সৃজনশীলতায় নারী-পুরুষের ভেদাভেদ নেই

করেছে Tania Akter

একাধারে প্রকাশক, প্রুফ রিডার ও গ্রাফিক ডিজাইনার আলেয়া বেগম আলো। এই সমাজে সৃজনশীল কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বেশি হলেও এই কাজগুলোতেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

রোদসীর নারী দিবসের আয়োজনে তার সঙ্গে কথোপকথনে ছিলেন তানিয়া আক্তার

 

ছবি: সৃজনশীল ভাবনায় মগ্ন আলেয়া বেগম আলো

সৃজনশীল কাজে যুক্ত হলেন কীভাবে?

আলেয়া বেগম আলো : শৈশব থেকেই যে কোনো সৃজনশীল কাজ আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার অবসরে যাওয়া এবং পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে দায়িত্বের গুরুভার আমাকে সৃজনশীল কাজের সুযোগ করে দেয়। তারপর জীবিকার মাধ্যম হয়ে ওঠে প্রকাশনা, প্রুফ রিডিং আর গ্রাফিক ডিজাইনিংসহ সৃজনশীলতার নানা শাখায়। একাদশে পড়ার সময়ই একটা অ্যাড ফার্মে যোগ দিই। নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি ছোট ভাইবোনের পড়াশোনাসহ পরিবারের দায়িত্ব ছিল। আমি আমার বাবা-মায়ের অনেক প্রত্যাশিত সন্তান। কারণ, তাদের বিয়ের ১০ বছর পর কোল আলো করে আমার আগমন ঘটে এই পৃথিবীতে। তাই এই পৃথিবীতে পরিবার আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সব সময়ই চাইতাম সৃজনশীল কোন কাজগুলো আয়ত্তে নিয়ে এলে জীবিকার পথ সুগম হবে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হব। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখে থাকতে পারব। সেই ইচ্ছাই আমার শেখার প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অ্যাড ফার্মে কাজ করার সময়ই নিজের উদ্যোগে গ্রাফিক ডিজাইনিং শিখে নিই।

ছবি: কচি পাতা প্রকাশনীর প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিন

পরবর্তী সময়ে ‘প্রেসক্রিপশন’ নামের একটি ম্যাগাজিনে প্রধান গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে দায়িত্ব পাই। পাশাপাশি বাবা বাসার ঠিকানায় ট্রেড লাইসেন্স করে দেয়। এরপর প্রিন্টিং, ডিজাইন, অ্যাড তৈরি এসব দক্ষতা দিয়ে নিজের অ্যাড ফার্ম করি পাতা ক্রিয়েশন নামে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করি। সেখানে প্রেসের কাজ, বাইন্ডিংয়ের কাজ এসব টেকনিক্যাল বিষয় শিখে নিই। বাংলা একাডেমির সঙ্গে কীভাবে কাজ করতে হয় এসব বিষয় জানতে পারি। এরপর আমার বোন এবং আমি মিলে কচি পাতা নামে শিশু-কিশোরদের জন্য একটা ম্যাগাজিন করি। এই দক্ষতাগুলো কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে শেখার সুযোগ হয়নি। মানুষের সঙ্গে মেশার সহজাত গুণের কারণে একেবারে মাঠপর্যায়ে এ কাজগুলো ধীরে ধীরে আয়ত্ত করে নিয়েছি। এই গুণগুলোই আমাকে প্রকাশক, প্রুফ রিডার ও গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে তৈরি করেছে। এভাবেই এই সৃজনশীল জগতে যাত্রা।

প্রকাশনায় কোন বিষয়গুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন?

আলেয়া বেগম আলো : আমার প্রকাশনাশিল্পে যাত্রা ২০১২ সালে। তবে আমার প্রথম বই বের হয় পাতা ক্রিয়েশন থেকে। তারপর যখন বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন আলাদা প্রকাশনী করি। তাই পাতা ক্রিয়েশন থেকে শুধুই অ্যাড ফার্মের কাজ করা হয়। ম্যাগাজিন হিসেবে আছে কচি পাতা এবং প্রকাশনার কাজ শুরু করি পাতা প্রকাশনীর মাধ্যমে। পাতা প্রকাশনীর যাত্রার দীর্ঘ সময় পর ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমির স্টল পাই। এই দীর্ঘ যাত্রার একটাই কারণ। আমি সব কাজ গুছিয়ে করতে পছন্দ করি। আর প্রকাশনাশিল্পে গোছানো এবং নির্ভুল থাকা খুবই জরুরি।

ছবি: বইয়ের মেলায় প্রকাশকের আনন্দ

 

 

এখানে প্রতিটি ধাপ খুব সতর্কতা নিয়ে এগোতে হয়। যেমন প্রথমে একটা লেখা পাওয়ার পর কম্পোজ করতে হয়। খুব যত্ন নিয়ে লেখাগুলো কম্পোজের পর সময় নিয়ে কয়েকবার প্রুফ দেখতে হয়। এরপর ডিজাইনিংয়ের ধাপ। সেই নির্ভুল লেখাটির সঙ্গে কোন ধরনের ছবি যাবে বা শিশুদের বইয়ে লেখার সঙ্গে কোন ধরনের ইলাস্ট্রেশন যাবে, এগুলো ঠিক করা। প্রচ্ছদ করতে হয়। আমি নিজেও প্রচ্ছদ করি। আমার করা প্রচ্ছদের সংখ্যা শতাধিক। এরপর এটা প্লেট হয়। সেটি ছাপার কাজ শুরু হয়। ছাপার সময় আমার পছন্দ অনুযায়ী রং ঠিক আছে কি না, এগুলো দেখতে হয়। ছাপা শেষ হলে লেমিনেশন করতে হয়। এর গুণাগুণ যেন ঠিক থাকে, অর্থাৎ বাতাস যেন না ঢোকে বা কোনোভাবে যেন নষ্ট না হয়ে যায়, এগুলো দেখতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অ্যাম্বুশ বা ফাইল করার দরকার হয়। এসব শেষে বাইন্ডিংয়ে যায়। এভাবে আরও কিছু ধাপ যত্ন ও সতর্কতা নিয়ে শেষ করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো লেখা নির্ভুল হতে হবে। প্রতিটি প্রক্রিয়া বেশ ভালোভাবে গুছিয়ে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

 

 

কাজে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কোন কোন ক্ষেত্রে?

আলেয়া বেগম আলো : সামাজিক নানা অনুশাসনই নারীদের প্রধান বাধা। কোনো একটা কাজের প্রসঙ্গ এলেই নারী এটা করতে পারবে না বলার প্রবণতা সবচেয়ে ক্ষতিকর। আমারও সেসব বাধা এসেছে। যেহেতু আমি এমন সব সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত, সেসব ক্ষেত্রে একমাত্র পুরুষেরাই উপযুক্ত এমনটা ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু আমি মনে করি সৃজনশীল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের তো কোনো ভেদাভেদ নেই। কাজ তো কাজই। সেখানে কেন এত লিঙ্গবৈষম্য? এ ছাড়া পুরুষের চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে নারীরা। কারণ, আমরা মায়ের জাত। সন্তান গর্ভধারণের মতো প্রাকৃতিক শক্তিও রয়েছে। আমার দুটো সন্তান। একা মানুষ করছি। ঘরে-বাইরে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছি। তবু এখনো আমাদের সমাজ নারীদের সাফল্য মানতে নারাজ। এ ছাড়া একই কাজ শেষ হতে পুরুষেরও দেরি হয়। কিন্তু নারী রাতে দেরি করে ফিরলে ভিন্ন চোখে দেখা হয়। এই যে সামাজিকভাবে পুরুষের তুলনায় নারীরা দুর্বল, অযোগ্য এসব ধারণাগত বিশ্বাসই সারা জীবন ভুগিয়েছে বেশি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে সব ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়েছে যে আমিও পারি।

 

ছবি: বসন্তের সাজে আলেয়া বেগম আলো

সমাজে সমতার লড়াইয়ে নারীদের কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য দেওয়া উচিত?

আলেয়া বেগম আলো : নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে কাজে লাগে, এমন দক্ষতাও শিখতে হবে। কারণ, এগুলো ছাড়া স্বাবলম্বী হওয়া কঠিন। সুন্দর জীবন পেতেও খুব দরকার হয়। আর এর মধ্যে সামাজিক নানা অনুশাসনের বাধা আসবে। সেগুলো অতিক্রমের জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস। নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকলে নারীরাও পুরুষের চেয়ে অনেক ভালো করতে পারে। এর উদাহরণ আমাদের সমাজে রয়েছে। তাই সাহস ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে যে কোনো পদক্ষেপ নিলেই সমতার লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারবে।

সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে

আলেয়া বেগম আলো : আপনাকেও ধন্যবাদ

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

five + one =