ তুমি শান্ত থাকলে ভালো লাগে, শান্ত বেবিকে আমরা খুব পছন্দ করি।
৫. শিশু খেতে না চাইলে আমরা বলতে পারিÑ খেলে তুমি স্ট্রং হবে, অনেক বড় হবে, সুস্থ থাকবে।
ওপরে কয়েকটি নমুনা দেওয়া হলো মাত্র। দৈনিক বিষয়গুলোর ইতিবাচক নির্দেশনা এলে তোমাকেই খুঁজে নিতে হবে। এবার নিশ্চয়ই মনে প্রশ্ন আসছে যে কেন এভাবে বলতে হবে?

কেন ইতিবাচক নির্দেশনা দেবে?

১. নেতিবাচক নির্দেশনা বা পরিণামের ভয় দেখিয়ে কাজ করানোর সময় আমাদের গলার টোন, মেজাজ কিন্তু কোমল বা নরম থাকতে চায় না। কিন্তু আমরা যদি শিশুকে বলতে চাইÑ সোয়েটার পরলে তোমার আরাম লাগবে, গোসল করলে তুমি পরিষ্কার বেবি হবে, পড়লে তুমি স্মার্ট হবে, তাতে আমাদের গলার স্বর চাইলেও খুব বেশি চড়া করা সম্ভব হয় না। এই কথাগুলোই এমন যে তুমি চিৎকার করে, মেজাজ খারাপ করে, হুমকির স্বরে বলতে পারবে না। অনেকটাই যে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলার মতো। রুক্ষভাবে কিন্তু ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ কথাটি বলা যায় না, বললেও তা রুক্ষ রুক্ষ লাগে না।
২. আমরা যখন বলি সোয়েটার না পরলে ঠান্ডা লাগবে, তখন শিশুর ব্রেইনে না পরলে ঠান্ডা লাগবে কথাটিই বেশি বেজে ওঠে। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য তো পরানো। তাই আমরা যদি বলি সোয়েটার পরলে আরাম লাগবে, তাতে আমাদের নির্দেশনা এবং শিশুর কাছে তার করণীয় বেশি স্পষ্ট এবং ইতিবাচক হয়।
৩. তুমি যখন বলবে তুমি পড়ালেখা করলে অনেক স্মার্ট হবে, অনেক জানতে পারবেÑ এটা শিশুকে উৎসাহ দেয়, শিশুর কাছে তোমার নির্দেশনা সঠিকভাবে পৌঁছায়। কারণ না পড়লে এই হবে, তাহলে পড়লে? এভাবে মিলিয়ে হিসাব করে কাজ করার মানসিক দক্ষতা শিশুদের ছয়-সাত বছরের আগে সাধারণত হয় না।
৪. কী করতে হবে তা বারবার বললে শিশু সহজেই বুঝতে পারে মা-বাবা কী চাইছে এবং তাকে কী করতে হবে। তাতে শিশুর ব্রেইন খুব সহজে নির্দেশনাটি গ্রহণ করতে পারে।


শিশুকে কথা শোনানো বা কোনো কাজ করানোর ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা কীভাবে শিশুর সঙ্গে কমিউনিকেট করছি। আমাদের নির্দেশনা দেওয়ার পদ্ধতি যদি সঠিক এবং ইতিবাচক হয়, তবে ফলও ইতিবাচক হবে। ইতিবাচক নির্দেশনা দিয়ে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করতে পারলে কিন্তু একটি উইন-উইন সিচুয়েশন তৈরি হয়। মানে তুমিও মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, আবার শিশুও কাজটি করল, যা ওর জন্য দরকার।
এই চর্চা শুরু করার দুই দিনের মধ্যেই শিশু কথা শুনবে এমন নয়, প্যারেন্টিং একটা নেভার-এন্ডিং জার্নি, তোমাকে সব সময় চেষ্টা করে যেতে হবে, কোনো কাজ দুবার বলেও হতে পারে, আবার কোনো কাজের বেলায় দুই শত বারও বলতে হতে পারে। হাল ছাড়বে না, চেষ্টা চালিয়ে যাও, জয় তোমার এবং তোমার সন্তানের হবেই। শুধু মনে রাখবে, In Every Relationship — Your Words Can Cause Miracles.

 

শারমিন শামুন
প্যারেন্টিং-বিষয়ক লেখক ও অ্যাডমিন প্যারেন্টিংয়ের পাঠশালা।

 

 

 

 

ছবি: লেখক ও সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

three × four =