শিশুর বাড়তি খাবার

করেছে Sabiha Zaman

ডা. লুনা পারভীন: অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের মায়ের দুধের পাশাপাশি কখন কীভাবে সম্পূরক খাবার দিতে হয় সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পান না। অথচ শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের সময় পুষ্টিহীনতা এড়াতে এটা খুবই জরুরি বিষয়। পুষ্টিকর উপাদান নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিশুকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত অবশ্যই মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে-

কেন দেবেন?

ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধেই বাচ্চার সব প্রয়োজন মিটে যায়। ছয় মাস পূর্ণ হলে বাড়তি খাবার লাগে বাচ্চার শরীর বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে, যা শুধু বুকের দুধ দিয়ে আর সম্ভব হয় না। টার্গেট হবে এক বছর বয়সের মধ্যে ঘরে তৈরি সব খাবার বাচ্চার সঙ্গে পরিচিত করাতে হবে।

কখন দেবেন?

ছয় মাস পূর্ণ হলে, প্রয়োজনে এর আশপাশে (তবে চার মাসের আগে অবশ্যই নয়)
যখন বাচ্চার ঘাড় শক্ত হবে, মাথা স্থির থাকবে, বসালে
বাচ্চা সাপোর্টসহ বা ছাড়া বসে থাকতে পারবে, হাঁ করে বড়দের খাবার খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করবে।

সাবির

কীভাবে দেবেন?

সবচেয়ে ভালো হলো ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার ১০-১২ দিন আগে থেকে পরিবারের সবাই যখন একসঙ্গে খেতে বসবে, তখন বাচ্চাকে একটা হাতলওয়ালা উঁচু চেয়ারে (বয়স উপযোগী) বসাতে হবে। খাওয়ার জন্য হাঁ করলে একটা-দুটো ভাত চটকে জিহ্বায় ডলে দেবেন, যেন মুখে দিয়ে নাড়াচাড়া করে আগ্রহ নিয়ে।
এভাবে ৪-৫ দিন দেওয়ার পর আলু সেদ্ধ, পেঁপে, পাকা কলা, আপেল চটকে দেবেন। যখন দেবেন, একটাই নতুন খাবার দেবেন এবং ৩-৪ দিন টানা দিয়ে তাকে অভ্যস্ত করবেন ও দেখবেন কোনো সমস্যা হয় কি না। যেমন পেটফাঁপা, বমি, বদহজম বা অ্যালার্জি।

কী কী দেবেন?

জাউভাত
খিচুড়ি শুধু চাল-ডাল-তেল দিয়ে
সেদ্ধ আলু, পেঁপে, ব্রকলি
পাকা কলা, পেঁপে, আপেলের পাশাপাশি শুরুতেই চামচে বা মামপটে পানি খাওয়ার অভ্যাসটা করাবেন।

কতবার দেবেন? কতক্ষণ দেবেন?

শুরুতে একবার, এরপর তিনবার পর্যন্ত দিতে পারবে সারা দিনে ৯ মাস পর্যন্ত। এরপর দিনে পাঁচবার এক বছর এবং এর পরে।
পাঁচ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা পর্যন্ত বা বাচ্চা যতটুকু আগ্রহ করে নিতে চায়।

কীভাবে বুঝবে বাচ্চার খাওয়া শেষ?

বাচ্চা মুখ সরিয়ে নেবে, মুখ থেকে ফেলে দেবে, মুখে বমিভাব করতে পারে। তেমন হলে জোর করবেন না মোটেও।
মনে রাখবেন, বাচ্চাকে বাড়তি খাবার দিচ্ছেন চেনানোর জন্য, পেট ভরার জন্য নয়। কাজেই শুরুতেই এক বাটি খাবার বাচ্চা খেতে নাও চাইতে পারে।

বাড়তি খাবার খেতে না চাইলে কী করবেন?

অপেক্ষা এবং বিরতি-
৩-৪ দিন পর আবার শুরু করুন, প্রয়োজনে অন্য কোনো খাবার দিয়ে শুরু করুন।
তরল করে জাউ, ভর্তা, পেটে গ্যাসের সমস্যা না হলে পিউরি বা রস করে দিতে পারো। তবে ব্লেন্ড নয় অবশ্যই। চেষ্টা করবে আস্তে আস্তে সেমিসলিড বা জাউয়ের মতো নরম খাবারে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে আনার।
বুকের দুধ খাওয়ানো কমিয়ে তারপর বাড়তি খাবার দেবেন, যেমন তিনবার বাড়তি খাবার দিলে তিনবার বুকের দুধ খাওয়ানো বাদ দেবেন।

ফিডিং চার্ট, ক্যালরি হিসাব করা কি জরুরি?

সব বাচ্চার খাওয়ার চাহিদা, পরিমাণ, ধরন ও রুচি একরকম নয়। কাজেই এক বাচ্চার রুটিন আরেক বাচ্চাকে জোর করে চেষ্টা করলে বরং খাওয়ার ইচ্ছাটা নষ্ট হয়ে যায় বাচ্চাদের। আর ক্যালরি হিসাব করে খাবে অপুষ্টির বাচ্চারা যেন তাদের খাবার হজম হয়, আবার ওজনও স্বাভাবিক হতে থাকে। তোমার বাচ্চার খাবারে ভাত, সবজি, মাছ, মাংস, ডাল, ডিম, ফল এক পিস করে থাকলেই হলো।

সকালবেলা:
খিচুড়ি, রুটি-সবজি, রুটি-ডিম, পাউরুটি, নুডলস, স্যুপ

মিড মিল:
একটা ফল, ডিম, হালকা খাবার

দুপুরবেলা :
ভাত, ডাল, সবজি, মাছ, মাংস
খিচুড়ি

বিকেলবেলা :
হালকা নাশতা,
নুডুলস, ফল, আলুর চপ, সবজি বড়া, স্যুপ
রাতের বেলা
দুপুরের মতো।
এর বাইরে তিন-পাঁচবার বুকের দুধ বয়সভেদে।

বাড়তি খাবারে যা করবেন না

শোয়ায়ে কখনোই বাড়তি খাবার দেবেন না। গলায় আটকে যেতে পারে।
খাবার ভুলেও ব্লেন্ড করে দেবেন না এবং গলায় আটকাতে পারে এমন ছোট পিস করেও দেবেন না।
এক বছরের আগে গরুর দুধ দিয়ে তৈরি খাবার দিবেন না। যদি অ্যালার্জি, বদহজম ও রক্তস্বল্পতা না হয়, তাহলে এক বছর হলে দিতে পারবে এবং দুই বছর হলে গরুর দুধ সরাসরি দিতে পারবে আধা কাপ দিনে একবার।
সুজি, চালের গুঁড়া কোনো পুষ্টিকর খাবার নয়। শুরুতে দিলে বরং বাচ্চার পর সময়ে চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস হয় না। রুচি বদলের জন্য পরে হালুয়া হিসেবে দিতে পারবে। সঙ্গে ডিম, ঘি মিশিয়ে পুষ্টিগুণ বাড়িয়ে।
ঘুমের মধ্যে বাচ্চাকে খাওয়াবেন না, এমনকি বুকের দুধও। নবজাতক ছাড়া বেশির ভাগ বাচ্চাই টানা কমপক্ষে চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমালে সমস্যা নেই। একটু বড় বাচ্চারা টানা ৮-১০ ঘণ্টাও ঘুমাতে পারবে।

ডা. লুনা পারভীন
শিশু বিশেষজ্ঞ, বহির্বিভাগ
ঢাকা শিশু হাসপাতাল
শ্যামলী।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

7 + three =