সোনামণির সুস্থতায়

করেছে Sabiha Zaman

হঠাৎ করেই যেন গরমের তীব্রতা বেড়েছে। সূর্য তার হৃদয় খুলেছে, বেড়েছে আগুন ঝলসানো রোদ। এ সময় নানা রকম রোগব্যাধি হানা দেয়। তবে শিশুদের নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে বেশি। এ সময় অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হয় যথাযথ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত, সঠিক যত্ন নিলে রোগব্যাধি তাড়া করতে পারে না। লিখেছেন সুরাইয়া নাজনীন।

গরমে শিশুরা ভাইরাসজনিত জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে, যা পাঁচ-সাত দিন স্থায়ী হয়। অনেক সময় বোঝা যায় না, শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত কি না। জ্বর ১০০ ডিগ্রি হলে প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ খাওয়াতে পারো। এ সময় শিশুকে ভারী কাপড়ে না ঢেকে বরং পাতলা জামাকাপড় পরাবে। ঘরের ফ্যান চালিয়ে রাখো।

প্রতিদিন শিশুকে গোসল করাতে হবে। শতভাগ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় জ্বর হলে আমরা শিশুকে গোসল থেকে বিরত রাখি কিন্তু জ্বর হলেও শিশুকে নিয়মিত গোসল দেওয়া উচিত। বললেন বারডেম হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ফাহমিদা রহমান।

তিনি আরও বলেন, এ সময় প্রচুর ডাইরিয়া রোগী দেখা যাচ্ছে। প্রতিবছরই এ সময় শিশুর ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা যায়। শিশুকে বাইরের খাবার একদম দেওয়া যাবে না। গরমে বাইরের খাবার শিশু নিতে পারবে না। এমনকি খুব কম বাইরে বের করতে হবে। বদ্ধ পরিবেশে রাখা যাবে না। ঘরেই খোলামেলা পরিবেশ তৈরি করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, যেন ঘর কোনোভাবে স্যাঁতস্যাঁতে না হয়। এতে রোগব্যাধি বাসা বাঁধে। পর্যাপ্ত পানি খাওয়াতে হবে শিশুকে। অনেকে ছোটবেলায় ডাব খাওয়াতে শুরু করে, কিন্তু এক বছরের আগে শিশুকে ডাবের পানি দেওয়া যাবে না। যদি কোনো রকম কমপ্লিক্যাসি দেখা দেয় শিশুর শরীরে তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়াতে হবে।

গরমে শিশুর চুল যতটা সম্ভব ছোট রাখাই ভালো। এতে চুলের গোড়া ঘেমে গেলেও তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। যেসব শিশুর ঠান্ডার সমস্যা আছে, তাদের চুল কখনোই বড় রাখা উচিত নয়। গোসলের পর চুল ভালোভাবে মুছে দাও। রোদ থেকে ঘরে ফিরেই সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে গোসল করানো থেকে বিরত থাকো।
গ্রীষ্মকালে শিশুকে প্রতিদিনই গোসল করাতে হবে। ঠান্ডা বা সর্দি-কাশির ভয়ে অনেকে সন্তানকে গোসল করাতে চায় না। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে শরীরের ঘাম জমে গিয়ে আরও অসুখ-বিসুখের শঙ্কা থাকে। গোসলের সময় শিশুর গায়ে সাবান দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। তবে শ্যাম্পু বেশি ব্যবহার না করাই ভালো, সপ্তাহে দুদিনই যথেষ্ট। গোসলের পানিতে কয়েক ফোঁটা ডেটল বা নিম তেল মিশিয়ে বাচ্চাকে গোসল করানো ভালো। ডেটল বা নিম তেল মিশিয়ে বাচ্চাকে গোসল করালে তার শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হবে। ফলে সে জীবাণুর আক্রমণ থেকেও রক্ষা পাবে। এ ছাড়া হাত পরিষ্কার রাখার জন্য নিয়মিত তার হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। গোসলের পর শিশুর শরীর ও মাথা ভালো করে মুছে দিয়ে পাউডার লাগানো ভালো। এতে করে ঘামাচির যন্ত্রণা থেকে শিশু থাকবে নিরাপদ। শিশুর ব্যবহৃত প্রসাধনসামগ্রী যেন অবশ্যই ভালো মানের হয়।
গরমে শিশুদের অবশ্যই নরম ও পাতলা সুতি কাপড়ের ঢিলেঢালা পোশাক পরাতে হবে। কেননা, শিশুরা ঘামে বেশি। ঢিলেঢালা পোশাকে বাতাস ঢুকতে পারে, এতে সহজেই ঘাম শুকিয়ে যায়। এ ছাড়া থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরালে আরাম পাবে। অতিরিক্ত গরম পড়লে শিশুকে শুধু সুতির প্যান্ট পরিয়ে রাখতে হবে। এ সময় বাচ্চাকে যথাসম্ভব ঘরের বাইরে না নিয়ে যাওয়াই ভালো। বিশেষ করে তীব্র গরমের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শিশুটিকে ঘরেই ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে রাখার চেষ্টা করো। একান্তই বাচ্চাকে বাইরে নিয়ে যেতে হলে তাকে একটা বড় ক্যাপ বা ছাতার নিচে রেখে তারপর বাইরে নিয়ে যাও। গরমে শিশুর শরীরে কোনো প্রকার তেল মালিশ করা যাবে না। নখ নিয়মিত কেটে ছোট করে দিতে হবে। এতে সে অনেক অসুখ-বিসুখ থেকে রক্ষা পাবে।

শিশুর সুস্থতার জন্য সঠিক সময়ে সঠিক খাবার নিশ্চিত করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আগে থেকে কোনো খাবার তৈরি করে রাখা যাবে না। এমনকি শিশুর দুধটাও তার খাবার সময়টাতেই বানিয়ে দিতে হবে। খুব বেশিক্ষণ আগে বানিয়ে রাখা যাবে না। এতে পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যান্য খাবার তৈরিতে এই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বেশি আগে বানিয়ে রাখা খাবার শিশুর জন্য ভালো নয়। কেননা খাবার এড়াতে বাইরে যাওয়ার সময় শিশুর খাবার তৈরি করে নিয়ে যাওয়া ভালো। সে ক্ষেত্রে খাবার এবং পানি বহন করার জন্য ভালো মানের ফুড গ্রেড প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করতে হবে, যাতে করে খাবারের মান অক্ষুণ্ন থাকে। খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এই সময়টাতে খুব বেশি থাকে। তাই যেকোনো সময় যেকোনো খাবার দেওয়ার আগে একবার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে নিতে ভুলবে না, যে খাবারটা আদৌ ঠিক আছে কি না।
গরমের সময়টাতে মশা, মাছি, পিঁপড়া ইত্যাদি পোকামাকড়ের প্রকোপ দেখা যায়। এগুলো শিশুর অসুস্থতার কারণ হতে পারে। ঘরকে এসব পোকামাকড়মুক্ত রাখতে অ্যারোসল বা অন্য কীটনাশক ব্যবহার করতে পারো। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখবে শিশু যেন কোনোভাবেই এগুলোর নাগাল না পায়। এ ছাড়া ঘরকে পোকামাকড়মুক্ত রাখতে ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ফুলের টবে বা অন্য কোথাও এমনকি বালতিতেও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। কারণ এগুলো ডেঙ্গু রোগবাহী মশার বংশবৃদ্ধিতে সহায়ক। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। শিশু সুস্থ থাকলে বাড়িময় আনন্দ বিরাজ করবে।

মডেল : ইয়োশা কবির প্রসন্ন

ছবি : অয়ন রহমান

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

9 + eighteen =