সঙ্গী পছন্দে নারীর স্বাধীনতা

করেছে Suraiya Naznin

সুরাইয়া নাজনীন-

একজন নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার বা ক্ষমতা কতটুকু? আমাদের সমাজ-সংসারে, মুখে মুখে অনেক কিছু বললেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। আর যদি তা হয় জীবনসঙ্গী নির্বাচন! নারী মেধাবী হলেও এক অদৃশ্য জালে আবদ্ধ। জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিজে পছন্দ করলে নারী-পুরুষ উভয়কেই কমবেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, এমনটাই বলছিলেন বিশেষজ্ঞরাও।

নারী-পুরুষ যখন একটা সম্পর্কে জড়ায়, তখন দুজনেরই সংশ্লিষ্টতা থাকে। দায়বদ্ধতা থাকে উভয়ের কিš‘ কটু কথা, গালমন্দ, হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ভাগটুকু নারীরই বেশি। এসব এক দিনে হয়নি। আমাদের সমাজের পরতে পরতে এমন দৃষ্টিভঙ্গি যেন সবার রক্তে মিশে আছে। মাইকে, ব্যানারে, টিভির পর্দায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় বড় লেকচার দিলেও নিজের ঘরে ঘটে চলেছে নিত্য এগুলো।

দৃষ্টিভঙ্গির অসমতা
রক্ষণশীল এই সমাজে মেয়ে যত বড় জজ, ব্যারিস্টার হয়েই পাত্র পছন্দ করুক না কেন, সে বেহায়া, নির্লজ্জ, অভদ্র। বিয়েটা বাবা-মায়ের মনের বিরুদ্ধে হয়ে গেলেও সে বউকে কখনো সহজভাবে মেনে নেয় না ছেলের পরিবার। বাইরের সমাজে আধুনিকতার নাটক করলেও ঘরে কিন্তু মেয়েটি ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারে না। ব্যতিক্রম হয় খুবই কম। এমনটাই বলছিলেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।
তিনি আরও বলেন, আইনের ক্ষেত্রে নারীকে ১৮ বছর বয়সে ভোটের অধিকার দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র তাকে বিশ্বাস করছে কিন্তু পরিবার, সমাজ তাকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিচ্ছে না। এমন স্বার্থপরতা আর দ্বৈত আচরণ নারীর সঙ্গে চলে, চলছে।

যৌতুকপ্রথার বীজ বপন
মুখে না বললেও আচরণে আমরা চাই নতুন বউয়ের সঙ্গে ঘরভরা জিনিস আসুক। তবে সরাসরি বলার দিনও শেষ হয়ে যায়নি। বিয়ে ঠিক করার সঙ্গে সঙ্গে দাবিদাওয়াগুলোও লিপিবদ্ধ হয় মেয়ের পরিবারের কাঁধে। আমাদের সমাজটাতে যৌতুকের বীজ বপন করেছি আমরা নিজেরাই। সেই বীজ থেকে তৈরি করছি বড় বড় বটবৃক্ষ। সময় বদলালেও পরিবর্তন হচ্ছে না এসব অন্যায় দৃষ্টিভঙ্গির।
তবে যৌতুকের বিষয় একটু আবডালে পড়ে, যদি নারী নিজে পছন্দ করে। সে ক্ষেত্রেও ছেলের পরিবারের জ্বলন্ত আগুন থাকে মস্তিষ্কে, মগজে। মেয়েটি বউ হয়ে এলে কথা শুনতে হয় উঠতে-বসতে। কারণ, দর-কষাকষির সেই পর্যায়টি জিতে যাওয়া ওই মেয়ের ক্ষেত্রে হয়নি।

তার সিদ্ধান্তে সে জয়ী হলেও বৈবাহিক জীবনে শতভাগ ভালো থাকার পরিবেশটি গড়ে ওঠে না, বললেন তুরিন আফরোজ।

জেন্ডার-বৈষম্য
জেন্ডার-বৈষম্যের শিকার নারী বরাবরই। বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে এই বৈষম্য আরও তুঙ্গে। একজন পুরুষকে সামনাসামনি কিছু না বললেও নারীটাকে অবলীলায় দুকথা শুনিয়ে দেওয়া যায়। কারণ, নারী এখনো প্রতিবাদ করতে শেখেনি। তার অধিকারটুকু বুঝে নিয়ে আগলে রাখার পরিবেশটা সৃষ্টি করা হয়নি। সে জন্য দরকার সামাজিক পরিবর্তন, ব্যক্তিগত পরিবর্তন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদারতা।

বাল্যবিবাহ
গ্রামে ১২-১৪ বছরের ছেলে-মেয়েকে নিজেদের পছন্দে বিয়ে করতে দেখা যায়। কিন্তু এখানে ছেলে-মেয়ের সিদ্ধান্ত দেওয়া-নেওয়ার বিষয় থাকে না। কারণ, সে সময় তাদের শিশু বয়স। আইনগতভাবে যেমন এটা অপরাধ, তেমনি প্রতিটি পদক্ষেপই হবে ভুলে ভরা। তাই বিয়ের সিদ্ধান্ত শুধু নিলেই হবে না, বয়সটাও দেখতে হবে।

 

সিদ্ধান্তের প্রভাব
মা-বাবা ছোটবেলা থেকেই নির্ধারণ করে দেয় আমার সন্তান ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে কিš‘ ছেলে-মেয়ে বড় হলে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করে না, রীতিমতো নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপাতে থাকে। তাই নিজের অমতে পড়াশোনা কিংবা পেশা নির্বাচন করতে হয়। তবে বিয়ের ক্ষেত্রে যদি নিজের পছন্দের কথা জানানো হয়, তখন আকাশ ভেঙে পড়ে বাবা-মায়ের মাথায়। যে সুবোধ বালিকাটি সারাজীবন পরিবারের কথায় চলেছে, সে কিনা পাত্র পছন্দ করবে? তাদের অভিমত থাকে এইটুকুন মেয়ে আবার কি-ই পছন্দ করবে বা করেছে। তার পছন্দকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করা হয় না। বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তমতো বিয়ে করে যদি বৈবাহিক
জীবনে অশান্তি হয়, তখন দোষ দেওয়া হয় নিয়তির।

পারিবারিক আইন
সব রকম বৈষম্যের মূলে আছে পরিবার এবং সমাজে নারীর অধস্তন অবস্থান এবং সেটার সমর্থক দৃষ্টিভঙ্গি। সম্পদে সমান অধিকার না থাকলে নারীর অধস্তন অবস্থান বা এই দৃষ্টিভঙ্গির বাধাগুলো কাটবে না। আর তাই পারিবারিক আইনগুলোর অসম বিধানের সংস্কার খুবই জরুরি। নারী অধিকারকর্মীরা অনেক দিন থেকেই একটি সর্বজনীন ও সম-অধিকারভিত্তিক পারিবারিক আইন দাবি করে আসছেন।
এসব আইনের বাস্তবায়ন হলে নারী তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক ধাপ এগিয়ে যাবে। তখন বিয়ের ক্ষেত্রেও তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ কিছুটা হলেও সহজ হবে।

জীবনসঙ্গী বাছাইয়ে নারীর অধিকার সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানী ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, জীবনসঙ্গী বাছাই জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে ছেলেমেয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিক, এটা পরিবার কিংবা সমাজ মানতে পারে না। এ বিষয়ে আমাদের সমাজে পুরুষকে ততটা অবজ্ঞা না করলেও নারীকে রীতিমতো জাঁতাকলে পেষা হয়। তার প্রতিবাদ-প্রতিরোধের দরজাটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুটি কথা বলার সাহস চিরতরে শেষ হয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, বিয়ের বয়স হলে ছেলে মেয়ে পছন্দ করবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু সমাজের গোঁড়ামি ও পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি তা হতে দেয় না, দিলেও তা বিষফোড়ার মতো বয়ে বেড়াতে হয়। ছেলের বাবা-মা মনে মনে খুব অখুশি হয়। ছেলেকে তেমন কিছু বলে না, ভয়ে। ছেলে যদি বাবা-মাকে ফেলে চলে যায়! এদিকে বউটার উঠতে-বসতে খোঁটা শুনতে হয়। মেয়ের বাড়ির লোকেদের গোষ্ঠী উদ্ধার করা হয়। আশপাশের মানুষেরাও বাঁকা চোখে দেখে, হাসি-তামাশা করে। নানা রকম মুখরোচক গল্প বানায়।

 

সাইকোলজিক্যাল কনফ্লিক্ট

বিয়ের বিষয়ে আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো পরিবার মনে করে ছেলে-মেয়ে যতই বড় হোক, সব সময় ছোটই থেকে যায়। তাই তারা বিয়ের মতো এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না কিংবা ভুল করবে। পাত্র বা পাত্রী যত ভালোই হোক না কেন, সেই সম্পর্ক তারা মেনে নিতে পারে না। তাদের এই চিন্তাধারা গভীর সাইকোলজিক্যাল কনফ্লিক্ট। তবে আমি অনেক মেয়েকে দেখেছি বাবা-মায়ের কথামতো বিয়ে করেনি কিংবা পছন্দের জায়গাটিও তৈরি করেনি। বাবা-মায়ের একপর্যায় বয়স হয়েছে, বড় ভাই দায়িত্ব না নিয়ে সংসার গুটিয়ে চলে গেছে অন্যখানে। সেই মেয়েটির সারাজীবনে আর কোনো গতি হয়নি পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে। সে ক্ষেত্রে মেয়েটির জীবন কাটে নিঃসঙ্গতায়। এসব সংকট কাটিয়ে বেশির ভাগ নারীই উঠতে পারে না। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। আর্থিক স”ছলতা তৈরি হয় না। তাই পারিপার্শ্বিক কিংবা সামাজিক প্রতিদানের আশায় না থেকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, এভাবেই বলছিলেন ডা. আনোয়ারা হক।

সাবকনশাস কনফ্লিক্ট
নারীরা একটা অদ্ভুত জাত। বিয়ে হলে শ্বশুরবাড়ির অবহেলা, অবজ্ঞার কথা লুকিয়ে রাখে। কিছুতেই প্রকাশ করতে চায় না। যদি বাবা-মা কষ্ট পায়, সেই ভয়ে। তার থেকে পরিত্রাণের পথ না খুঁজে সারাজীবন আঁচল কামড়ে চোখের জলের সাগর বানায়।
গ্রামের চিত্রগুলো আরও ভয়াবহ। স্বামীর যৌতুক আবদার, শ্বশুরবাড়ির নিগ্রহ, অন্যায়-অত্যাচার হলেও মুখ ফুটে কখনো বলে না আমার সমস্যা হচ্ছে, আমি ভালো নেই! নিজের আত্ম-অহংকার বজায় রাখার জন্য বেশির ভাগ নারী এটা করে থাকে, এভাবে সাবকনশাস কনফ্লিক্ট তৈরি হয়।

সিদ্ধান্তের প্রভাব
সন্তান বড় হলেও বাবা-মা তাদের ওপর সিদ্ধান্তের প্রভাব খাটায়, এটা বিয়ের ক্ষেত্রে বেশি হয়। তারা তাদের সিদ্ধান্ত সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়। কিন্তু ছেলে-মেয়ে কাউকে পছন্দ করলেই বলে ফেলে, ‘আমাদের মুখে চুনকালি দিলি। এবার আমরা সমাজে মুখ দেখাব কী করে?’ কিš‘ সন্তানের পছন্দের প্রাধান্য কোনোভাবেই দিতে চায় না। এটা পরে পারিবারিকভবে খুব খারাপ একটি বার্তা নিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে মেয়ের পছন্দটাকে আরও ইগনোর করা হয় আমাদের সমাজে, আমাদের পরিবারে।

বাড়াতে হবে অন্তর্দৃষ্টি
পারিবারিক অন্তর্দৃষ্টি বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে সমাজের অন্তর্দৃষ্টি। এই বিষয়টাতে পরিবারের সদস্যদের মতামত থাকলেও সমাজ ও পারিপার্শ্বিক প্রভাবের কারণে মুখ খুলতে পারে না। সমাজের শক্তি বৃহৎ। নারীর বৈষম্য এবং নারীর পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হলে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে।

 

প্রতিবাদী আচরণ
অনেক নারী এখনো মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না, আমাদের সমাজে এই সংখ্যাই বেশি। সাময়িক ভয় তাকে গ্রাস করে। ভাবে, কিছু বললে তাকে যদি তাড়িয়ে দেওয়া হয়, কিংবা নির্যাতন করে। সেই ভয়ে দিনকে দিন নিজের ই”ছা, পছন্দকে গলা টিপে মেরে ফেলে। কিš‘ ধীরে ধীরে প্রতিবাদের জায়গাটি তৈরি করলে নারীর অব¯’ান, বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র পছন্দসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থা তৈরি করা যেত অনায়াসে। ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হক এ বিষয়টাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা বলেছেন নারী সমাজকে। কারণ, যৌক্তিকভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নারীমুক্তি সম্ভব, তিনি বললেন।

পারিবারিক বন্ধন
সমাজের নেতিবাচক দিক আছে ভূরি ভূরি। বিশেষ করে নারীদের বিষয়ে সবাই উদাসীন। একটা অবস্থানে না যাওয়া পর্যন্ত পথটা খুব কঠিন। নানা রকম ঝড় আসতে পারে। তাই চলার পথে পদে পদে চোখ-কান খোলা রেখে চলতে হবে। কিš‘ অনেক পরিবার আছে সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কটা একেবারেই বন্ধুর মতো তৈরি করে। সে ক্ষেত্রে বিয়েতে অনায়াসে বাবা-মায়ের কাছে পাত্র-পাত্রীর বিষয়ে পছন্দের কথা শেয়ার করতে পারে, তখন সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাবা-মা সন্তানের পছন্দের মানুষটির সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করে। সে জন্য সমাজ পাল্টাতে পারিবারিক বন্ধন খুব জরুরি, বললেন আনোয়ারা সৈয়দ হক।

সমাজে তথাকথিত রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন কিছু লোক নারীকে সর্বক্ষেত্রে অবদমিত করে রাখতে চায়। ধর্মের অজুহাত দেখিয়ে তারা নারীকে এগিয়ে যেতে বাধা দেয়। কুসংস্কারা”ছন্ন নিয়মের জালে আবদ্ধ হয় নারী। ফলে তাকে কাটাতে হয় অন্ধকার জগতের এক বন্দিজীবন। বর্তমানে শহরে এ অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হলেও
গ্রামে ও মফস্বল অঞ্চলে এ ধারণা এখনো বিরাজমান। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যব¯’ায় সমাজে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। নারীরা শিকার হচ্ছে যৌতুক, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, অপহরণ ইত্যাদি ঘৃণ্য অপরাধের।

নারী-পুরুষের বৈষম্যের বীজ মানুষের মস্তিষ্কে আদিকাল থেকেই বপন করা হয়েছে। সে বীজ উপড়ে ফেলতে আরও অনেক দিন লাগবে। সময় এসেছে নারীদের আরও এগিয়ে যাওয়ার। নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে হবে। নারীকে অবহেলিত রেখে সমাজ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। পুরুষদের সাফল্যের পেছনেও রয়েছে নারীর অবদান। এ জন্য নারীর চিন্তাশক্তি, দূরদৃষ্টি ও মেধা ব্যবহার করে এগিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও নারীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছে। যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছে। কিš‘ অধিকাংশ নারী তাদের নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দেশ গঠন করছে এবং বলিষ্ঠ ও শিক্ষিত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলছে। নারীরা দেশকে ভালোবাসে, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে জানে, উন্নয়নপ্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারে, তারাই আমাদের সহায়তা করতে পারে একটি শিক্ষিত প্রজন্ম গঠনে। নারীরা হচ্ছে দেশের আত্মা ও শক্তি। নারীর স্নেহ-মমতা ছাড়া কোনো পুরুষও বেঁচে থাকতে পারে না। পৃথিবীর পুরুষেরা আসে অপূর্ণ হয়ে। মা বা স্ত্রীর ভালোবাসা তাকে পূর্ণতা দান করে। নারীরা তবু অবহেলিত আজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো রকম মূল্যায়ন নেই। বিয়ের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিলে আধুনিক সমাজও তাকে ন্যক্কারজনকভাবে অপমান করে। অনেক নারী পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে তোয়াক্কা না করে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। কিন্তু বেশির ভাগ নারী লোকলজ্জার ভয়ে নিজের পছন্দকে বলিদান দেয় জীবনভর।

 

 

বর্তমানে কথিত আধুনিক সমাজে আর একটি ভয়াবহ বিষফোড়া যুক্ত হয়েছে। আর তা হলো বিবাহবিচ্ছেদ। বিবাহবিচ্ছেদ হতেই পারে। কিন্তু একতরফা দোষ দেওয়া হচ্ছে নারীর ওপর। এটা সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। বললেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক গওহর গালিব। তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, তাই জন্মগতভাবে আমরা কিছুটা ছাঁচে তৈরি। সেই ছাঁচ থেকে বের হতে পারি না, চেষ্টাও করি না। চাপিয়ে দেওয়ার স্বভাবটি আমাদের তুমুলভাবে গ্রাস করে। সংসারের জন্য ভালো কিছু করলেও নারীর বাহ্বা পাওয়ার সেই জায়গাটি তৈরি হয় না। শতভাগ শাসনকেন্দ্রিক মনোভাব নিয়ে আমরা আমাদের পারিবারিক চর্চা চালিয়ে যাই।’
শিল্প-সাহিত্য, গল্প, উপন্যাসে নারীকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তব জীবনে এর কোনো প্রয়োগ নেই। একজন নারী কখনো তার পরিবারের সদস্যদের খারাপ চায় না। সন্তানের ভালোর জন্য জীবন দিতেও পিছপা হয় না। তাই তো প্রবাদে আছে, ‘আমার সন্তান থাকুক দুধেভাতে।’ আমাদের সমাজে, ‘পুরুষেরা বিয়ে করে, নারীদের বিয়ে হয়।’ অথাৎ নারীর ভূমিকা খুবই নগণ্য। সে আরেকজনের চালিকা শক্তি হয়ে কাজ করে। নিজের ই”ছা, অধিকার, পছন্দ বলে কিছু যে আছে, তার কোনো উদাহরণ পরিবার কিংবা সামাজিক অলিগলিতে পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে গওহর গালিব বলেন, প্রথমত- নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাড়াতে হবে। শিক্ষার বিষয়টিতে পরিবার তথা সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিয়েতে একজন নারীর অধিকারের দুয়ার হলো কাবিননামা। আমরা বর্তমানে কাবিনটাকে ফ্যাশন হিসেবে দেখি। কাবিননামায় টাকার অঙ্ক যত বেশি, সে তত ক্রেডিট নেবে কিš‘ মূল্যায়নের জায়গাটি তখনই তৈরি হবে, যখন পরিশোধ হবে শতভাগ। এ ক্ষেত্রে নারী বঞ্চিত হচ্ছে, আবার বাবার সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার নারীদের বিষয়ে গঠনমূলক ও গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়ন করছে, যার বাস্তবায়ন হলে অনেক বিষয়ে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

গওহর গালিব আরেকটি বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বললেন, নারীর স্বাছন্দ্য এবং অধিকারের জন্য পরিবারের অংশগ্রহণ একান্ত জরুরি। পরিবারে পুরুষ সদস্যরা যদি নারীকে ছোট ছোট সহযোগিতা করে, তাহলে তার কাজটি আর একটু সহজ হয়ে যায়। মূল্যায়ন এবং অধিকারের জায়গাটি দৃঢ় হয়।

দেখা যাচ্ছে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কিছুটা হলেও বেড়েছে। কিন্তু সঞ্চয়ের বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রণোদনা কিংবা স্কিম চালু করা হয়নি, এ ক্ষেত্রে সরকার তথা রাষ্ট্রের ভূমিকা জোরালো। সঞ্চয়ের উদ্যোগ নিয়ে সুপরিকল্পনা এবং পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হলে নারীর পিছিয়ে পড়ার কিংবা অবমূল্যায়নের জায়গাটির পরিবর্তন হবে। সামনে চলার ক্ষেত্রে নারীর পথটি অনেক বেশি সুন্দর হবে। জীবনসঙ্গী নির্বাচনেও নারী গুরুত্ব পাবে অবলীলায়, অনায়াসে।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

five × three =