সন্তান পড়াশোনা কিংবা চাকরির জন্য দূরে চলে গেছে, নিজের যত্ন নেবেন যেভাবে

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

সন্তান পড়াশোনা, চাকরি কিংবা সংসারের প্রয়োজনে অন্য শহরে বা অন্য দেশে চলে গেলে অনেক বাবা-মায়ের জীবনেই এমন এক শূন্যতা তৈরি হয়। সন্তান ভালো আছে—এই নিশ্চয়তা যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনি তার অনুপস্থিতি প্রতিদিনের জীবনে তৈরি করে এক অদৃশ্য অভাব।


ফোনে কথা হয়, ভিডিও কলে মুখ দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি আসে। তবু স্পর্শ করা যায় না। অসুস্থ হলে মাথায় হাত রাখা যায় না, মন খারাপ হলে পাশে বসা যায় না। উৎসবের দিনে ঘর সাজে, রান্না হয়, কিন্তু কোথাও যেন একটি চেয়ার খালি থেকে যায়।


এই অনুভূতিকে অনেক সময় বলা হয় ‘Empty Nest Syndrome’ বা সন্তান ঘর ছেড়ে যাওয়ার পর তৈরি হওয়া মানসিক শূন্যতা। এটি কোনো রোগ নয়। বরং জীবনের একটি বড় পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় তৈরি হওয়া নানা ধরনের আবেগ—একাকিত্ব, মন খারাপ, উদ্বেগ, উদ্দেশ্যহীনতা কিংবা নিজের প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ার অনুভূতি এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।


সন্তান দূরে গেছে, সম্পর্ক নয়


সন্তান বড় হয়ে নিজের জীবন বেছে নেবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে এই সত্য মেনে নেওয়া সহজ নয়।


বিশেষ করে যেসব মা-বাবার দৈনন্দিন জীবনের বড় একটি অংশ বহু বছর ধরে সন্তানকে ঘিরে ছিল, তাদের জন্য পরিবর্তনটি বেশি কঠিন হতে পারে। সন্তানের পড়াশোনা, খাওয়া, ঘুম, পোশাক, অসুখ-বিসুখ, পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবকিছুর মধ্য দিয়ে যে জীবনটি এতদিন চলেছে, হঠাৎ সেই ব্যস্ততার বড় অংশটিই আর থাকে না।


তখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—‘এখন আমি কী করব?’


এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—সন্তান দূরে গেছে, কিন্তু আপনার জীবন থেমে যায়নি।


সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কমিয়ে নয়, বরং সেই ভালোবাসার সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকেও জায়গা দিয়েই নতুন জীবন শুরু করা যায়।


সারাক্ষণ সন্তানের অপেক্ষায় নয়


সন্তানকে নিয়ে চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। সে ঠিকমতো খাচ্ছে কি না, নিরাপদে আছে কি না, কাজের চাপ কেমন—এসব ভাবনা থাকবেই। কিন্তু যদি সারাদিনের প্রায় পুরোটা সময় ফোনের অপেক্ষায় কাটে, বারবার ফোন করে তার অবস্থান জানতে ইচ্ছে করে, কিংবা সন্তান নিজের মতো করে সময় কাটালে অভিমান তৈরি হয়, তাহলে নিজের অনুভূতিগুলো একটু খেয়াল করা প্রয়োজন।


ভালোবাসা আর নির্ভরতার মধ্যে পার্থক্য আছে।


সন্তানকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখা নয়। বরং এমন একটি সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে দূরত্ব থাকলেও দুজনেরই নিজস্ব জীবন থাকে।


নিজের জন্য আবার সময়


সন্তান ছোট থাকলে অনেক বাবা-মা নিজের শখ, বন্ধুত্ব কিংবা ব্যক্তিগত আগ্রহকে পাশে সরিয়ে রাখেন। সন্তানের প্রয়োজনই হয়ে ওঠে প্রধান।


সন্তান বড় হয়ে নিজের জীবনে ব্যস্ত হলে সেই পুরোনো আগ্রহগুলো আবার ফিরিয়ে আনা যায়।


বই পড়া, গান শোনা, বাগান করা, রান্না শেখা, ছবি আঁকা, ভ্রমণ, শরীরচর্চা কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা শেখা—যে কাজটি করতে ভালো লাগে, সেটির জন্য সময় বের করা যেতে পারে।


এমনকি প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটতে বের হওয়া কিংবা পরিচিত কারও সঙ্গে চা খেতে বসাও হতে পারে নতুন জীবনের শুরু।


কারণ জীবনকে অর্থবহ করতে সবসময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। ছোট ছোট আনন্দও জীবনের ভেতর আলো ফিরিয়ে আনতে পারে।


দাম্পত্য সম্পর্কটাকেও নতুন করে দেখা


সন্তানকে কেন্দ্র করে অনেক দম্পতির সম্পর্কের বড় অংশ চলে যায়। সন্তান বড় হয়ে দূরে গেলে দুজন মানুষ হঠাৎ বুঝতে পারেন, এতদিন তারা মূলত ‘বাবা-মা’ হিসেবেই ব্যস্ত ছিলেন; স্বামী-স্ত্রী হিসেবে নিজেদের জন্য সময় দেওয়া হয়নি। এই সময়টি তাই সম্পর্ককে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগও হতে পারে।


একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া, বাইরে খেতে যাওয়া, পুরোনো দিনের গল্প করা, একসঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাওয়া কিংবা শুধু সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে চা খাওয়া—এগুলো সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে পারে। সন্তান চলে যাওয়ার পর ঘর ফাঁকা হয়েছে, কিন্তু সম্পর্কটিও ফাঁকা হয়ে যেতে হবে—এমন কোনো কথা নেই।


বন্ধুত্বের পরিধি বাড়ান


সন্তান দূরে চলে গেলে নতুন সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করাও জরুরি। আত্মীয়স্বজন, পুরোনো বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা একই আগ্রহের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে।


অনেক মা-বাবা সন্তানকে ঘিরে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে নিজেদের বন্ধুত্বগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন। এখন সেই সম্পর্কগুলো আবার ফিরিয়ে আনার সময়।


মাসে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, কোনো ক্লাবে যুক্ত হওয়া, সামাজিক বা স্বেচ্ছাসেবী কাজে অংশ নেওয়া—এসব একাকিত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে।


সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগেরও দরকার ভারসাম্য


দূরত্ব কমাতে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত ফোন, ভিডিও কল, ছবি ভাগ করে নেওয়া কিংবা বিশেষ দিনে একসঙ্গে অনলাইনে সময় কাটানো যায়। তবে যোগাযোগ যেন দায়িত্ব বা চাপ হয়ে না দাঁড়ায়।


‘কেন ফোন করলে না?’—এর বদলে ‘আজ দিনটা কেমন গেল?’—এই প্রশ্নটি অনেক বেশি আন্তরিক হতে পারে।


সন্তানকে নিজের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জানাতে বাধ্য করার বদলে তার স্বাধীনতাকে সম্মান করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিজের জীবন সম্পর্কেও তাকে জানানো যেতে পারে—আজ কোথায় গিয়েছেন, কী শিখেছেন, কার সঙ্গে দেখা করেছেন।


তাহলে সম্পর্কটি শুধু ‘সন্তান দূরে, মা-বাবা অপেক্ষায়’—এমন একমুখী সম্পর্ক থাকবে না। বরং দুজনের আলাদা জীবন থেকে তৈরি হবে নতুন এক সংযোগ।


নিজের শরীর ও মনের যত্ন নিন


সন্তান দূরে চলে যাওয়ার পর কেউ কেউ নিজের যত্ন নেওয়াও কমিয়ে দেন। নিয়মিত খাওয়া, ঘুম, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা শরীরচর্চা—এসবকে আর অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ নিজের যত্ন নেওয়া স্বার্থপরতা নয়। বরং নিজের জন্য বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত।


একাকিত্ব যদি দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ, ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত উদ্বেগ, কোনো কাজে আগ্রহ না থাকা কিংবা দৈনন্দিন কাজেও অনীহার মতো সমস্যা তৈরি করে, তাহলে বিষয়টিকে হালকা করে দেখা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।


‘আমার আর কেউ নেই’—এই ধারণা বদলাতে হবে


সন্তান জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সন্তানই পুরো জীবন নয়। একজন মা বা বাবা হওয়ার পাশাপাশি আপনি একজন মানুষ—আপনার নিজের পছন্দ আছে, স্বপ্ন আছে, বন্ধুত্ব আছে, সৃজনশীলতা আছে, ভালো লাগা আছে। সন্তানের জন্য আপনি যে জীবন দিয়েছেন, তার অর্থ এই নয় যে সন্তান দূরে গেলে আপনার জীবনের অর্থও শেষ হয়ে যাবে।


বরং এতদিন যে সন্তানকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন, এখন নিজের কাছেও সেই একই স্বাধীনতার সুযোগ দেওয়ার সময়।


সন্তান দূরে থাকুক। নিজের পৃথিবীটাও একটু বড় হোক। সে তার জীবনে ভালো থাকুক, নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক। আর আপনি? আপনিও বাঁচুন—নিজের মতো করে, নিজের আনন্দে। কারণ সন্তানকে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপগুলোর একটি হলো—তাকে উড়তে দেওয়া, আর নিজেকেও মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকতে শেখানো।

sidebar ad