সিঙ্গেল প্যারেন্টিং

করেছে Sabiha Zaman

সুরাইয়া ইসলাম মুন্নি: সিঙ্গেল প্যারেন্ট হিসেবে সন্তানকে একা বড় করার বড় কারণগুলো হলো স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ, স্বামী বা স্ত্রী ভিন্ন জায়গায় থাকা ইত্যাদি। যেকোনো পরিস্থিতিতে সন্তান লালন-পালন করা খুবই কষ্টকর। তাই সঙ্গী ছাড়া একা সন্তান বড় করা তুলনামূলক কঠিন। অতিরিক্ত দায়িত্ব সিঙ্গেল প্যারেন্টের ভেতরে মানসিক চাপ, শারীরিক চাপ ও ক্লান্তি তৈরি করে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানের মানসিক অবস্থা ও তার আচরণকে সিঙ্গেল প্যারেন্টিং সরাসরি প্রভাবিত করে। ২০০৩ সালে সুইডেনে আট বছরব্যাপী একটি গবেষণায় ১ মিলিয়ন শিশু-কিশোরের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ইতিহাসে দেখা গেছে সিঙ্গেল প্যারেন্ট দ্বারা পরিচালিত পরিবারের সন্তানদের মানসিক সমস্যা, আত্মহত্যার চেষ্টা এবং মাদকাসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ।
বিবাহবিচ্ছেদের আগে ও পরে সন্তানেরা বাবা-মাকে বিভিন্ন বিষয়ে ঝগড়া করতে দেখে। অনেক সময় ঝগড়ার কেন্দ্রবিন্দুই হয় সন্তান। বিবাহবিচ্ছেদের সময়ে সন্তানকে বাবা বা মায়ের মধ্যে যেকোনো একজনকে অভিভাবক হিসেবে বেছে নিতে বলা হয়। সন্তান এ পরিস্থিতিতে কাকে বেছে নেবে ও কাকে ছেড়ে দেবে, তা নিয়ে অপরাধবোধে ভোগে। এ ছাড়া কোনো একজন অভিভাবক সন্তানকে তার সঙ্গে নিতে না চাইলে সন্তান ধরে নেয় তাকে তার বাবা বা মা পরিত্যাগ করেছে।

১৯৯৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের ডিভোর্সের কয়েক বছর পর সন্তানদের ভেতরে অনেক বেশি অসামাজিক আচরণ, রাগ, উদ্বিগ্নতা এবং পড়াশোনায় সমস্যা দেখা দেয়। এ গবেষণায় আরও জানা যায় যথেষ্ট পরিমাণ সামাজিক সহায়তা, পরিবারের বড় কারও তত্ত্বাবধান এবং পর্যাপ্ত পারিবারিক উপার্জন থাকলে উল্লিখিত সমস্যাগুলো অনেকাংশে কমে যায়।

করণীয়

১. সন্তানকে বারবার জানাতে হবে তাকে তুমি কতটা ভালোবাসো এবং সে তোমার জন্য সে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে তার সুনির্দিষ্ট গুণগুলোর জন্য প্রশংসা করতে হবে।

২. সিঙ্গেল প্যারেন্টকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই সন্তানকে কিছু দায়িত্ব বুঝিয়ে দাও। আর এর জন্য সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো রুটিন তৈরি। রুটিন দ্বারা তোমার সন্তান সহজে বুঝতে পারবে তার কাছে কী ধরনের আচরণ তুমি আশা করছ। রুটিনে প্রতিদিন নিজেদের জন্য আলাদা সময় বের করো। এই সময়ে একসঙ্গে নিজেদের পছন্দের কাজগুলো করতে পারো। যেমন একসঙ্গে কোনো বোর্ড গেম খেলা, রান্না করা, বই পড়া, কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা ইত্যাদি।

৩. শিশুর যত্নের জন্য প্রয়োজনে ন্যানি বা কেয়ারগিভার রাখতে পারো। একজন অভিজ্ঞ কেয়ারগিভার শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে দেখাশোনা করতে পারবে। ছোট সন্তানকে দেখাশোনার জন্য বড় সন্তানের ওপরে পুরোপুরি নির্ভর না করা ভালো। কারণ সে নিজেও শিশু। নতুন কোনো বন্ধুবান্ধব বা প্রতিবেশীর কাছে সন্তানকে দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করো।

৪. বাসার জন্য কিছু নিয়ম ঠিক করে তা সন্তানকে জানাও। সন্তানকে স্পষ্টভাবে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলো তার কাছে কোন ধরনের আচরণ তুমি আশা করো। যেমন জোরে কথা না বলে স্বাভাবিকভাবে কণ্ঠে কথা বলা, বাড়ির কাজ করে ফেলা, যে পরিমাণ খাবার প্লেটে নিয়েছে তা শেষ করা ইত্যাদি। সন্তানের যদি অন্য কোনো কেয়ারগিভার থাকে, তাহলে তাকেও বাসার নিয়মগুলো জানাতে হবে। তোমার উপস্থিতি ও অনুপস্থিতিতে একই নিয়ম পালন করা হলে সন্তান খুব দ্রুত এ নিয়মগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

৫. সিঙ্গেল প্যারেন্ট হওয়ার জন্য নিজেকে বা সন্তানকে দোষারোপ না করা। অনেক সময় অপরাধবোধ থেকে সিঙ্গেল প্যারেন্ট সন্তানকে যা চায় তা দিয়ে দেয় ও সন্তানকে কোনো নিয়মের মধ্যে রাখতে চায় না। এতে সন্তানের উপকার না হয়ে ক্ষতিই হয় বেশি।

৬. নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া। মনে রাখবে, তুমি নিজে যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকো, তাহলেই তুমি তোমার সন্তানকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করতে পারবে। তাই নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার ও পানীয় খাও, পরিমিত ঘুমের অভ্যাস করো। নিজের পছন্দের কাজগুলো করো। যেমন বই পড়া, গাছের পরিচর্যা ইত্যাদি।

৭. অন্যান্য সিঙ্গেল প্যারেন্ট বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি করতে পারো। নিজেরা কীভাবে নিজের ও সন্তানের যত্ন নিচ্ছ বা নিতে পারো তা নিয়ে আলোচনা করতে পারো।

৮. আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখো। সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করো।

৯. সন্তানকে সব সময় সত্য কথা বলার চেষ্টা করো। যেকোনো পরিস্থিতিতে তাকে জানাও তুমি কেমন অনুভব করছ। অনেক বাবা বা মা সন্তানের কাছে সন্তানের প্রতি বয়সের তুলনায় বেশি আশা করে। তোমার সন্তানকে তার বয়স উপযোগী দায়িত্ব দাও এবং সে অনুযায়ী ফলাফল আশা করো।

বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কীভাবে কথা বলবে?

অনেক সময় বিবাহবিচ্ছেদের কারণে অনেক পরিবার সিঙ্গেল প্যারেন্ট দ্বারা পরিচালিত হয়। যদি তোমার ক্ষেত্রেও একই রকম হয়, তাহলে বিবাহবিচ্ছেদের কারণে তোমার জীবনে কী কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, তা নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলো। একই সঙ্গে মনোযোগসহকারে তোমার সন্তানের কথাও শোনো। তার চিন্তা ও অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করো। তোমার সন্তানের প্রশ্নের উত্তরে তাকে সহজে সত্য কথাগুলো জানানোর চেষ্টা করো। তোমার প্রাক্তন স্বামী বা স্ত্রী সম্পর্কে নেতিবাচক কথা না বলার চেষ্টা করো। অনেক সময় সন্তানেরা ভেবে নেয় তার বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের জন্য সে দায়ী। তাই তোমার সন্তানকে মনে করিয়ে দাও তোমাদের বিবাহবিচ্ছেদ তার কারণে হয়নি। তোমার সন্তানকে তুমি কতটা ভালোবাসো তা তাকে বারবার মনে করিয়ে দাও।

পুনর্বিবাহের সিদ্ধান্ত কীভাবে সন্তানকে জানাবে?

যদি তুমি আবারও বিয়ের সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে অবশ্যই তোমার সন্তানের ওপরে এই বিবাহের প্রভাব কেমন হবে, তা তোমাকে ভেবে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে এমন কাউকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নাও, যে তোমার ও তোমার সন্তানের সঙ্গে ভালো আচরণ করবে। নতুন সম্পর্কটি নিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে এরপর তোমার সন্তানের সঙ্গে তোমার নতুন সঙ্গীর পরিচয় করিয়ে দেবে। পরিচয় করানোর আগে অবশ্যই তোমার সন্তানকে তোমার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর কিছু গুণ জানাও। এ ক্ষেত্রে তোমাকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। শুরুতেই আশা করবে না তোমার সন্তান ও তোমার সঙ্গীর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হবে। দুজনকে সময় দাও যেন তারা নিজেদের জানতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সিঙ্গেল প্যারেন্টেদের সন্তানের বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা যেমন বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, রাগ, আশাহীনতা, ইত্যাদি তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে। সন্তানের ভেতরে এ ধরনের আচরণ দেখা দিলে অবশ্যই একজন সাইকোলজিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। এ ছাড়া সিঙ্গেল প্যারেন্ট নিজেও যদি মানসিক চাপে থাকে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, নেতিবাচক চিন্তা বেশি করে সে ক্ষেত্রে সে নিজেও একজন সাইকোলজিস্টের কাছে কাউন্সেলিং করাতে পারে।

 

 

 

 

 

 

 

 

সুরাইয়া ইসলাম মুন্নি
সাইকোলজিস্ট।

 

ছবি: সংগৃহীত

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

three × five =