স্বামী

স্বামীরা কেমন হয়

করেছে Rodoshee Magazine

একবাক্যে বলা কঠিন, স্বামীরা কেমন হয়। একজন স্ত্রীকেই প্রশ্ন করে দেখো না, একবার এক রকম বলবে। গড়ের ওপর একটা হিসাব আছে, এই ফলাফলে স্বামীরা হয় নানা ধরনের। এদের ধরন বলে শেষ করা যাবে না। স্বয়ং নারী এই হিসাবের খাতা খুলে বসলে খেই হারাবে। যদিও বলা হয় নারীর মন বোঝা কঠিন। আবার বলা হয় নারীর মন স্বয়ং ঈশ্বরও বোঝেনি। এবার তাদের যদি বলা হয়, স্বামী কয় প্রকার, কী কী? তাদের উত্তর কী হবে একটু ভাবো। ভাবতে থাকো, ভাবা প্র্যাকটিস করো। তোমার ভাবনাকে আরেকটু সহজ করে দিতে দেওয়া যায়। বিশ্বাস না হয়, দেখো।

১. ভাবখানা এমন যেন অবিবাহিত

বিয়ে করে সংসার পেতেছে। কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই। কথায় বলে মুখ দেখে যায় চেনা। এই সূত্র এখানে যেন বেমানান। আবার তোমার আশপাশেই এমন মানুষ পাবে, যে বিয়ের পরেও আগের মতো থাকে। এই বটগাছ প্রকৃতির স্বামীদের তার সাবেক বন্ধু থেকে শুরু করে নতুন বন্ধু, সবাই যখন-তখন বিপদে-আপদে পাশে পায়। ওদিক থেকে বেচারা স্ত্রী এক ছন্দহীন জীবনযাপন করে। মনে পড়ছে রাশেদ নামের এক যুবকের কথা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে। সুপার আড্ডাবাজ। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো থাকায় কাজের প্রতি প্যাশনটাও কম। বন্ধুদের নিয়ে ঘোরাঘুরি আর আড্ডাবাজি করেই তার সময় কাটত। পড়াশোনা শেষ করার পরও এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। বাবা-মা কোনো উপায় না পেয়ে ছেলেটির বিয়ে দেয়। পরিবারের ধারণা ছিল বিয়ের পর হয়তো এ স্বভাব পরিবর্তন হবে, কিন্তু ‘যে লাউ সেই কদু’। বিয়ের পরও ‘অবিবাহিত স্বামী’র মতো জীবনযাপন করতে থাকে।

এই যখন অবস্থা

স্ত্রী বিশেষ্য নাকি বিশেষণ, তা বলা কঠিন। এ কথা বলা যায়, সে হলো বিশেষ কেউ। তোমার সব ভালো লাগা না লাগার সবটুকু না হোক, অনেক কিছু জানার, ভাগ পাওয়ার অধিকার তার আছে। প্রথমে বিশ্বাস করো, সে তোমার সঙ্গে জীবনপথে চলার শপথ নিয়েছে। তাকে তোমার সঙ্গে নাও।

২. অ্যাসিডিক স্বামী

অ্যাসিডিক শব্দটি শুনতেই যেন কেমন লাগে। যদিও এই প্রকৃতির স্বামীর সংখ্যা কম হবে না। কোনো কোনো স্বামী অল্পতে রেগে ক্ষার হয়। খামখেয়ালিপনা তাদের খুব সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এরা হলো ‘অ্যাসিডিক স্বামী’! এরা বিপজ্জনকও বটে। স্ত্রী যদি কোনো যুক্তিসংগত কথাও বলে কিন্তু সে কথা স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তবেও সে বিস্তর রাগান্বিত ও হিং¯্র হয়ে ওঠে। কারণ অন্তরে তার, অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের ইচ্ছা। যার সঙ্গে একই ঘরে বাস, সেই মানুষটিই যখন অ্যাসিডিক আচরণ করে তখন স্ত্রীর আর লুকানোর জায়গা থাকে না।

এই যখন অবস্থা

‘দুজন মানুষ ঘর করে, ঘর করে আর ছল করে’ গানটা শুনেছ? কেন বলছি জানো, তুমি স্বামী আর তুমি যখন অ্যাসিডিক স্বামীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হও, তখন তারও আর ছল করা ছাড়া উপায় থাকে না। তুমি বরং তার মনের পাঠক হও। জানো স্ত্রী কী চায়। তুমি তার যতটুকু দিতে পারো, দাও। আর যেটুকু দিতে পারো না, কেন পারো না, তা বলো।

৩. বেহায়া স্বামী

শব্দটা কেমন যেন লাগে। যেমনই লাগুক এই বেহায়া শ্রেণির স্বামীর সংখ্যা একেবারে কম নয়। এরা একে নয়, একাধিকে স্বস্তি খোঁজে। শান্তি আর স্বস্তির পার্থক্য বিস্তর ভুলে যায়। বেহায়া স্বামীরা শান্তির খোঁজ করে বাইরে। অর্থকড়ির লগ্নি করে ঘরে ফেরে আর অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রাখে। বেচারা স্ত্রীর একলা আকাশ থমকে যায় এই বেহায়া স্বামীকে ভালোবেসে। তার বেসুর গিটারে সুর উঠেও ওঠে না।

এই যখন অবস্থা

এক সময় তোমার প্রেমে ডুবেছিল তোমার স্বামী। তোমার ভালোবাসায় আসক্ত হয়ে বধূ হিসেবে তোমাকে ঘরে তুলে এনেছিল। সুতরাং তুমি তো একসময় তার মনে ছিলে। হঠাৎ কেন দূরত্ব তৈরি হলো? নিজেকে প্রশ্ন করে কারণগুলো খুঁজে বের করো এবং সমাধান করো। ঘৃণা নয়, তোমার সবটুকু ভালোবাসায় স্বামীকে মুড়িয়ে নাও।

৪. বেরসিক স্বামী

যে স্বামীর স্বভাবে রসবোধের অভাব, এককথায় সে বেরসিক। এমন স্বামীর পাল্লায় যে পড়ে সে-ই জানে হাসির তোলা কত আনায় মেলে। হাসলেও যে হাসির কারণ জানতে চায়। আর এই যৌক্তিক কারণ বর্ণনা করতে করতে স্ত্রী হয়রান হবার জো। এরা কী করে, নিজের জন্মদিনেও স্ত্রীকে একটু তার মতো উদ্্যাপন করতে দেয় না। ধরো, স্ত্রী একতোড়া ফুল কিনে নিয়ে এসেছে দেখেই বলে দিল, ‘এর কী দরকার। ফুল গাছে থাকলেই সুন্দর। আর এত রঙ্গরস আমার পছন্দ না।’ এই হলো। ভালোবাসা তখন গুটিসুটি মেরে থাকে হৃদয়ের ক্যানভাসে।

এই যখন অবস্থা

হাত বাড়াও দাম্পত্য রসবোধ বাড়াও। না হলে স্ত্রীর হৃদয়ের রং নাগালে পাবে না। হুম।

৫. পরজীবী স্বামী

স্বামী পরজীবী মানে অন্যের কাঁধে বসে খাওয়া স্বভাবের যদি হয়, স্ত্রীর জীবন পুরাই ডাল। এরা শ্বশুরবাড়ি গেলে আসার নাম মুখে থাকে না। আত্মীয় বাড়ি-বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। যার তার কাছে টাকা চেয়ে বসে। মুখে আভিজাত্যের গল্প আওড়ায়। বাবার গল্প, দাদার গল্প, পরদাদার গল্প। তার গল্প শুনলে মনে হয় পরিবারে বীরত্বের শেষসীমা নেই। এই স্বামী যে স্ত্রীর ভাগ্যে জোটে, স্বামীর সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে হয় নিজে সম্মান হারায়, না হয় আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে যতদূর পারে নিজেকে আড়াল করে। সংসারে অশান্তি লেগে থাকে। এই পরজীবী স্বামীরা অনেক সময় প্রতারণা করে বসে। এরা আবার স্ত্রী-পাগলও হয়। মানে মানিকজোড় অবস্থা। স্ত্রী যেখানে-সেও সেখানে।

এই যখন অবস্থা

স্ত্রীর মনে ও শরীরে তখন জ্বর। সে বলেও বলতে পারে না। আমাকে ছাড়ো, তুমি অন্য কারও সঙ্গে বাঁধো ঘর।

৬. অবুঝ স্বামী

বিয়ে করেছে কিন্তু এখনো তার শিশুসুলভ আচরণ যায় না। একান্ত গল্পগুলো তার কাছে গভীর গুরুত্ব পায় না কখনো। তারপর আবার দাম্পত্যে ছোটখাটো কোনো সমস্যা হলেও ছুটে যায় বাবা-মায়ের কাছে। স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ বা আলোচনার কোনো প্রয়োজন মনে করে না। এমনকি তাদের দাম্পত্য জীবনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও বাবা-মায়ের দ্বারস্থ হয় সে। কোথাও কোনো ভুল হলে স্ত্রীর সঙ্গে নয় বরং বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে। সময়ের প্রয়োজনে যে নিজেকে একটু বদলাতে হয়, সেদিকে কোনো নজর থাকে না তার।

স্বামীরা এমন হয় না

বিয়ের পর তোমার জীবনের অর্ধেক অংশ তোমার স্ত্রী। তার ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তোমার। জীবনে চলার পথে নানা প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি তোমাকে হতে হবে। স্ত্রী যেহেতু তোমার জীবনের অর্ধেক অংশ, সুতরাং তার সঙ্গে তোমার সমস্যা নিয়ে কথা বলো। তবে হ্যাঁ, জীবনে কিছু কিছু সমস্যা থাকবে যেগুলো অবশ্যই বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করবে। তাই বলে সবকিছু নয়। আর স্ত্রীকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করার কোনো সুযোগ নেই। তোমার জীবনে মা ও স্ত্রী দুজনেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাই দুজনকে আলাদা সম্মান ও বিশ্বাসের জায়গায় রাখো।

স্ত্রীকে বলব

জীবনসঙ্গী হিসেবে তুমি যাকে বেছে নিয়েছ, সে যেহেতু তোমার অপরিচিত, তাই তাকে আগে বোঝার চেষ্টা করো। ভরসার জায়গা তৈরি করো। স্বামী যদি শিশুসুলভ আচরণ করে, তবে তাকে বোঝাও দাম্পত্য জীবনটা তোমার আর তার, একান্তই ব্যক্তিগত। তাই সব বিষয় সবার সঙ্গে শেয়ার করা যায় না, এতে ব্যক্তিত্বে হানি ঘটে।

৭. ভিজিটিং স্বামী

জীবনধারণের জন্য মানুষ কর্মমুখী হয়ে থাকে। আর প্রত্যেক পুরুষকে অবশ্যই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়। স্ত্রী-সন্তান অর্থাৎ পরিবারের অন্য সদস্যদের সুন্দর জীবন উপহার দেওয়ার জন্য কর্মময় একটি জীবন প্রয়োজন। সময় অনেক পাল্টে গেছে। করপোরেট সেক্টরে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এই করপোরেট জীবন সাধারণ জীবনের চেয়ে একটু আলাদা। এখানে কাজটাই মূল বিষয়। পুরোটাই ‘গিভ অ্যান্ড টেক’-এর নিয়মে চলে। এখানে আবেগের মূল্য নেই ঠিক তা নয়, তবে তা গৌণ। করপোরেট জীবনে প্রবেশ করে অনেকেই ‘ভিজিটিং স্বামী’ হয়ে যায়। কারণ, তারা সব সময় বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে সময় দিতে পারে না। কর্মক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করে। তারা বাড়িতে আসে অনেকটা ‘ভিজিট’ করতে। স্ত্রীকে সময় দিতে পারে না। এটা আমাদের সমাজের একটি বাস্তব চিত্র। স্বামীরা এই ত্যাগ স্ত্রী-সন্তানদের ভালো একটি জীবন উপহার দেওয়ার জন্যই মূলত করে থাকে। দিনরাত তারা কঠোর পরিশ্রম করে যায়। এসব স্বামী শুধু স্ত্রীর বস্তুগত প্রয়োজনটাই মেটায়, কিন্তু মানসিক প্রশান্তির জায়গাটা অপূর্ণ থেকে যায়।

এই যখন অবস্থা

স্বামী মশাই তোমাকে বলি যার জন্য করছ চুরি, সে তোমাকে চোর বলছে না তো! সুখ দিতে গিয়ে কি তুমিই হয়ে যাচ্ছো তার অসুখের কারণ। তুমি বরং জানতে চাও তোমাকে সে কী রূপে চায়। আর করপোরেট জীবনের ব্যস্ততা এই আধুনিক জীবনে সংসার ভাঙার একটি কারণ হিসেবেই দাঁড়িয়েছে। সুতরাং তোমাকে কর্মক্ষেত্র আর পরিবার আলাদা করতে হবে। কাজ কর্মক্ষেত্রে থাকবে তা যেন বাসায় না আসে। কারণ তোমার স্ত্রী-সন্তান সারা দিন তোমার পথ চেয়ে বসে থাকে। তারা তোমার সান্নিধ্য প্রত্যাশা করে। তারাও তোমাকে নিয়ে সময় কাটাতে চায়। তাই তাদের আবেগের মূল্য দাও।

৮. রোমান্টিক স্বামী

এরা সিনেমাটিক চরিত্র প্লে করে বসে মাঝে মাঝে। এমন চরিত্র নারীর ভালো লাগার অনেক বড় জায়গা দখল করে থাকে। এই স্বামীরা জানে, কথা, গল্প এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসও আলাদা করে নিবেদনের প্রয়োজন আছে। সংসারে সুখ-দুঃখের মাঝেও এরা যুগল জীবন রাঙিয়ে তোলে অন্য রঙে। জীবনকে আন্দোলিত করে অন্য সুর-তরঙ্গে।

এই যখন অবস্থা

এই স্বামীদের আর কী বলা যায়। তারা তো রাজ্যের রাজা।

৯. প্রোটেকটিভ স্বামী

পথে পথে চলতে চলতে হাত বাড়িয়ে দেয়, স্ত্রীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত থাকে। প্রোটেকটিভ স্বামীরা চায় স্ত্রীকে এমন কিছু করে দিতে, যেন সে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারে। এই প্রজাতির স্বামীরা কথায় কথায় বলতে থাকে ‘আমি না থাকলে তখন কী করবে সোনা’। এই স্বামী তার স্ত্রীকে দেখতে চায় সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে সফল ও মর্যাদাপূর্ণ স্থানে।

এই যখন অবস্থা

এরা যেন হাজার ফুলের মাঝে একটি গোলাপ। হাজার তারার মাঝে একটি চাঁদ। তবে ভালো রাখতে গিয়ে অনেক সময় বাড়াবাড়ি করে ফেলে। বাড়াবাড়িটা একটু কম হলে ভালো।

সব মিলিয়ে স্ত্রীকে বলা যায় : দেওয়া আর নেওয়া, ঘুরিয়ে বললে দেওয়া আর নেওয়া সমান হোক বা না হোক, বিনিময় হয় সময়। জীবন বেঁধেছ যার নামের সঙ্গে, সে তোমার মনে গড়া রাজপুত্র না-ও হতে পারে। খুঁজে দেখো তার ভেতরকার সৌন্দর্য। খুঁজে পাও তোমার জন্য জমিয়ে রাখা ভালোবাসা। মিটে যাবে বদল-না বদলের সবটুকু। আর একটি কথা, তুমি বিশ্বাস করো তো, মানুষ কাছাকাছি আসতে আসতে সে দূরের কিছু নিয়ে আসে। আর দূরে যেতে যেতে সঙ্গে রাখে কাছের একেবারে নিকটের যা কিছু তাই। তুমি তার হৃদয়ের হও। তার পৃথিবীতে নেমে আসো, তার আকাশে ওড়ো। তুমি তোমার হও, তুমি তারও হও। জীবনের প্রতিটি স্তরে মানুষ কিছু না কিছু উপজীব্য, উপলক্ষ করে বাঁচে, তার বাঁচাটা জানো। সে যদি তোমাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তোমার ওপর আস্থা রাখতে পারে তো সবই তোমার।

লেখা : আমিনুল ইসলাম শান্ত

রোদসী/আরএস

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

1 × 4 =