‘মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন’ নামক আসনগুলো মূলত নির্দেশ করে শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের দিকে, যারা আসলে চলাচলে অক্ষম কিংবা স্বাভাবিক চলাচলে তাদের সমস্যা হয়। কিন্তু সঙ্গে মহিলা শব্দটি যুক্ত করে এই সমাজ নারীদেরও সেই অক্ষম অবস্থায় আবদ্ধ করে ফেলেছে। তাদের অবস্থান আর একজন শিশু কিংবা প্রতিবন্ধীর অবস্থান যে আলাদা নয়, সেটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

সন্ধ্যা ছয়টা বেজে আটত্রিশ মিনিট। বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি বাসস্টপেজে দাঁড়িয়ে আছি কলিগকে সঙ্গে নিয়ে আধা ঘণ্টা হলো। কলিগ শুধু মেয়ে বলেই পরপর চারটা বাস তাকে নিতে অসম্মতিও না ঠিক, একদম নাকচ করে দিল। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে রাতের অন্ধকারে ডুবছে আর টেনশনে আমরা দুজন রীতিমতো ঘামছি। কলিগ কীভাবে বাড়ি ফিরবে, তা নিয়ে টেনশন নয়; টেনশনটা মূলত এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারী কীভাবে বাড়ি ফিরবে তা নিয়ে। এটা আমার নিত্যদিনের চোখে দেখা একটা তুচ্ছ ঘটনা মাত্র।

ধরলাম, কলিগ বাসে উঠল কোনোমতে। তারপর কী? ‘মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন’ নামক আরেক পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে আটকে থাকা। এই আসনগুলো মূলত নির্দেশ করে শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের দিকে, যারা আসলে চলাচলে অক্ষম কিংবা স্বাভাবিক চলাচলে তাদের সমস্যা হয়। কিন্তু সঙ্গে মহিলা শব্দটি যুক্ত করে এই সমাজ নারীদেরও সেই অক্ষম অবস্থায় আবদ্ধ করে ফেলেছে। তাদের অবস্থান আর একটি শিশু কিংবা প্রতিবন্ধীর অবস্থান যে আলাদা নয়, সেটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

শুধু লেখাতেই সীমাবদ্ধ এই আসনগুলো।

কিন্তু আসলে কি ব্যাপারটা তাই? একজন পুরুষ যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে চলন্ত বাসে দাঁড়াতে পারে, একজন নারী তা পারে না। একজন নারী শারীরিকভাবে কিছুটা নমনীয় আর পুরুষ হয় দৃঢ়। তা ছাড়া একজন নারীর সঙ্গে তার সন্তান কিংবা ব্যাগও থাকতে পারে; অথবা আরও একটু পরিষ্কার করে বললে একজন নারী অন্য একজন পুরুষের সংস্পর্শে অস্বস্তিবোধ করে- মূলত এ ধরনের কারণগুলোকেই বিবেচনায় নিয়ে মহিলা আসনের সূত্রপাত। কিন্তু সমাজ এই মূল্যবোধটাকেই সামান্য বাঁকিয়ে নারীদেরকে একজন শিশু বা প্রতিবন্ধীর অবস্থানে দাঁড় করায়।

উপরোক্ত ঘটনার কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কেননা, এই যে সংরক্ষিত আসন করে পুরুষেরা নারীদের নিজেদের ছায়াতলে আশ্রিত করল; সেই পুরুষেরাই আবার সেই সংরক্ষিত আসনে গিয়ে বসে থাকে বেশির ভাগ সময়। বাসের হেলপার, ড্রাইভার এমনকি যাত্রীদের কথা অগ্রাহ্য করে তারা ঠায় বসে থাকে সংরক্ষিত আসনে। তারপর যখন একজন নারী এসে তাকে সংরক্ষিত আসনে বসার কারণ জিজ্ঞেস করে, তখন সে গরম তেলে কিছু ছাড়ার মতো ঝাঁজ দেখিয়ে বলে ওঠে,

‘নারী-পুরুষ সকলেই সমান বলেন, সম-অধিকারের গীত গান অথচ সংরক্ষিত আসন নিয়ে কেঁদে বুক ভাসান!’

এখানে আবার শ্রেণিবিভক্ত নারী-পুরুষ উভয়েরই দেখা মেলে! এক দল ভাবে নারীরা কেবল সংরক্ষিত আসনেই বসবে; এক দল ভাবে সম-অধিকারের কথা বলে কেন সংরক্ষিত আসনের দাবি? সমান অধিকার হলে বাড়তি সুবিধা ভোগ করা মানে পুরুষেরা বৈষম্যের শিকার? শুধু পুরুষই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জন্য দায়ী! তাও কিন্তু নয়। নারীরাও নিজেদের পুরুষের আশ্রয়ের ছায়াতলে ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আর এটা বিশেষ করে আমাদের এই উপমহাদেশেই বেশি চোখে পড়ে।

মধ্যযুগে নারীরা ছিল দাসী। হাটে নারীদের কেনাবেচা হতো। তখনকার সময়ে নারীদের জীবনযাপনের জন্য দরকার ছিল পুরুষের আশ্রয়। হোক তা দাসী হয়ে, কিন্তু জীবনযাপনের জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় আর ছিল না। দিন বদলে গেল, সভ্যতার উন্নতি হলো, নারীরা প্রগতিশীল হয়ে উঠল। দাসী থেকে নারীরা পৃথিবীর উজ্জ্বল সব দৃষ্টান্তে নিজেকে নিয়ে দাঁড় করাল।

কিন্তু রক্তে যে একটা বন্দিত্বের স্বাদ রয়ে গেছে। আজীবন খাঁচায় থাকা একটা পাখি যেমন ওড়ার কথা ভুলে যায়, ঠিক তেমনি একজন নারী যেন জন্মগতভাবেই পুরুষের আশ্রয় মেনে নেয়। আর সেই জন্যই একজন স্বনির্ভর বা স্বাবলম্বী নারীও একজন পুরুষের আশ্রয়তলেই নিজেকে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আর এই স্বাচ্ছন্দ্যবোধের মায়াজালে তৈরি হয় এক বিপন্ন মানসিকতা আর সামাজিক পারিপার্শ্বিকতা।

সামাজিক এই পারিপার্শ্বিকতায় নারীরাও ঠিক নারী হয়ে উঠতে পারে না যেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে মুক্তি পেতে তারাও যেন মরিয়া। বিচক্ষণতাকে দূরে ঠেলে পুরুষের আদলে নিজেকে গড়ে তুলতে চায়। পুরুষ যা করতে পারে, তা একজন নারীরও পারা উচিত বলে মনে করে থাকে। কিন্তু কেন?

নারী যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্পী, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে! নারী সভ্যতার জন্ম দেয়। আর যদি নারী বন্ধ্যা হতো, তাহলে পৃথিবী আজকের এই অবস্থানেই আসত না।

তাহলে কেন নারীকে পুরুষের সমান হতে হবে? একজন পুরুষ বাইরে বের হয় বলে নারীকেও বের হতে হবে; একজন পুরুষ জিনস পরে বাইরে ঘোরে বলে নারীকেও তাই করতে হবে; একজন পুরুষ রাত দশটার পর বাইরে থাকে বলে নারীকেও থাকতে হবে। তাহলে নারীর স্বকীয়তা কি অটুট থাকল নাকি ক্ষুণ্ন হলো? হ্যাঁ, তোমার যদি জিনস পরতে ভালো লাগে কিংবা রাত দশটার পর বাইরে থাকার দরকার থাকে, তাহলে অবশ্যই সেটা করা উচিত। কিন্তু পুরুষ করে তোমাকেও করতে হবে, এমন বিপন্ন মানসিকতাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। কেননা, এরকম বিপন্ন অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে একজন নারী, নিজের নারী সত্তাকেই হারিয়ে ফেলে পুরুষের মতো ভাবগাম্ভীর্যতা বজায় রাখার ভিড়ে।

বছর ঘুরতেই চলে এল বিশ্ব নারী দিবস। এই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ভেসে যাবে নারীদের মাহাত্ম্য প্রচারে, নারীদের অধিকার আদায়ে, নারীদের নিয়ে সচেতনতামূলক পোস্ট শেয়ার করে। কিন্তু আদৌ কি এই পোস্টগুলোর খানিকটাও মনে ধারণ করতে পারে এই সমাজ? নাকি শুধু লোকদেখানো নারী উন্নয়নের প্রচারেই সীমাবদ্ধ সামাজিক যোগাযোগের ওই ঘুপচি?

নারী দিবস আসে, নারী দিবস চলে যায়, কিন্তু সমাজ একই রকম গৎবাঁধা আর ছকবাঁধা বৃত্তে বন্দিই রয়ে যায়।

বিশ্বব্যাপী এবারের নারী দিবসের স্লোগান Let all be each for equal বা হ্যাশট্যাগ #EachforEqual। বাংলাতে যার অর্থ দাঁড়ায়: প্রত্যেকেই সমান। এই যে বিশ্বব্যাপী নারী দিবস নিয়ে এত এত সংস্থা ব্যতিব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে, কনফারেন্স করছে; অথচ নারীর যোগ্যতার কথা ওঠে না এক মুহূর্তের জন্যও।

এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় অনুসারে প্রতীকী ছবি।

আজকের নারীর যে অবস্থান, তার জন্য কি নারীর কোনো অবদান নেই? নাকি শুধু নারী কোটার কারণে নারীর আজকের নারী হয়ে ওঠা? নারীর কি যোগ্যতার পরিমাপ তাহলে শূন্য? তাহলে তো সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দয়াতেই নারীর এত উন্নতি তা বাধ্য হয়েই বলতে হয়।

হ্যাঁ, একটা সময় ছিল যখন নারীর কোটার বিশেষ দরকার ছিল। মধ্যযুগীয় সেইকালে নারীর জন্য ঘরের চৌহদ্দি পেরোনোটাই মুশকিল ছিল। নারীকে প্রগতিশীল করে তুলতে এমন ব্যবস্থার দরকার ছিল। কিন্তু আজকের প্রগতিশীল এই যুগে নারী পৃথিবীর পরিসীমা পেরিয়ে মহাকাশের উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গেছে। এই সাফল্যটুকু কি নারী কোটার বদৌলতে এসেছে নাকি নারীর যোগ্যতার মাপকাঠিতে, তা নিয়ে কি তোমার সংশয় আছে?

আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং একজন নারী। আমাদের জাতীয় সংসদের স্পিকার একজন নারী। আমাদের বিরোধী দলের প্রধানও একজন নারী। অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে এমন সব নারীকে নিয়ে, যারা নিজ যোগ্যতার বলে আজকের এ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের কি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে আসতে হয়নি? নাকি তারা এমনি এমনি চলে এসেছেন? তাদেরও মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে, সংবিধান কর্তৃক আইনে সংরক্ষিত আসন ঘোষণা করার পরও। সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়া নারীকেও ঘরে ফিরে স্বামীর অপমানের বোঝা কাঁধে নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে। এ দায় কার?

এই সমাজ তো অনায়াসেই একজন উচ্চশিক্ষিত বেকার নারীকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেয়; কিন্তু এই সমাজ কোনো দিনই মন থেকে একজন উচ্চশিক্ষিত বেকার মেয়েজামাই মেনে নেয় না! জামাই তথা পুরুষ বেকার, ব্যাপারটা যেন একদমই মেনে যায় না। এমনকি স্বয়ং যে নারী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে, সে-ই হয়তো মেনে নেবে না। সংসারে পুরুষের অর্জন মানে সুরক্ষার রক্ষাকবচ। অথচ নারীর উপার্জন যেন চক্ষুশূল। নারীর স্বাধীনতা কোথায় তাহলে? নারীর যোগ্যতাটা কোথায় তাহলে?

পুরুষ বলতেই আমরা বুঝি বাপ-ভাইকে। যারা উপার্জন করে সংসার চালানোতে দক্ষ, যে কোনো বিপদে ঢাল হয়ে পরিবারকে রক্ষার দায়িত্বও তাদের। আর নারী বলতে আমাদের সমাজ আমাদের চিনিয়েছে একদল অবলা মানুষকে, যাদের আমরা মা-বোন-প্রিয়তমের রূপে দেখলেও কলুর বলদের মতো সংসারের হাল চালানোর কাজেই তাদের খাটতে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অথচ সংসারের নিত্যদিনের যুদ্ধে জয় অর্জন করতে হয় সেই অবলা নারীকেই, বাচ্চা লালন-পালন থেকে লেখাপড়ার দায়িত্বও নিতে হয় সেই নারীকেই, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তাদের সেবিকা হওয়ার দায়িত্বও যেন তাদেরই কাঁধে।

এই সমাজে পুরুষ হয় পণ্যের ও ভাবের উৎপাদক আর নারীরা সন্তানের। এই উৎপাদনের বলয়কে ঘিরে তৈরি হয় এক বিপন্নতা, যা পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চাঙা করে প্রতিনিয়ত। আর সে সুবাদেই পুরুষের চাকরি করাটা বাধ্যতামূলক আর নারীর চাকরি করাটা একধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা উচ্চাভিলাষ বলে মানা হয়!

অথচ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে এক দল নারী স্পেসওয়াক বা মহাকাশের শূন্যতায় ভেসে বেড়াল এই তো কয়েক দিন আগেই। গত বছর ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের যে ছবি প্রকাশ করল নাসা, সেটার পেছনেও ছিল এক নারীর অবদান। ম্যান বুকারপ্রাইজের মতো সম্মানিত পুরস্কারে ভূষিত হলো দুই লেখিকা, তা-ও এত দিনের প্রথা ভঙ্গ করে। কিন্তু দিন শেষে সব নারীকেই ফিরে আসতে হয় সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজেই। আবার সেই পুরুষ কর্তৃক নির্যাতিত নারীকেই সহ্য করতে হয় বঞ্চনা।

নারী নির্যাতিত হলেও নারীরই দোষ সবচেয়ে বেশি থাকে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। নারীর চালচলনে ছিল উচ্ছৃঙ্খলা কিংবা ভদ্রঘরের মেয়ে এত রাত করে বাইরে থাকে না-সহ হাজারো অবাঞ্ছিত কথার মালা। কিন্তু যে পুরুষ নারীর ক্ষতি করল, সে কিন্তু সমাজের চোখে ঘৃণিত নয়। আর এখানে এসে আটকে যায় আমাদের নৈতিক শিক্ষা। এই পুরুষতান্ত্রিক পারিপার্শ্বিকতা নৈতিক শিক্ষার বোধটাকেই বিপন্ন করে তোলে। যার জন্য নারীর অধিকার দেওয়াটা জরুরি নাকি নারীর যোগ্যতার পরিমাপটা জরুরি তা স্বয়ং রাষ্ট্রও বুঝে উঠতে পারে না।

‘শুধু প্রাচীনকাল নয়, মধ্যযুগেও পুরুষেরা নারীদের ওপর অমানুষিক উৎপীড়ন চালাত। যখন-তখন যথেচ্ছভাবে তাদের মারধর করত। শুধু তাই নয়, কোমরে, গলায়, হাত-পায়ে শিকল বেঁধে ঘরের ভেতর ফেলে রাখত ওদের। পাছে ওরা পালিয়ে না যায়। নারী সে ট্রাডিশন ক্ষুণ্ণ করল না। আজও তাই তারা হাতে, পায়ে, গলায় শিকল- অবশ্য আগে লোহার ছিল, এখন সোনার পরে গর্ব অনুভব করে।’ -জহির রায়হান

ওপরের উক্তিটি থেকে আমরা কী বুঝতে পারি? নারীরাও কি তাদের যোগ্যতা নিয়ে নিজেরাই দ্বন্দ্বে ভোগে না? এখনো এই স্বাবলম্বিতার যুগে এসেও কেন নারীরা পুরুষের আশ্রয়তলে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়? কেনই-বা সে উচ্চশিক্ষায় দীক্ষা নিয়ে সংসারের জঞ্জালে নিজের ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দেয়? সমান অধিকারের কথা বলে কেন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর ঘাড়েই সংসারের হাল চাপিয়ে দেয় আর নারীই-বা কেন এই হাল বয়ে নেয়? তাহলে সমান অধিকারের মূল্যটা থাকল কোথায়, যদি একজনকেই নির্দিষ্ট বিষয়ের সব দায়িত্ব বুঝে নিতে হয়।

নারী চিরকালই পুরুষ আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ইচ্ছার কাছে বন্দি। একসময় হাটে-বাজারে দাসী হিসেবে বিক্রি হতো। সৌন্দর্যের পরিমাপে তার দাম নির্ধারিত হতো। চেহারার সঙ্গে দৈহিক সৌন্দর্যের কারণেও উচ্চমূল্য পাওয়া যেত। সেই ধারাটা কি বর্তমানেও অটুট নেই? রাস্তার বিলবোর্ডের নারীকে পণ্য হিসেবে দেখানো হয় অহরহ। ফরসা নারীর আধিক্য টিকে থাকলেও কালো মেয়েকে অভিশাপ ভাবার প্রথাটাও বেঁচে আছে। কেন এই বৈষম্য?

কই পুরুষের সৌন্দর্য নিয়ে তো এত কথা ওঠে না সমাজে। পুরুষের ক্ষেত্রে যেখানে যোগ্যতার মাপকাঠি হয় কাজে-কর্মে, শিক্ষা-দীক্ষায়; সেখানে একজন নারীর যোগ্যতার মাপকাঠি হয় কালো না ফরসা, বেঁটে না লম্বা, মাথায় চুল কম না বেশি, নাক খাড়া না বোঁচা, সংসারের যাবতীয় কাজ জানে কি না, এসবই মূলত তার যোগ্যতার পরিমাপ। সারা জীবনের শিক্ষা-দীক্ষা সব জলাঞ্জলি দিতে হয় এই বিপন্নতাকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে।

ফরসা যেন মেয়ের প্রাথমিক গুণ আর দেহসৌষ্ঠব যেন তার উচ্চতর গুণের সার্টিফিকেট। শিক্ষা, দীক্ষা, দক্ষতা এসব কিছুই ফিকে; কেননা নারীর একমাত্র সম্বল কেবল ওই নারীর শারীরিক সৌন্দর্যে।

আর এই পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে আটকে সমাজ তার বিচারবুদ্ধি হারিয়ে একজন নারীর শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, মনন, সৃজনশীলতা কিংবা মানসিকতাকে দৃঢ় করার বদলে উৎসাহ দেয় গায়ের রং ঘষামাজা করে সুন্দর করার দিকে। তাই পারিপার্শ্বিকতার দায়ে স্বয়ং একজন স্বাবলম্বী নারীও ঝুঁকে পড়ে একই দিকে।

নারী প্রগতির এই যুগেও নারী উপভোগ্য সাপেক্ষের মতো একটা তুচ্ছ আর নোংরা দৃষ্টিভঙ্গির শিকার। নারীকে এখনো দেখা এবং পরিমাপ করা হয় পুরুষের পরিপ্রেক্ষিতে। নারী সারাটা জীবনই একটা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগে। তার নিজস্ব কোনো পরিচয় থাকে না। কেননা, এই সমাজ কুমারী নারীকে পিতৃপরিচয়ে, বিবাহিত নারীকে স্বামী পরিচয়ে, এরপর স্বামীহারা হলে সন্তানের পরিচয়ে- এভাবেই একজন নারীর আইডেন্টিটিহীনতায় কেটে যায় পুরো জীবন। অথচ নারীবিহীন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যে শূন্যতায় বিলীন হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট

মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের কথা মনে পড়ে? যার আগে কেউ নারীর অধিকারের কথা তোলেওনি পর্যন্ত। মেরি বলেছিলেন, রাষ্ট্র, সমাজ এমনকি আপনজনের কাছেও নারীরাই সবচেয়ে বেশি শোষিত আর বঞ্চিত। তার কথার সুরে তাল মিলিয়ে কার্ল মার্ক্সও বলেছিলেন, কোন দেশ কত উন্নত তা দেখতে হলে আগে দেখতে হবে সে দেশের নারী আর শিশুদের। নিজেদের পরিবারে দেখা ঘটনাগুলোকেই নাড়া দিয়েছিল মেরিকে। আর তাই তো মেরি বলেছিলেন, পুরুষশাসিত সমাজ ও সংস্কৃতি নারীকে নির্বোধ, প্রশ্নবিমুখ, পরনির্ভরশীল, দুর্বল, আত্মমর্যাদাহীন করে রেখে শুধু নারী জাতির নয়, সমগ্র মানবজাতির ক্ষতি করছে। মেরিও কিন্তু চেয়েছিলেন নারীর সমান যোগ্যতার দাবি।

মেরি যাওয়ার পর আরও এমন অসংখ্য উদাহরণ এসেছে পৃথিবীর ইতিহাসে, যারা নারীর উন্নয়নে অবদান রেখেছে। তাদের সবাই মেরির সুরে সুর মিলিয়ে নারীর সমযোগ্যতার কথা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এই যোগ্যতাকে কাটানোর জন্যই সমযোগ্যতার কথাটা ফিকে করে সম-অধিকারের মশাল প্রজ্বলিত করেছে বিশ্বব্যাপী। অথচ অধিকার আর যোগ্যতায় যে আকাশ-পাতাল তফাত, এটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। আধুনিক প্রগতিশীল যুগে এসেও নারী আবারও আটকে গেল পুরুষতান্ত্রিকতার এই বিপন্ন মূল্যবোধে।

যোগ্যতার বলে নারী যেখানে পুরো পৃথিবীকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে সমান অধিকারের বলয়ে প্রতিনিয়ত নারী নিজেকে পিছিয়ে দিচ্ছে। একমাত্র যোগ্যতা আর মানসিক দৃঢ়তাই নারীর মুক্তির অন্যতম উপায়। করুণা বা দয়া নয়, বরং নারীকে এগিয়ে যেতে হবে তার নিজের যোগ্যতায়। আজকের নারীদের অবস্থান যেমন কেউ তৈরি করে দেয়নি, ঠিক তেমনি ভবিষ্যতেও কেউ এই পথ বা অবস্থান তৈরি করে দেবে না। নারীর নিজেকেই করতে হবে। এভাবেই প্রমাণ পাবে- নারী করতে পারে, নারী পেরেছে এবং ভবিষ্যতেও নারীরা পারবে। আর এ জন্য নারীর সম-অধিকারের কথা না বলে নারীর দৃঢ়তা আর যোগ্যতার কথা বলা উচিত।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে রোদসী ম্যাগাজিন সব নারীকে জানায় সহস্র শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন। তবে রোদসী কখনোই শুধু নারীদের সম-অধিকারের কথা বলে না। রোদসী বলে নারীর সমযোগ্যতার কথা। রোদসী কখনোই বিশ্বাস করে না যে বর্তমানে নারীর অবস্থানের পেছনে নারী কোটারই অবদান বেশি; বরং রোদসী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নারী তার নিজস্ব যোগ্যতা আর স্বকীয়তায় স্রোতের বিপরীতে হেঁটে আজকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। নারী বেঁচে থাক তার যোগ্যতার বিচারে।

 

লেখা: ওয়াজেদুর রহমান ওয়াজেদ 
ছবিসূত্র: সংগ্রহীত 

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

8 + five =