শিল্পী নাজলী লায়লা মনসুর- বাঙালি নারীর পরাবাস্তবতার গল্প

করেছে Rodoshee

নারী অস্তিত্বের অনেক ব্যাখ্যাতীত অনুভূতি ও জীবনোপলব্ধির বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হয় যে শিল্পীর ক্যানভাস, তিনি শিল্পী নাজলী লায়লা মনসুর। বাংলাদেশের সমকা13453912_1204102932954646_479988305_nলীন চিত্রকলার অন্যতম প্রধান এই ব্যক্তিত্বের জন্ম ১৯৫১ সালে রাজশাহী শহরে। চিত্রকলায় তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূত্রপাত ১৯৬৮ সালে তৎকালীন ঢাকা আর্ট কলেজ হলেও সমাপ্তিটুকু ঘটে ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি চট্টগ্রাম আর্ট কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত ছবি আঁকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

রিকশা ও রিকশাচিত্র বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। শিল্পী নাজলী লায়লা মনসুরের চিত্রকলায়  আমাদের চিরচেনা রিকশা বাহনটি  ঘুরেফিরে আসে বারবার। শিল্পকৃতি হিসেবে রিকশাচিত্রকে মূল্যায়ন করতে হলে রিকশাচিত্রের মধ্যে এমন একটা স্বাতন্ত্র্যের ব্যাপার আছে যেটা খুব সহজেই বাংলার একান্ত নিজস্ব শিল্প-আঙ্গিক হিসেবে পরিচিতি বহন করে। এই সম্ভাবনাটাকে শিল্পী নাজলী খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন এবং তার ছবিতে এঁকে ব্যবহার করে গেছেন। তাই নাজলী লায়লা মনসুরের বিভিন্ন চিত্রকর্মের ফর্ম, রং ও বিন্যাসে  রিকশাচিত্রের প্রভাব দেখা যায়। বিশেষ করে রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি রিকশাচিত্রীদের থেকে অনুপ্রাণিত। নাজলীর চিত্রকলায় উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার ও বর্ণবৈচিত্র্যের ব্যাপারটা রিকশাচিত্র থেকেই এসেছে।

13457825_1204102936287979_265012872_n

নারীকেন্দ্রিক অনুষঙ্গ রয়েছে নাজলীর প্রতিটি ছবিতে। যদিও সাম্যবাদী এই শিল্পী নিজেকে শুধু নারীবাদী পরিচয়ের আবদ্ধে রাখতে নারাজ। নারীবাদ তার সার্বিক সমাজ-পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবেই এসেছে। শিল্পী মূলত সমাজের অসঙ্গতি ও বৈষম্যকে চিত্রকর্মে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। নারীর প্রতি বৈষম্যও এর একটা উদাহরণ। তবে নারী-পুরুষ আলাদা করে না ভেবে মানুষের মানবিক উৎকর্ষের মানদণ্ডেই সবকিছু বিচার করা দরকার বলেই মনে করেন তিনি। সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিবৈষম্য এবং সামাজিক অসমতা ও পীড়নের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এসব তার ছবিতে এসেছে। নারীবাদ এখানে কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এ ব্যাপারগুলোকে তিনি সামগ্রিক শোষণ ও বৈষম্যের অংশ হিসেবেই দেখতে ও দেখাতে চেষ্টা করেছেন। এটাই শিল্পী নাজলী লায়লমনসুরের চিত্রকলার মূল সুর।

নাজলী লায়লা মনসুর প্রতিটি চিত্রকর্মের মাঝে একটি গল্প থাকে। থাকে পরাবাস্তব অনুভূতি। হয়তো কোনো ঘটনাবহুল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে কোনো মেয়েকে। সাম্প্রতিক প্রায় ছবিতে দেখা যায় শিল্পী গল্পগুলোকে এঁকেছেন  বেডকভার, সোফা-কভার বা টেবিল-ক্লথের মতো আটপৌরে গৃহস্থালি জিনিসপত্রের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে কখনো কখনো শিল্পী তার পূর্বের  চিত্রকর্মগুলোকে পুনরায় উপস্থাপন করছেন বেডকভার, সোফা-কভার বা টেবিল-ক্লথের মতো আটপৌরে গৃহস্থালি জিনিসপত্রের মধ্যে। শিল্পী সচেতনভাবে তার চিত্রকর্মকে নামিয়ে এনেছেন প্রাত্যহিক  জীবনের নানান অনুষঙ্গে। যার মাধ্যমে ছবির একটা ব্যবহারিক মূল্যও খুঁজে পাওয়া যায়।

13453887_1204102929621313_1462874171_n

নাজলী লায়লা মনসুরের চিত্রকর্মের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো ব্যান্ডেজ মোড়ানো ফিগার। ব্যান্ডেজ-মোড়ানো একটা ফিগারকে নিষ্ক্রিয়ভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় তার অনেক চিত্রপটে। ব্যান্ডেজ-মোড়ানো ফিগারটি দিয়ে শিল্পী মূলত তার নিজের ও চারপাশের মানুষগুলো অবস্থার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। কেননা, আমরা প্রত্যেকে যেন একেকটা ব্যান্ডেজের ভেতরে নিষ্ক্রিয়ভাবে গুটিয়ে আছি। তবে ব্যান্ডেজটা খুব কোমল, আমরা চাইলেই ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারি; কিন্তু আমরা তা করছি না! শিল্পী নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এর দায় এড়াতে চান না।

নাজলী লায়লা মনসুর অংশ নিয়েছেন শিল্পকলা একাডেমির বার্ষিক প্রদর্শনী এবং এশীয় দ্বিবার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীসমূহে। তার প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারিতে ২০০০ সালে। এরপর ২০০২ সালে ভারতের নয়াদিল্লির ললিতকলা একাডেমিতে তার আরেকটি ছোট্ট প্রদর্শনী হয়। ২০০৫ সালে, ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারিতে একক প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয়। শিল্পকর্মের জন্য দেশে-বিদেশে নানা সম্মানে ভূষিত হয়েছেন এই শিল্পী। 

লেখা : দীপা মাহবুবা ইয়াসমিন

ছবি : সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

4 − three =