শিশু কিছু খেতে চায় না

করেছে Wazedur Rahman

একটি শিশুকে তিলে তিলে বড় করতে হলে বাবা-মাকে কত দায়িত্বই যে পালন করতে হয়, তা হিসাব করে শেষ করা যাবে না। শুধু দায়িত্ব পালনেই শেষ নয়, রীতিমতো মানসিক যন্ত্রণাও ভোগ করতে হয় কখনো কখনো। আর এই মানসিক যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপারগুলোর মধ্যে একেবারে অন্যতম হচ্ছে শিশুর খেতে না চাওয়ার বায়না। ডা. তানজিনা আল্-মিজান।

শিশু কিছু খেতে চায় না এই সমস্যাটি যেন এখন একেবারে নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাবা-মায়ের এই নালিশ এখন খুবই চেনা। কিন্তু বাচ্চা কিছু খেতে চাচ্ছে না অথবা খায় না এই সমস্যাটির সমাধান করার আগে জানতে হবে তার কারণ। অর্থাৎ তার কোনো শারীরিক সমস্যার জন্য খেতে চাচ্ছে না নাকি বাবা-মায়ের অতিরিক্ত সচেতনতার ফলাফল এই না খেতে চাওয়া।

প্রথমেই মনে রাখতে হবে প্রত্যেক বাচ্চাই আলাদা। অনেকে একেবারে বেশি পরিমাণ খেতে পারে, অনেকে আবার বারবার অল্প পরিমাণ খেতে পারে। তাই অন্যের সঙ্গে তুলনা করে বাচ্চা কতটা খাবে, সেটা ঠিক করা বন্ধ করতে হবে।

কোনো বাবা-মায়ের যদি মনে হয় বাচ্চা কম খাচ্ছে বা কিছু খেতে চাচ্ছে না, তাহলে অবশ্যই শিশু ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তবে কিছু বিষয় লক্ষ করতে হবে। যেমন, বাচ্চাদের বয়সের সঙ্গে ওজনের একটা সামঞ্জস্য থাকতে হয়। যদি সেটা ঠিক থাকে তাহলে অযথা চিন্তা করার দরকার নেই। আবার বাচ্চার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উচ্চতা, স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা এবং বাচ্চা প্লে ফুল কি না সেটাও খুবই জরুরি বিষয়। এগুলো যদি ঠিক থাকে, তবে বুঝতে হবে বাচ্চার শারীরিক সমস্যা নেই এবং তার খাবারের চাহিদা পূরণ হচ্ছে।

 

আমাদের দেশের মানুষজন খুব সহজেই কৃমির দ্বারা আক্রান্ত হয়। কাজেই নির্দিষ্ট সময় পরপর ও ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটিতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, বাচ্চারা মাঠে ধুলাবালিতে খেলাধুলা করে। কাজেই বাচ্চাদের কৃমি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কৃমির আক্রমণের কারণে শিশুর খাবারে অরুচি হয়।

আবার কৃমি হলে বাচ্চাদের রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং খাদ্যের অরুচির জন্য শিশুদের ভিটামিনের অভাবও হয়। এই আয়রন ও ভিটামিনের অভাব হলে বাচ্চাদের মেজাজ খিটখিটে হয় এবং শিশু কিছু খেতে চায় না। বিরক্ত করে।

শিশুর পেট যখন দীর্ঘ সময় খালি থাকবে অথবা এটা-সেটা খাবে, তখন পেটে গ্যাস তৈরি হবে। ফলে বাচ্চা খেতে চাইবে না। এই ডিজিটাল যুগে বাচ্চাদের জাংক ফুড আসক্তি এখন তুঙ্গে। আর এই জাংক ফুড অর্থাৎ চিপস, বার্গার, চকলেট এগুলো ক্ষুধামন্দা করার অন্যতম চাবি। কাজেই এগুলো থেকে বাচ্চাদের যত দূর সম্ভব দূরে রাখতে হবে।

আরেকটি ব্যাপারে খুব গুরুত্ব দিতে হবে, আর সেটি হলো বাচ্চার খাদ্য রুটিন। প্রতিদিন পোলাও দিলেও কিন্তু আমাদের ভালো লাগবে না। অর্থাৎ একই খাবার প্রতিদিন দিলে সে বিরক্ত হতে বাধ্য। বাচ্চার খাবারের একটি প্ল্যান করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। বাচ্চাদের রোজ একধরনের খাবার না দিয়ে মাঝেমধ্যে একটু বদলে দিতে হবে। ব্রেকফাস্ট সারা দিনের সবচেয়ে জরুরি খাবার। মনে রাখতে হবে বাচ্চার ব্রেকফাস্ট যেন হেভি ও স্বাস্থ্যসম্মত হয়। কার্বহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট এগুলো যেন সকালের নাশতায় থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 

বিকেলে একদিন সবজির স্যুপ দিলে অন্য দিন বিস্কুট দিলেই বাচ্চার খাবারের ইচ্ছা তৈরি হবে অর্থাৎ মনোটোনাস ভাব যেন না আসে। উইনিংয়ের সময় অর্থাৎ ছয় মাস পার হলেই কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখন বাচ্চা আর দুই ঘণ্টা পরপর খাবে না। কারণ, তখন সে বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবারও খাচ্ছে। কাজেই তখন যদি বাবা-মা দুই ঘণ্টা অন্তর বাচ্চাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন তাহলে শিশু কিন্তু খেতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। এই সময় বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় বাড়াতে হবে এবং বাড়ির খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করতে হবে। বাচ্চার খাবার মানেই একেবারে ট্যালটালে বা সেদ্ধ খাবার বানাতে হবে তার মানে নেই। বাড়িতে তৈরি পরিষ্কারভাবে তৈরি হলেই যথেষ্ট।

বাচ্চাদের সব সময় আলাদা করে খেতে দিতে হবে এমন নয়। বাড়ির অন্য সদস্যদের সঙ্গে খেতে দিলে বাচ্চারা ভালো খায়। সব সময় বাচ্চাকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর খেতে দিলে বাচ্চা খেতে চাইবে না। বাচ্চা কোনো খাবার খেতে না চাইলে জোর না করে তখন খাওয়ানো বন্ধ রেখে কিছুক্ষণ পর খাওয়ালে বরং সে খাবে।

অনেক সময় সে কি খেতে চায় এসব তার কাছে শুনে নিয়েই মেনু তৈরি করা যেতে পারে। বাচ্চা মেইন মিলের পূর্বে কোনো স্ন্যাকস যেন না খায় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আস্তে আস্তে বড়দের ফিডিং প্যাটার্নেই বাচ্চাদের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ভালো।

এই দিকগুলো খেয়াল করতে পারলে শিশু কিছু খেতে চায় না এই অতিপরিচিত সমস্যার সমাধান অনেকাংশেই হবে। যদি এরপরও সমস্যা মনে হয় তবে শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কোনোভাবেই শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা করা যাবে না।

লেখা: রোদসী ডেস্ক

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 × two =