সুন্দরবনে বাঘের ডেরায়!

করেছে Rodoshee

২০১৬ সালের কথা। সে বছর কোরবানির ছুটিতে ঢাকা থেকে খুলনায় নিজ গ্রামে আসি প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে। ঈদের দুদিন আগে প্রিয় খুলনা শহরে আমার আগমন। রূপসী রূপসার কোল ঘেঁষে আমার বাড়ি। ছুটিতে এসে বেশ ভালোই কাটল দুটি দিন। এলাকায় এক প্রতিবেশী বড় ভাই আছেন মাকসুম নাম। সিনিয়র এই ভাই আর আমি খুলনায় থাকা অবস্থায় একসঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। পরবর্তী সময়ে জীবনের সন্ধানে আমি চলে আসি ঢাকায়। তিনিও ঢাকায় নতুন চাকরিতে যোগ দেন। ফটোগ্রাফি আমার ছোটবেলার শখ। সেই যখন প্রথম ক্যামেরাসহ মোবাইল কিনলাম তখন থেকেই একটি ডিজিটাল ক্যামেরা কেনার চেষ্টা শুরু। ঢাকায় এসে অনেক কষ্টে একটি ক্যামেরা কিনে নিলাম। তবে শুধু ডিজিটাল নয়, একেবারে ডিএসএলআর। খুলনায় এসে দেখি মাকসুম ভাইও ডিএসএলআর নিয়েছেন। রীতিমতো ক্যামেরার সঙ্গে লেন্সও নিয়েছেন দুটি। আমি তো দেখে অবাক। মাকসুম ভাই আমাকে জানালেন সুন্দরবনের গভীরে দুবলারচরে রাস মেলার কথা।

বললেন, তুমি যদি চাও আমি যেতে পারি। আমি কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই রাজি হয়ে গেলাম। এমন সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। তারপর ফটোগ্রাফি, জীবনে এমন একটি সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। তাই তার কথায় কোনো কিছু না ভেবেই রাজি। মংলা দেখতে ভালোই। মংলায় ঠিক নদীর কাছে বাস থামল। নদী তখন বেশ শান্ত। বাস থেকে নেমে দুজন নদীর পারে গেলাম। আমি তো লোভ সামলাতে পারলাম না। ক্যামেরা বের করে ছবি নিতে শুরু করলাম। মাকসুম ভাই বললেন, এখন ছবি তোলার সময় নয়। আগে আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নদীঘাটে অনেক নৌকা আর ট্রলার। এপার থেকে ওপারে কিছু সময় পরপর নৌকা ছাড়ছে। আমরা এগোলাম। মজার বিষয় হচ্ছে এমন একটি চর সমুদ্রের মধ্যে যেখানে মানুষ বসবাস করে না। কিন্তু এই সময়ে হাজার হাজার মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়। বিদেশ থেকেও শত শত পর্যটক আসে। পরদিন সকালে বোট ছাড়ল। সবাই বোটের ওপরে ছাদে বসে আছি। মূলত এখানেই সবাই বসে। ওপরে ছাউনি আছে। চারদিকে বেঞ্চ পাতা আছে। মাঝে টেবিল আছে। হেলপার এসে এক ফানা কলা ঝুলিয়ে দিল। এই কলা আমাদের জন্য।
এরপর চায়ের পাত্র সাজিয়ে দিল সামনে। ফ্লাস্কভরা গরম পানি, পর্যাপ্ত চিনি, ডিব্যাভরা দুধ, কফির বেশ কিছু প্যাকেট আর টি ব্যাগ। জানালেন, চায়ের ব্যাপারে কোনো কিছু বলার নেই। পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। যখন মনে চাইবে খাবেন। আশা রাখি শেষ হবে না। শুরু হলো দুবলারচরের উদ্দেশে আমাদের যাত্রা। মাকসুম ভাই আর বসে থাকতে পারলেন না। তিনি সবার সঙ্গে পরিচয় পর্বটা সারার জন্য বললেন।
ভাই বললেন, আমরা যেহেতু তিন দিন এই বোটে থাকব, আমাদের উচিত সবার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। আমাকে পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন। শুরুতেই আমাদের দুজনের পরিচয় দিলাম। সাংবাদিক বলায় তাঁরা খুশিই হলেন। সবাই মনোযোগ সহকারে কথা শুনছেন এবং বলছেন। প্রত্যেকে যার যার পরিচয় দিলেন। তখনই জানলাম অল্পবয়সী ছেলেদের মধ্যে দুটি টিম আলাদাভাবে এসেছে। তাদের তিনজন এসেছে চট্টগ্রাম থেকে। বাকিরা ঢাকা। মধ্যবয়স্ক লোকগুলোকে যেমন ভেবেছিলাম তারা তো রীতিমতো আমাদের চমকে দিলেন। দারুণ মজার মানুষ তারা। বয়স বাড়লেও মনে তারা তরুণ। খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে গেলেন।

আমরা মংলা থেকে যাত্রা শুরু করলাম। বোট চলছে। আমরা গরম চায়ের স্বাদ নিতে নিতে গল্প চালিয়ে যাচ্ছি। কেউ কেউ পাকা কলা ছিঁড়ে খাচ্ছে। খাবেই না কেন, ঢাকা শহরে এমন দেশি পাকা কলা কমই পাওয়া যায়। তাই সবার আগ্রহটা একটু বেশি। যেভাবে কলার ওপর নজর পড়েছে তাতে বুঝতে বাকি নেই যে এই কলা সুন্দরবন পর্যন্ত যাবে না। আমরা বোটে বসে নদীর দুই পাশের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হলাম। মংলা অতিক্রম করার সময় বড় বড় জাহাজ চোখে পড়ল। দুপুরে আমরা সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে পৌঁছালাম। সেখানে সুন্দরবনে প্রবেশের পাস নিয়ে বোট মালিক অপেক্ষা করছে। গভীর সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হলে এখান থেকেই পাস নিতে হয়। এতে সুবিধা আছে। কতজন ট্যুরিস্ট এই বোটে ছিল তার একটা হিসাব থাকে। বনের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে তারা সহযোগিতা করতে পারে।
বোটের নিচে কেবিনের পাশে একটি ছোট্ট স্নানঘর আছে। বোটের মধ্যে কমোডের বাথ। বেশ অবাক হলাম। ঝরনাও আছে। বেশ ভালো লাগল। গোসল সেরে সবাই আবার ওপরে উঠে এলেন। সবাই গোল হয়ে বসে পড়লেন খাওয়ার জন্য। চারদিকে বসার জন্য ব্যবস্থা আছে। বড় বড় টুল। মাঝে রয়েছে টেবিল। দুপুরের কড়া রোদ আমাদের গায়ে এসে পড়ছে। তাই বোটের হেলপার চারদিকে ত্রিপল টানিয়ে দিলেন।
খাবার চলে এলো। সাদা ভাত, বেগুন ভাজি, বড় বড় ফালসে মাছ, খাসির মাংস, ঘন মুগডাল। এত মজার খাবার আমি তো আশা করিনি। মাছগুলো ঠিক আমার হাতের অর্ধেক সাইজের। এত বড় বড় মাছ নাকি এই নদী থেকেই ধরা হয়। ফালসে মাছ এই বাগেরহাট অঞ্চলেই বেশি পাওয়া যায়। মিষ্টি স্বাদের এই মাছ অনেক সুস্বাদু। শসা আর কাগজি লেবুরও কমতি ছিল না। বাবুর্চি রিপন নিজেই আমাদের খাবার তুলে দিচ্ছেন। সবাই তার রান্নার প্রশংসা করল। করবেই না কেন? এমন রান্না নিজের বাড়িতেও হয় না। সত্যি বলছি, তার রান্নার স্বাদ আজও আমার মুখে লেগে আছে।
এরই মধ্যে আমরা সুন্দরবনের সীমানায় ঢুকে গেছি। বোট নদীর মাঝ থেকে যাচ্ছে। মাস্টারকে আমরা বললাম বোট যে কোনো একটি পাড় থেকে চালানোর জন্য। কারণ, আমরা সুন্দরবনকে খুব কাছ থেকে দেখতে চাই। কিন্তু মাস্টার আমাদের জানালেন, এখন সম্ভব নয়। কারণ ভাটি পড়ে গেছে। এখন পাশে গেলে বোট চরে আটকে পড়তে পারে। আমি ক্যামেরা দিয়ে দূর থেকে যতটুকু পারি সুন্দরবনের ছবি তোলার চেষ্টা করছি। এমন রূপ কি আর সব সময় দেখা সম্ভব হয়। দুই পাশে সারি সারি কেওড়াগাছ। যত দূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। নদীর মাঝে আমরা ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি বোট ও বড় লঞ্চ আছে। তারা সবাই সুন্দরবনের দুবলারচরে যাচ্ছে। এ সময় দুবলারচরে ভরা পূর্ণিমায় মেলা বসে। মেলার নাম রাস মেলা। চারদিক থেকে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা আসেন এই মেলায়। তারা শুধু এই একটি রাতেই মেলার আয়োজন করেন। সারারাত এই মেলার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মালামাল বিক্রি হয়। হাজার হাজার পর্যটক আসেন। তারা সবাই রাতে জেগে থাকেন আর আনন্দ করেন। পরের দিন খুব ভোরে সবাই মিলিত হয় সাগরের পাড়ে। সেখানে পুণ্যস্নান করেন তারা। সাগরের জলে নিজেদের পাপ ধুয়েমুছে পবিত্র হন। এমনটিই তাদের বিশ্বাস।
দুবলারচরে কোনো বসতি নেই। তবে গভীর একই সমুদ্রের মাঝে একটি চর। যার চারপাশে শুধু পানি আর পানি। চারপাশে সাগর দিয়ে ঘেরা দুবলারচর। এখানে আসার একমাত্র বাহন বোট, লঞ্চ, ট্রলার। আর শুধু আকাশ পথেই হেলিকপ্টারে আসা যায়।
আমাদের আর তাড়া সইছে না। কখন যাব দুবলারচরে। ইতিমধ্যে আমরা করমজল অতিক্রম করেছি। বোট মাস্টার আমাদের আগেই জিজ্ঞেস করছিলেন যে আমরা করমজলে নামব কি না।
মাকসুম ভাই আর গাইড মামুন ভাই বললেন এখানে নেমে সময় নষ্ট না করাই ভালো। তার চেয়ে বরং আমরা আগে আগে দুবলারচর যাই। রাত হলে দেখা যাবে না। তাই সিদ্ধান্ত হলো ফেরার পথে করমজল হয়ে তারপর আসব।

সুন্দরবনের আকর্ষণীয় বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে করমজল পর্যটন কেন্দ্রে প্রতিবছর সর্বাধিক সংখ্যক পর্যটক আসে। খুলনা শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার এবং মংলা সমুদ্র বন্দর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে পশুর নদের তীরে ৩০ হেক্টর আয়তনের আকর্ষণীয় এই পর্যটন কেন্দ্রটি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের অন্তর্গত চাঁদপাই রেঞ্জের অধিক্ষেত্রাধীন এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। মংলা থেকে করমজল লঞ্চ বা ট্রলারে মাত্র ৪৫ মিনিটের পথ হওয়ায় দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসার সুবিধা এবং ভ্রমণে তুলনামূলক কম খরচের কারণে অধিকাংশ পর্যটকেরই সুন্দরবন ভ্রমণে প্রথম পছন্দের স্থান করমজল। পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো বিকেলে করমজল এলাকায় দল বেঁধে বন্য চিত্রল হরিণের আগমন এবং পর্যটকদের হাত থেকে খাবার গ্রহণ। করমজল গিয়ে পর্যটকেরা সহজেই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণীর সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। পরিচিতির সুবিধার্থে এখানে বিদ্যমান গাছের সঙ্গে নামফলক যুক্ত করে রাখা আছে। এ ছাড়া পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য এখানে বনের ভেতর দিয়ে ৭২১ ফুট দীর্ঘ কাঠের তৈরি পথ, ১০ মিটার উচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, গোলঘর, কুমির প্রজনন ও পালন কেন্দ্র, হরিণ প্রজনন ও পালন কেন্দ্র, বানর প্রজনন ও পালন কেন্দ্র বিদ্যমান। অসংখ্য শ্বাসমূল আর জোয়ারের পানির কারণে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে হেঁটে চলা খুবই কষ্টকর, তাই দীর্ঘ কাঠের তৈরি পথ পর্যটকদের বনাভ্যন্তরের পরিবেশ উপভোগের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আঁকাবাঁকা পথে কাঠের পথ নির্মাণ করে বনাভ্যন্তরের গাছগুলোকে সযত্নে সংরক্ষণ করার বিষয়টিও সবার দৃষ্টি কাড়ে। এ ছাড়া মিষ্টি পানির জন্য এখানে তিনটি পুকুর রয়েছে, যা থেকে পর্যটকেরা পানি পান করে থাকেন। ভবিষ্যৎ পর্যটকদের জন্য অধিক পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে অধিকসংখ্যক পর্যটককে আকৃষ্ট করা, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারি পর্যায়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। করমজল দর্শনের জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন হয় না। তবে নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব প্রদানের রীতি আছে। করমজলে পর্যটকদের আগমন দিন দিন বেড়েই চলেছে। সরকারি ছুটির দিন, ধর্মীয় উৎসবে এখানে দর্শক সমাগম বৃদ্ধি পায়।
সবুজ সুন্দরবনের বুক চিরে শান্ত নদী বয়ে গেছে। আর সেই নদীর মাঝে বিরামহীনভাবে আমাদের বোট চলছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
দুবলারচর কত দূর?
নুডলস রান্না করে বাবুর্চি রিপন আমাদের খেতে দিলেন। আমরা বিকেলের গোলাপি আলোয় মন খুলে ডানা মেলে উড়ছি। বোট সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে নদীর পাড় থেকে যাচ্ছে। আমরা চোখ মেলে সুন্দরবনের রূপ দেখেছি। সৃষ্টিকর্তা যে কত বড় রহস্যের জাল পেতে রেখেছেন, তার হিসাব মেলা দায়।
সবাই মিলে অনেক মজা করতে রইলাম। এভাবে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো। আমরাও দুবলারচরে এসে পৌঁছালাম। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানের দেখা মিলেছে। চর থেকে কিছুটা দুরে বোট থামল। চরের শুকনো মাটির কাছে বোট নেওয়া সম্ভব নয়। একবার আটকে গেলে সহজে ছাড়ানো সম্ভব হবে না। তাই একটু দূরেই নোঙর ফেলতে হলো।
আমাদের বোটের সঙ্গে মংলা থেকে একটি ডিঙি নৌকা নিয়ে আসা হয়েছে। এটি সব সময়ই বোটের পেছনে বাঁধা থাকে। পথে যদি কোনো বিপদ হয় তবে এটি দিয়ে অন্তত রেহাই মিলবে। তাই এ ধরনের ট্যুরিস্ট বোটের সঙ্গে একটি করে ডিঙি নৌকা রাখা হয়। নৌকার মাঝি আমাদের বোট থেকে নিয়ে গেলেন চরে। আমরা সবাই চরে নামলাম।
এই চরে আজ রাতেই রাস মেলা বসবে। রাস পূর্ণিমায় চন্দ্রদেবের কাছে প্রার্থনা করে আগামীকাল পুণ্যস্নান সারবেন ভক্তকুল। তাই তো ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটেছে। এ তো গেল নদীর পাড়ে চরের ঘটনা। আমরা তখনো চরেই আছি। চরে নামার পর বোট মাস্টার ও গাইড মামুন ভাই আমাদের কিছু বিষয় লক্ষ করতে বললেন।
তিনি জানালেন, এখানে মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। তাই আপনাদের দল বেঁধে থাকতে হবে। যদি কেউ হারিয়ে যান তবে সোজা এখানে এসে দাঁড়াবেন। আজ রাতে বোট এখানেই থাকবে। রাতে খাওয়া দাওয়া করে আপনারা আবার চাইলে চরে আসতে পারবেন। সকালে স্নান শেষ করে তবেই আমরা বোট ছাড়ব।
আমরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে গেলাম। ঢাকা থেকে যে দলটি এসেছে ওরা এক দলে, চট্টগ্রামের ওরা এক দলে, চুয়াডাঙ্গার ওনারা এক দলে আর আমি এবং মাকসুম ভাই এক দলে ভাগ হয়ে গেলাম।
চর থেকেও প্রায় এক দুই মাইল দূরে মেলার মাঠ। অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে সেখানে গেলাম। এর মাঝে আসার পথে নদীর পাড়ে জেলেদের নৌকার জীবনচিত্র দেখে নিলাম। এসব জেলে নাকি এই মৌসুমে এখানেই থাকেন। নৌকাতেই রান্না চলে নৌকাতেই বসবাস। রাত-দিন তারা নেট জাল দিয়ে মাছ ধরে। তা এই চরেই শুকায়। মোটকথা এখানে শুঁটকি মাছের একটি বড় ব্যবসাক্ষেত্র গড়ে উঠেছে।


রাতে জাল ফেলে ভোরে মাছ ওঠানো হয়। সেই মাছ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চরে শুকাতে দেওয়া হয়। এরপর এগুলো রোদে শুকিয়ে শুঁটকি মাছে পরিণত হয়। শুঁটকিপল্লি দেখতে দেখতে আমরা চলে গেলাম মেলার মাঠে।
বিশাল এলাকাজুড়ে মেলা বসেছে। হরেক রকমের পণ্যের পসরা বসেছে এ মেলায়। গরম জিলাপি ভাজা, পেঁয়াজু ভাজা, মিষ্টির নানান ধরনের আয়োজন আছে এখানে। বিশেষ করে অনেকগুলো বাতাসার দোকান দেখলাম। প্রতিবছর মেলায় একটি মন্দির তৈরি করা হয়। এসব বাতাসা ভক্তরা কিনে নিয়ে ওই মন্দিরে দেন। সারারাত যে বাতাসা জমা হয় তা আবার সকালে সবাইকে প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হয়।
মেলার এক পাশে বড় স্টেজ সাজানো হয়েছে। মেলা উদ্বোধন করতে ঢাকা থেকে কে যেন একজন এসেছে। তিনি এসেছেন হেলিকপ্টারে। তা ছাড়া বিভিন্ন চ্যানেলের সাংবাদিক তাদের বড় বড় ক্যামেরা সাজিয়ে রেখেছেন মেলার চারপাশে।
সামনে এগোতেই দেখলাম ভিন্ন জগৎ। শত শত বিদেশি পর্যটক একত্র হয়ে কথা বলছেন। প্রত্যেকের গলায় বড় বড় ক্যামেরা। কারও কারও কাছে দুইয়ের অধিক ক্যামেরাও আছে। আমি অনেক সময় দাঁড়িয়ে বিদেশি পর্যটকদের দেখছিলাম। তাদের কথা শুনছিলাম। তাদের কথা শুনে মনে হলো তারা কিসের জন্য যেন অপেক্ষা করছে।
এখানে উদ্বোধনের সময় পটকা ফোটানো হয়। অনেক ধরনের আতশবাজিতে পুরো সুন্দরবন আলোর ঝলকানিতে মেতে ওঠে। বেশ কিছু ফানুসও ওড়ানো হয়। ওই তো একটু দূরে ফানুস প্রস্তুত করা হচ্ছে। কিছু সময়ের মধ্যেই আকাশে ওড়ানো হবে। অনেকটা সময় সেখানে কাটালাম।
বোটে এসে দেখি সে আরেক বিশাল আয়োজন। বাবুর্চি রিপন আমাদের জন্য অনেক ধরনের খাবার রান্না করে বসে আছেন। আমাদের খাইয়ে তিনিও নেমে পড়বেন মেলা দেখতে। ভ্রমণে এসে এত আয়োজন কল্পনাই করিনি।
বোট ঘুরিয়ে পাশের খালের মধ্যে এনে রাখা হয়েছে। এখান থেকে মেলা মাঠ খুবই কাছে। নৌকায় করে বোট থেকে মাঠের পাশে যাওয়া যায়। মেলায় আসা এক হিন্দু পুরোহিতের সঙ্গে আমার অনেক সময় ধরে কথা হয়।
তিনি জানান, প্রতিবছর অগ্রহায়ণ মাসের ভরা পূর্ণিমায় দুবলারচরে তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। এ সময় দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী এবং তীর্থযাত্রীর পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো সাগরপার। তবে মূল মেলা চলে এক রাত। মেলায় হস্ত ও কুটিরশিল্পের কয়েক শ দোকানি পসরা সাজিয়ে বসে। এ ছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয়।
তাদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, প্রবহমান লবণাক্ত নদী, নদীতে হরেক রকম মাছ, সুন্দরীসহ বিভিন্ন রকম গাছ, বানর, বাঘ, শিয়াল, বনমোরগ, বন মহিষসহ বিচিত্র সব প্রাণীসহ সুন্দরবনে আছে অনেক দর্শনীয় স্থান। এর অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান হচ্ছে সমুদ্রের কোলঘেঁষা বালুরচর দুবলারচর। যেখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রাস মেলার পুণ্যস্নান। সনাতন হিন্দুধর্ম মতে রাস হচ্ছে রাধাকৃষ্ণের দৈবিক চোখের মিলন। এ মিলনে পুণ্যপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় প্রতিবছর একটা নির্দিষ্ট (কার্তিক মাসের পূর্ণিমায়) সময় আয়োজন করা হয় তিন দিনব্যাপী রাস উৎসব বা রাস মেলা।
দেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা বালুময় তীরে মনজুড়ানো দুবলারচরের অবস্থান। ১০ কিলোমিটার বালুর সৈকতসহ যার মোট আয়তন ৮১ বর্গকিলোমিটার। কে কবে কখন ঐতিহাসিক এই পুণ্যভূমির সন্ধান পেয়েছিল, সে রহস্য আজও অজানা। তবে বংশ পরম্পরায় প্রতিবছর নিয়মিত রাস পূর্ণিমায় পুণ্যস্নানের আয়োজন করা হয় এই চরে।
পরের দিন ভোরে আমরা বোট থেকে সমুদ্রপারে চলে এলাম। দীর্ঘ সমুদ্রের পাড়ে লাইন দিয়ে বসে আছে হাজার হাজার মানুষ। সূর্য ওঠার আগে থেকেই এরা লোনা পানিতে পাপমুক্তির অপেক্ষায় আছেন। মেলায় যে মন্দির বানানো হয়েছিল, সেখানে যে বাতাসা-মিষ্টি রাতভর দিয়েছিল ভক্তরা সেসব আবার খুব ভোরে পুরোহিতরা বিলি করেছে মন্দিরে আসা মানুষের মাঝে।
সমুদ্রের পাড়ে  স্নানে আসা সবাই সেই প্রসাদ সামনে নিয়ে লোনা পানির জলে গা ভেজাচ্ছেন। কী এক অসাধারণ দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করানো যাবে না।
কনকনে শীত না হলেও কম নয়। সেই শীতের মধ্যে সবাইকে খালি গায়ে সমুদ্রের জলে ভিজতে দেখার দৃশ্য সত্যি অদ্ভুত। জোয়ার বাড়ছে, সূর্যও উঠছে। সবাই দেবতার কাছে প্রার্থনা করছে। অনেকের সামনে ধূপকাঠি জ্বালানো রয়েছে। দুবলারচরে আমার দেখা ভিন্ন দৃশ্যের মধ্যে এটি একটি।
স্নানের ছবি তোলা শেষ। দেখলাম শত শত মানুষ ঝুড়ি মাথায় নিয়ে আমাদের দিকে আসছে। কৌতূহল হলো কি আছে ওই ঝুড়িতে? দেখলাম তাদের ওই ঝুড়িতে সাগরের ভিন্ন ধরনের মাছ। রূপচান্দাও আছে।

সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে শরণখোলা রেঞ্জের অধীন সমুদ্রের তীরবর্তী এক চমৎকার পর্যটন কেন্দ্র কটকা অভয়ারণ্য। এখানে প্রায়ই দেখা মেলে সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে থাকা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের। এ ছাড়া নানান জাতের পাখি, শান্ত প্রকৃতি, মনোরম চিত্রা হরিণের দল এবং বিবিধ রকমের বন্য প্রাণী। এ কারণে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় কটকা অভয়ারণ্য সব সময়ই আলাদা স্থান দখল করে আছে। আমরা সেদিকে রওনা দিলাম।
আমরা নীল সমুদ্রে পৌঁছে গেলাম। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আশপাশে কোনো বোট বা লঞ্চও নেই। একটু একটু ভয় ভয়ও করছে। বিরামহীনভাবে বোট চলছে কিন্তু পথ যেন শেষ হতে চাইছে না।
নীল সমুদ্র দেখলে সত্যি হৃদয়টা উদার হয়। এক কাজে দুটি কাজ হয়ে গেল। সমুদ্রও দেখা হলো। আমরা বিকেলে কটকা পৌঁছালাম। এসে দেখি শুধু আমরা না এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি লঞ্চ ও সি বোট। তারাও সুন্দরবন ভ্রমণে এসেছেন। মজার বিষয় হচ্ছে আজ রাতটা এখানেই কাটাতে হবে।
আমাদের বোট নোঙর করা হলো কটকা খালে। খালের পশ্চিম পাড়ের জেটি পেরিয়ে ওপরে উঠলেই বন কার্যালয়। এখান থেকে খানিকটা পশ্চিমে এগোলেই দেখা মিলবে ইট বাঁধানো সংক্ষিপ্ত একটি পথের। এর পরে আরেকটু সামনে গেলে সমুদ্র। সূর্যাস্ত দেখার জন্য এই স্থানটি বেশ মনোরম। কটকা বন কার্যালয়ের পেছন দিক থেকে সোজা পশ্চিমমুখী কাঠের তৈরি ট্রেইল। ট্রেইলের উত্তর পাশের মরা খালটির তলায় ভাটার সময় ম্যানগ্রোভ জাতীয় উদ্ভিদের ঘন শ্বাসমূল দেখা যায়। এ ছাড়া একটু শান্ত থাকলে বা নিরিবিলি যেতে পারলে এখানে দেখা মেলে চিত্রা হরিণেরও। আমরাও অনেক হরিণ দেখলাম।
এখান থেকে শেষ মাথায় হাতের ডানে সোজা দক্ষিণে মিনিট বিশেক হাঁটলে টাইগার টিলা। এই টিলায় প্রায়ই বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। এ জন্যই এ জায়গার এ নামকরণ। টাইগার টিলা থেকে সামান্য পশ্চিমে বয়ার খাল। দুই পাশে কেওড়া, গোলপাতা আর নানান পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে জায়গাটি। কটকার জেটির উত্তরে খালের চরজুড়ে থাকা কেওড়ার বনেও দেখা মেলে দলবদ্ধ চিত্রা হরিণ, বানর আর শূকরের। আমরা অবশ্য শূকরের দেখা পাইনি। তবে শীতের সময় ভাগ্য ভালো থাকলে দেখা মিলতে পারে লোনা জলের কুমিরেরও। আমরা সামনে এগিয়ে গেলাম। এখান থেকে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত দেখা যায় চমৎকার। আমরা সন্ধ্যায় সেই দৃশ্যও মিস করলাম না।
কটকায় রাত কাটাতে হবে। আমাদের আশপাশে বেশ কিছু পর্যটকের লঞ্চ ও বোট আছে এখানে থাকার দুটি উদ্দেশ্যে-
এক. এখান থেকে ফিরে যাওয়া নিরাপদ নয়
দুই. সকালে পূর্ব দিকে কটকার মূল স্পটটি দেখা হয়নি। বোট মাস্টার জানালেন, খুব সকালে আমরা রওনা হব। ভেতরে বোট যাবে না। নৌকায় করে খালের মধ্যে ঢুকতে হবে। সেখান থেকে শনের রাশি রাশি মাঠ পাড়ি দিয়ে কটকার মূল পয়েন্ট যেতে হবে। সেভাবেই আমরা প্রস্তুত হলাম। সন্ধ্যা শেষে রাত। এই নদীর পাড়ে হরিণদের পাল আসে পানি খাওয়ার জন্য। ওই তো দূর থেকে অন্ধকারে কিছু হরিণ দেখা যাচ্ছে। চোখগুলো টর্চের মতো জ্বলছে। আমাদের বোটের বড় সার্চলাইট ঘুরিয়ে দেওয়া হলো নদীর পারে হরিণের গায়ে। তখনই দেখলাম একপাল হরিণ নদীর পানি খাচ্ছে। অনেক ধরনের হরিণ। ছোট বাচ্চাও আছে।
রাতের খাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। তবে দুবলারচরে যে পরিমাণ ঠান্ডা ছিল এখানে তেমনটা নেই। খুব সকালে বোট মাস্টার সবাইকে ডাকলেন। সবাই উঠে গেলেন। হালকা অন্ধকার। ঘন কুয়াশা। ভোরের আলো তখনো জেগে ওঠেনি। আমরা নাশতা না করে নৌকায় উঠলাম। সবাই একটি নৌকায় চেপে বসলাম। নৌকা পুব দিকের একটা খালে প্রবেশ করল। এখান থেকে একটু ভেতরে ঢুকে ডান পাশে শনের জঙ্গল পার হয়ে মূল স্পট। আমরা পৌঁছালাম। তখনো কুয়াশা সাদা হয়ে আছে। সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পায়ের নিচে ঘাস ভেজা। ভেতরে প্রবেশের আগে গাইড মামুন ভাই জানালেন, সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে। বেশি বেশি হুংকার করতে হবে। জোরে জোরে কথা বলতে হবে। কারণ এ এলাকায় বাঘের আনাগোনা বেশি। এখানে হরিণের বিচরণ অন্যান্য জায়গার তুলনায় বেশি।
আমাদের নৌকা খালের মধ্য দিয়ে সামনে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের মামুন ভাই দেখালেন কিছু সময় আগে নদী সাঁতরে যাওয়া বাঘের রেখা। খালের পাড়ে যে কাদামাটি তাতে বাঘের পায়ের ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
আমরা পৌঁছালাম। কাঠের পুল বেয়ে উঠে সবাই লাইন হয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে লাগলাম। ঘন শনবন পার হয়ে ঘন জঙ্গল। এরপর মাঠ। তারপর আবার জঙ্গল। এরই মধ্যে মানুষ চলাচলের একটা রেখা চলে গেছে। সমুদ্রের পারে। আমরা ভয়ে ভয়ে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছালাম। দল বেঁধে আমরা সমুদ্রের পার দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। ওই দূরে হরিণের পাল দেখা যায়। তবে সেখানে যাওয়া নিষেধ। গাইড আমাদের চোখে চোখে রাখছেন। সরতে দিচ্ছেন না। সমুদ্রের পানিতে নামতে খুব ইচ্ছে হলো। কিন্তু নামা যাবে না। অতিরিক্ত সতর্কতা। তাও ভালো নিরাপদে আছি। হঠাৎ একজন চিৎকার করে ডাকলেন। বাঘ বাঘ বাঘ। দৌড়ে ছুটে এলাম। বাঘ কই?


একজন বললেন, বাঘ তো চলে গেছে। এই যে দেখেন পায়ের ছাপ।
সত্যি, একেবারে তাজা পায়ের ছাপ। খুব কাছ থেকে বাঘের পায়ের ছাপ দেখলাম এই প্রথম। বাঘ না দেখতে পারি, পায়ের ছাপ তো দেখলাম। এতেই বোঝা গেল সত্যি এ এলাকায় বাঘ আছে।
আমরা বেশি সময় থাকলাম না। কারণ আজই আমাদের ভ্রমণের শেষ দিন। আমাদের সঙ্গে কটকায় যে দলগুলো ছিল তাদের মধ্যে কিছু বিদেশি পর্যটকও ছিল। ওদের সঙ্গে কথা বললাম। তারাও সুন্দরবনের রহস্য জানতে ছুটে এসেছেন এই গভীর জঙ্গলে।
আমরা ফিরে যাচ্ছি। যাওয়ার পথে শনবনে অনেক প্রজাপতি চোখে পড়ল। আমি তো শুয়ে পড়ে প্রজাপতির ছবি তুলতে লাগলাম। সবাই সামনে চলে গেছে। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি আশপাশে কেউ নেই। বাঘের ভয় তখনই অনুভব করলাম। দৌড়ে ছুটে এলাম। এখানে উপর থেকে সুন্দরবন দেখার জন্য একটা উঁচু টাওয়ার আছে। অনেকেই উঠেছে।
চলে এলাম নৌকার কাছে। এসে এখানে একটু বসলাম। কাঠের যে পুল রয়েছে সেখানে বসার ব্যবস্থা আছে।
এরপর উদ্দেশ্য হিরণ পয়েন্ট। হিরণ পয়েন্টে যাওয়ার জন্য আমরা ভিন্ন পথে রওনা হলাম। দুবলারচর থেকে সমুদ্রের যে পথটি দিয়ে আমরা কটকা এসেছি সে পথ ছাড়াও আরও একটি পথ রয়েছে হিরণ পয়েন্টে যাওয়ার জন্য। সেই পথেই রওনা হলো বোট। আজই আমরা মংলা ফিরে যাব। তাই যত দ্রুত সম্ভব আমাদের পৌঁছাতে হবে হিরণ পয়েন্টে।
আমরা চলে এলাম পশুর নদে। পশুর নদের ওপর দিয়ে বোট চলছে। চারদিকে অথৈ পানি, দূর থেকে সুন্দরীগাছগুলো যেন আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। পশুর নদের পানি স্বচ্ছ এবং হংসরাজ নদের পানি ঘোলা, সত্যিই সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা। সকাল পেরিয়ে দুপুরের খাবারের পর্ব চলছে। কিন্তু এখনো বাঘ, হরিণ, কুমির তো দূরের কথা, একটি গাঙচিলের দেখাও মিলল না। দুরবিন নিয়ে যারা ব্যস্ত, তারাও হতাশ। হঠাৎ মাকসুম ভাইয়ের চিৎকার। দেখা পেয়েছি। হ্যাঁ, আমরাও সবাই খালি চোখেই দেখতে পেলাম একটা কুমির। আনন্দে সবাই আত্মহারা। ধীরে ধীরে আমাদের চোখে ধরা পড়তে লাগল গাঙচিল, বক, অচেনা পাখি। হিরণ পয়েন্টের জেটিতে এসে পৌঁছালাম। হিরণ পয়েন্টে এসে দেখি অসংখ্য বোট এখানে ট্যুরিস্টদের নিয়ে জটলা পাকাচ্ছে। আমরা বোট থেকে নৌকায় উঠলাম। ভেতরে প্রবেশ করলাম। ওপরে উঠতেই দুটি বাঘ আমাদের স্বাগত জানাল। তবে জীবিত না, পাথর দিয়ে তৈরি। তবে এই এলাকায়ও বাঘের আনাগোনা বেশি।
হিরণ পয়েন্ট একটি সংরক্ষিত অভয়ারণ্য। এর আরেক নাম নীলকমল। প্রমত্তা কুঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে, খুলনা রেঞ্জে এর অবস্থান। হিরণ পয়েন্ট, ইউনেসকো ঘোষিত অন্যতম একটি বিশ্ব ঐতিহ্য।
হিরণ পয়েন্ট থেকে তিন কিলোমিটার দূরে কেওড়াসুঠিতে রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। যেখান থেকে আশপাশের প্রকৃতি দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা উঠলাম। এটিও কটকার সেই ওয়াচ টাওয়ারের মতো দুলছিল। বেশি লোক উঠলেই এটি দুলতে থাকে।
এখানে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালিত তিনটি ভালো রেস্টহাউস আছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে তাতে থাকা যায়। একটি বড় পুকুরও আছে এখানে।
বোটে উঠে রওনা হলাম মংলার উদ্দেশে। দুপুরে খাওয়া শেষ করলাম। বোট সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে যাচ্ছে। আমরা সবাই কড়া নজর দিয়ে তাকিয়ে আছি ঘন জঙ্গলের দিকে। যদি কিছু চোখে পড়ে। সেই দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত চেয়ে থাকলাম। কিছুই আমাদের দেখা দিল না। অনেক আশা ছিল একটা বাঘ হয়তো দেখা যাবে। কারণ আমরা তো গভীর জঙ্গলে। কিন্তু না। ফিরে যেতে মন চাইছে না। তবু যেতে হবে।

লেখা: সোহাগ আশরাফ

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

one × four =