শৈশবহীন একদল মানুষ || জাহীদ রেজা নূর

করেছে Rodoshee

১.
শাওনকে যখন ফোন করে বললাম, তোমার ছোটবেলার কথা তো জানাই হয়নি কখনো! তখন শাওনের সে কী হাসি! ‘এতদিনে ছোটবেলা!’
তেতাল্লিশ বছর আগে আমাদের অনেকের জীবনেই যে ঝড় বয়ে গিয়েছিল, সে কথা এতদিন পর শুনতে হবে কেন? শুনে কী হবে? এই প্রশ্ন তো যে কারো মনে হতেই পারে।
ডিসেম্বর এলেই বিজয়ের কথা আসে, বিজয়ের কথা এলেই সংগ্রাম আর বীরত্বের পাশাপাশি আত্মদানের কথা আসে। আত্মদানের কথা এলেই আমরা কতিপয় মানুষ বুঝতে পারি, ওই ছোটবেলায়ই আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম আমাদের শৈশব। শিশুকালে আমাদের শৈশব ছিল না। আমরা অতি দ্রুত যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী জীবনের ওঠা-নামার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে শিখেছি। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো এখনও সবার অগোচরে খুঁজতে থাকি আমাদের শৈশব। কল্পনায় দেখতে পাই বাবার সঙ্গে নিজেকে। যে বাবার অবয়ব হয়তো ছবিতেই আটকে আছে, তাঁকে মনের গহিন কোনো নিয়ে কত গল্পের জন্ম দিই আমরা! আর আজ যে সত্য গল্পটি বলব, তাতে থাকবে আমার বাবা ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী ও বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন আর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র অমর সুরস্রষ্ট্রা আলতাফ মাহমুদের কথা। শাওন আর আমি ছাড়াও আরো কয়েকজন ঘুরেফিরে আসবে গল্পে। আসতেই হবে। নইলে শৈশবহীন মানুষের গল্প পূর্ণতা পায় না।
২.
২৫ মার্চ রাতে আমার ঘুম ভাঙানো হলে প্রথমেই দেখেছিলাম আয়নায় প্রতিফলিত দাউ দাউ আগুন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের খুব কাছে চামেলীবাগে ছিল আমাদের ভাড়া বাড়ি। আমি তখন পাঁচ। বাড়িওয়ালার শ্যালক লুলু মামা আমাকে পাঁজাকোলা করে আমাদের বাড়ি থেকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ এদিকটায় রাজারবাগ। কানফাটানো গোলাগুলি আর আগুনের লেলিহান শিখা থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে কি না, সেটাই ছিল প্রশ্ন। আমাদের পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্য যদি থ্রি নট থ্রি রাইফেল থেকে একটা গুলি করে, তবে শত শত স্টেন গানের গুলি ছুটে আসে রাজারবাগের দিকে। সে এক অবিশ্বাস্য যুদ্ধ। ইউনিফর্ম পরা পুলিশেরা সে রাতে চলে আসতে থাকে আমাদের পাড়ায়। খুব দ্রুত হামলে পড়ে আমাদের পোশাকের আলমারিগুলোয়। আরও দ্রুততার সঙ্গে তারা পাল্টে ফেলে পোশাক। এমনকি কোনো কোনো পুলিশ সদস্য আলমারির তাকে রাখা আম্মার ইস্ত্রি করা শাড়িও পরে ফেলেন লুঙ্গির মতন। সেদিন আমার বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেন অফিসেই আটকা পড়েছিলেন। ফিরেছিলেন তিনদিন পর।
কিন্তু ১০ ডিসেম্বর তাঁকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী আর আল বদর সদস্যরা।
তিনি আর ফিরে আসেননি।
এরপরের নয় মাস আমাকে, আমার ভাইদের জীবনকে শৈশবহীন করে দিল।
এরপরের নয় মাস ৩০ লাখ নিহত মানুষের সন্তানদের জীবন শৈশবহীন করে দিল।
৩.
সে সময়ের শিশুরা খেলার মাঠে যাওয়ার বদলে আকাশে বোমারু বিমানের ওড়াওড়ি দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। বড় কারো হাত ধরে রাস্তায় বের হয়ে মোড়ের দোকানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কোনো সদস্যকে দেখলে কথার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া শিখে গিয়েছিল। যেমন, কোনো শিশু চলতিপথে যদি গুনগুন করে গাইত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি, তবে পাকিস্তানি সেনাদের দেখামাত্রই চিৎকার করে গেয়ে উঠত ‘পেয়ারা পাকিস্তান হামারা পেয়ারা পাকিস্তান’, পাকিস্তানিটা চলে গেলেই আবার কণ্ঠে উঠে আসত সোনার বাংলার গান। অর্থাৎ ওই বয়সেই কূটনীতি শিখে গিয়েছিল তারা। পড়ার চাপ নেই, রাতে ব্ল্যাকআউট, রাস্তাঘাটে লোকজন কম, মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা গুলির শব্দ শিশুদের করে তুলেছিল অন্যরকম। আর সেই অন্যরকম শিশুদের কেউ কেউ একাত্তরে স্বজন হারালো। তাদের হারানো শৈশব এবার হারিয়ে গেল আরো বেশি গাঢ় অন্ধকারে। সেই গল্পই বলব এবার।

৪.
আমরা আশরাফুল হক নিশানের গল্পও শুনতে পারি। প্রায় একই রকম গল্প। তবে, একটু আলাদাও। আমরা যারা বাবা কিংবা মাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যেতে দেখেছি কিংবা পাকিস্তানি সেনা বা রাজাকার-আলবদরদের হাতে নিহত হতে দেখেছি, তারা যত ছোটই থাকি না কেন, স্মৃতিতে বাবা কিংবা মা রয়েই গেছেন। যেমন, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা হোসেন আর তাঁর একমাত্র সন্তান সুমন জাহিদ। একাত্তরে সুমনের আট বছর বয়স। ওর সামনে থেকেই ওর মাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল হানাদারেরা। সুমনের স্মৃতিতে আছে ওর মা।
কিন্তু নিশানের ক্ষেত্রে আমরা কী বলব? নিশানের বাবা ডা. আজহারুল হককে যখন ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ওর মা সালমা হক অন্তঃসত্ত্বা। মাঝ নভেম্বরে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরদিনই ডা. হকের লাশ পাওয়া যায় নটরডেম কলেজের উল্টোদিকে কালভার্টের গর্তে। নিশানের জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশে।
একটু আগে বলছিলাম শৈশবহীন মানুষদের কথা। নিশানকে কী বলব? জন্মের পর বাবার ছবিই ওর সম্বল। ও কি শুধু শৈশবহীন, নাকি শৈশব শব্দটিই ওর নামের পাশে একেবারেই যুক্ত হতে পারে না? এই তো সেদিন ফেসবুকে ছবি দিয়ে বাবাকে স্মরণ করেছে নিশান। আর ধক্ করে উঠেছে আমার বুক। একাত্তরে নিশানের মায়ের বয়স ছিল বিশের কোঠায়। স্বাধীন বাংলাদেশে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে কী সংগ্রামটাই না করতে হয়েছে তাঁর! টিকে থাকার সংগ্রাম করতে করতেই তাঁকে যোগ দিতে হয়েছে একাত্তরের ঘাতকবিরোধী আন্দোলনে। কখনো শহীদ মিনারে, কখনো জাতীয় স্মৃতিসৌধে, কখনো বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে দাঁড়িয়ে তাঁকে সোচ্চার হতে হয়েছে।
এ গল্প পৃথিবীর সবচেয়ে ট্র্যাজিক রূপকথাকেও হার মানায়। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের মৎস্যকন্যা শেষপর্যন্ত রূপান্তরিত হয়েছিল ফেনায়। সালমা হক ফেনার মতোই ভেসে আছেন স্বাধীন বাংলাদেশে। কোনো স্বপ্নই তাঁর চোখে নেই।

৫.
ছড়িয়ে যাওয়া গল্পটিকে আবার গুটিয়ে নিয়ে আসি। আবার শাওনে ফিরে যাই। গত বছর কোনো এক সন্ধ্যায় হঠাৎ একটি ফোন পেলাম ওর, ‘জাহীদ ভাই, আমি না গানটা করেছি।’
আমি তখন গাড়িতে। জ্যামে আটকে আছি। তাই আগ্রহবিহীনভাবেই বলি, ‘কোন গানটা।’
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। বাবার গানটা।’
‘খুব ভালো।’ এবারও আমার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল না, যা ওকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
কিন্তু ফোন ছাড়ার পরই আমার মাথায় ঝলক দিয়ে ওঠে শব্দদুটো। ‘বাবার গানটা’ শব্দযুগল আমাকে নিঃস্ব করে দেয়। আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা এই গানটি যে কারণে অমর হয়ে উঠল, তা তো আলতাফ মাহমুদের দেওয়া সুর! সেই গানই করেছে তাঁর মেয়ে শাওন মাহমুদ! আমি অফিসে পৌঁছেই শাওনকে ফোন করি। জেনে নিই বিস্তারিত। তারপর ‘মেয়ের কণ্ঠে বাবার গান’ নামে একটি ফিচার লিখি প্রথম আলোয়।
গানটা শুনি শাওনেরই দেওয়া ফেসবুক লিংকে। ভালো লাগে। অবসকিউরের টিপু ভাই শাওনের সঙ্গে ঘর বেঁধেছেন। মেয়ের কণ্ঠে বাবার গান গাওয়ার আয়োজনটার সঙ্গে তাঁর আন্তরিক যুক্ততা আমাকে স্পর্শ করে।
৬.
সেটা জোট সরকারের আমল। একের পর এক মূল্যবোধের সমাধি ঘটছে তখন। নিজামী আর মুজাহিদকে মন্ত্রী বানিয়েছে সরকার। ওদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা দেখে আহত হয় আমাদের মায়েরা, আহত হই আমরা। তখনো আমরা বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি, একাত্তরের ঘাতকদের বিচার হতে পারে।
১৪ ডিসেম্বর মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গেছি আমরা প্রজন্ম ’৭১-এর পক্ষ থেকে। সেখানে টেলিভিশনের রিপোর্টাররা নানা প্রশ্ন করছে। একটি প্রশ্নের উত্তরে শাওন বলেছিল, ‘ওরা আমাদের মারলে আমরাও ওদের মারব!’ ‘আঘাতের জবাব প্রত্যাঘাত’ কিংবা ‘মারের জবাব মার’ কথাগুলো যেন শাওনের কথায় মূর্ত হয়ে উঠল। তখন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাতে এতটা মনোবল আমাকে বিস্মিত করেছিল। এরপর সে বছরই দু-একটি টকশোতে শাওনের সঙ্গে অংশ নিয়েছি। আমরা আমাদের কথা বলেছি।

৭.
কি্ন্তু লক্ষ করে দেখলাম, আমাদের সবার শৈশব আমাদের জানা নেই।
এ কারণেই শাওনকে জিজ্ঞেস করলাম ওর শৈশবের কথা।
বলে নেওয়া ভালো, শৈশবহীন আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই একটি মিল আছে। আমরা সবাই বছরে একবার কোনোভাবে এক সেট পোশাক বানাতে পারতাম। শৈশবে সবাই খুব দ্রুত বেড়ে ওঠে, তাই সেই পোশাক খুব দ্রুত আঁটো হয়ে যেতে থাকে। কিন্তু নতুন আরেক সেট পোশাক বানানো বা কেনার মতো সামর্থ্য আসলে গুটিকয় শহীদ পরিবার বাদে কারোরই ছিল না। ফলে আমাদের প্যান্ট যখন গোড়ালির ওপর উঠে যেত, তখনও বন্ধুদের রসিকতা মুখ বুজে সয়ে আমরা স্কুলের ক্লাস করতাম, একই পোশাক পরে স্কুলে আর মেহমানের বাড়িতে যেতাম। এই তো, আমাদের সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ইউনিফর্মের শার্টের রং ছিল হালকা নীল। ফলে, এই শার্ট পরে স্বজনদের বাড়িতে গেলে কেউ বুঝতেই পারত না, স্কুলের পোশাকেই চলে এসেছি।
শাওনের জীবনের কাহিনীই বা ব্যতিক্রমী হবে কী করে?
শাওন পড়ত ভিকারুননিসা নূন স্কুলে। ওর ক্লাসে যারা পড়ত, তাদের সবার বাবার গাড়ি ছিল। ক্লাসের একমাত্র ছাত্রী শাওন, যাকে আসতে হতো রিকশায় করে। ছোটবেলার এই বৈপরীত্য শাওন এখনো ভুলতে পারে না। আর স্কুলের খাতার বিষয়টি? খাতা তো কিনতে হতো স্কুল থেকেই। সে খাতার যে দাম ছিল, তাতে এক ক্লাসের পুরনো খাতার লেখা হয়ে যাওয়া পাতাগুলো মলাটের ভিতরে রেখে সেই খাতা দিয়েই শুরু করত পরের ক্লাসের লেখালেখি। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেওয়া হয়নি অনেকের মতো, পুরনো বই দিয়েই চালাতে হয়েছে পড়াশোনা।
স্কুল জীবনের শুরুতে শাওনের নাম হয়েছিল ক্রাইং বেবি। স্কুলে গেলেই কাঁদত ও। আর স্কুলে যাওয়া শুরু করার প্রথম ৬-৭ মাস বমি করত খুব। এই বমির পেছনের গল্পটি অনেকেই জানে না।
একাত্তরে শাওনের বয়স ছিল তিন বছর। ওর বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তিন বছরের শিশুটির মনে আতঙ্ক ভর করেছিল। ভোরে বা সকালে হঠাৎ উঠলে ওর বমি হতে থাকে। বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে চুপ হয়ে গিয়েছিল শাওন। প্রথম দুই বছর আতঙ্ক ছিল প্রকট। ক্লাসরুমের বাইরে বসে থাকতেন মেজ মামা। তাঁর পা দেখা যেত দরজার বাইরে। তবেই আতঙ্ক কাটত শাওনের। শিক্ষকেরা খুব সাহায্য করেছেন ওর বেড়ে ওঠার ব্যাপারে।
উইকএন্ডে দিনু মামা যখন কোকা-কোলা খাওয়াতেন, তখন সেটা ছিল জীবনে উল্লেখ করার মতো একটি বিষয়। মধুমিতা সিনেমা হলে তিন মাসে একবার সিনেমা দেখার আনন্দও ভোলা যায় না, এ যেন ঈদের আনন্দ এনে দিত মনে।
শাওনের মনে আছে ওর দিদু (নানি) নিজের সময়ের একটা বড় অংশই দিতেন শাওনকে। মা তখন জীবন সংগ্রামে রক্তাক্ত। দিদুই ছিলেন ভরসা। শুক্র আর শনিবার এই দিদু মাজারে মাজারে গিয়ে খুঁজতেন আলতাফ মাহমুদকে। ভাবতেন, কোনো একদিন দেখা পেয়ে যাবেন তাঁর।
৮.
দাদি আশরাফুন্নেসা আমার মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, ‘কাঁদছ কেন? আমি বিশ্বাস করি সিরাজ বেঁচে আছে। পাকিস্তানের কোনো কারাগারে ওকে রেখে দিয়েছে। ও তো কোনো অন্যায় করেনি। ওকে কেন মেরে ফেলবে?’
মৃত্যুর আগপর্যন্ত দাদি বিশ্বাস করেননি, তাঁর ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমার মা, নূরজাহান সিরাজী আটটি সন্তান নিয়ে বিধবা হলেন। এরপর যে সংগ্রাম তিনি শুরু করলেন, তা থেকে জীবনের শেষদিন অবধি রেহাই পাননি। অল্প কটি টাকায় বিশাল সংসার টেনে নিয়ে এগিয়ে চলা, সে এক বিশাল যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ময়দান হাহাকারে ভরা, না পাওয়ার বেদনায় পূর্ণ, হতাশায় ঢাকা। আবার এরই মধ্য দিয়ে যখন কোনো সাফল্যের খবর আসে, তখন হৃদয়ে উৎসবের জন্ম হয়। সেই আনন্দ-বেদনার কাব্যই তিনি লিখেছেন আজীবন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার হতাশা বা ঈর্ষার জায়গাটি কিন্তু অন্যভাবে আমাদের জীবনেও ছিল। রয়্যাল গুলি কিংবা রাস উৎসব নিয়ে আমাদের আক্ষেপ ছিল না সত্যি, কিন্তু যে জীবন পাওয়া উচিত ছিল, সেটা পাইনি বলে কষ্টও ছিল।
বাসের পাদানিতে কোনোমতে পা রেখে কলেজ যাওয়া, একদিন বন্ধুদের শিঙাড়া খাওয়ালে পর পর চারদিন হেঁটে কলেজে যাওয়া, ফুটপাত থেকে প্যান্ট কিনে পাড়ার দর্জিদের দিয়ে ‘ফিটিং’ করিয়ে নেওয়া-কী জীবনই না ছিল আমাদের! আর পঁচাত্তরের পর থেকে দেশ যখন উল্টোদিকে হাঁটা শুরু করল, তখন আমাদের স্বজনদের আত্মবলিদানের প্রসঙ্গটিই দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে লাগল। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হচ্ছে। এটা একটা ভরসার জায়গা। এই বিচার আমাদের দুঃখ ভোলাতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু জাতি তাঁর মাটিতেক জন্ম নেওয়া কুলাঙ্গারদের চিহ্নিত করে সাজা দিতে পারছে, এটাও কম বড় পাওয়া নয়।
আমরা শৈশব হারানো কতিপয় মানব সন্তান সময়ের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে শিখেছি। স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছি। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হওয়ার পর প্রজন্ম ’৭১-এর সদস্যরা নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি।
সবসময় মনে হয়, আমরা কাছাকাছি আছি। রক্তের বন্ধন বলে একটা কথা আছে। আমাদের স্বজনেরা রক্ত দিয়ে আমাদের সবাইকে সেই বন্ধনে আবদ্ধ করে গেলেন। তাই শাওন মাহমুদ, আসিফ মুনীর, শমী কায়সার, নুজহাত চৌধুরী শম্পা, আশরাফুল হক, গোলাম মোর্তজা কিংবা সুমন জাহিদ কিংবা একাত্তরে স্বজন হারানো কেউ একজন যখন পাশে এসে দাঁড়ায়, তখন হৃদয়ের খুব কাছের তন্ত্রীতে বুঝি ঝংকারের শব্দ পাই। সেই ঝংকারই আমাদের সম্পর্ককে গাঢ় করে, নিবিড় করে। আমাদের বাঁচতে শেখায়।

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

thirteen − 4 =