হারিয়ে যাওয়ার চার বছর

করেছে Shaila Hasan

শায়লা জাহান

সময় ১৬ অক্টোবর, ২০১৮; রংপুর জিলা স্কুল মাঠে চলছে ‘শেকড়ের সন্ধানে মেগা কনসার্ট’। কানায় কানায় পূর্ন মাঠের স্টেজ থেকে যখন ভেসে আসলো পরিচিত গানের গীটারের সুর, দর্শকদের উচ্ছ্বাস দেখে কে? সমস্বরে সবাই গেয়ে উঠলো ‘চলো বদলে যাই’ গান। কিন্তু কে জানতো গানের উন্মাদনায় বুঁদ করে রাখা আইয়ুব বাচ্চু তার ঠিক দুদিন পরেই এক আকাশের তারা হয়ে যাবেন।

চট্রগ্রামে জন্ম নেয়া আইয়ুব বাচ্চু, যিনি রক ব্যান্ড এল আর বি’র গায়ক ও গীটারবাদক  হিসেবে পুরো বিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। তাকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতের ধারায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী ও গীটারবাদক বলা হয়। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া তাঁর পক্ষে সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়া এতটা সহজ ছিলোনা। গীটারের প্রতি ছিলো তাঁর অগাধ ভালোবাসা। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে হাতেখড়ি হয় জেকব ডায়াজ নামের এক বার্মিজের কাছে। পরবর্তীতে চট্রগাম কলেজে পড়াকালীন সহপাঠীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ব্যান্ডদল ‘গোল্ডেন বয়েজ’। যা পরে নাম বদলে হয় ‘আগলি বয়েজ’। সেই ব্যান্ডের গায়ক ছিল কুমার বিশ্বজিৎ এবং আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন গিটারিস্ট। ১৯৭৭ সালে তিনি যোগ দেন ফিলিংস নামের একটি রক ব্যান্ডে, যেখানে টানা ৩ বছর জেমসের সাথে কাজ করেছিলেন। আইয়ুব বাচ্চুর অসাধারন গীটার বাজানোর মুগ্ধতায় সোলস ব্যান্ডের নকীব খান তাকে তাদের সাথে যুক্ত হওয়ার অফার দেন। পরবর্তী ১০ বছর তিনি সোলস’এর মূল গীটার বাদক, গীতিকার এবং গায়ক(অনিয়মিত) হিসেবে কাজ করে। ১৯৯০ সালে অবশেষে তাঁর নিজস্ব ব্যান্ড ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’ গঠন করেন, যা পরবর্তী সময়ে ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’ বা সংক্ষেপে ‘এল আর বি’ নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

নিজস্ব ব্যান্ড গঠনের পর তাদের প্রথম কনসার্টটি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কনসার্টটি বামবা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৯২ সালে তারা বাংলাদেশের প্রথম ডাবল অ্যালবামঃ এলআরবি ১ এবং এলআরবি ২ প্রকাশ করে। ব্যান্ডটির ৩য় স্টুডিও অ্যালবাম সুখ, যা বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ রক অ্যালবামগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। আর এতে ছিল সেই কালজয়ী গান ‘চলো বদলে যাই’। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অল্প কয়দিনের মধ্যেই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রক ব্যান্ডের মধ্যে একটি হয়ে উঠে এল আর বি। বাংলাদেশের বাইরে তাদের করা ১ম কনসার্ট ছিল ব্যাংগালোরে। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠান করা তারাই ছিল একমাত্র বাংলাদেশি ব্যান্ড।

শুধু যৌথভাবেই নয়, একক শিল্পী হিসেবেও তিনি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। সোলস’এ থাকাকালীন তাঁর ২টি অ্যালবাম বের হয়েছিল। ‘রক্ত গোলাপ’ ও ‘ময়না’ উভয় অ্যালবামেই মূলত পপ রক গান ছিল। পুরো দেশে ময়না অ্যালবামটির ৬০,০০০ কপি বিক্রি হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে ব্যান্ডের ঘুমন্ত শহরে অ্যালবামের পর নিজের একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’ রেকর্ড করেন। ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘ জেগে আছি একা’ র মত জনপ্রিয় গানের সম্মিলন ছিল এই অ্যালবামটিতে। বরাবরের মত এই অ্যালবামটিও প্রচুর জনপ্রিয় হয়। কারো কারো মতে এটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যালবাম। এক বছরের ভেতরেই এর ৩ লক্ষ কপি বিক্রিত হয়েছিল।

সংগীত জীবনে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অনেক সম্মাননাও পেয়েছেন। ব্যান্ড এল আর বি’র সাথে ৬টি মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কার এবং ১ টি সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস জিতেছেন। ২০০৪ সালে বাচসাস পুরষ্কার জিতেছিলেন সেরা পুরুষ ভোকাল বিভাগে। ২০১৭ সালে টেলি সিনে আজীবন সম্মাননা পুরষ্কার জিতেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি বেশ সুখী ছিলেন। পছন্দের মানুষ ফেরদৌস চন্দনা কে বিয়ে করেছিলেন ১৯৯১ সালের দিকে।

২০১২ সালের দিকে ফুসফুসে পানি জমার কারনে কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসা গ্রহন শেষে পরবর্তিতে সুস্থ হোন। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ বিধি। ২০১৮ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই লিজেন্ড মৃত্যু বরন করেন। আইয়ুব বাচ্চুকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য চট্রগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে স্থাপন করা হয় ‘রুপালী গীটার’ ভাস্কর্য। তিনি হারিয়ে গেছেন ঠিকই কিন্তু মানুষের মনে এক বিরাট অংশ জুড়েই রয়েছে তাঁর অস্তিত্ব।

-ছবি সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

one × three =