শিশু চঞ্চল হলে

করেছে Sabiha Zaman

ডা. লুনা পারভীন: ছয় বছরের আদিব চেম্বারে ঢুকেই টেবিলের ওপর থেকে সব কাগজ, কলম, পেপার ওয়েট ধরে তছনছ করে বেসিনের সাবান ফেলে দিল, ময়লার ডিব্বা উল্টে ফেলল, তারপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল কম্পিউটারের মনিটরের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে এত কাণ্ড ঘটানো শিশুর অতি চঞ্চলতায় আমি দিশেহারা হয়ে বাচ্চার মায়ের দিকে তাকালাম। পাশে বসা দাদি প্রশ্রয়ের হাসি দিয়ে বলল, তা-ও তো এখন জ্বরে কাহিল বলে কম দুষ্টুমি করতেছে, নাহলে তো…

আমি বিব্রত হাসি দিয়ে বললাম, এখন থেকেই একটু কন্ট্রোল করার চেষ্টা করুন। কথা শেষ করতে পারলাম না, দাদি রাগ হয়ে বললেন, বাচ্চারা এ বয়সে এ রকম করেই।
সমস্যা এখানেই যে বেশির ভাগ অতি দুষ্টু, চঞ্চল বাচ্চাদের অভিভাবকেরা মানতে চান না এ অতিচঞ্চলতা বা হাইপার অ্যাকটিভিটি। আসলে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক নয় শিশুর মানসিক বিকাশগত সমস্যা, যা নামের আচরণগত সমস্যার একটি লক্ষণ। অনেক সময় স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে মনে করায় এটা নির্ণয় করতে অনেক দেরি হয়ে যায় এবং চিকিৎসা করে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকে।

ADHD কী? কেন হয়?

এটা শিশুর মানসিক বিকাশগত সমস্যা। যার কারণ নির্দিষ্ট নয়। ধরে নেওয়া হয় এটা জিনগত ও পরিবেশের প্রভাবও বিদ্যমান। মা-বাবার যে কারও ADHD অউঐউ থেকে থাকলে বাচ্চার বেলায় ৫০ পারসেন্ট চান্স আছে এটা হওয়ার। সাধারণত মেয়েদের চেয়ে ছেলে বাচ্চাদের বেশি হয় (৪:১)। এ ছাড়া মস্তিষ্কের রোগ, থাইরয়েড হরমোনের আধিক্য, গর্ভকালীন মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা, বিষাক্ত কেমিক্যাল, কীটনাশক, লোহা ও সিসার সংস্পর্শে আসা, অপুষ্ট ও সময়ের আগে বাচ্চা হলেও পরে এডিএইচডি হতে পারে।
সাধারণত বাচ্চার চঞ্চলতাকে বয়সের সঙ্গে স্বাভাবিক ধরে নেওয়ায় সমস্যা নির্ণয় করতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। ৭-১২ বছর বয়সের আগে বেশির ভাগ মা-বাবাই বুঝতে পারে না, সময়ে ঠিক হয়ে যাবে মনে করে নেন।

মায়োমী

কী দেখে বুঝবেন বাচ্চার অউঐউ আছে?

ADHD -এর তিনটি ধরন হয়ে থাকে।
১. অমনোযোগিতা
২. অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও অযাচিত আচরণ
৩. ওপরের দুটোই একসঙ্গে হওয়া যা বেশির ভাগ বাচ্চার ক্ষেত্রে দেখা যায়।

লক্ষণসমূহ:

১. নিজের মনমতো কাজ করা ও নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া।
২. কোনো কাজ সুশৃঙ্খলভাবে না করা ও শেষ পর্যন্ত লেগে না থাকা। দ্রুত মনোযোগ সরে যাওয়া।
৩. হঠাৎ করে রেগে যাওয়া, জেদ করা বা বিষণ্ন হয়ে যাওয়া কারণ ছাড়াই।
৪. এক জায়গায় স্থির হয়ে না বসা, সারাক্ষণই ছোটাছুটি করা।
৫. চুপচাপ কোনো কাজ না করা, অযথাই চিৎকার করা, অপ্রয়োজনে ও অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা। অন্যের কথা মাঝে কথা বলা ও তাদের কথায় কান না দেওয়া।
৬. যেভাবে করতে বলা হয় তা মেনে না নেওয়া, গুছিয়ে কোনো কাজ না করতে পারা, প্রায়ই কাজে ভুল করা যেমন, হোমওয়ার্ক না করা, জিনিসপত্র হারানো।
৭. কথা মনোযোগ দিয়ে না শোনা, উদাস হয়ে যাওয়া, অবাস্তব কল্পনা করা, অন্যদের এড়িয়ে চলা বা মিশতে না পারা, হঠাৎ মারমুখী হওয়া।
অটিজম আর অউঐউ কি একই সমস্যা?
না, দুটো একই রকম নয়। অটিজমে অমনোযোগিতা, সঙ্গবিমুখ হওয়া, কমান্ড ফলো না করার মতো কিছু লক্ষণ আছে অউঐউ-এর মতো, তবে তা অটিজমের অংশ নয়।

সমস্যা নির্ণয়ের উপায়

মাত্রাতিরিক্ত ও ধ্বংসাত্মক চঞ্চলতাকে অবহেলা বা প্রশ্রয় না দিয়ে তার মধ্যে এর কোনো লক্ষণ দেখা গেলে নিকটস্থ শিশু বিকাশ কেন্দ্র বা নিউরোলজির বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেবে। শিশুর আচরণ পর্যবেক্ষণ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও বিকাশের ধাপগুলো যাচাই করেই কনফার্ম বলা হবে, অযথা নয়।

চিকিৎসা না করালে কী ক্ষতি?

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড় হলে বাচ্চা ঠিক হয়ে যাবে, এমন আশা করে লাভ নেই। কারণ, ৩০ থেকে ৭০ পারসেন্ট ক্ষেত্রে এ সমস্যা বড়বেলায় দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এরা পরিবারে, সমাজে, কার্যক্ষেত্রে কোথাও খাপ খাওয়াতে পারে না।

চিকিৎসা

অতিরিক্ত চঞ্চলতা কমানোর জন্য ওষুধ দেওয়ার আগে কিছু উপায় আছে, যা পালনে এ রোগ আস্তে আস্তে ভালোও হয়ে যেতে পারে। যেমন :
১. বাচ্চার এনার্জিকে ভালো কাজে লাগানো, যেমন : সাঁতার কাটা, সাইক্লিং করা, কারাতে বা মার্শাল আর্ট শেখানো।
২. সহজ ভাষায় বাচ্চাকে বোঝাতে হবে, অল্প কথায় কাজ বুঝিয়ে দিতে হবে। তার মেজাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সহানুভূতির সঙ্গে তাকে শেখাতে হবে।
৩. ছোট ছোট কাজের লিস্ট দিতে হবে, যাতে সে অল্প সময়ে মনে করে সব কাজ করতে পারে এবং সময় বেঁধে দিতে হবে।
৪. লিস্টের কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারলে তাকে প্রশংসা করা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. ঘরে টিভি, ট্যাব, কম্পিউটার ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে বাইরে খোলা মাঠে সবুজ প্রকৃতিতে খেলতে দিতে হবে।
৬. হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে গেলে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া, জোরে জোরে শ্বাস নিতে বলা এবং সহানুভূতির সঙ্গে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
৭. স্কুলে টিচার, অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় থাকতে হবে যেন ক্লাসে ওর দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়, ওকে পড়া তৈরি করতে সাহায্য করা, প্রশংসা করা, কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারলে তাকে পুরস্কৃত করা সবই স্কুল ও মা-বাবার দায়িত্ব নিয়ে পালন করতে হবে।
৮. শান্ত করার জন্য মাঝেমধ্যে তাকে গান শুনতে দেওয়া, বিশ্রামে রাখা ও তার সঙ্গে সহজ ভাষায় গল্প করে তার মনোযোগ ধরে রাখতে হবে।

আমাদের দেশে কী চিকিৎসা আছে?

নিশ্চয়ই আছে। প্রতিটি মেডিকেল কলেজেই চাইল্ড নিউরোলজিস্ট বসেন, শিশু বিকাশ কেন্দ্রে  এ রোগের কাউন্সেলিং ও থেরাপি দেওয়া হয়।

খাবারের সঙ্গে অউঐউ-এর সম্পর্ক

সাধারণত গম, ভুট্টা, চকলেট, টমেটো, আঙুর, শিমজাতীয় খাবার দিতে মানা করা হয়। চিনি বা কোনো অ্যালার্জিক খাবারের সঙ্গে অউঐউ বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মায়ের কাছে যদি মনে হয় কোনো খাবারে বাচ্চার চঞ্চলতা বেড়ে যায়, তাহলে সে খাবার দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা যায় যে সেটা অ্যালার্জি নাকি অতিচঞ্চলতা।
অনেক গবেষণায় বলা হয় যে ভিটামিন বি, সি, ডি-থ্রি, ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ম্যাগনেশিয়াম জাতীয় ভিটামিন ও খনিজ লবণ এডিএইচডি কমাতে সহায়তা করে।
উপসংহারে বলব, মাত্রাতিরিক্ত ধ্বংসাত্মক চঞ্চলতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে একটু সচেতন হলেই কিন্তু বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। শিশুর ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত থাকবে।

ডা. লুনা পারভীন
শিশু বিশেষজ্ঞ বহির্বিভাগ,
ঢাকা শিশু হাসপাতাল শ্যামলী।

ছবি: ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

seven + nineteen =