সাজের বিবর্তন নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক

করেছে Sabiha Zaman

চলছে বিয়ের মৌসুম। প্রতিবছর এই সময় ফ্যাশন এবং সাজগোজের নানা খেলা দেখা যায়। বিবর্তন চোখে পড়ে খুব বেশি। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, বিবর্তন কেন হয়? সেই সব প্রশ্নের নানা রকম বিশ্লেষণ নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল রোদসীর গোলটেবিল বৈঠক। উপস্থিত ছিলেন জনপ্রিয় বিউটি এক্সপার্টরা। রোদসীর সম্পাদক সাবিনা ইয়াসমীনের সঞ্চালনায় পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়েছে সুনিপুণভাবে। গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠানের বিস্তারিত বর্ণনা শুনে লিখেছেন সুরাইয়া নাজনীন

সাবিনা ইয়াসমীন, সম্পাদক, রোদসী_
বিয়ে একটি সামাজিক নীতি। আইনতভাবে একজন নারী ও পুরুষকে একসঙ্গে থাকার, জীবন কাটানোর অনুমতি প্রদান করা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই বিয়ের জন্য একটি মৌসুম রয়েছে। আর সেই সময় ধরেই বিয়ের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। তবে বিয়েতে সাজগোজ ছাড়া কনে যেন অম্লান। আগেকার দিনে বর-কনের সাজ দেখা যেত সেই সময়কার চাহিদা এবং ট্রেন্ড ধরে। এখন তার ঢের তফাত। গয়নায় হোক, পোশাকে হোক, সাজের ম্যাটেরিয়ালে হোক। বিয়ের সাজের বিবর্তনটাই এবারের রোদসীর বিয়ের আয়োজনের গোলটেবিল বৈঠকের বিষয়বস্তু। আর এই বিষয়টা ধরেই কথা বলেছেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।

সাবিনা ইয়াসমীন, সম্পাদক, রোদসী

রওশনয়ারা জামান মিলি, উপসম্পাদক, রোদসী_
বিয়েতে সাজগোজ তো আছেই। তবে পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক হলে অনেক সময় কনের মনের ওপর অনেক চাপ থাকে। এতেই কিন্তু ত্বক উজ্জ¦লতা হারায়। এ সময় আসলে কী করা দরকার?
আফরোজা পারভীন এই প্রশ্নের উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, এটা তো খুব স্বাভাবিক বিষয়। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের আছে প্রি-ওয়েডিং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা। যেখানে একটা সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, সেই সময়মতো তারা আসেন। আমরা তাদের মানসিক প্রস্তুতির সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটা কাউন্সেলিং দিয়ে দিই। এতে অনেকখানি কাজ হয়ে যায়। বিয়ের দিন পর্যন্ত তারা নির্ভার থাকেন। সেই চাপটি আর চেহারায় দেখা যায় না।

রওশনয়ারা জামান মিলি, উপসম্পাদক, রোদসী_

আফরোজা পারভীন, স্বত্বাধিকারী, রেড বিউটি স্টুডিও অ্যান্ড স্যালন_

বিয়েকে কেন্দ্র করে অনেক কিছুরই বিস্তার ঘটে। দুটি মনের মেলবন্ধন তৈরি হয়, সঙ্গে দুটি পরিবারেরও। আর বিয়ের দিনটাকে স্মৃতিবিজড়িত করে রাখতে অনেক রকম পরিকল্পনা করা হয়। প্রায় এক মাস ধরে চলে ঝলমলে উৎসব। বিয়ে মানেই সাজ। এককথায় সাজ ছাড়া বিয়ে হয় না। আগে যেমন হুটহাট করে বিয়ের কথা পাকা হতো। আমি অর্ধেক রাতেও বিয়ে ঠিক হতে দেখেছি। সে ক্ষেত্রেও কিন্তু আয়োজনের কমতি রাখত না বাড়ির লোকেরা। বাজারের দোকানদারকে উঠিয়ে সাজসজ্জার জিনিস কিনে বর-কনেকে সাজিয়েই তবে বিয়ে। মাঝখানের সময়টাতে দেখা যেত কনেকে মেকআপে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে সাজের ক্ষেত্রে। অবশ্য সে সময় ওইটাই ট্রেন্ড ছিল। আবার ইদানীং দেখা যায় বর নিজেই খুঁজে খুঁজে ভালো বিউটি স্যালন ঠিক করছে। আবার ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছে যেন সাজটা ন্যাচারাল হয়। তবে সাজের বিবর্তনের কথা বলতে গেলে বলতে হবে এখন চলছে ন্যাচারাল সাজের ট্রেন্ড। কনের মুখে যদি পিম্পল থাকে, তবে তা ঢাকাও হয় না এখন। খুব ন্যাচারাল টোনে স্নিগ্ধ সাজটাই চলছে। ব্যবহার করা হচ্ছে খুব ভালো মানের মেকআপ প্রোডাক্ট। হেয়ার স্টাইলেও এসেছে নানা পরিবর্তন। খুব ফুলিয়ে এখন চুল বাঁধা হয় না। স্টিকি স্প্রে ব্যবহারের দিনও শেষ। আগে যেমন বাঁধা চুল খুলতেই সারা রাতের ঝক্কি ছিল। এখন কমফোর্টটাও বিবেচনা করা হয়।

আফরোজা পারভীন, স্বত্বাধিকারী, রেড বিউটি স্টুডিও অ্যান্ড স্যালন_

ফারহানা রুমি, স্বত্বাধিকারী, জারাস বিউটি লঞ্জ অ্যান্ড ফিটনেস সেন্টার_
সাজের বিবর্তন নিয়ে যদি বলতে হয়, আমি বলব হ্যাঁ, সাজের বিবর্তন হয়েছে। এখন বিউটি সেক্টরটাকে পার্লামেন্টেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। আগের সেই নাক সিটকানো ভাবটা আর নেই। এখন ঘরে ঘরে সবাই বেশ সচেতন। বউ আর শাশুড়ি একসঙ্গে স্যালনে এসে কাজ করে যাচ্ছে। শাশুড়িরাই বউদের বলছে নিজের কেয়ার নাও। এভাবেই দিন বদলাচ্ছে। বদলের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদেরও বিবর্তিত হতে হচ্ছে। ডিমান্ডে এসেছে অভিনবত্ব। যুগে যুগে এই পরিবর্তন থাকবেই।

ফারহানা রুমি, স্বত্বাধিকারী, জারাস বিউটি লঞ্জ অ্যান্ড ফিটনেস সেন্টার_

শারমিন সেলিম তুলি, স্বত্বাধিকারী, বেয়ার বিজ_
মানুষ একটা সময় ভাবত সুন্দর মানেই ফরসা। ফরসা না হলে সে সুন্দর নয়। বিয়ের সাজে শ্যামলা কিংবা বর্ণেও কনেকে ফরসা বানানোটাই রেওয়াজ ছিল। কিন্তু এখন গায়ের রং বিবেচনা করা হয় না। নিজস্ব গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ন্যাচারাল শেডে মেকআপ করা হয়। বলতে গেলে মেকআপের বিবর্তন হয়েছে ওয়ার্ল্ডওয়াইড। আমরা আমাদের ইচ্ছেমতো সবকিছু হাতের নাগালে পাচ্ছি। সাজের থিমগুলো ব্রাইডরা পছন্দ করে রাখে আগেভাগেই। বিবর্তনের কারণ বলতে গেলে অনেক আছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিবর্তন হবেই, এটাই স্বাভাবিক।

শারমিন সেলিম তুলি, স্বত্বাধিকারী, বেয়ার বিজ_

জুলিয়া আজাদ, স্বত্বাধিকারী, আকাঙ্ক্ষা  গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড_
আগেকার দিনে হার্ড মেকআপ করা হতো। কেকি মেকআপ লুকটাই চলত। খুব মোটা করে ফাউন্ডেশন ব্যবহার হতো। তখন মুখের আসল অবয়বটাই বোঝা যেত না। তাই অনেকে মজা করে বলত বিয়ের পরে বউকে আর চেনাই যায় না। কিন্তু সেসব ট্রেন্ড এখন বদলেছে। ইন্টারনেটের যুগে মানুষের সবকিছুই হাতের মুঠোয়। নিজের স্কিন টোনের সঙ্গে মিলিয়ে এখন সবাই সাজতে পছন্দ করে। ডার্ক শেডকে লাইট করা বর্তমানে ব্রাইডরা পছন্দ করে না। আবার কাউকে বিয়েতে সুন্দর লাগল, সেটাই নিজের জন্য সাজের চাহিদা হয়ে যায়। মোটকথা এখন সাজের একটা ব্যালান্স তৈরি হয়েছে। এভাবেই আসলে সাজের বিবর্তনগুলো হয়।

জুলিয়া আজাদ, স্বত্বাধিকারী, আকাঙ্ক্ষা  গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড_

সাহিদা আহসান, স্বত্বাধিকারী, সাহিদা’স বিউটি ওয়ালেট_
আমার একটি ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। সেখানে মেয়েদের নানাভাবে গ্রুমিং করানো হয়। সাজের নানা রকম ধাপ রয়েছে। সেই ধাপগুলো একটা ব্রাইডের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে ভাবে বিয়ের কনে মানেই যা পারছি তাই দিয়ে সাজিয়ে ফেলি। একদমই তেমনটি ভাবা উচিত নয়। আগে এই চলটি খুব ছিল। বউ মানেই জবরজং সাজ। এখন বউয়ের পরিবার আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখে সাজটা আসলে কেমন হবে। শৈল্পিকতার যুগে এই বিবর্তনটা আসলেই দরকার ছিল।

সাহিদা আহসান, স্বত্বাধিকারী, সাহিদা’স বিউটি ওয়ালেট_

শোভন সাহা, স্বত্বাধিকারী, শোভন মেকওভার_
একটা সময় ছিল বিয়ে মানেই সাজ কিংবা বিয়েকে কেন্দ্র করেই সাজ। এখন কিন্তু তা আর নেই। এখন ছোটখাটো পার্টিতে যাওয়ার সময়ও সাজের চল এসেছে। বেবি শাওয়ারেও দেখা যায় জমজমাট আয়োজন। আর সাজ তো মাস্ট। এখন বাংলাদেশে প্রচুর ডে ওয়েডিং হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সাজের প্যাটার্ন কিছুটা বদলাতে হয়। কারণ সূর্যের আলো মাথায় রেখে সাজানো ভালো। এখন ওয়েডিং ফটোগ্রাফি গুরুত্বের জায়গা দখল করে রয়েছে। ফটোগ্রাফাররা আমাদের বলে দেন মেকআপ কোন লুকে করতে হবে। ছবি যেন জ্বলে না যায়। সাজের অনেক বিষয়ই এখন মাথায় রাখতে হয়। কনের পোশাক, স্টেজের থিম সবকিছু।

শোভন সাহা, স্বত্বাধিকারী, শোভন মেকওভার_

লিয়া নাজ, স্বত্বাধিকারী, লিয়াস বিউটি বক্স_

সাজগোজের চর্চা বহুকাল থেকে ছিল, আছে, থাকবে। আগে দাদি-নানিরা যেমন চোখে কাজল, সুরমা ব্যবহার করত, এটাও কিন্তু সাজের অংশ। কিছু না থাকলেও চুলটা পরিপাটি করে বেঁধে রাখত, এটাও সাজের বাইরে নয়। আর বিয়েতে বাড়তি নজর বউয়ের দিকে। এখন অবশ্য কনের পাশাপাশি বরেরাও হালকা-পাতলা সাজগোজ করে। ওই যে ছবির প্রসঙ্গে আবার আসতে হয়। কনেকে ঝলমলে দেখাবে, অন্যদিকে বর ফ্যাকাশে। এটা ছবিতে ভালো লাগে না। তাই বরও আজকাল স্কিন কেয়ারের দিকে নজরটা রাখে, যেটা আগে দেখা যেত না। এটাও বিবর্তনের বিষয়।

লিয়া নাজ, স্বত্বাধিকারী, লিয়াস বিউটি বক্স_

ছবি: রোদসী 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 × four =